চারুলতা (উপন্যাস) (সম্পূর্ণ) - অধ্যায় ৩৮
চারুলতা
লেখক - কামসম্রাট
পর্ব - ৩৬
দিন কাটতে লাগলো। লতার ছেলে এখন ২ মাসের। স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে। নাম রেখেছে রতন। লতা বেশ খুশি। নিশীথ আর মালতী সেই যে লতার সঙ্গে এসেছিল, আর যাওয়ার নাম নেই। এখানেই ঘাঁটি গেড়ে বসেছে।
মা কে আমি নিশীথ আর মালতীর ব্যাপারে সব খুলে বলেছি আর মা সরল হলেও ওদের মতলব চিনে ফেলেছে। ওরা ডাকলেও মা আর যায় না, কথা ঘুরিয়ে দেয়। মা নিজের কাজ নিয়ে থাকে আর তার স্বামী মানে আমার যত্নের প্রতি সারাদিন খেয়াল, রাতেও। লতা ও তার ছেলের খেয়াল রাখতে রাখতেই মায়ের ক্লান্তির শেষ নেই, নিজের নাতি বলে কথা।
বাবা মাঠে যাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। শরীরটা তার একেবারেই ভেঙে পড়েছে। অতিরিক্ত বিড়ি খাওয়ার জন্য দম নিতে কষ্ট হয় বলে চাষের কাজ তার পক্ষে আর সম্ভব নয়। বাড়িতেই থাকে সারাদিন। তবে তার স্বভাব পুরো বদলে গিয়েছে। মাকে এখন সে সম্পূর্ণরূপেই নিজের বউমার মতো দেখে। আর নিশীথ ও মালতীর জটিল প্যাঁচ থেকে নিজের ছেলের বউকে রক্ষা করে সারাদিন বাড়িতে বসে।
এবার আসি আমার কথায়। স্কু/লে চাকরি পাওয়ার পর ৮ মাস কেটে গেছে, এই ৮ মাসে মাত্র হাতে গোনা দুটো দিন ছুটি নিয়েছিলাম , বাকি ছুটিগুলো জমাই ছিল। একইসঙ্গে ভাবলাম মাকে নিজের করে পেলাম ঠিকই, কিন্তু এই ঘরের মধ্যেই জীবন কেটে যাচ্ছে। যেন দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো আমার। তাই ভাবলাম মা কে নিয়ে কোথাও থেকে ঘুরে এলে কেমন হয়! এতে মাও খুশি হবে, আমিও। আর আমাদের একপ্রকার মধুচন্দ্রিমাও সারা হয়ে যাবে। যদিও অনুষ্ঠান করে বিয়ে করাটা এখনো হয়ে ওঠেনি। কিন্তু বিয়ে কি শুধু কয়েকজনকে দেখিয়ে বা খাইয়েই সম্পূর্ণতা পায়? নাকি এই বিয়ে নামক বস্তুটি আত্মিক! ভেতর থেকে উপলব্ধি করার বস্তু, যা তৈরি হয় মনের বন্ধন থেকে, যা আমার ও মায়ের মধ্যে অনেকদিন আগেই তৈরি হয়ে গেছে। তাই ভাবলাম আমাদের হৃদয়ে যখন আমরা বিবাহিত যুগল, তখন হৃদয়েই মধুচন্দ্রিমার স্বপ্ন দেখতে দোষ কি!
- চারু, চলো ঘুরে আসি একটা জায়গা থেকে... সমুদ্র, পাহাড় ও জঙ্গল - তিনই রয়েছে সেখানে। সেখানে শুধু তুমি আর আমি থাকবো, সব ব্যবস্থা করে নিয়েছি!
- সত্যি!!!
- হ্যাঁ চারু...তোমার সিঁথিতে সিঁদুর দেওয়ার পর থেকে আমার মন চাইতো কোথাও থেকে স্বামী-স্ত্রী ঘুরে আসি।
- কিন্তু লতার খেয়াল কে রাখবে? ওর ছেলেটার খেয়াল...!
- মালতী রয়েছে, ও রান্না, খেয়াল সবই রাখবে, বাবা রয়েছে, চিন্তা কি!
- তুমি...!
- আমি?
- তুমি...আমায় ঘুরতে নিয়ে যাবে?
- হ্যাঁ চারু....!
