২টি ছাদ ও কয়েকটি বিকেল... - অধ্যায় ৯
পর্ব ৯:
সকালের আলোটা সেদিন অদ্ভুতভাবে নরম ছিল। এমন না যে দিনটা বিশেষ কোনো কারণে আলাদা, তবু চারপাশে একটা অচেনা স্থিরতা ছড়িয়ে ছিল। রাস্তায় রিকশা চলছে, একটার পর একটা, ঘণ্টার টুংটাং শব্দ যেন শহরের সকালের পরিচিত সুর। ফুটপাত ধরে মানুষজন হাঁটছে—কারও হাতে অফিস ব্যাগ, কারও হাতে বাজারের থলে। দূরে একটা চায়ের দোকানে কেটলির ঢাকনা ঠকঠক করে উঠছে, ধোঁয়া উঠছে ধীরে ধীরে। সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক, তবু এই স্বাভাবিকতার ভেতরেও কোথাও একটা চাপা অস্বস্তি লুকিয়ে আছে—যেন প্রত্যেকে নিজের ভেতরে একটা অদৃশ্য বোঝা বয়ে নিয়ে হাঁটছে, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাকে ভারী করে রাখে।
শিউলি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে একটা মগ, চা অনেকক্ষণ আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে খেয়ালই করেনি। তার চোখ নিচের রাস্তায়, কিন্তু মন যেন অন্য কোথাও। মানুষগুলোকে দেখতে দেখতে তার মনে হচ্ছিল—প্রতিটা মুখের পেছনে একটা গল্প আছে। কেউ হয়তো চাকরির দুশ্চিন্তায় আছে, কেউ পরিবারের চাপ নিয়ে, কেউ হয়তো ভালোবাসার টানাপোড়েনে। বাইরে থেকে সবকিছুই এত সহজ, এত স্বাভাবিক লাগে—কিন্তু ভেতরে ভেতরে জীবন কখনোই এত সহজ না।
সে নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হালকা বাতাস এসে তার চুল উড়িয়ে দিল, কিন্তু সেই বাতাসেও যেন স্বস্তি নেই। যেন শহরটা আজ একটু বেশি চুপচাপ, একটু বেশি ভারী।
ভেতর থেকে তার বাবার কাশি শোনা গেল। শব্দটা খুব জোরে না, কিন্তু এমন যে শুনলেই বোঝা যায়—ক্লান্তি আছে সেখানে। শিউলি একটু চমকে উঠল, যেন নিজের ভাবনা থেকে হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এল। সে দ্রুত ভেতরে ঢুকে গেল।
ড্রয়িংরুমের পাশে ছোট্ট একটা কাজের ঘর। সেখানে টেবিলের ওপর ফাইল ছড়িয়ে বসে আছেন মাসুদ রহমান। চশমাটা নাকের ডগায় নেমে এসেছে, চোখ দুটো লালচে ক্লান্ত। সামনে কাগজের স্তূপ—বাপ্পির কেসের নথি, সাক্ষ্য, রিপোর্ট, আইনগত ধারার কপি। একটা কলম তার হাতে, কিন্তু কিছুক্ষণ ধরে তিনি একই জায়গায় তাকিয়ে আছেন।
শিউলি চুপচাপ পাশে এসে দাঁড়াল। কিছু বলল না। সে জানে, এই সময়ে তার বাবা সাধারণত কথাবার্তা পছন্দ করেন না। কিন্তু আজকে সে লক্ষ্য করল—তার বাবার হাতটা খুব সামান্য কাঁপছে। এতটাই সামান্য যে অন্য কেউ হয়তো খেয়ালই করত না, কিন্তু তার চোখ এড়াল না।
“বাবা,” সে আস্তে করে ডাকল।
মাসুদ রহমান মাথা তুললেন না। শুধু বললেন, “চা ঠান্ডা হয়ে গেছে?”
কথাটা এমনভাবে বললেন, যেন সবকিছু স্বাভাবিক। যেন কোনো অস্থিরতা নেই।
শিউলি হালকা হাসল। “হ্যাঁ। আবার করে দিই?”
“না, থাক,” তিনি বললেন। “এখন এসবের দিকে মন নেই।”
এই ‘এসব’ কথাটার ভেতরে কত কিছু লুকিয়ে আছে—শিউলি সেটা বোঝে। শুধু চা না, স্বাভাবিক জীবনটাই যেন এখন তাদের কাছে ‘এসব’ হয়ে গেছে। খাওয়া, ঘুম, ছোট ছোট কথা—সবকিছুই যেন এখন গুরুত্বহীন।
কিছুক্ষণ নীরবতা। ঘরের ঘড়িটার টিকটিক শব্দটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
তারপর হঠাৎ মাসুদ রহমান নিজেই বললেন, “তুই কি জানিস, আইন আর ন্যায়—এই দুইটা জিনিস এক না?”
