কাশীপুরের কান্ড - অধ্যায় ১৪

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-74150-post-6242467.html#pid6242467

🕰️ Posted on Fri Jun 19 2026 by ✍️ Toxic boy (Profile)

🏷️ Tags:
📖 687 words / 3 min read

Parent
অধ্যায় ১৪ : লণ্ঠনের আলো মধু ঘোষের ছাগলটা সেদিন আর ফিরল না। রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়ে গেছে। বেশিরভাগ বাড়ির হারিকেন নিভে এসেছে। কাশীপুর ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ছে। তবু কয়েকটা মানুষ এখনও জেগে। কারণ একটা ছাগল হয়তো খুব বড় ব্যাপার নয়, কিন্তু গ্রামের মানুষ জানে—যা প্রতিদিনের নিয়মে ঘটে, হঠাৎ তা না ঘটলে অস্বস্তি থেকেই যায়। ⸻ নরুর দোকানের সামনে তখনও দু-একজন দাঁড়িয়ে। হারিকেনের আলোয় ধোঁয়া ভাসছে। মধু ঘোষের মুখে চিন্তার ছাপ। ভোলা ঘোষ গোঁফে হাত বুলিয়ে বললেন, — চল, আর একবার খুঁজে দেখি। — এখন? — এখনই। — কুয়াশা বাড়ছে। — তবু চল। ⸻ শেষ পর্যন্ত পাঁচজন বেরোল। মধু ঘোষ। তার ভাই নিতাই। ভোলা ঘোষ। গদাধর কাকা। আর হরিপদ মাস্টার। হরিপদ মাস্টার প্রথমে যেতে চাইছিলেন না। কেউ খেয়াল করেনি। শুধু ভোলা ঘোষ একবার বলেছিলেন, — আপনি যাবেন? বৃদ্ধ মানুষটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলেছিলেন, — যাই। শব্দটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু তার মুখটা সাধারণ ছিল না। ⸻ প্রত্যেকের হাতে লণ্ঠন। মাটির রাস্তা ধরে তারা এগোতে লাগল। পায়ের নিচে শুকনো পাতা মচমচ শব্দ করছে। দূরে কোথাও শেয়াল ডেকে উঠল। নিতাই থেমে গেল। — শেয়াল। — তা তো। ভোলা ঘোষ বললেন। — বাঘ না। লোকজন হেসে ফেলল। কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ টিকল না। ⸻ প্রথমে তারা পুকুরপাড় খুঁজল। তারপর বাঁশঝাড়ের দিক। তারপর জমির আল। ছাগলের কোনো চিহ্ন নেই। কোথাও না। ⸻ একসময় মধু ঘোষ বিরক্ত হয়ে বলল, — তাহলে গেল কোথায়? কেউ উত্তর দিল না। শুধু লণ্ঠনের আগুনটা বাতাসে দুলে উঠল। ⸻ আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে তারা মাঠের কাছে পৌঁছাল। দিনের সেই চেনা মাঠ। যেখানে বিকেলে ছেলেরা খেলাধুলো করে। এখন কুয়াশায় আধা ঢাকা। দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন মাঠটা আরও বড়। আরও ফাঁকা। আরও নীরব। ⸻ হরিপদ মাস্টার হঠাৎ হাঁটা একটু ধীর করলেন। খুব সামান্য। কেউ খেয়াল করার কথা নয়। তবু ভোলা ঘোষ করলেন। তিনি কিছু বললেন না। শুধু একবার তাকালেন। তারপর আবার সামনে। ⸻ মাঠের শেষপ্রান্তের দিকে যেতে যেতে কুয়াশা যেন একটু ঘন হলো। হয়তো সত্যিই। হয়তো শুধু মনে হচ্ছে। রাতের বেলায় অনেক কিছুই নিশ্চিত করে বলা যায় না। ⸻ নিতাই লণ্ঠন উঁচু করল। আলোটা সামনে পড়ল। শুকনো ঘাস। ঝোপ। মাটি। আর কিছু না। ⸻ ঠিক তখনই মধু ঘোষ বলল, — দাঁড়া। সবাই থামল। — কী হয়েছে? — ওটা কী? মাটির দিকে আঙুল দেখাল সে। ⸻ লণ্ঠনের আলো নামানো হলো। মাটিতে কিছু একটা পড়ে আছে। একটা দড়ি। ছাগলের গলায় বাঁধা দড়ির মতো। মধু ঘোষ নিচু হয়ে তুলে নিল। — এটাই তো! তার গলায় উত্তেজনা। — এটাই আমার ছাগলের দড়ি। ⸻ ভোলা ঘোষ বললেন, — ছিঁড়েছে নাকি? মধু ঘোষ দড়িটা উলটে-পালটে দেখল। তারপর কপাল কুঁচকে গেল। — না। — খুলে গেছে? — তাও না। ⸻ কথাটা শুনে সবাই চুপ। দড়িটার একদিক অদ্ভুতভাবে ফাঁকা। যেন বাঁধা ছিল। আবার যেন ছিল না। ছেঁড়া নয়। খোলা নয়। তবু আলাদা। ⸻ ঠিক সেই সময় হরিপদ মাস্টার নিচের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। দীর্ঘক্ষণ। অস্বাভাবিক দীর্ঘক্ষণ। ⸻ ভোলা ঘোষ বললেন, — কী দেখছেন? হরিপদ মাস্টার উত্তর দিলেন না। প্রথমে। তারপর খুব আস্তে বললেন, — কিছু না। কিন্তু তার গলার স্বর বলছিল, তিনি কিছু একটা দেখেছেন। অথবা মনে করেছেন। ⸻ মাটিতে দড়িটার কাছেই কালচে একটা দাগ ছিল। পুরোনো। খুব পুরোনো। বৃষ্টিতে ধোয়া। রোদে পোড়া। মাটির সঙ্গে প্রায় মিশে যাওয়া। দিনের বেলায় কেউ দেখলেও গুরুত্ব দিত না। ⸻ হরিপদ মাস্টারের চোখ সেখানে স্থির। তার মুখে এমন এক অভিব্যক্তি ফুটে উঠল, যা রতন কখনও দেখেনি। যদিও রতন এখানে নেই। তবু যদি থাকত, সে বুঝত— এটা ভয় না। এটা আতঙ্কও না। এটা এমন কিছু, যা বহু বছর ধরে ভুলে থাকতে চেয়েও ভুলে থাকা যায়নি। ⸻ হঠাৎ দূরে একটা রাতচরা পাখি ডেকে উঠল। খুব কাছে মনে হলো। আবার খুব দূরে। নিতাই চমকে কাঁধ ঘুরিয়ে তাকাল। কেউ কিছু বলল না। ⸻ শেষ পর্যন্ত তারা ছাগলটাকে পেল না। শুধু দড়িটা নিয়ে ফিরে এল। ⸻ ফেরার সময় কেউ খুব বেশি কথা বলছিল না। লণ্ঠনের আলো রাস্তার ওপর দুলছিল। একেকবার মনে হচ্ছিল সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কাছে গেলে দেখা যাচ্ছে, একটা ঝোপ। অথবা বাঁকা গাছের ছায়া। ⸻ কাশীপুর তখন ঘুমিয়ে। বাড়ির ভেতরে রতনও ঘুমিয়ে। প্রতিমা ঘুমিয়ে। রমাপদ ঘুমিয়ে। তারা কেউ জানে না, সেই রাতে গ্রামের কয়েকজন মানুষ এমন একটা জায়গায় গিয়েছিল, যেখানে গিয়ে হরিপদ মাস্টার ফেরার পর অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারেননি। আর বহু বছর পরে প্রথমবারের মতো, তিনি শুয়ে শুয়ে একটা পুরোনো নাম মনে করার চেষ্টা করেছিলেন। একটা নাম… যেটা তিনি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চারণ করেননি। আর যার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কাশীপুরের বহু পুরোনো, প্রায় বিস্মৃত একটা ইতিহাস।
Parent