বিপদের বন্ধু - অধ্যায় ৩

Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-72878-post-6165357.html#pid6165357

Posted on Thu Mar 19 2026 by Mr. X2002 (Profile)

1227 words / 6 min read

Parent
গল্প: বিপদের বন্ধু অধ্যায় ৩: বিপদ এক বছর কেটে গেছে। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেছে—কিন্তু কিছু জিনিস যেন আগের মতোই আছে। ঢাকার সেই বড় বাড়ি, সেই ডাইনিং টেবিল… আর পরিবারের একসাথে বসে খাওয়ার অভ্যাস। দুপুরের লাঞ্চ। ডাইনিং টেবিলে বসে আছে সবাই—সাব্বির, রাহা, ছোট্ট রাফা আর রিনা বেগম। আজকের পরিবেশটা হালকা, অনেকদিন পর এমন হাসিখুশি মুহূর্ত। রাফা চামচ দিয়ে প্লেটে টোকা দিচ্ছে। “মা, আমি নিজে খেতে পারব!” রাহা হেসে বলল, “ঠিক আছে, মামনি… কিন্তু জামা নষ্ট করলে কিন্তু আমি ধুতে দিবো না!” রাফা হেসে ফেলল। “না, আমি বড় মেয়ে!” রিনা বেগম বললেন, “আমার নাতনি তো একেবারে লন্ডনের মেয়ে!” সবাই হেসে উঠল। কিন্তু টেবিলের এক কোণে বসে থাকা সফিক ইসলাম চুপচাপ। তার প্লেটে খাবার আছে, কিন্তু তিনি খাচ্ছেন না। চোখে এক ধরনের চিন্তার ছায়া। সাব্বির খেয়াল করল। “বাবা, আপনি কিছু খাচ্ছেন না কেন?” সফিক হালকা হাসার চেষ্টা করলেন। “খাচ্ছি তো… তোমরা খাও।” কিন্তু তার কণ্ঠে সেই আগের দৃঢ়তা নেই। হঠাৎ— টিং টং! কলিং বেল বেজে উঠল। রিনা বেগম মুখ তুলে বললেন, “এই সময় আবার কে আসল?” তিনি পাশের চাকরানীকে বললেন, “দেখে আয় তো।” চাকরানী দ্রুত দৌড়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সে হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এল। “বড় সাহেব…”—তার গলা কাঁপছে, “ঘরে পুলিশ এসেছে…” টেবিলের সবাই থমকে গেল। “পুলিশ?”—রাহার কণ্ঠে বিস্ময়, “এখন পুলিশ কেন আসবে?” সফিকের হাত কাঁপতে শুরু করল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য ভয় স্পষ্ট হয়ে উঠল। ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল কয়েকজন পুলিশ অফিসার আর সঙ্গে দুজন আইনজীবী। পরিপাটি পোশাক, কিন্তু তাদের উপস্থিতি ঘরের পরিবেশকে মুহূর্তেই ভারী করে তুলল। “মি. সফিক ইসলাম?”—একজন অফিসার জিজ্ঞেস করল। সফিক ধীরে এগিয়ে এসে বললেন, “জি… আমি।” আইনজীবীদের একজন বললেন, “আমাদের আপনার সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। একান্তে।” সফিক মাথা নাড়লেন। “চলুন।” তিনি তাদের একটা আলাদা রুমে নিয়ে গেলেন। ড্রয়িংরুমে বাকিরা দাঁড়িয়ে। রিনা বেগমের মুখ ফ্যাকাশে। “কী হইতেছে এগুলা…” সাব্বির কিছু বলতে পারছে না। রাহা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার চোখে স্পষ্ট অস্বস্তি। সময় যেন থেমে গেছে। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে সফিক বের হলেন। তার মুখের রঙ বদলে গেছে। চোখ লাল, ঠোঁট শুকনো। তিনি সোজা দাঁড়িয়ে বললেন— “তোমরা… তোমাদের জামা-কাপড় গুছিয়ে নাও।” রিনা বেগম হতভম্ব। “কেন? কী হইছে?” সফিক কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “আমি একটা বড় অংকের লোন নিয়েছিলাম…” সবাই চুপ। “আমি ভেবেছিলাম… আমি শোধ করতে পারব…”—তার গলা ভেঙে যাচ্ছে, “কিন্তু… আমার মালবাহী জাহাজ… সাগরে ডুবে গেছে।” ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা। “সব শেষ…”—সফিক নিচু গলায় বললেন, “আমি… নিঃস্ব হয়ে গেছি।” রিনা বেগম হঠাৎ বসে পড়লেন। