কিছু সম্পর্ক - অধ্যায় ৭৯
কিছু সম্পর্কঃ ৯ (ছ) এর পরের অংশ……
বিকেল গড়াতেই জয় আর রানী আবার হসপিটালে উপস্থিত হলো। তখন অবশ্য রহিম ঘুমিয়ে পড়েছে। জান্নাত সোফায় বসে মোবাইল স্ক্রল করছে, যেখানটায় কিছুক্ষণ আগেও ওর বাবা জয়নাল বসে ছিল। আর আয়শা ছোট চেয়ারে বসে আছে। ঘরে শব্দ বলতে শুধু এসির একটা মৃদু গুঞ্জন। কাচের জানালা পেরিয়ে বিকেলের আলো কেবিনের সাদা দেয়ালে এসে কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
জয় দ্বিতীয় বিছানায় গিয়ে বসলো। জান্নাত মোবাইল থেকে চোখ তুলে একবার জয়ের দিকে তাকালো। সকালে যতটা শার্প দেখাচ্ছিলো, আশ্চর্যভাবে সারাদিন ভার্সিটিতে কাটিয়ে আসার পর এখন ওকে তার চেয়েও বেশি শার্প লাগছে। এমন নয় যে জয় ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট এসব নিয়ে খুব ভাবে, বা সেসবের পেছনে খুব দৌড়াদৌড়ি করে। তবুও আজকের জেল্লাটা একটু অন্যরকম। একটু আলাদা।
মনে হচ্ছে, ওর ভেতরে কোথাও একধরনের গর্ব জমেছে। শুধু গর্ব নয়, তার সঙ্গে খুব সূক্ষ্ম একটা অহংকারও মিশে আছে। যেন সারাদিনের ভিড়, ক্লাস, ক্যাম্পাস, আড্ডা সব পেরিয়ে জয় এখানে ফিরেছে ক্লান্ত হয়ে নয়, বরং নিজের ভেতরে কোনো গোপন বিজয় নিয়ে।
রানী প্রথমেই বসলো না। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো ঘুমন্ত রহিমের কাছে। বেডের মাথার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
রহিমের চোখগুলো আজ যেন একটু বেশি কোটরের ভেতর বসে গেছে। মুখের চামড়ায় ক্লান্তির টান। বুকটা শ্বাস নেওয়ার সাথে সাথে একটু বেশিই ওঠানামা করছে। খুব মৃদু, কিন্তু চোখে পড়ার মতো। কেবিনের সাদা আলোতে সেই ওঠানামাটা আরও স্পষ্ট মনে হচ্ছিলো রানীর কাছে।
সকালেও রানী আব্বুকে দেখে গেছে। কিন্তু তখন এসব কিছু খেয়াল করা হয়নি। তখন ঘরে এত মানুষ, এত কথা, এত স্বস্তির ভান ছিল যে, আব্বুর শরীরের এই নীরব ক্লান্তি চোখে পড়েনি।
আসলে মানুষকে সত্যি করে দেখতে হলে তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখা প্রয়োজন। জেগে থাকা মানুষ কথা দিয়ে, হাসি দিয়ে, চোখের দৃষ্টি সরিয়ে অনেক কিছু লুকাতে পারে। কিন্তু ঘুমন্ত শরীর কিছু লুকাতে পারে না। ঘুমন্ত মুখ নিজের আসল চেহারা মেলে ধরে।
রানী ছোট করে একটা নিঃশ্বাস ফেললো। স্বাভাবিক কোনো নিঃশ্বাস নয়।
এই মুহূর্তে রানী কিছু একটা অনুধাবন করেছে।
সে অনুধাবন করেছে, ওর আব্বুর বয়স হচ্ছে।
যে আব্বুর উপস্থিতি এতদিন ওর কাছে নিরাপত্তার চাদরের মতো ছিল। যাকে ঘরে ঢুকতে দেখলেই মনে হতো, এবার সব ঠিক হয়ে যাবে। আর ভয় নেই। যার গলা শুনলেই মনে হতো, বাইরে যত ঝড়ই থাকুক, ঘরের ভেতর এখনো আশ্রয় আছে।
সেই আব্বু বদলে গেছে। ধীরে ধীরে, চোখের সামনে, দিনের পর দিন। অথচ রানী টেরই পায়নি।
হয়তো মানুষ নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষদের বদলে যাওয়া সবচেয়ে শেষে বুঝতে পারে। কারণ প্রতিদিন দেখা মুখের ভাঙন আলাদা করে চোখে পড়ে না। শুধু একদিন হঠাৎ ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে মনে হয়, এই মানুষটা এত ক্লান্ত হলো কবে?
