জুলাই আন্দোলন - অধ্যায় ১২
পর্ব ১২: মিরা ও রাহাত
রাত তখন এগারোটা বেজে গেছে। বাড়ির ড্রয়িং রুমে আলো জ্বলছে। মিরা তার ছেলে মিরাজকে পড়াচ্ছিল। ছোট্ট টেবিলের উপর ইংরেজি বই খোলা। মিরাজ বারবার একই কবিতার লাইন মুখস্থ করার চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই মনে রাখতে পারছে না।
'' Baa Baa Black Sheep
Baa Baa Black Sheep
Baa Baa Black Sheep"
“মা… আমি আর পারছি না। ঘুম পাচ্ছে,” মিরাজ ক্লান্ত গলায় বলল।
মিরা রেগে গিয়ে বলল, “ঘুমাবে? ঘুমাবে তুমি? এর আগে এই কবিতাটা মুখস্থ করবে। একবারও ঠিকমতো বলতে পারছ না!”
মিরাজের চোখে পানি চলে এল। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, “মা… আমার মাথা ব্যথা করছে…”
“চুপ! একদম চুপ!” মিরা ধমক দিয়ে বলল।
মিরাজের কান্নার আওয়াজ বেড়ে গেল। বেডরুম থেকে তার বাবা রাহাত বের হয়ে এল। তার মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।
“কী করছ মিরা? ছেলেকে এত রাতে এভাবে পড়াচ্ছ কেন? অনেক হয়েছে। ঘুমাতে দাও ওকে,” রাহাত বিরক্ত সুরে বলল।
মিরা ঘুরে তার স্বামীর দিকে তাকাল। তার চোখে রাগ আর হতাশা মিশে ছিল।
“তুমি কী বুঝবে? ছেলেকে সময় দাও? আমি বুঝি। প্রতিবার কলেজে ওর জন্য আমাকে লজ্জা পেতে হয়। ঝুমুর চেয়ে আমি কি কম দিচ্ছি ওকে? তবুও রেজাল্ট খারাপ হয় কেন? অন্য বাচ্চারা কীভাবে এত ভালো করে?”
কথা বলতে বলতে মিরা রাগের মাথায় মিরাজের পিঠে একটা চড় মেরে দিল। “কাল কলেজে গিয়ে ঝুমুর পা ধোয়া পানি এনে খাবি! তাহলে হয়তো তোর মাথায় একটু বুদ্ধি ঢুকবে!”
মিরাজ জোরে কেঁদে উঠল। সে তার বাবার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে বলল, “বাবা…”
রাহাত ছেলের দিকে তাকাল। তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু সে কিছু বলতে পারল না। শুধু অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
সে জানে, মিরা তার চেয়ে অনেক বেশি ধনী পরিবারের মেয়ে। বিয়ের আগে মিরা তাকে সাহায্য করে আর বিয়ে করার পর মিরার বাবা কবির মিয়া তাকে অনেক সাহায্য করেছিলেন। এখনো এই বাড়ি, এই সংসার — সবকিছুর পেছনে কবির মিয়ার অবদান আছে। রাহাত জানে, সে যদি মিরার বিরুদ্ধে কথা বলে, তাহলে তার অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। তাই সে চুপ করে থাকে।
মিরা আরও ক্ষেপে গিয়ে বলল, “দেখো, ছেলেকে নষ্ট করার জন্য তুমি কথা বলো না। আমি যা করছি, ঠিকই করছি।”
রাহাত শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেডরুমের দিকে ফিরে গেল। তার পেছনে মিরাজের কান্নার আওয়াজ আরও জোরে বাজতে থাকল।
মিরা ছেলের সামনে বসে আবারও কবিতার বই খুলে ধরল। তার চোখে জেদ আর হতাশা মিশে ছিল। সে চায় না তার ছেলে কোনোদিন তার বান্ধবির মেয়ে ঝুমুর চেয়ে কম পাক। মিরা চৈতীকে সব ক্ষেত্রে ভালোবাসলেও এ ক্ষেত্রে হিংসে করে। সে নিজের ছেলেকে তার বান্ধবীর মেয়ের চেয়ে ভালো করতে চায়। বাংলাদেশে এ প্রতিযোগিতা মনে হয় শহর থেকে গ্রাম সব ঘরে ঘরে।
কিন্তু এই রাতে, এই ড্রয়িং রুমে — শুধু একটা ছোট ছেলের কান্না আর একজন মায়ের কঠোরতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
