ছায়ার আড়ালে আগুন -Crime Thriller [Part-3: অন্ধকারের অধিশ্বর] - অধ্যায় ৫৯
[b][b]গল্প: "ছায়ার আড়ালে আগুন" (পার্ট-৩: অন্ধকারের অধীশ্বর) [/b][/b]
আটান্নতম[b][b] পরিচ্ছেদ: [/b][/b]শেষ নি:শ্বাস
পরের দিন সকাল সাড়ে দশটা।
বিন্দুবালা দেবী বাড়ির সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি আজ সকাল থেকেই অস্থির ছিলেন। ব্রজদাসীর গ্রেপ্তার, অংশুমানের বিশ্বাসঘাতকতা — সব মিলিয়ে তাঁর মাথায় একটা ভারী চাপ ছিল। তিনি ভাবছিলেন, আজই কিছু একটা করতে হবে। অংশুমানকে শায়েস্তা করতে হবে।
তিনি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলছিলেন। শাড়ির আঁচলটা একপাশে সরে গিয়েছিল। চারপাশে সকালের স্বাভাবিক কোলাহল — রিকশা, ভ্যান, কয়েকজন লোকজন হাঁটছে।
হঠাৎ একটা কালো স্করপিও গাড়ি দ্রুতগতিতে রাস্তা দিয়ে আসছিল। গাড়িটা যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। চাকার শব্দটা খুব জোরে ছিল।
বিন্দুবালা দেবী ফোন কানে লাগিয়ে কথা বলছিলেন। তিনি গাড়িটাকে দেখতেই পাননি।
থাক্ক!
স্করপিও গাড়িটা সরাসরি বিন্দুবালার শরীরে ধাক্কা মারল। তাঁর শরীরটা বাতাসে উড়ে গিয়ে রাস্তার ওপর পড়ল। শাড়ি ছিঁড়ে গিয়েছিল, শরীর থেকে রক্ত বেরিয়ে আসছিল। তাঁর মাথা রাস্তার ওপর ঠুকে গিয়েছিল।
চারপাশে চিৎকার উঠল।
“আরে! মারা গেল! মারা গেল!”
লোকজন ছুটে আসতে লাগল। কেউ কেউ গাড়িটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। স্করপিও গাড়িটা থামল না। সেটা দ্রুতগতিতে এগিয়ে গিয়ে রাস্তার মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
বিন্দুবালা দেবী রাস্তার ওপর শুয়ে ছিলেন। তাঁর শরীরটা রক্তে ভেজা। চোখ দুটো অর্ধেক খোলা। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
রানি বাড়ির ভিতর থেকে চিৎকার শুনে ছুটে বেরিয়ে এল। সে বিন্দুবালাকে রাস্তার ওপর পড়ে থাকতে দেখে থমকে গেল। তারপর হঠাৎ করে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এল।
“মাসী! মাসী!”
রানি বিন্দুবালার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সে বিন্দুবালার রক্তাক্ত মাথাটা তুলে নিজের কোলে নিল। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
“মাসী… মাসী… উঠুন… আপনি উঠুন…”
বিন্দুবালা দেবী ধীরে ধীরে চোখ খুললেন। তাঁর চোখে ব্যথা আর দুর্বলতা। তিনি রানির দিকে তাকালেন। তারপর কাঁপা হাতটা তুলে রানির মাথায় রাখলেন।
“রানি…” তিনি আস্তে আস্তে বললেন। তাঁর গলা ভেঙে যাচ্ছিল।
রানি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “মাসী… আপনি ভয় পাবেন না… আমি আছি… আমি আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি…”
বিন্দুবালা দেবী দুর্বল গলায় বললেন, “ভালো থাকিস… ভালো থাকিস রানি… আর আমার ব্যবসাটা… তোর হাতে দিয়ে গেলাম… আমার তো তুই ছাড়া আর কেউ নেই…”
রানি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “এমনটা কীভাবে হল মাসী? এমনটা কীভাবে হল?”
বিন্দুবালা দেবী চোখ বন্ধ করে ফেললেন। তারপর আবার খুলে রানির দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে এখন একটা তীব্র, জ্বলন্ত আগুন ছিল।
“অংশু…” তিনি আস্তে আস্তে বললেন। “ওই অংশুমানই… আমার এই হাল করেছে… তুই বদলা নিস… তুই তাকে ছাড়বি না…”
রানি চমকে উঠল। সে বিন্দুবালার দিকে তাকিয়ে রইল।
বিন্দুবালা দেবী আবার বললেন, “তুই… আমার ব্যবসাটা দেখিস রানি… আমি তোর ওপর দায়িত্ব দিয়ে গেলাম। দেখিস রানি আমার।”
তাঁর শ্বাসটা আরও কষ্ট করে উঠছিল। রক্ত বেরিয়ে আসছিল।
রানি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “মাসী… আপনি চিন্তা করবেন না… আমি সব করব… আপনি শুধু ভালো হয়ে উঠুন…”
কিন্তু বিন্দুবালা দেবী আর কথা বলতে পারলেন না। তাঁর চোখ দুটো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এল। শরীরটা একবার কেঁপে উঠল, তারপর স্থির হয়ে গেল।
লোকজন ছুটে এসে বিন্দুবালাকে তুলে একটা গাড়িতে তুলল। রানি সাথে সাথে উঠে পড়ল। গাড়িটা দ্রুতগতিতে নার্সিং হোমের দিকে ছুটল।
কিন্তু রাস্তাতেই বিন্দুবালা দেবীর শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
নার্সিং হোমে পৌঁছানোর আগেই তিনি মারা গেলেন।
রানি গাড়ির ভিতরে বিন্দুবালার রক্তাক্ত শরীরটা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। তার চোখ দিয়ে জল থামছিল না।
“মাসী… মাসী…”
গাড়ির ভিতরে শুধু রানির কান্নার শব্দ আর ইঞ্জিনের গর্জন শোনা যাচ্ছিল।
বিন্দুবালা দেবী চলে গেছেন।
কিন্তু তাঁর শেষ কথা — “তুই বদলা নিস” — রানির কানে এখনো বাজছিল।
রানি চোখ মুছে সামনে তাকাল। তার চোখে এখন আর শুধু দুঃখ ছিল না — একটা ঠান্ডা, জ্বলন্ত প্রতিশোধের আগুন জ্বলছিল।
[[তৃতীয় খন্ড সমাপ্ত]]