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। “এই বয়সে… আমরা কোথায় যাব?” সাব্বির স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। তার মাথা যেন কাজ করছে না। রাহা ধীরে ধীরে নিজের রুমে চলে গেল। তার হাত কাঁপছে, কিন্তু সে ব্যাগ গুছাতে শুরু করল। কাপড়, দরকারি জিনিস—সব এলোমেলোভাবে গুছাচ্ছে। সাব্বির ভেতরে ঢুকল। “রাহা…” রাহা থামল না। “চলো… আমরা ইংল্যান্ড চলে যাই।” সাব্বির থমকে গেল। “এখন?” “হ্যাঁ!”—রাহা ঘুরে দাঁড়াল, “এখানে থাকলে আমরা কিছুই করতে পারব না!” সাব্বির গভীর নিঃশ্বাস নিল। “আমরা যাব… কিন্তু বাবা-মায়ের পাসপোর্ট, ভিসা… সব করতে সময় লাগবে।” রাহা চুপ। “এই সময় ওদের রেখে আমি যেতে পারব?”—সাব্বিরের গলায় কষ্ট। সে একটু থেমে বলল, “তুমি আর রাফা চলে যাও।” রাহা হতবাক হয়ে তাকাল। “কি বলছ?” “তোমরা সেফ থাকবে…”—সাব্বির নিচু গলায় বলল, “আমি এখানে থেকে সব সামলাই।” রাহার চোখ ভিজে উঠল। “না… তোমাকে একা রেখে আমি কোথাও যাব না।” ঠিক তখনই ছোট্ট রাফা এসে দাঁড়াল দরজায়। “মা…”—সে মিষ্টি গলায় বলল, “তুমি ব্যাগ গুছাচ্ছো? আমরা কোথাও যাচ্ছি?” রাহা হাঁটু গেড়ে বসে তাকে বুকে জড়িয়ে নিল। “হ্যাঁ মামনি…”—সে হাসার চেষ্টা করল, “আমরা… বেড়াতে যাচ্ছি।” রাফা খুশি হয়ে বলল, “ইয়েই!” ঘরের বাইরে সবাই দাঁড়িয়ে। ড্রয়িংরুমে এক অদ্ভুত নীরবতা। সফিক ইসলাম ধীরে ধীরে তার ঘরের দিকে তাকিয়ে আছেন। এই বাড়ি… এই দেয়াল… এই স্মৃতি— সবকিছু তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। তার চোখ দিয়ে ধীরে ধীরে পানি গড়িয়ে পড়ল। একটা জীবনের অর্জন… একটা মুহূর্তে যেন ভেঙে গেল। দূরে কোথাও আকাশ মেঘলা হয়ে আসছে। আর এই বাড়ির ভেতরে— একটা ঝড় ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। ? চলবে… গল্প: বিপদের বন্ধু অধ্যায় ৪: পরিচয় গ্রামটা যেন সময়ের বাইরে পড়ে থাকা এক টুকরো পৃথিবী। চারদিকে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, মাঝে মাঝে ধানগাছের মাথা হেলে পড়ছে হালকা বাতাসে। দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ, আবার কোথাও মাটির চুলা থেকে ধোঁয়া উঠছে। এখানে শহরের মতো কোলাহল নেই—শুধু নীরবতা, আর পরিশ্রমের শব্দ। মানুষের প্রধান কাজ—কৃষি। সকাল থেকে দুপুর, তারপর বিকেল—সূর্যের সঙ্গে লড়াই করেই চলে তাদের জীবন। দুপুরের কড়া রোদ। মাঠের মাঝখানে এক কালো, শক্তপোক্ত দেহী লোক মাটি কোপাচ্ছে। তার শরীর ঘামে ভিজে গেছে, রোদে চকচক করছে। লুঙ্গিটা কাছা দিয়ে বাঁধা, হাঁটু পর্যন্ত উঠে আছে। আরেকটু উপরে উঠলে হয়ত তার বিশাল এনাকোন্ডাটা দেখা যেত। পেশিগুলো স্পষ্ট, যেন বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের ছাপ। এই লোকটাই—রামু। হঠাৎ দূর থেকে দৌড়ে আসতে লাগল একটা ছেলে। “রামু কাকা! রামু কাকা!” রামু থেমে দাঁড়াল। কপালের ঘাম হাত দিয়ে মুছে তাকাল। “কী রে?” ছেলেটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “তোমার সাথে দেখা করতে একটা লোক আসছে!” রামু ভ্রু কুঁচকাল। “কে রে?” ছেলেটা মাথা নাড়ল, “জানি না… কিন্তু প্রথমে ‘রহমত, রহমত’ বলে ডাকছিল… পরে আবার ‘রামু’ বলছে।” রামুর চোখ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। (রহমতের পরিচয়) ছোটবেলায় তার নাম ছিল রামু। গ্রামের এই মাটিতেই জন্ম। তার বাবা ছিল একজন দিনমজুর। কিন্তু ভাগ্যের