ভাঙনের পরে - অধ্যায় ১১৯

Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-64501-post-5851326.html#pid5851326

Posted on Fri Jan 10 2025 by Henry (Profile)

807 words / 4 min read

Parent
---আমি গো দিদা! হেসে বললে অংশু। ---অংশু? ---হ্যা। ---ক'টা বাজলো রে? ---ক'টা আবার? সাড়ে আটটা হবে। রান্নাঘরে কড়াইতে তেলে আনাজ ছাড়লো ডালিয়া মাসি। নির্জনতাকে ভঙ্গ করে তীক্ষ্ণ শব্দে ভরে গেল রান্নাঘর। এই রান্নাঘরটা সেকেলে। আজকের ফ্ল্যাটবাড়ির মত ছোট নয়। বেশ বড় লম্বা। পুরোনো দিনে একেই বোধ হয় রান্নাশাল বলা হত। ডালিয়া মাসি বললে---একসময় এখানে কাঠের উনোনে রান্না হত। মা আর মামীমা রান্না করত। জ্বালের তো অভাব নেই এ বাস্তুতে। গেরামের দু একটা বোস্টমী বউ আসে মাঝে মধ্যে। মাথায় করে জ্বাল নিয়ে যায়। অংশু বললে---ডালিয়া মাসি। এই বাস্তুটা কত ডেসিমেল গো? ---ডেসিমেল-টেল বুঝিনা বাপু। মামীমা বলে চার বিঘার চেয়ে সামান্য বেশি এই বাস্তু। মামার তো জমিও আছে। চাষও হয়। ভাগ কে চাইবে? ভাগ চাষীরা মেরে সব বসে আছে। কে সেসব উদ্ধার করবে? সুচি দি'ই তো ওয়ারিশ। সে যদি এসব না ভাবে, কে ভাববে? হ্যা রে অংশু সিনু আসবে আর দেশে? অংশু হেসে বললে---সিনু মাসি? না না। ওখানেই ওরা সেটল। এখন তো ওরা আমেরিকার নাগরিক। যোগাযোগও তেমন রাখে না। জমি সংক্রান্ত অংশুর কোনো ধারণা না থাকলেও সে জানে তাদের কলকাতার বাড়িটা মাত্র পাঁচ ডেসিমেল জায়গার ওপর। দাদুর বাড়ির এই বাস্তু কম করে দেড়শ থেকে দু'শ ডেসিমেল তো হবেই। সে বললে---মাসি? এই দীঘিতে মাছ আছে? ---থাকবে না কেন? থাকবে বৈকি। আগে তো এই দীঘির জলে স্নান করা, মাছ ধরা হত। তখন কি আর এসব নলকূপ ছিল। তোদের তো আবার কলকাতায় পাম্প মোটর বসে গেছে। এই দীঘিতেই মরল আমার দিদি। ---ঝুমুর মাসি? ডালিয়া কড়াইটা ঢাকা দিয়ে ওভেনটা কমিয়ে বলল---তুই জানলি কোথা থেকে? ---মা প্রায়শই বলে ঝুমুর মাসির কথা। ডালিয়া মাসি বললে---হ্যা, সুচি দি আর ঝুমুর দি ছিল হরিহর আত্মা। সিনু আর আমি তো অনেক ছোট। ---তাহলে তুমি গফুর কে দেখোনি আগে? বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল অংশু। ডালিয়া বললে---দেখিনি কেন? দেখেছি তো। সে ছোটবেলায়। শুনেছি ছোট থেকেই নাকি অমন বখাটে ছিল। পালিয়ে গেল যখন তখন তো আমি দশ বছরের। আমার কাকার ঘরে থাকতাম। আসলে আমরা দুই বোন হলে পরে আমার বাপ মাকে ছেড়ে আবার বিয়ে করে, কিন্তু আমার ছোটকাকা ছিল দরদী। তার পড়ালেখা ছিল কিনা। সে বলল ছোট মেয়েকে আমি মানুষ করব। চৌদ্দ বছর পর্যন্ত কাকা-কাকীর কাছে থেকেছি। সেভেন পর্যন্ত পড়েছি। সেই কাকার ছেলেই তো দিল্লিতে থাকে। আমার চেয়ে ছোটো। বলে ডালি দি চলে আয় দিল্লি। তার ছেলেমেয়েগুলো ছোটো ছোটো, দেখাশোনা করার কেউ নেই। অংশু দেখলে ডালিয়া মাসি অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছে, তাই সে পুনরায় বললে---গফুরকে তাহলে তুমিও আগে চিনতে? ---চিনতাম মানে ঝুমুর দির মুখে শুনতাম আলি চাচার ছেলে গফুর দা'র কথা। দেখেছিলাম দু একবার পূজার