জুলাই আন্দোলন - অধ্যায় ২০
পর্ব ২০: সীমা
আজ এক অঘটন ঘটেছে। সীমা এক ট্রাক ড্রাইভার এর সাথে পালিয়েছে।
সীমার পালানোর খবরটা বাজারে ছড়াইতে সময় লাগল না পাঁচ মিনিটও। লোকনাথ তখন সবে মাছের দোকানে দামাদামি করতেছে, হঠাৎ পিছন থেইকা হাশেম চাচা কনুই দিয়া গুঁতা।
"কিরে লোকনাথ, শুনলাম তোর ঘরের পাখি নাকি ট্রাকের হর্ন শুইনা উইড়া গেছে?"
বাজারের সব কয়টা মাথা তখন লোকনাথের দিকে ঘুরা। কেউ পান চিবাইতে চিবাইতে হাসে, কেউ বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে চোখ টিপে।
জব্বার মুরব্বি আরেক কাঠি সরেস, "কি রে আকাটা, তোর সোনা ছোট নাকি? মাইয়া তাই ট্রাকের ডালার লগে ভাইগা গেল?"
চারপাশে হো হো কইরা হাসির রোল। লোকনাথের কান গরম হইয়া যাইতেছে। সীমার লগে তার সম্পর্ক কোনোদিনই মধুর আছিল না, ঝগড়া-ঝাটি লাইগাই থাকত। কিন্তু তাই বইলা বাজারের মাঝখানে ইজ্জতের ফালুদা বানাইব?
লোকনাথ মাছওয়ালার বাটখারাটা ঠাস কইরা ফালাইয়া সোজা হইয়া দাঁড়াইল। চোখ দুইটা লাল। জব্বার মুরব্বির দিকে তাকাইয়া ঠোঁট বাঁকাইয়া কইল,
"চাচা, নিজের চরকায় তেল দেন। আমার সোনা ছোট না বড়, হেইডা মাপার শখ হইলে আপনার মাইয়াডারে রাইতে পাঠাই দিয়েন। হাতে-কলমে বুঝাইয়া দিমু নে। একবারে মাপজোখ সহ।"
পুরা বাজার এক সেকেন্ডের লাইগা চুপ। তারপরেই বিস্ফোরণ। কেউ বিষম খায়, কেউ হাসতে হাসতে বসে পড়ে। জব্বার মুরব্বির মুখ কালো হইয়া গেল, গজগজ করতে বিড়ি ফালাইয়া হাঁটা দিল।
হাশেম চাচা ফিসফিস কইরা কয়, "লোকনাথ, তুই তো আগুন লাগাই দিলি রে।"
লোকনাথ থুতু ফালাইয়া মাছের ব্যাগটা হাতে নিল। "আগুন তো সীমাই লাগাইছে, চাচা। আমি খালি একটু তাপ দিলাম।"
বাড়ি ফেরার পথে লোকনাথ ভাবে, সীমা গেছে ভালো হইছে। যন্ত্রণা কমল। কিন্তু এই বাজারের মানুষগুলার মুখ সে বন্ধ করবে কেমনে?
ডুপ্লেক্স বাড়ির নিচতলার ডাইনিং স্পেস। ঝাড়বাতির আলো টেবিলের কাঁচের উপর পড়ছে। সেন্টার টেবিলে ভাত, মুরগির ঝোল, ডাল, সালাদ সাজানো। এসির হালকা শব্দ ছাড়া পুরা ঘর চুপচাপ। সীমার পালানোর খবরটা এই দামি ফার্নিচারগুলারেও কেমন মলিন কইরা দিছে।
কুদ্দুস মিয়া চেয়ার টাইনা বইসা প্লেটে ভাত নিতে নিতে লোকনাথের দিকে তাকাইল। গলায় সান্ত্বনার সুর, "লোকনাথ, মন খারাপ করিস না বেটা। এইটা উপশহর। এখানে একটা গেলে দশটা আসে। তুই চিন্তা করিস নি, তোরে আবার বিয়া দিমু। এবার একদম সুন্দর দেইখা।"
লোকনাথ টেবিলের অন্য মাথায় বসা। সামনে প্লেট, কিন্তু খাচ্ছে না। কাঁটা চামচ দিয়া খালি প্লেটের ভাতগুলা নাড়তেছে। মুখে একটা শব্দ নাই। বাইরে বাজারের অপমান, আর এখন ঘরের ভিতর এই আলোচনা।
কুদ্দুস মিয়া খাওয়া শেষ কইরা টিস্যু দিয়া মুখ মুছল। "আমি উঠলাম। তুই খাইয়া রেস্ট নে।" বইলা দোতলায় নিজের রুমে চইলা গেল।
কুদ্দুস যাইতেই রাজিব আর চুপ থাকতে পারল না। হাতের গ্লাসটা টেবিলে রাখতে গিয়া ফিক কইরা হাইসা ফেলল। "লোকনাথ ভাই, তুমি টেনশন নিও না," বইলাই আবার হাসি। শেষমেশ টেবিলের উপর মাথা রাইখাই হো কইরা হাইসা দিল। "ট্রাক ড্রাইভার... সিরিয়াসলি
... হাহা..."
লোকনাথের হাতের মুঠ শক্ত হইয়া গেল। কাঁটা চামচটা টেবিলের কাঁচের সাথে ঠক কইরা শব্দ করল। এই ডুপ্লেক্স বাড়ির ভিতরেও তার ইজ্জতের দাম নাই?
পাশের চেয়ার থেইকা চৈতি কড়া গলায় কইয়া উঠল, "এই রাজীব, স্টপ ইট।"
রাজিব হাসি থামাইয়া চৈতির দিকে তাকাইল। চৈতি তখন ডাইনিং চেয়ারটা একটু শব্দ কইরা সরাইয়া সোজা হইয়া বসল।
"একটা মানুষের ব্যাড টাইম চলতেছে, আর তুমি এখানে বইসা তামাশা করছ? এইটা কোন ধরনের ম্যানার?" চৈতির গলা শান্ত কিন্তু ধারালো। "
রাজিব একদম চুপসে গেল। "আরে আমি তো জাস্ট... ফান করতেছিলাম।"
"ফানেরও একটা লিমিট থাকে," চৈতি এবার লোকনাথের দিকে তাকাইল। লোকনাথ তখনও প্লেটের দিকে তাকাইয়া আছে। চৈতির গলাটা একটু নরম হইল, "লোকনাথ ভাই, আপনি খান। বাইরের মানুষ কী বলল না বলল, বাদ দেন।"
লোকনাথ আস্তে কইরা মুখ তুলল। ঝাড়বাতির আলোয় চৈতির চোখ দুইটা কেমন স্থির, শান্ত। বাজারের চিল্লাচিল্লি, রাজিবের হাসি, সবকিছুর মাঝে এই একটা গলা তার পক্ষে কথা কইল।
লোকনাথ কিছু বলল না। শুধু পানির গ্লাসটা হাতে নিল। ডাইনিং রুমটা আবার নীরব, শুধু এসির শব্দটা শোনা যাইতেছে।