অঘটনঘটন পটিয়সী (নতুন আপডেট ৩৭) - অধ্যায় ২৩২
খ
সাফিনা আর সিনথিয়া চা বানাতে কিচেনে যেতেই নামায পড়তে আসমা বেগম উঠে পড়লেন। নুসাইবা ওয়াশরুমের দিকে গেল আর আরশাদ একটা কাজে ঘন্টা দুয়েকের জন্য বাইরে গেল। ড্রয়িংরুমে তখন খালি মিজবাহ, মাহফুজ আর সাবরিনা। মাহফুজ কে এলবামের ছবি দেখাতে দেখাতে যখন বিভিন্ন ঘটনা বলছে, এই সময় মিজবার একটা অফিসিয়াল কল আসল। কলে কথা বলতে বলতে মাস্টার বেডরুমের দিকে চলে গেল মিজবাহ। রুমে রইল শুধু এখন সাবরিনা আর মাহফুজ। রুমের ভিতর অদৃশ্য টেনশন হঠাত করে উত্তেজনার পারদে সর্বোচ্চ সীমায় উঠে গেল। এই কয়দিন ধরে সাবরিনা চেষ্টা করেছে যাতে মাহফুজ আর ও কোন ভাবে এক রুমে একা না পড়ে যায়। আজকে হঠাত করে না চাইতেও সেই অবস্থা তৈরি হয়ে গেল। উঠে চলে যাবে কি যাবে না সেই কথা ভাবতে ভাবতেই মাহফুজ জিজ্ঞেস করল তুমি ঠিক আছ সাবরিনা। পরিচিত কন্ঠ আর সাধারণ জিজ্ঞাসা তবু সাবরিনা কেপে উঠল। সাবরিনার ভিতরের দ্বিধা চোখেমুখে ফুটে উঠেছে অনায়েসে। মাহফুজ নিজেও টের পেয়েছে সাবরিনা ওকে এড়িয়ে চলছে। তবে মাহফুজ রুমে ঢুকলে বের হয়ে যাচ্ছে এমন না বরং অন্তত তৃতীয় আরেক ব্যক্তি রুমে না থাকলে সাবরিনা মাহফুজ কে এড়িয়ে যাচ্ছে। মাহফুজ তাই নিজে থেকে বলল তুমি কি ভয় পাচ্ছ? কি উত্তর দিবে বুঝতে পারছে না সাবরিনা। তবে সাহস দেখিয়ে বলে উঠে না, না। মাহফুজ বলে দেখ সাবরিনা আমি টের পাচ্ছি কিছু একটা তোমার মাথায় ঘুরছে। তোমার এই রকম দ্বিধা দ্বন্দ্ব কিন্তু অন্যদের চোখে পড়লে ব্যাখ্যা করা কঠিন হবে। সিনথিয়া আমাকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিল। মাহফুজের কথা শুনে আতকে উঠে সাবরিনা। কি জিজ্ঞেস্ক করেছে সিনথিয়া। মাহফুজ বলে আমার সামনে আসলে তোমার যে দ্বিধা এইটা সিনথিয়ার চোখে পড়েছে। তোমার মত স্মার্ট মেয়ে ছোট বোনের জামাই এর সামনে এইরকম আচরণ করলে সেটা চোখে পড়বেই। সাবরিনার হার্টবিট বেড়ে যায় অনেক। কি উত্তর দিবে এই প্রশ্নের। মাহফুজের কথা যে ভুল নয় সেটা নিজেও বুজছে সাবরিনা তবে মানুষের অনেক সময় তার নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। মাহফুজ প্রসঙ্গগটা সাবরিনার জন্য এমন একটা বিষয়। আমাদের আর সাবধান হতে হবে বলে মাহফুজ। সাবরিনা নিজেও জানে তবে ওর মনের ভিতর যে কথা গুলো ঘুরছে সেটা নিজের কাছেও স্বীকার করতে পারছে না কীভাবে মাহফুজ কে বলবে। মাহফুজ আর সিনথিয়া কে একসাথে দেখে মনের ভিতর গিলটি ফিলিংসটা স্বাভাবিক। সেটা মেনে নিয়েছে সাবরিনা। সারা জীবন রুল মেনে চলা মেয়ে কিভাবে এইভাবে এতবড় একটা ভুল করতে পারল? তাও ছোট বোনের হবু জামাই এর সাথে। তবে এই ফিলিংসের থেকে সাথে সাথে আরেকটা ফিলিংস টের পেয়েছে সিনথিয়া আর মাহফুজ কে বিয়ের স্টেজে দেখে- জেলাসি। আজকেও বার বার মাহফুজ যখন সিনথিয়া কে জড়িয়ে