সময়। আলি চাচাকে তো দেখিসনি অংশু, এই গফুরের মত লম্বা চওড়া ছিল। কিন্তু কি ভদ্র মানুষ ছিল জানিস। মু-সলমান হলেও এ বাড়ির ভরসার লোক ছিল। মা, মামীর মুখে শুনেছি। আর এই গফুর মাতালকে দেখ, স্বভাব চরিত্র কোনোটাই আলি চাচার না! অংশু আর ডালিয়ার কথার মধ্যেই সুচিত্রা হ্যারিকেন হাতে হাজির হল। বলল---কি রে রান্না শেষ? ---মাছটা তুমি রাঁধো বাপু। আমি আর পারবনি। মা কোমরে শাড়ির আঁচল বেঁধে মাছগুলোতে নুন-হলুদ মাখাতে লাগলো। আর বলল---ডালিয়া দোতলার ঘরটা পরিস্কার করে দিয়েছিস? রাতে অংশু ওখানে শুয়ে পড়ুক। অংশু উঠে এলো রান্নাঘর থেকে। চারপাশ ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। রান্নাঘরে ছাড়া কেবল দিদার ঘরে মিচমিচে আলো। চওড়া বারান্দায় মেলানো লম্বা কাঠের চেয়ার। অংশু বসে রইল ঐ অন্ধকারে। ডালিয়া মাসি একটা টর্চ লাইট দিয়েছে অংশুকে। ভাবলে কি আর করবে, একটু ঘোরাফেরা যাক। তারপর খানিক সময় পেরোতেই টর্চ জ্বেলে সে ঢুকল মায়ের ঘরের মধ্যে। মায়ের ঘরের বিছানায় খাটটা বেশ উঁচুতে ও ছোটও। ওখানে দুটো বাচ্চা ঘুমিয়ে রয়েছে। মশারির দড়িটা বাঁধা আছে এই পুরোনো মজবুত মেহগিনি খাটের স্ট্যান্ডগুলোতে। মায়ের ঘরের ভেতরেই উত্তরমুখো দেয়ালে একটা দরজা আছে। সেবার যখন এসেছিল এই দরজায় একটা জং পড়া তালা দেওয়া ছিল। অংশু দেখলে এবার তালা দেওয়া নেই, বরং শেকল দেওয়া কেবল। বোঝা গেল এই দরজা দিয়ে পাশের ঘরে যাওয়া যায়। পাশের ঐ ঘরে বোধ হয় কেউ থাকে না। তার ঠিক পরেই দিদার ঘর। পরে দোতলার সিঁড়ি ও বিশাল রান্নাঘর। ভেতরের এই দরজাটা খুলল অংশু। খুলে টর্চের আলো ফেলতেই ভুল ভাঙলো তার। এই ঘর আসলেই অব্যবহৃত নয়। বরং বলা ভালো মায়ের ছোট ঘরের সাথে এই সংলগ্ন ঘরটা আসলে একটাই ঘর। সেপারেট দেয়াল করে দরজা একটা করা। ঠিক একই রকম দোতলাতে যে ঘরে অংশুর থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, সে ঘরেও এমন ভেতর দিয়ে দরজার মাধ্যমে পাশের ঘরের সংযুক্তি আছে। অংশু বুঝতে পারলে নীচতলা আর দোতলা একই আদলেই তৈরি। শুধু নিচতলায় যেখানে লম্বা রান্নাঘর আছে, দোতলায় সেখানে বেশ বড় বারান্দা। ঠিক অংশুদের বাড়ির ছাদ বারান্দার মত। তবে তার চেয়ে ঢের বড়। অংশু আলো ফেলে ঢুকল ঐ ঘরে। ঘরের মধ্যে গুমোট গরম বেশ। চমকে উঠল এ ঘরেও অনেক জিনিসপত্র রাখা। একটা সেকেলে একই রকম পায়ার তলায় ইট দিয়ে উঁচু করে রাখা পালঙ্ক খাট। একটা বন্ধ বড় আলমারি। একটা বুক সেলফ, একটা আলনা, আলানাতে মায়েরই শাড়ি, ব্লাউজ, ব্রেসিয়ার। জানলা রয়েছে ঘরটার পাশের ঘরগুলোর মতই পশ্চিমমুখো। ওপর পাল্লা দুটো খোলা। বাড়ির পেছনের বারান্দা দিয়েই কেবল এ ঘরের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। অংশু পেছনের বারান্দায় গিয়ে দেখলে দীঘির জলে একফালি চাঁদের ছায়া। দৈত্যাকার কালো কালো সব গাছ। বাড়ির পেছন দিকের এই ঝোপ জঙ্গল আর দীঘি দেখলে সত্যিই ভয় করবে। এই দীঘির জলেই ডুবে মরেছিল ঝুমুর মাসি। গা ছমছম করে উঠল অংশুর। আর না থেকে চলে এলো বাড়ির সামনের বারান্দায়। ***
Parent