ছিন্নমূল ঃ কামদেব - অধ্যায় ৩০
ত্রিংশৎ অধ্যায়
সাদিয়া বেগম রান্না ঘরে। আনিস মিঞা বৈঠক খানায় বসে মনে হচ্ছে কার সঙ্গে কথা বলছে।চায়ের জল চাপিয়ে দিয়েছে সাদিয়া।উনি আবার আজ বেরোবেন।সাদিয়া বেগম নিজের পেটের দিকে তাকিয়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করে।আনিস মিঞা এসে বলল,মকবুল এসেছে দুই কাপ চা দিবি।
এই হারামীটা যত নষ্টের গোড়া।সাদিয়া বলল,শোনেন আপনেরে একটা কথা বলি।
আনিস মিঞা ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,তোর আবার কি কথা?
মনে হচ্ছে আমার পেট বেধে গেছে।
অবাক চোখে বিবির আপাদ মস্তক দেখে আনিস বলল,তুই আমারে কি ভাবিস বলতো?শোন তোরে একটা কথা বলি এভাবে তুই সাদি আটকাতি পারবি না।এক রাত্তিরে ওনার পেট বেধে গেল।
কথাটা বিশ্বাস করবে না সাদিয়া জানতো।মনে মনে একটা মতলব করল।দু কাপ চা নিয়ে বৈঠকখানায় গিয়ে টেবিলের উপর নামিয়ে চলে আসছিল মকবুল বলল,ভাবী কি আমার উপর গোসসা করছেন?
গা জ্বলে যায় কিন্তু সাদিয়া মাথা গরম করে না বলল,আপনে কেডা আপনের প্রতি গোসসা করব?
মকবুল হেসে বলল,আজ মেয়ে দেখতি যাচ্ছি না।
সাদিয়া চলে যেতে আনিস মিঞা বলল,তোর এসব কথা বলার দরকার কি?
দেখলাম ভাবীর মুখটা কেমন গম্ভীর তাই--।শোনো যে কথা বলতি এসিছি,ওস্তাদ ওরা এক পায়ে খাড়া দোকান দেখে গেছে খালি একটা ব্যাপারে--
আবার কি হল?
এতদূরে মানে কোলকাতার কাছাকাছি হলে মানে--।
আনিস মিঞা কিছুক্ষন ভেবে বলল,হুউম। তুই কলকাতায় ঘর দেখ।এতদুর থেকে যাতায়াত আমারও অসুবিধে হয়--।
সাদিয়া ফিরে আসে রান্না ঘরে।আজ যাচ্ছে না কেন?তাহলে তার কথায় কি কাজ হয়েছে?কোনো কথা তারে খুলে বলে না।গরম মেজাজ কোনো কিছু জিজ্ঞেস করতেও ভয় হয়।ওনারে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে হবে।
ঘুম ভাঙ্গলেও সুখ আলসেমী করে পড়েছিল।এক সময় খেয়াল হয় বেরোবার আগে মা চা দিয়ে গেছে।উঠে বসে মাথার কাছে রাখা কাপ নিয়ে চুমুক দিয়ে বুঝলো জুড়িয়ে জল হয়ে গেছে।চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে মনে হল একবার কাকুর সঙ্গে দেখা করলে কেমন হয়।সেখানে অন্তত এক কাপ চা পাওয়া যাবে। মিলি্র কথা কি বলেছেন শুধু শনিবারের কথা বলেছেন নাকি আর পড়াতে হবে না সেটা নিশ্চিত হওয়া দরকার। অবশ্য বাসুদি বলেছে কলকাতায় একটা টিউশন ঠিক করে দেবে।মিলিকে না পড়ালেও ক্ষতি নেই।চোখে মুখে জল দিয়ে জামা প্যাণ্ট পরে বের হল।রাস্তায় নির্মলের সঙ্গে দেখা।
কিরে সুখ তোর তো পাত্তাই পাওয়া যায় না।অবশ্য আমিও বেশী বেরোই না।
কোথায় ভর্তি হলি?
দীনবন্ধু।তোর সীমা তো তাপসের সঙ্গে সেটকে গেছে।
আমার সীমা মানে?
না মানে তোর সঙ্গে খুব ভাব ছিল।
সবার সঙ্গে যেমন আমার সঙ্গেও তেমন।যাক কোথায় চললি?
বটতলা।চল যাবি সবার সঙ্গে দেখা হবে।
না রে একটা জরুরী কাজে বেরিয়েছি।
দেবেন বিশ্বাস দোতলার বারান্দায় দাড়িয়েছিলেন।তাকে দেখে ইশারায় ডাকলেন।সুখদা সিড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে কাকু বললেন,তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালই হয়েছে।এসো ভিতরে এসো।
সুখ ভিতরে ঢুকে বসতেই দেবেনবাবু বললেন,বোসো আমি আসছি।
সুখ বুঝতে পারে কাকু চা আনতে গেলেন।কিছুক্ষন পরে দু-কাপ চা নিয়ে ঢুকে বললেন,বৌদির কাছে সব শুনেছো তো?
হ্যা মা বলেছে কল্যাণিতে আপনার বদলি হয়েছে।
মিলি ওর মামার বাড়ী গেছে।সকালে ফেরার কথা ছিল ফেরেনি।কখন ফিরবে কে জানে।কাল তো ওর স্কুল আছে। তুমি সামনের শনিবার থেকেই পড়াবে।
ট্যুইশনিটা তাহলে থাকছে সুখ নিশ্চিত হল।
তুমি কাল কোথায় গেছিলে?বৌদি চিন্তা করছিলেন।
মায়ের এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেছিলাম।
ও একটা ভালো খবর তোমাদের বাড়তি ভাড়া দিতে হবে না।সামনের মাস থেকে দুজন আসছে।শুনেছি দুজনেই একই অফিসে কাজ করে,মেদিনীপুরের লোক।
কাল থেকে আপনি কল্যাণীতে যাবেন?
