জুলাই আন্দোলন - অধ্যায় ১৫

Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-73076-post-6193237.html#pid6193237

Posted on Fri Apr 24 2026 by Mr. X2002 (Profile)

1010 words / 5 min read

Parent
পর্ব ১৫: সিলেট রাত আটটা। বাসটা যখন সিলেট শহরে ঢুকল, জানালার কাচে লেগে থাকা ধুলোর স্তরের ওপাশে অন্য একটা জগৎ দেখা গেল। ঢাকার হলদে ধোঁয়াশা আর ক্লান্তিকর হর্নের বদলে এখানে পাহাড়ের গাঢ় সবুজ, রাস্তার পাশে চা-বাগানের সারি, আর আকাশে ঝকঝকে তারা। বাতাসটাও আলাদা—ভারী নয়, হালকা। শীতল। মিরা উত্তেজনায় রাহাদের হাত খামচে ধরল, “এই দেখো দেখো, পাহাড়! সত্যিকারের পাহাড়!” রাহাদ জানালায় মুখ ঠেকিয়ে হাসল। তার চোখেও মুগ্ধতা। “হ্যাঁ। মনে হচ্ছে পাহাড়ের কোলের মধ্যেই কেউ শহরটাকে বসিয়ে দিয়েছে। কী সুন্দর!” ওদের কথার শব্দে চৈতির পাতলা ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখ মেলে প্রথমে সে বুঝতে পারল না কোথায় আছে। তারপর টের পেল—তার মাথাটা এলিয়ে আছে লোকনাথের চওড়া কাঁধে। আর লোকনাথের মাথাটা আলতো করে ঠেকে আছে তার চুলের উপর। একটা গরম স্রোত বয়ে গেল চৈতির শিরদাঁড়া দিয়ে। লজ্জা। তীব্র লজ্জা। এসি বাসের নীল আলোয় লোকনাথের মুখটা ঘুমন্ত, নিষ্পাপ লাগছে। এখন যদি সে নড়ে ওঠে, লোকনাথ জেগে যাবে। সবার সামনে কী ভীষণ অস্বস্তিকর একটা দৃশ্য হবে! চৈতি নিঃশ্বাস চেপে স্থির হয়ে রইল। মাথাটা সরাল না। বরং চোখ দুটো ঘুরিয়ে জানালার বাইরে রাখল। সিলেট। সত্যিই যেন স্বর্গ। তাদের শহিরের মত সেই চেনা ধুলো, কালি, মানুষের চিৎকার, রাজনীতির মারপ্যাঁচ—কিছুই নেই এখানে। শুধু নিকষ কালো পাহাড়ের রেখা, আর এক অদ্ভুত, শান্ত নিরবতা। বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা যেন একটু হালকা হলো। বাসটা হোটেলের সামনে এসে থামল। তিনতলা সাদা বিল্ডিং, সামনে বাগান। আজ রাতের পরিকল্পনা—পুরো দল এখানেই থাকবে। ড্রাইভার দুবার লম্বা হর্ন দিল। ঘুমন্ত যাত্রীদের জাগানোর সংকেত। হর্নের শব্দে চৈতি এবার ধীরে মাথাটা তুলে নিল। লোকনাথও নড়েচড়ে উঠল। চোখ কচলে চারপাশে তাকাল, যেন বুঝতে পারছে না কোথায় আছে। এর মধ্যেই মিরা সামনের সিট থেকে উঠে এসেছে। চৈতির হাত ধরে ঝাঁকিয়ে বলল, “কিরে, উঠবি না? চল তবে, নামি আমরা। ঘুমিয়ে তো পুরো রাস্তা পার করে দিলি।” চৈতি উঠে দাঁড়াল। পা দুটো একটু ঝিমঝিম করছে। লোকনাথ তখনও সিটে হেলান দিয়ে আছে, ঘুমটা পুরোপুরি কাটেনি। চোখ আধবোজা। মিরা লোকনাথের দিকে ফিরে গলায় অধিকার ফলিয়ে বলল, “লোকনাথ ভাই, শোনেন। বাসের পেটে যে মালপত্র আছে, ওগুলো নামাতে হবে। আমার আর চৈতির ব্যাগগুলো তিনতলায় ৫০১ নাম্বার