শিউলি কিছু বলল না। সে জানে, এই প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর নেই।
“আইন কাগজ দেখে,” তিনি ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন। “প্রমাণ দেখে। সাক্ষী দেখে। কিন্তু ন্যায়? সেটা মানুষের ভেতরে থাকে। অনেক সময় আইন জিতে, কিন্তু ন্যায় হেরে যায়।”
তার গলায় একটা গভীর ক্লান্তি। বহু বছরের অভিজ্ঞতা, অনেক না-পারা, অনেক না-বলা কথার ভার যেন জমে আছে সেখানে।
শিউলি আস্তে করে বলল, “তাহলে আপনি লড়ছেন কেন?”
প্রশ্নটা বাতাসে ঝুলে রইল। মাসুদ রহমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন। চোখ দুটো কিছুটা ভেজা মনে হল, যদিও তিনি সেটা আড়াল করার চেষ্টা করলেন।
“কারণ আমি আগেও হেরেছি,” তিনি বললেন। “অনেক বছর আগে… একটা কেস ছিল। আমি জানতাম লোকটা নির্দোষ। কিন্তু প্রমাণ করতে পারিনি। কোর্ট তাকে দোষী সাব্যস্ত করল।”
শিউলি নিঃশব্দে শুনছে।
“সে জেলে গেল,” তিনি বললেন। “আমি শুধু দাঁড়িয়ে দেখলাম।”
তার চোখে তখন দূরের একটা দৃষ্টি। যেন সেই পুরনো দিনের দিকে ফিরে গেছেন।
“তারপর?” শিউলি খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল।
তিনি হালকা হাসলেন। সেই হাসির ভেতরে ব্যথা লুকানো।
“তারপর আর কিছু না। কিছু বছর পরে শুনলাম লোকটা জেলেই মারা গেছে। তখন বুঝলাম—সব হারানোর পর মানুষ আর কিছু নিয়ে বাঁচতে পারে না।”
ঘরের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল। যেন বাতাসও থমকে গেছে।
“এইবার আমি হারতে চাই না,” তিনি খুব ধীরে বললেন।
শিউলি তার বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হল—মানুষ আসলে শুধু অন্যের জন্য লড়ে না, নিজের ভেতরের অপরাধবোধের সাথেও লড়ে।
মাসুদ সাহেব উঠে যাওয়ার সময় বললেন, "তোর ওই ফ্রেন্ড নীলার খবর কি? বিয়েটা কার সাথে করবে? শুনলাম রাফির নাকি চাকরি হয়েছে।"
শিউলি- আমি অত কিছু জানিনা বাবা। শুধু এটা জানি কোন কিছু আর আগের মত নেই।
বাবা- নীলা হয়তো আগে এমন ছিল না। তুইও তো আগের মত নাই।
---
নীলা আগে এমন ছিল না—এই কথাটা শিউলির মাথায় এখন প্রায় প্রতিদিনই ফিরে আসে। একসময় এই মেয়েটা যেন চারপাশে আলো ছড়িয়ে দিত। ক্লাসে ঢুকেই হাসত, ছোট ছোট বিষয় নিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়ত, কখনো হুট করে কোনো মজার গল্প শুরু করত, আর আশেপাশের মানুষগুলো অজান্তেই সেই গল্পের অংশ হয়ে যেত। কিন্তু এখন যেন সেই আলোটা কোথাও গিয়ে নিভে গেছে। নীলা কথা বলে, কিন্তু খুব কম। হাসে, কিন্তু সেটা যেন মুখে আটকে থাকা একটা অভ্যাস, ভেতর থেকে আসা কোনো অনুভূতি নয়। তার চোখের নিচে হালকা কালি পড়েছে, আর তার ভেতরে যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়েছে—যার ভেতরে কেউ ঢুকতে পারে না।
সেদিন কলেজে যাওয়ার পথে রিকশায় বসে শিউলি বারবার নীলার দিকে তাকাচ্ছিল। রাস্তায় আগের মতোই ভিড়, হর্নের শব্দ, মানুষের তাড়াহুড়ো—সবকিছু একই আছে, কিন্তু তাদের দুজনের মাঝখানে একটা চাপা নীরবতা জমে ছিল। এই নীরবতা শুধু কথার অভাব না, এটা এমন এক দূরত্ব, যা একই জায়গায় বসে থেকেও তৈরি হয়। শিউলি বুঝতে পারছিল—নীলা তার পাশে আছে, কিন্তু তার মন অনেক দূরে কোথাও আটকে আছে, এমন এক জায়গায় যেখানে সে একা।
কলেজের গেটে ঢোকার সময় শিউলি একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। সে হালকা গলায় বলল, “আজ ক্লাসে যাবি তো?” প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে একটা উদ্বেগ লুকিয়ে ছিল। যেন সে জানতে চাইছে—“তুই ঠিক আছিস তো?”