আব্বুর মুখের সেই ক্লান্তিটা তখনও রানীর চোখের কোণে আটকে ছিল।
তবে পেছনে থাকা এই মানুষগুলোর মাঝে থাকলে চাপটা নিজে থেকেই একটু হালকা হয়ে আসে। হয়তো এ কারণেই পেছনের ফিসফিস কথাগুলোও ধীরে ধীরে তার কানে ঢুকতে শুরু করল।
“আমার কার্ড কই? নিজের মনে করে রেখে দেওয়ার ইচ্ছা আছে নাকি?” প্রথমে শুরু করলো জয়।
“এই নে তোর কার্ড।”
“পাঁচ হাজার কথা হইছিলো। তুই মনে হয় ভুলে গেছিস, মেসেজ আসে আমার মোবাইলে।”
“বাকিটা গত কয়েক মাসে তোর আর তোর নায়িকার ড্রামা সহ্য করার জরিমানা।”
কথাটা শুনেই রানী চট করে পেছনে ঘুরে তাকালো। জয়ের দিকে বা জান্নাতের দিকে নয়। প্রথমেই তাকালো আয়শার দিকে।
আয়শা শুনেছে কিনা সেটা বোঝার চেষ্টা করলো। মুখে কিছু নেই, কিন্তু মনে মনে জয় আর জান্নাতকে অসংখ্য অভিশাপে ভাসিয়ে দিচ্ছে। এই দুজনের মুখে কোনো দরজা-জানালা নেই। যা খুশি, যেখানে খুশি, বলে ফেলতে পারে।
আয়শার দিকে তাকাতেই আয়শা নরম করে নিজের চিরাচরিত মিষ্টি হাসি দিলো। তারপর চোখের ইশারায় রানীকে বসতে বললো। রানীও হেসে জান্নাতের পাশে গিয়ে বসে পড়লো। তবে হাসিটা ঠিক স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না, টেনে আনা হাসি ছিল।
“দুপুরে কিছু খেয়েছিস? কলা আছে, দেই?” রানী বসতেই আয়শা ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলো।
“না না, খাবো না বড় আম্মু।”
রানীর পেটে আসলেই আর জায়গা নেই। ফেরার আগে জয় ওকে জোর করে বার্গার কিং থেকে বড় একটা বার্গার খাইয়ে এনেছে। আজ থেকে নাকি রানীর ওজন বাড়ানোই জয়ের একমাত্র গোল।
আর জয় কথাগুলো খুব নিরীহ ভঙ্গিতে বলেনি। তাই বার্গার কিং-এর কথা মনে হতেই রানীর গালে লাল একটা শেড পড়ে গেলো।
ওদিকে জান্নাত আর জয়ের কথাও চলছিল।
জয় কার্ডটা পকেটে রাখতে রাখতে জান্নাতের পাশে রাখা প্যাকেটগুলোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “কি কিনলি?”