ধরছিল, প্রেমময় দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল তখন বুকের মাঝে জেলাসি জ্বলে উঠছিল। নিজের কাছে নিজেই স্বীকার করতে চায় না এই জেলাসি তাই দ্রুত কথা শেষ করার জন্য বলল, এমন আর হবে না। এই পুরো ব্যাপারটা আমার জন্য নতুন। তাই একটু সময় লাগবে। আর সিনথিয়া অল্প কয়দিন পর চলে যাচ্ছে। পরে আবার ফেরত আসার আগে আমি সামলে উঠব। সাবরিনার উত্তর শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হয় মাহফুজ।
সাফিনা আর সিনথিয়া কিচেনে চায়ের সাথে হালকা নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত। সিনথিয়া মাকে সাহায্য করতে থাকে আর কি কি করতে হবে জিজ্ঞেস করে। সাফিনা টিপ্পনি কাটেন- এত বছর বকা দিয়ে রান্না ঘরে আনতে হত এখন একদম নিজে থেকে নাস্তা বানাতে চাচ্ছিস। বিয়ে করে দুই দিনে একদম চেঞ্জ হয়ে গেছিস নাকি। সিনথিয়া বলে আসলে এটার সাথে বিয়ের সম্পর্ক নাই মা। দেশের বাইরে গিয়ে প্রথম টের পেলাম রান্না আসলে একটা লাইফ স্কিল। সবার জানা থাকা উচিত। চা খেতে চাইলে সেখানে তো আর মা কে পাওয়া যাবে না। সাফিনা হেসে উঠেন মেয়ের কথায়। তারপর বলেন এখন তো মা আছে, তাহলে আজকে কেন। সিনথিয়া একটু লাজুক স্বরে বলে মাহফুজ কে একটু নিজ হাতে চা বানিয়ে খাওয়াতে চাই। ওদের বাসায় একদিন চা বানালাম সবাই খুব প্রশংসা করল। মাহফুজ বলেছিল এমন ভাল চা বানাই জানলে নাকি তোমাদের আর আগে রাজি করাতো বিয়ের জন্য। সিনথিয়ার আলগা মুখে এইসব কথা শুনে মুচকি হাসেন সাফিনা। আচ্ছা আচ্ছা তাহলে খালি জামাই এর জন্য বানাচ্ছিস, আমরা তাহলে শুধু এক্সট্রা প্লেয়ার। সিনথিয়া মা কে জড়িয়ে ধরে বলে, কি বল তুমি হলে আসল প্লেয়ার। আমার এই সুন্দরী লক্ষী আম্মুটাকে চা না দিয়ে আর কাউকে চা দিব নাকি। সাফিনা আর সিনথিয়া এই গল্পের মাঝে নুসাইবা কিচেনের দরজায় এসে দাঁড়ায়। নিজের কখনো সন্তান না হওয়ায় ভাইয়ের মেয়েদের নিজের মেয়ের মত করে দেখে এসেছে সব সময়, আর ভাইয়ের বউ কে সবসময় মনে হয়েছে নিজের বড় বোনের মত। প্রিয় দুই মানুষের এই সুন্দর খুনসুটি দরজা থেকে উপভোগ করে নুসাইবা। সাফিনার চোখ পড়তেই, নুসাইবা কে জিজ্ঞেস করে কিরে কিছু দরকার তোর? নুসাইবা বলে না ভাবী। তাহলে দরজায় দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোমাদের মা মেয়ের আহ্লাদ দেখছি। সিনথিয়া, নুসাইবার দিকে হাত বাড়ায় বলে ফুফু চলে আস তোমাকেও হাগ দেই। গ্রুপ হাগ। তিনজন পরষ্পরকে জড়িয়ে ধরে থাকে কয়েক সেকেন্ড। সিনথিয়ার মনে হয় পৃথিবীর এর থেকে সুখের আর জায়গা আর নেই। যেখানে সব প্রিয়জনেরা এক ছাদের নিচে। চা বিস্কুটের এরেঞ্জমেন্ট করতে করতে তিনজনের কথা হয়। নুসাইবা বলে ভাবী তোমাকে এই কয়দিন খুব হাসিখুশি লাগছে। যেন আগের তুমি একদম ফিরে এসেছ। তোমার ডিপ্রেশন সিনথিয়া এক ফুতে উড়িয়ে