মায়ের চোখদুটো জলে ভিজে এলো। এতোখানি সম্মান, ভালোবাসা জীবনে প্রথমবার পেলে বুঝি সবারই চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে!
- তুমি আমায় এতো ভালোবাসো?
- হ্যাঁ...আমার প্রাণ তুমি... তোমায় যে এক দন্ড না দেখে থাকতে পারি না.... সেইজন্যেই তো তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছি, যাতে প্রতি প্রহরেই তোমার দর্শন ঘটে!
মা আমায় আবেগে জড়িয়ে ধরলো। তার চোখের জল আমার বুকের জামা ভিজিয়ে দিয়ে বলে গেল,
- আমি যে তোমায় ছাড়া বাঁচতে পারি না গো!!!
বিন্দি... জায়গাটার নাম। এমন জায়গা দুনিয়ায় খুব কমই আছে! একদিকে সমুদ্র, অন্যদিকে তার তীরে পাহাড় ও জঙ্গল ঘেরা এই প্রকৃতির মধ্যে কটা দিন নিজের স্ত্রীর সঙ্গে বেশ কাটবে। এই জায়গাটার নাম অনেক মানুষই জানেন না, আর তাই জন্যেই বোধহয় এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য এখনও অটুট রয়েছে। প্রকৃতি নিজের সবুজ ডানা মেলে এই সমুদ্রতট ভরে সাজিয়েছে! আমার নির্জন জায়গাই পছন্দ। মানুষের কোলাহল, তাদের অস্তিত্ব আমার খুব পছন্দের নয়। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় এই জনপদ ছেড়ে কোনো নির্জনে গিয়ে কাছের মানুষটির সঙ্গে নিভৃতে কাটিয়ে দিই বাকি জীবনটা। মানুষের ভিড়ে প্রতি মুহূর্তে নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয় হয় যে!
এখানে থাকার জায়গা বলতে সমুদ্রের তীরে একটা ছোটো মাটির কুঁড়েঘর। দুটি প্রাণী এই নির্জন প্রান্তরে কয়েকটা দিন নিজেদের সুখ আদান-প্রদান করবো, আমাদের ভালোভাবেই কেটে যাবে!
যখন পৌছালাম সেখানে, তখন সকাল। ব্যাগে হাঁড়ি, কড়াই, চাল, ডাল, মশলা, ফলমূল নিয়ে এসেছি কিনে, দুবেলা নিশ্চিন্তে রান্না করে খাওয়া যাবে। আর পানীয় জলের জন্য এখানে পাহাড়ে একটা ঝর্ণা রয়েছে, তার জল পানযোগ্য, সুতরাং জলেরও চিন্তা নেই। এই কুঁড়েঘরে ঢুকে সব জিনিসপত্র রেখে আমরা খালি হাতে দুজনে নেমে এলাম সমুদ্রের তীরে।
এখানে লোকজন নেই, কেবল আমরা দুজন, আর দূরে কয়েকজন জেলে মাঝি সমুদ্রে তাদের নৌকা ভাসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। মা এর আগে সমুদ্র আর পাহাড় দেখেনি। তার আনন্দ দেখে কে! মা আজ নীল একটা সিল্কের শাড়ি, সাদা ব্লাউজ পরেছে। এই নীল সমুদ্রের সঙ্গে বেশ মানিয়েছে তাকে! যেন এক ডানা কাটা পরী পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়েছে...সে এই বালুচরে ছুটে বেড়াচ্ছে সমুদ্রের এই পাগলা হাওয়ায়!
- ওগুলো কি গো?
বালির দিকে তাকিয়ে বাচ্চা মেয়ের মতো উৎসুক দৃষ্টিতে আমায় জিগ্যেস করলো মা!
- আরে এগুলো ঝিনুক...!
- মানে?
তাকে এবার বোঝাতে হবে ঝিনুক মানে কি! আমার সরল বউ কিছুই জানে না! আর এই জানে না বলেই তাকে এত সুন্দর দেখায়! যারা সব জানে, তাদের আগ্রহ কমে যায়, কিন্তু যারা কিছু জানে না, তাদের ছোটো ছোটো জিনিসেও আগ্রহ ফুটে ওঠে। আর এই আগ্রহ ভরা মায়ের চোখদুটো দেখতে আমার বড্ড বেশি ভালো লাগে! মা জানবে কিভাবে...ওই তিনটা ঘরের মধ্যেই তো জীবনটা কেটে গেল তার, বাইরের দুনিয়ায় যে তার কল্পনা পৌঁছাতেও পারে না!