জান্নাত হেসে বলল, “মনে কর, অস্ত্র-গোলাবারুদ।”
“কার জীবন তামা তামা করতে যাচ্ছিস?” জয় একটু তাচ্ছিল্যের সুরে বললো। “তোদের সাংবাদিকদের কাজই তো মানুষের জীবনে নাক গলানো।”
“উহু, মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে নয়।” জান্নাত এবার একটু সোজা হয়ে বসলো। “তবে কারো জীবনযাপন যদি অন্য কারো জীবনকে বিষিয়ে তোলে, সেখানে নাক গলানোকে আমরা পবিত্র দায়িত্ব মনে করি।”
শেষের কথাগুলো জান্নাত একটু উঁচু স্বরেই বলে ফেলেছিল।
জান্নাতের উঁচু স্বর শুনে আয়শা বিরক্ত হয়ে দুজনকেই মৃদু ধমক দিলো, “আহ, চুপ কর তো তোরা। রহিম ভাই ঘুমাচ্ছে।”
কথার ফাঁকে রহিম ঘুমের ভেতর সামান্য নড়লো। সঙ্গে সঙ্গে সবাই কয়েক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। তারপর আবার কেবিনে এসির মৃদু গুঞ্জনটা স্পষ্ট হয়ে উঠলো।
আয়শা দুই ভাইবোনকে ধমক দিয়ে আবার রানীর দিকে নজর দিলেন। বললেন, “আচ্ছা কলা না খা, কমলা আছে। সেটা খা। কমলায় তো আর পেট ভরবে না।”
রানী উত্তরে কিছু বলে ওঠার আগেই জান্নাত বলে উঠলো, “আম্মু!”
সবাই তাকাতেই জান্নাত একটু আহত হওয়ার ভান করে বললো, “আমি এতক্ষণ ধরে এলাম, আমাকে তো কলা-কমলা কিছুই দিলে না?”
জান্নাতের স্বরে স্পষ্ট খোঁচা। হিংসা নয়। বরং আয়শা যে রানীর সামনে একটু বেশি নরম হয়ে যায়, সেটাই ধরে ফেলেছে।
“তুই নিয়ে খা, না করেছে কে?” ধরা পড়ে গিয়ে আয়শা নিজেকে ডিফেন্ড করলেন।
“তুই ছোটবেলা থেকেই হিংসুক, আর হিংসুকই রয়ে গেলি জান্নাত।” পাশ থেকে জয় যোগ দিলো।
জান্নাত এবার মায়ের দিক থেকে জয়ের দিকে ঘুরলো। “তুই তো বলবিই। তোর তো ভালোই লাগছে আম্মু রানীকে বেশি আদর করছে।”
“হয়েছে হয়েছে।” রানী আর বেশি বাড়তে দিলো না জান্নাতকে।
নিজেই উঠে গেলো। কলা-কমলা নিয়ে এসে জান্নাতকে একটা কলা আর একটা কমলা দিলো। জয়কেও একটা কমলা দিলো। কলা দিলো না। জানে, জয় কলা মুখেই তুলবে না।
তারপর নিজে একটা কমলা নিয়ে সেটা খোসা ছাড়াতে শুরু করলো। একটা কোষ আয়শাকে দিলো, আরেকটা নিজের মুখে দিয়ে বললো, “এবার সবাই খুশি তো?”
আয়শা হেসে ফেললেন। হাসতে হাসতেই বললেন, “দেখছিস কেন আমি রানীর যত্ন নিই বেশি? আমার মা হয়।”
কথাটা বলার পর আয়শা একটু চুপ করে রইলেন। হাসিটা মুখে থাকলেও দৃষ্টি যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য দূরে কোথাও চলে গেল। একবার ঘুমন্ত রহিমের দিকে তাকালেন, তারপর আবার রানীর মুখে ফিরে এলেন। ভবিষ্যৎ, নাকি অতীত, সেটা বোঝা গেল না।
******
রাজীব ঘুম থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠলো। কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারলো না, সে কোথায় আছে। মাথার ভেতর ঘুমের ভার এখনো ঝুলে আছে। তারপর পাশে রাখা মোবাইলটা হাতে নিয়ে সময় দেখে নিলো।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে প্রায়।
ধুর বাল, এতক্ষণ ঘুমাইলাম?