রাহাত বিছানায় শুয়ে পড়ল। ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই। মিরাজের কান্না আর মিরার রাগী গলা এখনো কানে বাজছে। সে চোখ বন্ধ করতেই অতীতের স্মৃতি ঝড়ের মতো ভেসে উঠল।
মিরা ছিল তার কলেজের সবচেয়ে ধনী ও সুন্দরী মেয়ে। রাহাদ কখনোই ভাবে নি, মিরার মত মেয়ে তাকে পছন্দ করবে। মিরা গার্লফ্রেন্ড হিসেবে ছিল অনেক সাপোর্টিভ। রাহাদ পড়াশোনায় ছিল অনেক ভালো, কিন্তু তাকে প্রায় ই অন্য ছেলেরা বিভিন্ন কারণে বিরক্ত করত। মিরা ওই ছেলেদের খুব কঠিন শাস্তি দেয়। যার কারণে রাহাদকে আর কখনো বিরক্ত করার সাহস পায় নি।
বিয়ের আগে আসলেই মিরা তাকে যেভাবে ভালোবাসত, সেই দিনগুলো এখন স্বপ্নের মতো লাগে।
সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনো তার বুক জ্বলে। যেদিন সে কবির মিয়ার কাছে মিরার হাত চাইতে গিয়েছিল, সেদিন কবির মিয়া তাকে অনেক অপমান করেছিলেন।
“তোমার কি মনে হয়? তোমার মতো ছোট লোককে আমি আমার মেয়ে তুলে দেব? যে জায়গা থেকে আমার মেয়ের সম্বন্ধ আসছে, তুমি সেই জায়গার চাকর হওয়ার যোগ্যতাও রাখো না!”
কথাগুলো এখনো রাহাতের কানে বাজে।
কিন্তু মিরা সেদিন তার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ করেছিল।
“বাবা, একদিন তুমি নিজেই গর্ব করে বলবে — রাহাত আমার মেয়ের জামাই!”
সেদিন মিরা রাহাতের হাত ধরে কবির মিয়ার বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। আর সেই রাতেই তাদের বিয়ে হয়।
বিয়ের পর মিরা তার বান্ধবী চৈতীর পা ধরে কেঁদেছিল। মিরা নিজের স্ট্যাটাস ভুলে যায়। চৈতি তখন তার শ্বশুর কুদ্দুস মিয়াকে বলে রাহাতের জন্য পৌরসভায় একটা সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।
মিরাজ যখন জন্ম নিল, কবির মিয়া সব কিছু ভুলে গেলেন। জামাইকে মেনে নিলেন। রাহাত তখন গর্বিত পুরুষ ছিল। রাহাত সব পেয়ে গিয়েছিল, সন্তান, শ্বশুর বাড়ির সাপোর্ট ও একটা সুন্দর ও সাপোর্টিভ বউ।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সব বদলে গেছে।
এখন রাহাত আর গর্বিত পুরুষ নয়। সে এক বিষণ্ণ, অসহায় মানুষ। মিরার চোখে সে এখন শুধু তার বাবার টাকায় বেঁচে থাকা একটা “রক্তের পিণ্ড জন্তু”। মিরার অহংকার প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। রাহাত যত চেষ্টা করে দূরত্ব কমাতে, মিরা ততই দূরে সরে যায়।
আড়াই মাস আগে শেষবার তারা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক রেখেছিল। রাহাত তখন মিরার শরীরের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মিরা তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, “এখন আমার মন নেই।”
তারপর থেকে আর কোনোদিন হয়নি।
রাহাত চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠছিল। একসময় যে মেয়ে তার জন্য বাবার বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে এসেছিল, আজ সেই মেয়েই তাকে প্রতিদিন ছোট করে দিচ্ছে তার ই ছেলের সামনে।
পাশের ঘর থেকে এখনো মিরাজের ফোঁপানি ভেসে আসছিল। রাহাতের চোখের কোণে অশ্রু জমে উঠল, কিন্তু সে মুছে ফেলল।
সে জানে, এই সংসারে তার কোনো অধিকার নেই। শুধু সহ্য করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।