নীলা একটু তাকাল তার দিকে। সেই দৃষ্টিটা ক্লান্ত, নিস্তেজ। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে শুধু মাথা নাড়ল। কোনো বাড়তি কথা নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই। যেন তার ভেতরে এত কিছু জমে আছে যে, সে আর শব্দ খুঁজে পায় না।
ক্লাসরুমে ঢুকে তারা আগের মতোই পিছনের বেঞ্চে বসল। এই বেঞ্চটা তাদের অনেক দিনের—এখানে বসে তারা একসাথে কত গল্প করেছে, কত হাসাহাসি, কত পরিকল্পনা। আজ সেই একই জায়গা, কিন্তু পরিবেশটা পুরো আলাদা। ম্যাডাম বোর্ডে লিখছেন, ক্লাস নিচ্ছেন, ছাত্রছাত্রীরা খাতায় নোট নিচ্ছে। সবকিছু খুব স্বাভাবিক, নিয়মমাফিক। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই নীলার মন যেন কোথাও নেই। সে খাতার দিকে তাকিয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু কিছু লিখছে না। তার চোখ যেন বোর্ডের ওপর দিয়ে কোথাও দূরে চলে যাচ্ছে।
হঠাৎ ম্যাডামের কণ্ঠ ভেসে এল, “নীলা, তুমি বলো তো—এই প্রশ্নের উত্তর কী?”
এই ডাকটা যেন হঠাৎ করে তাকে বাস্তবে টেনে আনল। নীলা চমকে উঠল, ধীরে ধীরে দাঁড়াল। পুরো ক্লাসের চোখ এখন তার দিকে। কিন্তু তার মাথা যেন ফাঁকা। শব্দগুলো সে শুনছে, কিন্তু তার অর্থ ধরতে পারছে না। যেন তার ভেতরে কোনো সংযোগ কাজ করছে না। কয়েক সেকেন্ড সে দাঁড়িয়ে রইল—নিঃশব্দ, স্থির। ক্লাসের ভেতরে ফিসফাস শুরু হলো। কেউ কেউ তাকিয়ে আছে কৌতূহল নিয়ে, কেউ হয়তো একটু মজা পাচ্ছে। কিন্তু শিউলির বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। সে বুঝতে পারছিল—এই কয়েক সেকেন্ড নীলার জন্য কতটা কঠিন।
অবশেষে ম্যাডাম বললেন, “বসো।” গলায় বিরক্তি খুব বেশি ছিল না, কিন্তু সেই শব্দটা যেন একটা ছোট আঘাতের মতো লাগল। নীলা ধীরে ধীরে বসে পড়ল। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু শিউলি বুঝতে পারছিল—ভেতরে ভেতরে সে ভেঙে যাচ্ছে। এই ভেঙে পড়াটা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়।
লাঞ্চ ব্রেকে শিউলি আর দেরি করল না। সে নীলার হাত ধরে তাকে ছাদের দিকে নিয়ে গেল। এই ছাদটা তাদের দুজনের জন্য একটা আলাদা জায়গা—এখানে তারা আগে অনেক সময় কাটিয়েছে। রোদে দাঁড়িয়ে গল্প করা, হাওয়ায় চুল উড়তে দেওয়া, ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় বড় স্বপ্ন দেখা—সবকিছু যেন এই ছাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
কিন্তু আজ সেই ছাদে দাঁড়িয়ে দুজনই চুপ। হালকা বাতাস বইছে, দূরে শহরের অস্পষ্ট শব্দ ভেসে আসছে। আকাশটা ফাঁকা, তবুও মনে হচ্ছে কিছু একটা ভারী হয়ে আছে।
শিউলি অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর হঠাৎ বলল, “তুই কাঁদিস না কেন?” প্রশ্নটা হঠাৎ, কিন্তু খুব গভীর। সে অনেকদিন ধরে এটা ভাবছিল।
নীলা একটু তাকাল তার দিকে। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “কাঁদলে কি হয়?” এই প্রশ্নের মধ্যে একটা ক্লান্তি ছিল—যেন সে অনেক কিছু চেষ্টা করে দেখেছে, কিন্তু কোনো কিছুতেই স্বস্তি পায়নি।
“হালকা লাগে,” শিউলি বলল, খুব স্বাভাবিকভাবে। তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলা।
