নীলা by Kalidash - অধ্যায় ২০
আমাকে দেখে চাচী আবেগ সামলাতে পারলেন না। শাড়ির আচল দিয়ে ভেজা মাথা-মুখ মুছিয়ে দিলেন। অনেক সময় বুকে চেপে ধরলেন। বুঝতে পারলাম চাচী কাঁদছেন। আমারও চোখে পানি এসে গেল। চাচা আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। চাচার চোখের তারা চকচক করতে লাগল। কান্না থামানোর চেষ্টা করছেন। না পেরে দ্রুত সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলেন। ডাকতে লাগলেন নীলা মা-নীলা দেখে যা কে এসেছে। আমাদের বংশের আলো, প্রদীপ, সিগগির ওঠ। চাচার চেচামেচিতে নীলা ঘুম জড়ানো চোখে আশ্চার্য মানুষটিকে দেখতে নেমে এল। আমাকে দেখে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।চাচা-চাচীর মত কোন উচ্ছ্বাস নেই। কোন আবেগ নেই। শুধু এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। মনে হল আমাকে কত কাল দেখেনি। চোখের তারা স্থির। মাথার চুল এলোমেলো। পরনে হালকা খয়েরী রংঙের স্কাট। আমি দেখতে লাগলাম আমার মানসপ্রিয়াকে। যাকে একটু দেখার জন্য ছুটে আসা। বৃষ্টি থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলাম না। সেই আমার সামনে দাঁড়িয়ে। স্থির। নিশ্চল। দু’জনই বিহ্বল।মনে হল, আমাদের এই দেখা দেখির লগন শেষ হবে না কোন দিন। কিছুক্ষণ পর আমার নীলা সোনার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে গালবেয়ে টপ টপ করে পড়তে লাগল। হাত উঠিয়ে পানি মোছানোর দরকার বোধ করল না।একটু পরে ঠোটে মৃদ হাসি ফুটে উঠল। এই জল ভেজা চোখ, গাল বেয়ে ঝরে পড়া পানি, ঠোটে মৃদ হাসি, এক সাথে এত রূপ আর ক’জনের আছে? আমার সোনা কিছু না বলে আস্তে আস্তে উুপরে উঠে গেল। প্রকৃতি যাকে এত রূপ এক সাঙ্গে দিয়েছে তার কথা বলার কি দরকার?
বেডরুমের স্মৃতি আমার আজও স্পষ্ট মনে আছে। আমি বাথরুম থেকে ফিরে এসে দেখি, এরই মধ্যে নীলা নিজেকে তৈরী করে নিয়েছে। নীল বঙের একটা শাড়ী পরেছে।চুল ব্রাস করেছে। কানে লাল-নীল পাথরের দু’টো দুল। শাড়ীর আচল মেঝে বরাবর নেমে গেছে। ডান হাতে অনেকগুলো কাচের চুড়ি, টুন টুন করে আওয়াজ তুলে বিছানা তৈরী করছে।
আমি বললাম, নীলা কেমন আছ?
বলল, ভাল, এতদিন পরে মনে পড়ল?
আমি বললাম, এতদিন পরে মনে পড়বে কেন? সব সময়ই তো মনে পড়ে।
নীলা কপট রাগ দেখিয়ে বলল, সব সময় না ছাই, চাচা কেমন আছেন, তাই বল। একটা খবর দিলে তো গাড়ী পাঠাতে পারতাম। আমি বললাম, খবর দেবার সময় পেলাম কোথায়? তোমার চিঠি পড়ে আমার মাথা খারাপ হবার উপক্রম হল। ভাবলাম, আমার সম্পদ কেউ চুরি করবে হয়ত! তাই পাহারা দিতে এলাম। বাবাকে হালকা নোনিশ দিয়েছি মাত্র।
নীলা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একটা স্বর্গীয় পরী আমাকে দেখছে। আস্তে আস্তে নীলার একটা হাত ধরলাম। ও কেঁপে উঠল। মনে হল যেন, বৃষ্টিতে ও ভিজে ঠান্ডাহয়ে যাচ্ছে। চোখের তারা জ্বলজ্বল করছে। আমি নিজেকে সামলাতে পারলাম না।বুকের ভিতর টেনে নিলাম। আদর করলাম। অনেক সময় জড়িয়ে থাকলাম দু’জন। একসময় নীলা বলল, ঠিক আছে আর না। এবার একটু বিশ্রাম কর। সারা রাত জার্নি করে এসেছ।তার উপর আবার ভিজেছ, অসুখ বিশুখ বেধে যেতে পারে। তখন আমার দায়িত্ব বেড়ে যাবে। আমি বললাম, তাহলে তো বেঁচে যাই। তোমার ছোয়ায় ছোয়ায় মরে যাব। রাগী ভাবে নীলা বলল, ছিঃ- এসব কি বল, বলত? তুমি শোও। আমি চা-আনতে যাচ্ছি। চা না কপি খাবে বলত? আমি বললাম, তোমার হাতের চা, কপি, পরটা সব খাব, নিয়ে এস। আমি বিছানায় শুয়ে পড়লাম।