- আরে এরা হলো এক ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী, যেমন মাছ, জেলিফিস, অক্টোপাস, আরও অনেক কিছু আছে, যারা সমুদ্রে বসবাস করে। এই যে ঝিনুক দেখছো, এটা কচ্ছপের মতো, এই যে খোলসটা, এর মধ্যে ও বেঁচে থাকে। সাধারণত এরা অগভীর জলে থাকে, তীরে আসে না। কিন্তু কিছু সময় ঝড় বা ঢেউয়ে কিছু কিছু ঝিনুক তীরে এসে পৌঁছায়। এই যে এগুলো দেখছো, এরা জীবিত না।
মন দিয়ে সব কথা গোল গোল চোখ করে কোমরে দুহাত দিয়ে মা শুনলো, কিছু বুঝলো, তারপর একটা ঝিনুক কুড়িয়ে নিল। তারপর আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
- ও। তুমি কিভাবে জানলে?
এবার এই প্রশ্নের উত্তর-ও আমাকেই দিতে হবে!
- বই পড়ে, মানুষের কাছে শুনে। তুমি মুক্তোর নাম শুনেছো?
এবার মেয়েদের রাজত্বে আমি ঢুকে পড়লাম। মেয়ে সম্পর্কিত কোনো বস্তু মেয়েরা জানে না, এমনটা দুর্লভ! সেই বস্তু তাদের কাছে না থাকলেও, খবর ঠিকই রাখবে তারা।
- হ্যাঁ... মুক্তোর হার হয়!
- ঠিক তাই। এই ঝিনুক থেকেই মুক্তো পাওয়া যায়। তবে সব ঝিনুক থেকে নয়। খোলো খোলো...খোলসটা ফাঁক করো।
মা দুহাতে ঝিনুকটা খুললো, ভেতরটা ফাঁকা।
- এ কি! কিছুই নেই তো!
আমি হেসে ফেললাম তার মুখের ভঙ্গিমা দেখে। আমার সরল মা টা। তারপর তাকে জড়িয়ে ধরলাম দুহাতে।
- এই ছাড়ো, কেউ এসে যাবে।
বউদের এই কথা সর্বজনীন ও চিরসত্য! জনহীন মরুভূমির কেন্দ্রবিন্দুতেও যদি এক বর তার বউকে জড়িয়ে ধরে, উত্তরটা একই আসবে।
- এখানে আর কে আছে বলতো...? কেউ নেই বলেই তো এখানে এসেছি তোমাকে নিয়ে যাতে দুদন্ড তোমায় কাছে পেতে পারি!
সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ ভেসে আসছে। এক ঝাঁক গাঙচিল ডাক ছাড়তে ছাড়তে উড়ে যাচ্ছে আকাশে। এই নির্জন সৈকতে মাকে জড়িয়ে ধরে আমি দাঁড়িয়ে আছি তার দিকে চেয়ে। মা ঝিনুক ফেলে আমায় জড়িয়ে ধরলো। যেন আমরা ফিরে গেছি ৭০ লক্ষ বছর আগের পৃথিবীতে, যখন মানুষ বলে কেউ ছিলনা আর আমরা, চারুলতা ও চয়ন প্রথমবার সঙ্গম করে মানুষের সৃষ্টি করতে চলেছি। এই বালুময় তীরে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে এই দুনিয়ায় সবকিছু অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে, রয়ে গেছি কেবল আমরা দুজনে! এই নির্জন প্রান্তরে আমরা দুটি প্রাণী একে অপরের স্পর্শে বিভোর হয়ে আছি, আর সমুদ্রের ঢেউ এসে বারে বারে আমাদের পা ছুঁয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে যাচ্ছে আমাদের নতুন জীবনের।
- দাদা....এদিকে!
চিন্তা থেকে বেরিয়ে এলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি দুজন জেলে আমাদের ইশারা করছে।
- হ্যাঁ বলুন।
- আপনারা নতুন দেখছি?