রুমে রেখে আসবেন। আমরা দুজন এক রুমে থাকব।” একটু থেমে আবার বলল, “আর বাকি ব্যাগগুলো—রাহাদেরটা, মিরাজ আর ঝুমুর জামাকাপড়—ওগুলো চারতলার ৬০১ নাম্বারে। ওই রুমে রাহাদ, মিরাজ আর ঝুমু ঘুমাবে।” চৈতি অবাক হয়ে মিরার দিকে তাকাল। ঝুমু তার সাথে না, রাহাদের সাথে ঘুমাবে? মিরা চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করল। মিরা এবার চৈতির হাত শক্ত করে চেপে ধরল। চোখে পুরনো দিনের সেই দুষ্টু ঝিলিক। “চল, হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নিই আগে। তারপর সাররাত গল্প। শুধু তুই আর আমি, এক রুমে। কতদিন পর বল তো! কলেজের হোস্টেলের মতো মজা হবে, দেখিস।” চৈতি হালকা হাসল। মিরার হাতের উষ্ণতায় একটা ভরসা পেল। বাস থেকে নামার জন্য পা বাড়াল, কিন্তু মনের ভেতর একটা খচখচানি রয়েই গেল। লোকনাথ এখনও ঘুম-জড়ানো চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। বাস থেকে নেমে হোটেলের নিচে কাচের টেবিলে বসে আছে মিরা আর চৈতি। সামনে সাতরঙা চায়ের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে। দুই বান্ধবীর গল্প থামছেই না—কলেজ, সংসার, না-বলা অভিমান সব উঠে আসছে একে একে। একটু দূরে রাহাদ ব্যস্ত। মিরাজের আইসক্রিমের আবদার সামলাচ্ছে, আবার ঝুমুর বেণী ঠিক করে দিচ্ছে। বাবা হিসেবে রাহাদকে আজ অন্যরকম লাগছে। ওদিকে লোকনাথ ঘেমে নেয়ে একসাথে তিনটা ট্রলি ব্যাগ টানছে সিঁড়ি দিয়ে। কাঁধে আরও একটা হ্যাভারস্যাক। দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে খিস্তি করছে, “মিরা মাগী, কাজ করাইতে পারলে বাঁচে। হারামজাদি নিজে তো নাচতেছে জামাই নিয়ে। এখন যদি একটু ওকে... ধুর! আর চৈতিকেই তো কাছে পাইতেছি না। এতদূর টেনে আনলাম, হাতের নাগালে পেয়েও ছুঁতে পারছি না।” ভাবনার মাঝেই ঘটল অঘটন। তিনতলার ল্যান্ডিংয়ে একটা চার-পাঁচ বছরের বাচ্চা তীরের মতো ছুটে এসে সোজা লোকনাথের পায়ে ধাক্কা মারল। লোকনাথ তাল সামলাতে পারল না। ব্যাগসুদ্ধ ধড়াম করে পড়ে গেল সিঁড়ির উপর। কনুইটা রেলিংয়ে লেগে ছড়ে গেল। ব্যথা আর রাগে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “এই খানকির ছে...” পুরোটা শেষ করার আগেই এক মহিলা হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এল। বাচ্চাটার কান মলে দিয়ে অপরাধী গলায় বলল, “সরি ভাইয়া, সরি। বাচ্চাটা না খুব দুষ্টু। এক সেকেন্ডের জন্য চোখ সরাইছি...” লোকনাথ ব্যথা চেপে, রক্ত মুছে উঠে দাঁড়াল। লাগেজটা টেনে তুলতে তুলতে মুখে জোর করে হাসি আনল, “না না, সমস্যা নাই আপা। বাচ্চা মানুষ তো।” কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার আগুন জ্বলছে, “বাচ্চা