টানে, তার মা শহরে কাজ করতে যায়—ঢাকায়, এক বড় বাড়িতে। সেই বাড়িতেই একদিন রামুকে নিয়ে যাওয়া হয়। সফিক 'র মা—এক দয়ালু মহিলা—ছোট্ট ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “এই নামটা ঠিক তার ঠিক লাগে না… তোকে আমরা রহমত বলে ডাকব নাম রাখব রহমত।” সেই থেকেই রামু হয়ে যায় রহমত। শহরের সেই বাড়িতেই বড় হওয়া, সেই পরিবারই হয়ে ওঠে তার নিজের পরিবার। (বর্তমান) রামু ধীরে ধীরে মাঠ থেকে বেরিয়ে এল। দূরে, কাঁচা রাস্তার পাশে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে। তাদের পোশাক, তাদের ভঙ্গি—সবকিছুই এই গ্রামের সাথে বেমানান। রামু একটু এগিয়ে গিয়ে থেমে গেল। তার চোখে অবিশ্বাস। সফিক ইসলাম। তার পাশে সাব্বির, রিনা বেগম… আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে রাহা, কোলে রাফা। সফিকের চেহারা ভেঙে গেছে। চোখের নিচে কালি, মুখ শুকনো—এক বছর আগের সেই দৃঢ় মানুষটার সাথে কোনো মিল নেই। কিছুক্ষণ তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর— সফিক এগিয়ে এসে হঠাৎ করে রামুকে জড়িয়ে ধরলেন। “রহমত…”—তার গলা ভেঙে গেল। তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। রামু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। তার হাত দুটো ধীরে ধীরে উঠল… কিন্তু সে পুরোপুরি জড়িয়ে ধরল না। এই দৃশ্য দেখে ছোট্ট রাফা অবাক হয়ে গেল। সে রাহার দিকে তাকিয়ে বলল, “মা… দাদু কাঁদছে কেন?” রাহা কিছুক্ষণ চুপ থাকল। রাহা রাফার দিকে তাকাল। শব্দ শুনে রামু রাফার দিকে তাকালো… সরাসরি তার দিকে। সেই দৃষ্টি— কঠিন, তীক্ষ্ণ… আর কোথাও যেন এক ধরনের অদ্ভুত ক্ষুধা লুকানো। রাফাকে বলল, “দাদু তার পুরনো ভাইকে দেখেছে… তাই কাঁদছে।” রাফা বুঝে না, কিন্তু মাথা নাড়ল। (এখানে আসার আগে…) যখন রাহা প্রথম শুনেছিল— তারা রহমতের বাড়িতে যাবে। সে একদম রাজি হয়নি। “তুমি সিরিয়াস?”—সে সাব্বিরকে বলেছিল, “যে মানুষটা আমাদের সাথে এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা করেছে… তার বাড়িতে আমরা থাকব?” সাব্বির চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে বলেছিল, “আমাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা আছে?” রাহা কিছু বলতে পারেনি। “আমি আর কাউকে চিনি না…”—সাব্বির বলেছিল, “এই অবস্থায় কে আমাদের সাহায্য করবে?” রাহা চোখ নামিয়ে ফেলেছিল। সব যুক্তি তার বিপরীতে চলে যাচ্ছিল। শেষমেশ— কোনো উপায় না পেয়ে— সে রাজি হয়েছিল। (বর্তমান) সফিক এখনো কাঁদছেন। “আমি শেষ হয়ে গেছি, রহমত…”—তার গলা ভেঙে যাচ্ছে, “সব হারাইছি…” রামু চুপ। তার চোখে কোনো কান্না নেই। শুধু একটা গভীর দৃষ্টি—যেন সে সবকিছু ভেতরে ভেতরে মেপে নিচ্ছে। সাব্বির এগিয়ে এসে বলল, “চাচা…” শব্দটা বলেই থেমে গেল। এই সম্বোধনটা এখন কতটা ঠিক—সে নিজেই বুঝতে পারছে না। রামু তার দিকে তাকাল। তারপর ধীরে মাথা নাড়ল। “কেমন আছেন?”— সাব্বির বলল, রামু সাব্বিরকে দেখে তার মাথায় হাত বুলালো। রাহা পেছনে দাঁড়িয়ে। তার বুকের ভেতর একটা অজানা অস্বস্তি। এই জায়গা… এই মানুষ… সবকিছু তার কাছে অপরিচিত, অস্বস্তিকর। আর রামুর সেই দৃষ্টি— সে ভুলতে পারছে না। কাঁচা রাস্তা ধরে তারা হাঁটতে শুরু করল। দূরে একটা ছোট, পুরনো ঘর দেখা যাচ্ছে। সেখানে তাদের নতুন জীবন শুরু হবে। নাকি— আরও বড় কোনো বিপদের শুরু? ? চলবে…
Parent