- হ্যাঁ। আজই এলাম, ঘুরতে.... কয়েকদিন থাকবো।
- দাদা, সন্ধায় সমুদ্র থেকে দূরে থাকবেন, এর জোয়ারের ঢেউ কিন্তু খুব বেশি। বিপদে পড়তে পারেন। তীরে অনেকদূর অবধি জল উঠে আসে। আপনারা নতুন লোক, জানিয়ে দিলাম।
- অনেক ধন্যবাদ দাদা।
মনটা ভরে উঠলো। সত্যিই এমন মানুষ আজও আছে। মনে মনে তার মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করলাম। তারা হেসে সমুদ্রে নৌকা ভাসালো। কতদূরে তারা এবার ভেসে যাবে মাছ ধরতে, কতদিন পর আবার নিজের বউ বাচ্চার মুখ দেখবে, কিছুই এরা জানেনা। শুধু জানে বেঁচে থাকতে হলে কাজ করে যেতে হবে।
কত বিচিত্র এই জগৎ। যেখানে এমন মানুষও আছে যারা অন্যের ক্ষতি করতে চায়, অন্যের সব কেড়ে নিয়ে নিজে সুখী হতে চায়, আবার এমন মানুষও আছে, যারা অন্যের উপকার করতে চায়, যারা সব অন্যকে দিয়ে অন্যকেই সুখী করতে চায়! বিচিত্র এই জগৎ, আর বিচিত্র তার মানবসভ্যতা! তবুও এর মধ্যেই আমি বেঁচে থাকতে চাই... বেঁচে থাকতে চাই চারুলতার জন্য...ওর যে আমি ছাড়া আর কেউ নেই!
পেছনে তাকিয়ে দেখি আরেক বিপদ। আমি ওদের সঙ্গে কথা বলার সময় চারু কখন সমুদ্রে নেমে গেছে খেয়ালই করিনি।
- চারু.... ফিরে এসো.... এক্ষুনি!
বাতাস খুব জোরে বইছে। চারু আমার কথা শুনতে পেল না। শাড়ি পরে থাকা সত্ত্বেও সাঁতার দিয়ে অনেকটা গভীরে চলে গিয়েছে সে। আমি দেখলাম তার সামনেই একটা বড় ঢেউ তৈরি হয়েছে, তার দিকেই এগিয়ে আসছে। যদি তার ভারসাম্য একটুও হারায় সে একমুহুর্তে তলিয়ে যাবে সমুদ্রের গভীরে।
আমি ঝাঁপ দিলাম। সেই ঢেউ আসার আগে আমাকে তার কাছে পোঁছাতে হবে।
- চারু....এই চারু....ঢেউ....ঢেউ....ফিরে এসো....চারু...!
সে শুনতেই পাচ্ছে না, উপরন্তু আরও গভীরে চলে যাচ্ছে। আর কিছুটা....আর দশ হাত.... পাঁচ.... দুই....এক....ধরে ফেলেছি...ঠিক এমনসময় সেই মারাত্মক বড়ো ঢেউটা আমাদের দুজনের ওপরে আছড়ে পড়লো। মুখ দিয়ে একটা কথাও বেরোল না, চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। ঢেউয়ের ধাক্কায় চারুর পেটে জল ঢুকে সে অচৈতন্য হয়ে পড়েছে। দুজনেই আমরা জলের তলায়। আমি নিঃশ্বাস বন্ধ রেখে চারুর হাতটা ধরতে পেরেছি কোনোমতে। তাকে বুকে টেনে নিলাম, তারপর কোনোমতে সাঁতরে তাকে নিয়ে তীরে এসে উঠলাম। চারু অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে। তার কোনো সাড়া নেই। আমি এই অবস্থায় কি করতে হয় একসময় পড়ে এসেছিলাম, সেই জ্ঞান-ই প্রয়োগ করলাম। তাকে চিৎ করে শুইয়ে তার মাথাটা পেছনদিকে হেলিয়ে দিলাম, এতে তার শ্বাসনালী খুললো। এবার তার নাক চেপে মুখে বাতাস ফুঁ দিয়ে ঢোকাতে লাগলাম কিছুক্ষন। তারপর তার দুই বুকের মাঝখানে আমার দুটো হাত লক করে চাপ দিতে লাগলাম জোরে জোরে। না, এখনও কোনো সাড়া নেই চারুর! আমি কি ওকে হারিয়ে ফেলবো....আমার চারু....ভেতরটা কেঁপে উঠলো!
- চারু...!!! ফিরে এসো চারু...!!!