তোমাকে বলা হয়নি।অফিস থেকে ফিরে দেখলাম তুমি বেরিয়ে গেছো।ছোটো একটা প্রোমোশন তার চেয়ে বড় কথা বাড়ী থেকে অফিস করা যাবে।পরিবারের মানুষজনের সঙ্গে রোজ দেখা হবে।আচ্ছা রঞ্জন সুবীর বাবু তোমার কেউ হয়?
সুবী মামা?উনি আমার মামা হন।
নিজের মামা?
হ্যা মায়ের ছোটো ভাই।বাংলাদেশে মামাদের বিরাট অবস্থা ছিল।কেন কাকু?
কিছু একটা বলতে গিয়ে কাকু থেমে গেলেন।সুখ জিজ্ঞেস করে,আপনি কি সুবী মামাকে চেনেন?
দেখো রঞ্জন আমাকে কেউ প্রণাম করলে বলি,বড় হও--আমি কেন সবাই এরকম বলে।কিন্তু সত্যি যদি আমাকে অতিক্রম করে যায় আমি কি সহজভাবে নিতে পারবো?পৃথিবীতে দুটি মানুষ আছে সব চেয়ে আপন।এক মা দুই বাবা।সন্তান যদি বাবাকে অতিক্রম করে যায় তাতে মা-বাবার মতো খুশী কেউ হয় না।
মায়ের কথা উঠতে চোখ ঝাপসা হয়ে এল।এই যে লোকের বাড়ী কাজ করছে সেকী নিজের জন্য?নিজেকে সামলে নিয়ে সুখ বলল,মামার কথা কি বলছিলেন?
তেমন কিছু না।আসলে কি জানো তুমি খুব সহজ সরল এটা তোমার বড় গুণ।এই সরলতাকে অনেকে ভাবে বোকামী,তার সুযোগ নিতে চায়।কাউকে বেশী ভরসা করবে না।
কাকু সম্ভবত মামার কথা বলতে চাইছেন।মামাকে তেমন মনে হয়নি।বিপদে আপদে সব সময় মামা পাশে থাকে।
কাল থেকে তো তোমার আবার কলেজ।মিস শেখোয়াত মহিলা বাইরে একটু চোটপাট করলেও অত খারাপ নয়।তবে কি অস্বাভাবিক জীবন যাপন করলে একটু-আধটু পারভারশন আসতেই পারে।এই বয়সে ওর সংসার করার কথা।পুরুষ বিদ্বেষ ঐসব বইয়ের প্রতি ঝোক অস্বাভাবিক নয়।দেবেনবাবু হেসে বললেন, নেও বেলা হল।এবার ওঠা যাক।
সুখদা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,হ্যা আপনারও তো স্নানের সময় হয়ে গেছে।আসি?
সিড়ি বেয়ে নীচে নেমে এল।কাকু বোধ হয় ঐসব বই বলতে পর্ণ গ্রাফির কথা বলতে চাইছেন।বাসুদি পর্ণ গ্রাফির বই পড়ে ভেবে কেমন মায়া হল।বৈচিমাসী বিয়ে হয়েও কুমারী মেয়ের জীবন যাপন করছে বাসুদির তো বিয়েই হয় নি।একেই কাকু অস্বাভাবিক জীবন যাপন বলছেন।কাকুর সঙ্গে কথা বললে অনেককিছু শেখা যায়।বাইরে বেশ ঝাঝালো রোদ উঠেছে।মা মনে হয় এতক্ষনে ফিরে এসেছে।
মকবুল চলে যেতে রান্না ঘরে এসে আনিস মিঞা বলল,মেহমানের কিভাবে কথা বলতি হয় জানিস না?
যে যেমন তার সাথে তেমন ব্যবহার করতে হয়।
থাপড়ায়ে দাত ফেলায়ে দেব।বেয়াদব মেয়েছেলে।এতকাল কিছু হল না একরাতে ওনার পেট বেধে গেছে।কি ভেবেছিস আমারে?
শোনেন আল্লামিঞার মর্জি হলি কুমারী মেয়েও পোয়াতি হতি পারে।
চোপা বেড়েছে খুব কোথায় শিখলি এসব?খেয়ে দেয়ে কাজ নাই আল্লা ওর পেটে বাচ্চা ভরে দেছে।
তাহলি হায়েজ বন্ধ হল খালি খালি?জিদের বশে বলে ফেলল সাদিয়া।
কি বললি?আনিস মিঞা অবাক হয়ে বিবির পেটের দিকে তাকায়।
হায় হায় একী বলল?সাদিয়া ভাবে হাতের ইট আর মুখের কথা একবার বেরিয়ে গেলে ফেরানোর আর উপায় থাকেনা।
আবার মিছা কথা।
হ্যা আমি তো মিছা কথা বলি হাচা কথা বলে আপনের দোস্ত।
দাড়া হারামজাদী কাল কলকাতা থেকে ফিরে তোর ব্যবস্থা করছি।
রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবে সাদিয়া এতো নিজের জ্বালে নিজেই জড়িয়ে গেল।আপু বারবার বলছিল মাথা গরম করিস না।কাল কি করবে ভেবে পায় না।কেন যে বানায়ে হায়েজের কথা বলতে গেল।আল্লাহ এবারের মত আমার গুণাহ মাপ করে দেও।আমি তো ইচ্ছা করে বলি নাই মুখ ফস্কায় বেরোয় গেছে।উল্টা দিকে মুখ ফিরায়ে শুয়ে আছে আনিস মিঞা।