২টি ছাদ ও কয়েকটি বিকেল... - অধ্যায় ৭
পর্ব ৭
রাত অনেকটাই নেমে এসেছে। পাড়ার দোকানপাট একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। দিনের শেষে যে সামান্য শব্দগুলো চারদিকে ভেসে থাকে—কোথাও থালা ধোয়ার শব্দ, কোথাও দূরের কোনো বাড়িতে টিভির আওয়াজ, কোথাও কোনো বাচ্চার কান্না—সেগুলোও ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে। রাস্তার বাতিগুলো কুয়াশার মতো ম্লান আলো ছড়িয়ে রেখেছে চারদিকে। আলো আছে, কিন্তু শক্ত নয়; যেন অন্ধকারের সাথে লড়াই করার শক্তিটুকুও তাদের নেই। এই সময়টায় সাধারণত এই এলাকায় আর তেমন কেউ থাকে না। দিনের ব্যস্ততা শেষ হলেই সবাই দ্রুত বাড়ি ফিরে যায়।
কিন্তু রহিম চাচা এখনো তার ছোট্ট দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। দোকানটা খুব বড় কিছু নয়—টিনের ছাউনি, সামনে কাঠের বেঞ্চ, একটা পুরোনো চুলা আর কাচের বয়ামে রাখা বিস্কুট। তবুও এই ছোট দোকানটাই তার পুরো পৃথিবী। এখানেই তার দিনের শুরু, এখানেই দিনের শেষ। তিনি টিনের ঝাঁপটা ধীরে ধীরে নামিয়ে তালা লাগাচ্ছেন। কাজটা খুবই সাধারণ, বছরের পর বছর ধরে প্রতিদিনই তিনি এই কাজটা করে আসছেন। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যেন এই সাধারণ কাজটাও একটু বেশি সময় নিচ্ছে। তালাটা লাগিয়ে আবার টেনে দেখেন, আবার লাগান, আবার একটু দাঁড়িয়ে থাকেন। যেন ঝাঁপটা বন্ধ হলেই তাকে একা একটা অন্ধকার রাস্তা ধরে হাঁটতে হবে, আর সেই অন্ধকারে কি অপেক্ষা করছে তিনি জানেন না।
কিছুদিন আগেও এই দোকানটা সন্ধ্যার পর সবচেয়ে জমজমাট জায়গা ছিল। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠত, বেঞ্চে বসে মানুষ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করত, ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে চিৎকার করত। কেউ হেসে উঠত, কেউ গালাগালি করত, আবার পাঁচ মিনিট পর সবাই একই কাপ থেকে চা খেত। সেই আড্ডাগুলোর মাঝখানে বাপ্পি সবসময় থাকত। ছেলেটা যেন এই দোকানের প্রাণ ছিল। চা বানাতে বানাতে সে খদ্দেরদের সাথে গল্প করত, কারো সাথে তর্ক লাগলে গলা চড়িয়ে বলত—“এইটা কিন্তু ভুল কইতেছেন চাচা!” আবার একটু পরে নিজেই হেসে ফেলত। রহিম চাচা মাঝে মাঝে মজা করে বলতেন, “তুই যদি একটু কম ঝামেলা করতি, দোকানটা একদিন তোকে দিয়ে দিতাম।” বাপ্পি হেসে বলত, “তাহলে তো আপনি বেকার হয়ে যাবেন চাচা।”
কিন্তু সেই হাসিগুলো এখন যেন অন্য জীবনের গল্প। শামসুর মারা যাওয়ার পর থেকে পাড়াটা অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে। আগে রাত হলেই কোথাও না কোথাও ঝগড়া, মোটরসাইকেলের গর্জন বা চিৎকার শোনা যেত। এখন সেসব নেই। অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এসেছে। কিন্তু সেই নীরবতা শান্তির না—বরং আরও ভয়ের। কারণ সবাই জানে, গল্পটা এখনো শেষ হয়নি। বাপ্পি এখন জেলে। যে ছেলেটা একসময় এই দোকানে বসে চা বানাত, সেই ছেলেটাই এখন খুনের আসামি। মাঝে মাঝে রহিম চাচা ভাবেন—ঘটনাটা কি সত্যিই এমন হওয়ার কথা ছিল? বাপ্পি কি সত্যিই খুনি? নাকি সে শুধু একটা ভুল মুহূর্তে ভুল জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েছিল?
