আমার মা রানী চন্দ্রাবতী - অধ্যায় ১
গল্প: আমার মা রানী চন্দ্রাবতী
পর্ব ১
সন ১২০২ বঙ্গাব্দ। ইংরেজি ১৭৯৫।
আমি ঈশানচন্দ্র রায়। রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠজনেরা শুধু ‘ঈশান’ বলেই ডাকে। তখন আমার বয়স দশ পেরোয়নি।
বাংলার আকাশে তখন তিন চিল ঘুরছিল। কলকাতায় কোম্পানির লালমুখো সাহেবরা দেওয়ানি পেয়ে জাঁকিয়ে বসেছে। নাগপুর থেকে মারাঠা বর্গিরা প্রতি হেমন্তে ঝাঁকে ঝাঁকে আসে, ধান কাটে, গোলা লুট করে, আর সঙ্গে করে নিয়ে যায় যুবতী মেয়েদের। দিল্লির বাদশাহ শুধু নামেই বাদশাহ; তাঁর ফরমান কেউ খুলেও দেখে না।
এই তিন শত্রুর মাঝে কাঁসাই নদীর দু’পাড় আগলে রেখেছিলেন আমার বাবা, রাজা দেবনারায়ণ রায়। লোকে বলে, আমার পিতামহ নাকি পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজের হয়ে তলোয়ার চালিয়েছিলেন। নবাবের পতনের পর মীর জাফরের দরবারে মাথা নোয়াননি। কাঁসাইয়ের চরে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠেছিলেন, “মেদিনীপুর কারো গোলাম নয়।”
সেই থেকে আমাদের রাজ্যের কপালে বহিঃশত্রুর রক্তচক্ষু লেগে আছে। আমাদের রাজ্য না স্বাধীন না পরাধীন। ব্রিটিশ রা সুযোগ খুঁজছে, যেকোনো সময় আমাদের আক্রমণ করার।
আর আমার মা — রানী চন্দ্রাবতী।
খুলনার ভূঁইয়া বংশের মেয়ে আমার মা। বয়স বত্রিশ। কিন্তু যখন কোমরে তলোয়ার গুঁজে ঘোড়ায় চড়েন, তখন পাইক-বরকন্দাজরাও চোখ নামিয়ে নেয়। তাঁর শরীরে এখনও কিশোরী নদীর অবাধ স্রোত বয়ে চলে। শাস্ত্রে, শস্ত্রে, জ্যোতির্বিদ্যায় এবং রাজনীতিতে তাঁর মতো বিচক্ষণ নারী আমি দ্বিতীয়টি দেখিনি। পণ্ডিতমশাইরা বলতেন, রানী নাকি লীলাবতী আবার পড়তে পারেন।
শ্রাবণের সাত তারিখ, ভোররাত।
অন্তঃপুরে হঠাৎ শাঁখ বেজে উঠল। দাই-বুড়ি কাঁথায় জড়ানো এক ফুটফুটে নবজাতককে তুলে দিল মায়ের কোলে। আমার একটি বোন হয়েছে।
সঙ্গে সঙ্গে রাজবাড়ির তোপখানা থেকে তোপ দাগা হলো। কাঁসাই নদীর জল কেঁপে উঠল। প্রজারা কলাগাছ পুঁতে, মঙ্গলঘট সাজিয়ে আনন্দ করল। সারা মেদিনীপুরে ঢোল-কাঁসি বেজে উঠল — রানী চন্দ্রাবতীর ঘরে লক্ষ্মী এসেছে।
কেবল আমি দালানের একটা থাম ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বোনের কান্না শুনে আমার বুকের ভিতরটা কেমন হিম হয়ে গেল। মনে হলো, এই আনন্দের দিনেও বাতাসে কার যেন দীর্ঘশ্বাস ভাসছে। কার, তা তখন বুঝিনি।
........