বিছানা থেকে নামতেই শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করে উঠলো। দিনের বেলা লম্বা ঘুম দিলে রাজীবের শরীর কখনো ভালো লাগে না। বরং মনে হয় মাথার ভেতর তুলা ভরে রাখা হয়েছে। বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিলো। ঠাণ্ডা পানির ঝাপটায় চোখের লালভাব পুরো কাটলো না, তবে ঘুমের ধোঁয়াটা কিছুটা সরে গেল।
আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে রাজীব নিজেই একটু বিরক্ত হলো। গাল, ঠোঁট, চোখ সব এখনো ঘুমের কারণে সামান্য ফুলে আছে। চোখের নিচের ক্লান্তিও পুরো যায়নি। দ্রুত একটা জিন্স আর টি-শার্ট পরে নিলো। তার উপর পাতলা একটা জ্যাকেট জড়িয়ে নিলো। চুলে কয়েকবার হাত চালিয়ে ঠিক করার চেষ্টা করলো, কিন্তু চুলও যেন আজ নিজের মতো থাকতে চায়।
নিচে নেমে দরজা খুলে উঠানে বেরিয়ে এলো। উঠানের বাতাসে দিনের গরম আর সন্ধ্যার ঠাণ্ডা মিশে আছে। চাবি দিয়ে দরজা বন্ধ করে বাইকের দিকে এগোলো। বাইকটা শেডের নিচে ছিল। সিটে হাত বুলিয়ে একবার দেখে নিলো, তারপর স্টার্ট দিলো।
ইঞ্জিনের শব্দ উঠান ভরিয়ে দিতেই রাজীবের মনে হলো, একটু দেরি হয়ে গেছে। খুব বেশি নয় হয়তো, কিন্তু হাসপাতালের মানুষজন অপেক্ষা করছে, এই ভাবনাটুকুই ওর বুকের ভেতর হালকা অস্থিরতা তৈরি করলো।
বাইক নিয়ে রাস্তায় উঠলো রাজীব।
****
এদিকে কেবিনের ভেতর রহিম জেগে উঠেছে। বিছানার মাথার দিকটা একটু উঁচু করা। রহিম আধশোয়া হয়ে আছে, গায়ের উপর পাতলা চাদর। চোখে ঘুমের ভার আছে এখনো, কিন্তু মুখে আগের চেয়ে কিছুটা স্বস্তি। হাতে কমলার রসের একটা গ্লাস।
ডাক্তার এসে দেখে গেছে। ছুটি দিয়েছে। ব্যাগপত্র প্রায় গোছানো। জয়নাল বিল পরিশোধ করে ফিরে এসেছে। তবু কেউ বের হচ্ছে না। যেন সব কাজ শেষ, কিন্তু একটা কিছু এখনো আটকে আছে।
আয়শা ছোট টেবিলের পাশে চেয়ারে বসে ব্যাগ গুছাচ্ছে। রহিমের চশমার কেস, মোবাইল চার্জার, পানির বোতল, টিস্যু, ভাঁজ করা গামছা, এসব আলাদা করে রাখছে। মাঝে মাঝে ব্যাগের চেইন টেনে দেখে আবার খুলছে, যেন কিছু বাদ পড়ে গেছে কিনা তা নিজেই নিশ্চিত হতে পারছে না।
জয়নাল দ্বিতীয় বেডে বসে আছে। হাতে হসপিটালের বিলের ফাইল।
জান্নাত সোফার কোণায় বসে আছে। হাতে মোবাইল, স্ক্রল করছে। তবু ওর চোখ বারবার দরজার দিকে চলে যাচ্ছে। মনোযোগ পুরোপুরি মোবাইলে নেই।
জয় আর রানী রহিমের বিছানার কাছেই। রানী পায়ের দিকের পাশে বসে আছে, এক হাত চাদরের উপর রাখা। জয় দাঁড়িয়ে আছে ওর কাছাকাছি, বিছানার ধারের দিকে একটু ঝুঁকে। কিছুক্ষণ পর পর রহিম আর রানীর সাথে কথা বলছে। কথাগুলো যে ফানি সেটা রহিম আর রানীর মুখের হাসি দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে রাজীব ঢুকলো।