তালা লাগিয়ে তিনি ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করলেন। বাড়ি খুব দূরে নয়, তবুও এখন এই পথটা অদ্ভুতভাবে দীর্ঘ মনে হয়। গলির মুখে ঢুকতেই তিনি টের পেলেন বাতাসটা যেন একটু ভারী। ঠিক তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—“কেমন আছেন রহিম চাচা?” কণ্ঠটা শুনেই তার বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি থেমে গেলেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা ছায়া বেরিয়ে এল। রকি।
যে ছেলেটা শামসুর মারা যাওয়ার রাতেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল।
রহিম চাচার গলা শুকিয়ে গেল। রকি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল। তার মুখে একটা ঠান্ডা হাসি। হঠাৎ সে খুব দ্রুত এগিয়ে এসে রহিম চাচার তলপেটে একটা ছুরি ঠেকিয়ে দিল। ধাতব ঠান্ডা স্পর্শে রহিম চাচার শরীর কেঁপে উঠল।
“ভয় পাবেন না চাচা,” রকি ফিসফিস করে বলল। “এখনো কিছু করিনি।”
তার চোখের দৃষ্টি ছিল ভয়ঙ্কর ঠান্ডা। যেন কোনো আবেগ নেই সেখানে। সে খুব ধীরে বলল, “একটা কথা বলতে এসেছি। আদালতে কি বলবেন, সেটা ভালো করে ভেবে বলবেন।”
রহিম চাচা কিছু বললেন না। তার বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা এত জোরে ধকধক করছিল যে মনে হচ্ছিল রকি হয়তো শুনতে পাচ্ছে।
রকি বলল, “যদি বলেন বাপ্পি শামসুর ভাইকে মেরেছে—তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু যদি বাপ্পিকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যা বলেন…”
সে ছুরিটা একটু চাপ দিল।
“তাহলে কিন্তু ভালো হবে না।”
তারপর যেন হঠাৎ কিছু মনে পড়ল। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “শুনেছি আপনার বউ মা হতে চলেছে।”
এই কথাটা শুনে রহিম চাচার বুকটা ধক করে উঠল। মমতা দুইদিন আগে খুব লজ্জা আর আনন্দ নিয়ে তাকে বলেছিল—“তুমি বাবা হতে যাচ্ছো।” সেই মুহূর্তে রহিম চাচার মনে হয়েছিল, জীবন হয়তো আবার একটু ভালো হতে পারে। কিন্তু এখন সেই খবরটাই যেন ভয় হয়ে দাঁড়াল।
রকি ঠান্ডা গলায় বলল, “নতুন বাচ্চা আসবে। সুন্দর সংসার। তাই না চাচা?”
তারপর ফিসফিস করে বলল, “সাবধানে কথা বলবেন আদালতে।”
রকি ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। রহিম চাচা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তার মাথার ভেতর একটা প্রশ্ন ঘুরছে—সত্য বলবেন, না সংসার বাঁচাবেন?
ঠিক সেই সময় শহরের অন্য প্রান্তে একেবারে অন্য এক সকাল শুরু হচ্ছিল। ঢাকার ধানমন্ডির এক পুরোনো কিন্তু অভিজাত বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সাইফ রহমান। বাড়িটার সামনে একটা বড় আমগাছ, ভোরের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে বারান্দায় পড়ছে। সাইফের হাতে একটা কফির মগ, কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে গেছে সে সেটা খায়নি। সে যেন কফির স্বাদও টের পাচ্ছে না। তার চোখ আকাশের দিকে, কিন্তু মন অন্য কোথাও।
সাইফ রহমান ছোটবেলা থেকেই একটু আলাদা ধরনের ছেলে ছিল। তার বাবা রাশেদ রহমান ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা—কঠোর নিয়মানুবর্তী মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন জীবনে সফল হতে হলে নিয়মই সবচেয়ে বড় শক্তি। সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে ওঠা, নিয়ম করে পত্রিকা পড়া, সময়মতো অফিস, সময়মতো খাবার—সবকিছু নির্দিষ্ট। তিনি কখনো খুব বেশি আবেগ দেখাতেন না। সাইফ যখন কলেজে প্রথম হয়েছিল, তখন তিনি শুধু বলেছিলেন, “ভালো করেছো। কিন্তু আরও ভালো করতে হবে।”