দেখতে দেখতে বোনের নামকরণের দিন এসে গেল।
ভোর থেকেই রাজবাড়িতে সানাইয়ের সুর ভেসে বেড়াচ্ছে। বাবা নিজ হাতে পাঁঠা বলি দিয়ে পুরোহিতকে বললেন, “মেয়ের নাম রাখলাম লক্ষ্মীবতী রায়। আমার ঘরে লক্ষ্মী চিরকাল বাঁধা থাকুক।”
আমি দৌড়ে অন্তঃপুরে চলে গেলাম। দাইমা কাঁথায় জড়ানো ছোট্ট পুঁটুলিটা আমার কোলে তুলে দিয়ে বললেন,
“এই তোমার বোন, রাজকুমার। রাজকুমারের সবচেয়ে বড় কাজ — তার বোনকে রক্ষা করা।”
ছোট্ট লক্ষ্মীবতীর আঙুলগুলো আমার কড়ে আঙুল শক্ত করে চেপে ধরল। বুকের ভিতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল। আমি তার কপালে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বললাম,
“আমি তোর দাদা। যতদিন বাঁচব, তোকে আগলে রাখব।”
কথা শেষ হতে না হতেই সে কেঁদে উঠল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। দাইমা তাড়াতাড়ি তাকে কোলে তুলে নিলেন। আমার আঙুল ছেড়ে দিয়ে সে দাইমার বুকে মুখ গুঁজল।
“সবাই এবার বাইরে যাও,” দাইমা নরম গলায় বললেন।
গায়েশ্বরীদিদি আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। বেরোনোর সময় দাইমা ধীরে ধীরে ভারী পর্দাটা টেনে দিলেন। ঘরের ভিতরটা হঠাৎ নরম, নিভৃত ও আধো-আলো হয়ে গেল।
পর্দার আড়াল থেকে আমি দেখলাম — দাইমা বোনকে মায়ের কোলে তুলে দিলেন। মা আঁচলটা একটু সরিয়ে লক্ষ্মীবতীকে বুকের কাছে টেনে নিলেন। সেই মুহূর্তে আমার মা যেন অন্য এক রূপ ধারণ করলেন।
চন্দ্রাবতী রানী এমনিতেই অসামান্য সুন্দরী। চাঁদের মতো স্নিগ্ধ মুখ, দীঘল চোখ, উন্নত বক্ষ, সরু কোমর আর পূর্ণ নারীসুলভ দেহলাবণ্য তাঁর প্রতিটি অঙ্গে। কিন্তু সন্তান জন্মের পর সেই সৌন্দর্যে যেন এক নতুন পূর্ণতা এসেছে। মাতৃত্ব তাঁকে আরও নরম, আরও গভীর, আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
লক্ষ্মীবতী মায়ের ডান স্তনের বোঁটা মুখে নিয়ে চুষতে শুরু করল। তার কান্না ধীরে ধীরে থেমে গেল। মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন, চোখে অপার মমতা।
আমি চোখ সরাতে পারছিলাম না।
এই দৃশ্যটা শুধু পবিত্র নয়, এতে এক অদ্ভুত গভীরতা ছিল। একজন নারীর শরীর যখন মা হয়, তখন তার সৌন্দর্য শুধু চোখে পড়ে না — সে সৌন্দর্য অনুভব করতে হয়। মায়ের স্তন দুটি তখন ভারী ও উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল, শিরা-উপশিরা স্পষ্ট, আর বোঁটা দুটি গাঢ় রঙের। লক্ষ্মীবতী যখন জোরে জোরে চুষছিল, মায়ের ঠোঁট থেকে অল্প একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল।
মাতৃত্ব শুধু দায়িত্ব নয়, এ যেন নারীত্বেরই এক গভীরতম রূপান্তর।
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। বুকের ভিতরে এক অজানা অনুভূতি জেগে উঠছিল — যার নাম তখনও জানতাম না।
গায়েশ্বরী দিদি ডাকলেন," চলো রাজকুমার, আমরা বোনের কাছে আবার পরে ফিরে আসব।"