চোখ দুটো ভিজে এলো আমার। আরো জোরে চাপ দিয়ে গেলাম। ২০ বার এভাবে চাপ দিতেই বমি করে পেট থেকে জল বের হয়ে আমার চারুলতা চোখ মেলে তাকালো। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম!
- একটা চড় মারবো গালে, সব বুঝে যাবে! আর যদি কোনোদিন আমায় না বলে কোথাও গেছো...!!!
চারুলতা আমাকে আঁকড়ে ধরে থাকলো। আমি তার মাথায় একটা চুমু খেলাম।
- আর কখনো যাবে আমাকে ছেড়ে...?
মা ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেললো।
- না...আমার ভুল হয়ে গেছে!
- আর কখনো যেও না, তোমায় ছাড়া...!!
- আমায় ছাড়া?
- তোমায় ছাড়া যে এই জগৎ?
- আমায় ছাড়া এই জগৎ?
- অর্থহীন চারু...! সব অর্থহীন!
তার মুখের পানে চেয়ে রইলাম। এই মিষ্টি মুখটা আমার এতো পছন্দ যে এর জন্য জগৎ জয় করা যায়! কিছুক্ষণ আগে যখন চারুর সাড়া মিলছিল না, আমি তখনই উপলব্ধি করেছি একাকীত্বের স্বরূপ ! এই জগতে মানুষ অনেক, কিন্তু কাছের মানুষ....একজনই হয়! সেই কিছুক্ষনের জন্য চারুলতাকে হারাবার ভয় আমাকে চারুলতার মূল্য বুঝিয়ে দিয়ে গেল!
দুপুরে আজ ফলমূল খেয়েই কাটিয়ে দিলাম। খাওয়া সেরে মাকে নিয়ে আবার এসে দাঁড়ালাম সমুদ্র সৈকতে। কি মনোরম বাতাস এখানে। সূর্য অনেকটা পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে। রোদ থাকলেও তার তেজ খুব বেশি না, বেশ শীত শীত লাগছিল। একটা চাদর নিয়ে এসেছি। এখন ভাটা চলছে। আমরা এমন জায়গায় বসেছি, আমাদের পায়ে সমুদ্রের জল এসে গোড়ালি পর্যন্ত ভিজিয়ে দিচ্ছে। আশেপাশে কোনো লোকজন নেই। শুধু আমি চারুলতার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছি। মা বসে আমার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে আর এই প্রকৃতিকে উপভোগ করতে করতে আমার সঙ্গে গল্প করছে।
- চারু, তুমি খুশি?
- খুব....আমি আগে কখনো সমুদ্র দেখিইনি।
মায়ের এই সরল কথাগুলো বেশ লাগে...এই সমুদ্রের স্নিগ্ধ বাতাসের মতোই ভেতরটা জুড়িয়ে দিয়ে যায়।
- কিন্তু ওরা এখন কি করছে....তোমার বাবা...লতা....ওর ছেলেটা...আমি থাকলে হয়তো খেয়াল রাখতাম এখন...!!!
- একটা কথা বলো...!
- বলো...!
- আজ তোমায় কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে আমি নিজেকে চিনতে পারলাম!
এই কথায় মা চুপ করে আমার চোখে তাকিয়ে রইল। তার চোখে প্রেম ও কৌতূহল মিশে আমায় তা জানান দিচ্ছে।
- কি চিনলে?
- চিনলাম এই যে....তুমি যদি না থাকো.... বোধহয় আমিও আর বাঁচতে পারবো না!
মা আমার মুখ চেপে ধরলো।
- এ কথা বলবে না কখনো।
আমি মায়ের চোখের দিকে তাকালাম। তার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। আমি তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরলাম। মা চোখ বন্ধ করলো। আমি মায়ের কোলে শুয়ে থাকায় মা ঝুঁকে আমাকে চুমু খাচ্ছে। আহ্....কি মিষ্টি আমার চারুর ঠোঁট! এমনসময় একটু আগের সেই ঘটনার কথা মনে পড়তেই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো আর আমি শিউরে উঠে মায়ের ঠোঁট ছেড়ে দিলাম। মা বুঝতে পারলো।
- ভয় পেলে?
- হ্যাঁ!
- কিসের ভয়?
- তোমাকে হারাবার!
- একটা কথা বলবো...?
- বলো!
- আমাকে বকবে না?