দিয়েছে। রান্না ঘরে মা ফুফুর কথা শুনতে শুনতে জিনসপত্র গুছিয়ে মা কে হেল্প করছিল সিনথিয়া কিন্তু যে মূহুর্তে ডিপ্রেশন শব্দটা কানে গেল তখন চট করে ফিরে তাকালো। সিনথিয়ার চেহারার পরিবর্তন আর সাফিনার চোখের ইংগিতে না না বলা দেখে বুঝে গেল নুসাইবা যে একটা ভুল করে ফেলেছে। কথা ঘুরানোর জন্য বলে উঠল, ভাবী তোমার কলেজের কি অবস্থা? প্রমোশন কবে হবে। শুনেছিলাম না যে প্রমোশন হবে? সাফিনা তাড়াতাড়ি উত্তর দিয়ে প্রসংগ ঘুরিয়ে নিতে চায় তবে সিনথিয়া ছাড়ার পাত্র না। সিনথিয়া বলে আম্মু, ফুফু থাম তো দুইজন। ফুফু কি বললা এই মাত্র? নুসাইবা বলে কি বললাম আবার? তোর আম্মুর প্রমোশন নিয়ে কথা হচ্ছে। কবে প্রমোশন হবে। সাফিনা মাথা নাড়ায়। সিনথিয়া আবার বলে ফুফু এর আগে কি বললা? নুসাইবা বলে আবার কী বললামরে মা। তোর সাথেই তো গল্প করছিলাম। সিনথিয়া এইবার বলে আম্মুর ডিপ্রেশন নিয়ে কি বলছিলে? আম্মুর ডিপ্রেশন কবে হল? কেউ আমাকে বলে নি কেন? আপু জানে? আব্বু জানে? এই কথা আমার কাছে এতদিন লুকিয়ে রাখলে কেন? আমাকে বললে তো আমি নেক্সট ফ্লাইট ধরে চলে আসতাম। একটানা কতগুলো প্রশ্ন করে যায় সিনথিয়া। দূর্দান্ত স্মার্ট নুসাইবা আর ব্যক্তিত্ববান সাফিনা দুইজন, সিনথিয়ার প্রশ্নের চোটে হতভম্ভ হয়ে যায়। ওদের কয়েক সেকেন্ডের নীরবতায় সিনথিয়া বুঝে যায় লুকাচ্ছে কিছু দুইজন।
সাফিনা বুঝেন এখন কথা লুকানোর চেষ্টা করা ঠিক হবে না, মেয়ে কে জন্ম থেকে চিনেন তিনি। যত লুকানোর চেষ্টা করা হবে তত জেদ চাপবে সিনথিয়ার আর তখন মিজবাহ, সাবরিনা আর অনান্য আত্মীয়স্বজনদের প্রশ্ন করে করে রাষ্ট্র করে দিবে ব্যাপারটা। তাই আগে থাকতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়া ভাল। এই জন্য তিনি নিজেই বলেন আমি ডিপ্রেশনের জন্য কয়দিন ধরে সাইকোলজিস্ট এর কাছে যাচ্ছি আমি। আতকে উঠে সিনথিয়া। সাধারণত জেদ ধরে জিতে গেলে খুশি হয় সিনথিয়া তবে আজকে এই জয়ে যেন পরাজয়ের বিষাদ।
সাফিনা বলেন গত কয় বছর ধরে কিছু কিছু সিম্পটম ছিল তবে অত পাত্তা দেই নি। তুই বিদেশে যাবার পর পরিমাণটা বেড়েছে। এরপর নুসাইবার সাথে কথা বলে সাইকোলজিস্ট এর সাথে দেখা করেছি। এর পর থেকে আস্তে আস্তে উন্নতি হচ্ছে। সিনথিয়ার চোখ টলমল করে উঠে। চোখের এক কোণা দিয়ে এক ফোটা পানি আস্তে করে গড়িয়ে পড়তে থাকে গাল জুড়ে। সিনথিয়া ধরা গলায় জিজ্ঞেস করে বাসার আর কে কে জানে? আমি কি লাস্ট পারসন? সাফিনা বলেন না বোকা মেয়ে কেউ জানে না নুসাইবা ছাড়া। নুসাইবা চুপ করে কথা শুনছে। এই মূহুর্তে আর কিছু বলছে না। সিনথিয়া বলে আমাকে সব বল আম্মু। আমি সব জানতে চাই। সাফিনা বলেন আজকে না আম্মু। আজকে বাসায় সবাই আছে। আমি তোমাকে সব বলব যাবার আগে। সিনথিয়া বলে প্রমিজ? সাফিনা বলেন প্রমিজ। নুসাইবার চোখে অকারণে জল আসে মা মেয়ের দৃশ্য দেখে।