নীলা মাথা নাড়ল। “আমার লাগে না।” এই কথাটা সে এমনভাবে বলল, যেন এটা একটা চূড়ান্ত সত্য। তার কণ্ঠে কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো আবেগের প্রকাশ নেই—শুধু একটা ফাঁকা স্বীকারোক্তি।
শিউলির বুকটা কেঁপে উঠল। সে বুঝতে পারছিল—এটা শুধু কান্না না পারার কথা না, এটা এমন এক জায়গা যেখানে মানুষ এতটাই ভেতরে আটকে যায় যে, চোখের পানি বের হওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যায়।
“আমি পারি না,” নীলা আবার বলল, এবার একটু নিচু গলায়। যেন এই স্বীকারোক্তিটা বলতে তার কষ্ট হচ্ছে।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর সে খুব ধীরে বলল, “যদি বাপ্পি ছাড়া না পায়… সব বদলে যাবে।” এই কথাটা বলার সময় তার গলায় ভয় ছিল। ভবিষ্যতের ভয়, অনিশ্চয়তার ভয়।
শিউলি তার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু বলার মতো কথা খুঁজে পেল না।
“সবাই জড়ায়া গেছে,” নীলা বলল। “রাফি… সাইফ… আমার বাপ…” প্রতিটা নামের সঙ্গে একটা আলাদা টান, আলাদা দায়িত্ব জড়িয়ে আছে। যেন এই একটা ঘটনায় তাদের সবার জীবন কোনো না কোনোভাবে আটকে গেছে।
“সবাই নিজের মতো করে বাঁচতে চায়,” সে ধীরে বলল। “কিন্তু সবসময় কি পারা যায়?” এই প্রশ্নটা বাতাসে ঝুলে রইল। এর কোনো সহজ উত্তর নেই।
সন্ধ্যায় নিজের রুমে ফিরে শিউলি অনেকক্ষণ জানালার পাশে বসে ছিল। বাইরে আলো ধীরে ধীরে কমছে, আকাশের রঙ বদলাচ্ছে। শহরের শব্দ একটু একটু করে অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। দিনের কোলাহল থেকে রাতের নীরবতায় ঢুকে পড়ছে সবকিছু।
সে হঠাৎ আয়নার দিকে তাকাল। নিজের চোখের দিকে। সেই চোখে সে কী দেখছে—এটা বোঝার চেষ্টা করল।
“আমি কি খারাপ মানুষ?” সে খুব আস্তে বলল। প্রশ্নটা যেন নিজের কাছেই ছুড়ে দিল।
তার মনে পড়ল—একসময় সে রাফিকে পছন্দ করত। সেই অনুভূতিটা খুব স্পষ্ট না হলেও, ছিল। অপেক্ষা ছিল, ছোট ছোট আশা ছিল, না পাওয়ার একটা কষ্টও ছিল।
এখন সেই জায়গায় অন্য একটা অনুভূতি এসে দাঁড়িয়েছে। সাইফ। এই মানুষটা তার ভেতরে এমনভাবে ঢুকে গেছে, যেটা সে নিজেও বুঝতে পারেনি কখন।
সে ভাবতে লাগল—এটা কি ভুল? একজন মানুষকে ভুলে অন্য কারো দিকে টান অনুভব করা কি বিশ্বাসঘাতকতা? নাকি এটাই স্বাভাবিক?
সে আলমারির ভেতর থেকে পুরনো একটা ডায়েরি বের করল। পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে। পাতা উল্টাতে উল্টাতে একটা জায়গায় থেমে গেল। সেখানে লেখা—“আজ রাফি আমাকে দেখেও দেখল না।”
এই লাইনটা পড়ে সে হালকা হাসল। সেই হাসির ভেতরে একটা কষ্টও ছিল, কিন্তু সেই কষ্ট এখন আর আগের মতো তীব্র না। সময় সেটাকে নরম করে দিয়েছে।
সে ডায়েরিটা বন্ধ করল। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল, “আমি আবার ভালোবাসতে পারি?”
এই প্রশ্নটা তার নিজের কাছেই। উত্তর সে জানে না। কিন্তু সে বুঝতে পারছে—তার ভেতরে কিছু একটা বদলাচ্ছে। একটা নতুন অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে, যেটা তাকে আবার ভয়ও দেখাচ্ছে, আবার টানও দিচ্ছে।
বাইরে শহর জ্বলে উঠছে—একটা একটা করে আলো। প্রতিটা আলো যেন একটা গল্প, একটা জীবন। আর সেই আলোদের মাঝেই শিউলি বসে আছে—নিজের ভেতরের অন্ধকার আর আলো নিয়ে, বুঝতে চেষ্টা করছে সে আসলে কোন পথে যাবে।
(চলবে...)