অন্যদিকে সাইফের মা সুলতানা রহমান ছিলেন একেবারে অন্যরকম মানুষ। নরম, আবেগী, পরিবারের প্রতি ভীষণ যত্নশীল। সাইফ ছোটবেলায় অসুস্থ হলে তিনি রাত জেগে বসে থাকতেন। মাঝরাতে ছেলেটা ঘুম ভেঙে গেলে তাকে কোলে বসিয়ে গল্প বলতেন। এই দুই ভিন্ন স্বভাবের মানুষের মাঝেই সাইফ বড় হয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই সে খুব শান্ত ছিল। অন্য বাচ্চাদের মতো খুব হৈচৈ করত না। কলেজে তার খুব বেশি বন্ধু ছিল না, কিন্তু তার ফলাফল সবসময় ভালো ছিল। শিক্ষকরা বলতেন—ছেলেটা খুব চিন্তাশীল।
সাইফের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরটা খুব শান্ত, স্বাভাবিক, এমনকি রুটিনময়ই বলা যায়। সে ছিল চুপচাপ, মিতভাষী, নিজের মধ্যে ডুবে থাকা ধরনের ছেলে। ক্লাস করে, লাইব্রেরিতে বসে বই পড়ে, তারপর বাসায় ফিরে যেত—জীবন যেন একধরনের স্বাভাবিক ছন্দে চলছিল। বন্ধু ছিল, কিন্তু খুব ঘনিষ্ঠ কেউ না। মানুষজন তাকে ভদ্র, শান্ত, একটু দূরের মানুষ হিসেবেই চিনত। যেন তার চারপাশে অদৃশ্য কোনো দেয়াল তৈরি হয়ে গেছে, যা তাকে বাইরে থেকে দেখা হলেও স্পর্শ করা যায় না।
আরিবার সাথে তার প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল এক বিকেলের লাইব্রেরিতে। বৃষ্টি পড়ছিল, জানালার কাঁচে ফোঁটা পড়ার শব্দ বাতাসে মিশে গিয়েছিল। সাইফ কোণের একটি টেবিলে বসে একটি মোটা বই পড়ছিল। খোলা নোটবুক, কলম হাতে, কিন্তু তার মন পুরোপুরি বইয়ের ভেতরে হারিয়ে গেছে। হঠাৎ কেউ এসে তার টেবিলের সামনে দাঁড়াল। “একটু বসতে পারি?” কণ্ঠটা মিষ্টি, আর হাসিটা স্বাভাবিক। সাইফ অবাক হয়ে মাথা নাড়ল। “জি… বসুন,” বলল সে।
মেয়েটির নাম আরিবা। ভিজে চুল, চোখে ক্লান্তি, মুখে উজ্জ্বলতা—সবকিছুই এমন যেন সাইফের শান্ত জীবনটাতে হঠাৎ আলো ঢেলে দিয়েছে। প্রথম দিন তাদের কথোপকথন খুব বেশি হয়নি। তারা শুধু পড়াশোনা করেছে, বই নিয়ে চোখে চোখ রেখেছে, মাঝে মাঝে ছোট মন্তব্য করেছে—বৃষ্টি, লাইব্রেরি, শিক্ষক, ক্যাম্পাসের সাধারণ ঘটনা নিয়ে। তবুও সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতেই একটা অদৃশ্য বন্ধন গড়ে উঠেছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দেখা বেড়েছে। কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো ক্যান্টিনে, কখনো ক্লাসের করিডোরে। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। আরিবা ছিল জীবন্ত, প্রাণবন্ত, কথা বলার আনন্দে ভরা। সে ছোট ছোট বিষয়কেও হাসি খুঁজে পেত। একদিন ক্যান্টিনে বসে চা খাচ্ছিল তারা, আরিবা হঠাৎ বলল, “তুমি সবসময় এত সিরিয়াস থাকো কেন?” সাইফ ভ্রু কুঁচকাল। “আমি সিরিয়াস?” “হ্যাঁ। মনে হয় যেন তুমি সবসময় কোনো বড় দায়িত্ব নিয়ে ঘুরছ,” আরিবা হেসে বলল। সাইফ হালকা করে হাসল, “আমি তো শুধু পড়াশোনা করছি।” আরিবা চুপচাপ তাকাল, তারপর বলল, “না, তোমার চোখের ভেতর বোঝা যায় অনেক কিছু ঘুরছে।” সেই মুহূর্তে সাইফ প্রথমবার অনুভব করল যে কেউ সত্যিই তার ভেতরের জগৎটা পড়তে পারছে।
ক্যাম্পাসের পেছনে বড় গাছের তলে তাদের জন্য একটা ছোট জায়গা হয়ে উঠল। তারা সেখানে বসত, কখনো পড়াশোনা করত, কখনো শুধু একে অপরের সাথে গল্প করত। এক বিকেলে, আরিবা হঠাৎ প্রশ্ন করল, “তুমি কি কখনো কাউকে খুব মিস করেছ?” সাইফ কিছুক্ষণ চুপ করল, “হয়তো না।” “তাহলে তুমি জানো না, কাউকে মিস করা কত অদ্ভুত অনুভূতি।” সে হেসে বলল, “কারণ তখন মানুষটা সামনে না থাকলেও মনে হয় সে ঠিক পাশেই আছে।” সাইফ কিছু বলেনি, কিন্তু সেই দিন তার ভেতরে একটা অদৃশ্য অনুভূতি জেগে উঠল।