এই কথায় আমি তার মায়াবী মুখখানা কাছে টেনে তার চোখে চুমু খেলাম।
- না।
- আমি তোমার থেকে বড়ো, অনেক বছরের।
- হুমম।
- তাই...!
- তাই?
- রাগ করবে না?
- না, বলো।
- আমায় ছেড়ে কিন্তু তোমায় থাকতে হবে একদিন!
আমার ভেতরটা হু হু করে উঠল মায়ের এই ছোট্ট একটা কথায়। মা যে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কতকিছু নিজের ওই ছোট্ট হৃদয়টিতে ভেবে রেখেছে, তা আজ জানতে পারলাম। মা যে আমার চেয়ে অনেক আগেই এই পৃথিবী ছেড়ে...আমায় ছেড়ে...তার প্রেমকে.... ছেড়ে চলে যাবে, এই কথাটা ভাবতেই আমার ভেতরে কেমন এক সূক্ষ্ম যন্ত্রনা অনুভব করলাম! আজ এত কাছ থেকে মায়ের অভাব আমি বোধ করেছি, কিছুক্ষণ পর মাকে ফিরেও পেয়েছি তারপর, কিন্তু সেদিন আর মা ফিরবে না... সেদিন মা চলে যাবে না ফেরার দেশে...আমার দুচোখ বেয়ে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে মায়ের কোলের শাড়ি ভিজিয়ে দিতে লাগলো....এই কথা ভাবতেই ভেতর থেকে আমার হৃদয় আমার পাঁজরে মাথা ঠুকে বলতে লাগলো,
- আমি বাঁচবো না তোমাকে ছেড়ে চারু.... সেদিন আমি তোমার সঙ্গেই চলে যাবো.... মিলিয়ে নিও!
মা কাঁপা গলায় বললো,
- একটা কথা রাখবে আমার?
আমার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে মাও কাঁদতে লাগলো। আমি বললাম,
- বলো।
- আমাদের ছেলে হোক বা মেয়ে, যখন আমি থাকবো না, তোমাকে ওদের সঙ্গে বাঁচতে হবে....আর...!!!
আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম,
- আর কি চারু....বলে দাও....আমায় আজ তুমি ভেঙে চুরে এই সৈকতে বিলীন হয়ে যেতে দাও এই বালুকণার অন্তরে!
- ওগো....তুমি কান্না থামাও....তুমি এভাবে কাঁদলে আমি যে থাকতে পারি না...!!!
- তুমি বলো চারু....আর....আর কি?
- আর....তুমি যেখানেই থাকো, শেষ বয়সে একটিবার আমাদের গোবাদায় ফিরে আসবে... যেখানে তোমায় আমি প্রথম ভালোবেসেছিলাম... ওই ভিটেই আমাদের কত স্মৃতি ছড়িয়ে আছে বলোতো....আমি থাকবো না সেদিন.... কিন্তু তুমি থাকবে....তুমি যাবে ওই ভিটেই...তাহলেই আমার শান্তি...আমি সেদিন মনে করবো আমি তোমার সঙ্গেই রয়েছি....কারণ...!!!
আমার মুখ দিয়ে কথা বেরোলো না.... শুধু ভেতর থেকে একটা চাপা কষ্ট বেরিয়ে আসতে লাগলো...।
- কারণ....আমিও যে তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না...!!!
মা কেঁদে ফেললো।
এই সমুদ্রের কাছে আমি প্রশ্ন পাঠালাম....এত কষ্ট কেন? যদি সব শেষ-ই হবে একদিন.... শুরু হয় কেন? যদি সব টুকরো হয়ে যাওয়াই হয় পরিণতি, তবে গড়ার খেলা কেন....যদি প্রেম হারিয়েই যায়, তবে প্রেম এসেছিল কেন? এতো নিষ্ঠুর তুমি!
এই সমুদ্র তার উত্তর আমায় দিল...আমার পায়ে তার জল ছুঁইয়ে আবার নিয়ে গিয়ে সমুদ্রেই মিশিয়ে নিলো। বুঝিয়ে দিয়ে গেলো....এই কিছুক্ষণের স্পর্শ.... কিছুক্ষণের জন্যেই বরাদ্দ... জীবনটা যে এমনই...যে এসেছে...সে ফিরে যাবে....থেকে যাবে শুধু স্মৃতিগুলো!!!
(ক্রমশ.....)