সামলাইতে পারোস না, তো বিয়াইতে গেছিলি কেন মাগী? মানুষের ঝামেলা বাড়াইতে?” টেবিলে তখন অন্য নাটক। অনেকক্ষণ পর মকবুলের নজর পড়ল চৈতি আর মিরার টেবিলে। চোখ চকচক করে উঠল। সে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে গলায় মধু ঢেলে বলল, “আরে, আপনারা এখানে! আমি তো ভাবলাম রুমে রেস্ট নিচ্ছেন।” মিরা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ভুরু কুঁচকে তাকাল, “কেন? তবে কোথায় থাকব আমরা?” মকবুলের কাছে মিরার প্রতিটা শব্দ বিষের মতো লাগে। কিন্তু কবির মিয়ার মেয়ে, তাই গিলতে হয়। তবু খোঁচাটা দিল, “আরে মিরা, তুমি তো কবির ভাইয়ের মেয়ে। তোমার মা কত শান্তশিষ্ট। তুমি এত মুখরা কেন, মা?” মিরা কাপটা শব্দ করে নামিয়ে রাখল। চোখে চোখ রেখে বলল, “আপনিও তো নেতা মানুষ, কাকা। কিন্তু কাজকাম তো পাড়ার ছাপড়ি পোলাপানের মতো।” মকবুলের মুখটা ঝুলে গেল। এই বেয়াদব মেয়েটার উপর তার রাগ চড়চড় করে বাড়ছে, কিন্তু প্রকাশ করার উপায় নেই। সে শুধু ঢোক গিলল। ঠিক তখনই সাতরঙা চা-ওয়ালা ছেলেটা ট্রে-তে দুটো কাপ নিয়ে হাজির। সিলেটি টানে মকবুলকে বলল, “ভাই, আফনে যে স্পেশাল চা’র কথা কইছলা।” মকবুল সুযোগ পেয়ে গদগদ হয়ে বলল, “হ, দে। ম্যাডামদের দে।” ছেলেটা সাবধানে কাপ দুটো মিরা আর চৈতির সামনে রেখে চলে গেল। দৃশ্যটা হেডমাস্টার সাহেবের চোখ এড়াল না। ফ্রি চায়ের খবর পেয়ে তিনি আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে বললেন, “আরে মকবুল ভাই, একাই চা খাওয়াচ্ছেন নাকি? আমাকে তো ডাকলেন না।” মকবুল মনে মনে গালি দিল, “এই হইল আরেক মাঙ্গের পোলা। ফ্রি পাইলে গু-ও খাইবো, শালা।” কিন্তু মুখে হাসি টেনে বলল, “আরে স্যার যে! খাবেন নাকি? আসেন, আসেন।” হেডমাস্টার একগাল হেসে বললেন, “আপনি সাধলে না করি কী করে? আসলে কী জানেন, প্রত্যেক জায়গার একটা স্পেশাল জিনিস থাকে। সেটা টেস্ট না করলে ট্যুর অসম্পূর্ণ থেকে যায়।” মকবুল উঠে দাঁড়াল। মিরা আর চৈতির দিকে তাকিয়ে নরম সুরে বলল, “আচ্ছা লেডিস, আমি চললাম তবে। কোনো কিছুর দরকার হলে নিঃসংকোচে জানাবেন আমাকে।” কথা শেষ করে মকবুল হাঁটা দিল। আর তার পেছন পেছন লেজ নাড়তে নাড়তে চলল হেডমাস্টার—ফ্রি চায়ের লোভে। ওরা দুজন চোখের আড়াল হতেই মিরা আর চৈতি আর হাসি চাপতে পারল না। একসাথে ফেটে পড়ল। মিরা হাসতে হাসতে চেয়ারে লুটিয়ে পড়ল, “জোকার! একেবারে সার্কাসের জোকার একটা!” চৈতি মকবুলের হাঁটার ভঙ্গি, গলার স্বর নকল করে বলল, “চা খান ভাবি... কিছু লাগলে জানাবেন... আমি তো আছিই...” দুই বান্ধবীর হাসির শব্দে হোটেলটা যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠল।
Parent