সময়ের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল। তারা একসাথে নোট তৈরি করত, পরীক্ষা নিয়ে চিন্তা করত, ক্যাম্পাসের নতুন খাবারের দোকান ট্রাই করত। কখনো কখনো শুধু হাঁটত—কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য ছাড়া। আরিবা তার সঙ্গে ছোটখাটো তর্ক করত, হেসে বলত, “তুমি এত ধীরে কথা বলো কেন?” সাইফ হাসত, “তুমি এত দ্রুত কথা বলো কেন?” এই ছোটখাটো মুহূর্তগুলোই তাদের ভালোবাসাকে ধীরে ধীরে গভীর করে তুলছিল।
কিন্তু সুখের সময়গুলো কখনো কখনো খুব দ্রুত শেষ হয়। এক সন্ধ্যায় আরিবা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। খবরটা পৌঁছতেই সাইফের পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে যায়। সে হাসপাতালে ছুটে যায়, করিডরের সাদা আলো, ডাক্তারদের ব্যস্ত মুখ—সবকিছু যেন দূরের দৃশ্য। কেউ বলে, “আমরা দুঃখিত…” কিন্তু সাইফ ঠিক শুনতে পারে না। সেই মুহূর্তে যেন তার ভেতরের এক অংশ ছিঁড়ে বের হয়ে যায়।
এরপরের কয়েক মাস সাইফের জীবন একদম নিস্তব্ধ। সে ক্লাসে যায় না, বন্ধুদের ফোন ধরতে চায় না। রাতের অন্ধকারে বারান্দায় বসে থাকে। মাঝে মাঝে তার হাতে পুরনো নোটবুক থাকে, যেখানে আরিবার লেখা কিছু লেখা। সময় কেটে যায়, কিন্তু ক্ষত থেকে যায়। মানুষ বেঁচে থাকে, তবে স্মৃতি কখনো মুছে যায় না।
ধীরে ধীরে সাইফ নিজেকে কাজে ডুবিয়ে রাখে। ব্যাংকের চাকরিতে ঢুকে দক্ষ হয়ে ওঠে। সহকর্মীরা তাকে সম্মান করে, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে সে দূরত্ব বজায় রাখে। জীবনের সেই উজ্জ্বল মুহূর্তগুলো—লাইব্রেরির বৃষ্টি, ক্যাম্পাসের পুরনো গাছ, আরিবার হাসি—সবকিছু যেন অদূরের কোনো স্মৃতিতে পরিণত হয়। তবে সেই স্মৃতি তাকে কখনো ভুলে যেতে দেয় না, এবং সেই আলো এখনও কোথাও তার ভেতরে ম্লানভাবে জ্বলছে, অপেক্ষা করছে নতুন জীবনের জন্য। তার বাবা মা বহুবার বিয়ের কথা বলেছেন, কিন্তু সে সবসময় এড়িয়ে গেছে।
অবশেষে নীলার সাথে তার বিয়ের কথা ওঠে। সে খুব আপত্তি করেনি। ভেবেছিল—এটাই হয়তো ঠিক পথ। কিন্তু নীলাকে প্রথম দেখেই সে বুঝেছিল—মেয়েটার চোখে অন্য কারো নাম লেখা আছে। সেই নাম রাফি।
তারপর শুরু হয় আদালতের দিনগুলো। সেখানে সে শিউলিকে দেখে—একটা আলাদা ধরনের মেয়ে। সরাসরি কথা বলে, কোনো ভয় নেই। একদিন শিউলি তাকে বলেছিল, “আপনি খুব অদ্ভুত মানুষ।”
সাইফ হেসে জিজ্ঞেস করেছিল, “কেন?”
শিউলি বলেছিল, “আপনার বিয়ে ঠিক হয়েছে নীলার সাথে। অথচ নিজেই তাদের একা থাকতে দেন।”
সাইফ বলেছিল, “মানুষকে সুখী হতে সাহায্য করা খারাপ নাকি?”
শিউলি তখন শান্ত গলায় বলেছিল, “কিন্তু নিজের সুখ?”
সেই প্রশ্নটা আজও সাইফের মাথার ভেতর ঘুরছে। ড্রয়িংরুম থেকে রাশেদ ডাকলেন। কিছুক্ষন পর সাইফ ভেতরে ঢুকল। তার বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “আজও আদালতে যাবে?”
সাইফ মাথা নাড়ল।
তার মা ধীরে বললেন, “নীলার ব্যাপারটা কি ভেবেছ?”
সাইফ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “হয়তো একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসে গেছে।”
আর সেই মুহূর্তে তার মনে হলো—তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তটা খুব শিগগিরই তাকে নিতে হবে। কারণ একদিকে আছে একটা ঠিক হয়ে যাওয়া সম্পর্ক, আর অন্যদিকে আছে এক নতুন অনুভূতি—যেটা বহু বছর পর তার হৃদয়কে আবার জাগিয়ে তুলছে।
(চলবে...)