ঢুকতেই সবার আগে জান্নাত তাকালো রাজীবের দিকে।
মোবাইলের স্ক্রিন তখনো ওর হাতে জ্বলছে, কিন্তু ওর চোখ আটকে গেল রাজীবের মুখে। ঘুম থেকে উঠেছে বোঝা যাচ্ছে। চোখ এখনো লালচে, গাল আর ঠোঁটে ঘুমের হালকা ফোলা ভাব। চুলও পুরোপুরি ঠিক হয়নি। জান্নাত খেয়াল করলো ঘরে ঢুকেই ছেলেটা নিজের ঘুম, নিজের ক্লান্তি সব গিলে ফেললো যেন। চোখ একবারেই কাজের জায়গাগুলো খুঁজতে শুরু করলো।
জয়ও রাজীবকে দেখেই নিজের ভঙ্গি একটু বদলে নিলো। বিছানার দিকে ঝুঁকে থাকা শরীরটা সোজা করলো, কাঁধ সামান্য টানটান হলো। মুখের সেই হাসিখুশি ভাবটাও কিছুটা কমে গেলো, উধাও হলো না, কিন্তু আগের মতোও রইলো না।
তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এলো রানীর মাঝে। সেই সবচেয়ে বেশি স্টিফ হয়ে গেলো, একটু আগের সেই শিথিল ভাব রইলো না। রাজীবের সামনে জয়ের এত কাছাকাছি অবস্থান ওর কাছে এলার্মিং লাগে। আর কারো সামনে নয়, এমনকি নিজের বাবার সামনেও না।
জান্নাত এখনো তাকিয়ে আছে রাজীবের দিকে।
অন্যরাও তাকিয়েছে। ঘরে একজন মানুষ ঢুকলে তাকানোই স্বাভাবিক। জয়নাল তাকিয়েছে। আয়শা ব্যাগ থেকে মুখ তুলে তাকিয়েছে। রহিমও তাকিয়েছে, বরং রাজীবকে দেখেই তার চেহারা একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। রানী তাকিয়েছে, আর তাকিয়েই নিজের অবস্থান সামান্য পরিবর্তন করেছে। জয়ও তাকিয়েছে, আর সেই তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভঙ্গি বদলে নিয়েছে।
কিন্তু জান্নাতের তাকানো অন্য সবার চেয়ে আলাদা।
ওর কাছে ব্যাপারটা শুধু ঘরে কেউ ঢুকেছে, এমন নয়। সে এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিল, কখন রাজীব ঢুকবে। আর রাজীব ঢোকার পর সে প্রকৃত অর্থেই দেখেছে ওকে। মুখের ঘুম, চোখের লালচে ভাব, চুলের অগোছালো অবস্থা, আর সেই সবকিছুর নিচে চাপা দেওয়া তাড়াহুড়ো, সব।
আর সেই কারণেই ওর চোখ এড়ালো না, রাজীবের দৃষ্টি প্রথমে কোথায় গেল।
স্বভাবতই, রাজীবের চোখ প্রথমে গেল রানীর দিকে।
প্রথমে রাজীব খুঁজলো রানীর চোখ।
গতকাল দুপুরের সেই চোখ। আতঙ্কে স্থির না থাকা মণি, অচেনা দৃষ্টি, কাউকে ঠিকমতো চিনতে না পারার সেই ভয়ের ঘোর। গাড়ির ভেতর কুঁকড়ে থাকা মুখ, হাতের অনিয়ন্ত্রিত কাঁপুনি, আর নিজের মানুষদের দিকেও যেন দূরের মানুষের মতো তাকানো।
আজ সকালে রানী স্বাভাবিক ছিল। কথা বলেছে, হেসেছে, আব্বুর পাশে বসেছে। তবু রাজীবের ভেতরের দুশ্চিন্তা পুরো কাটেনি। এত সহজে কাটার কথাও নয়। গতকাল যা দেখেছে, সেটা একদিনের স্বাভাবিকতায় মুছে যাওয়ার মতো কিছু না।
রানীকে দেখলেই এখন কিছুদিন রাজীব হয়তো আগে সেই দৃশ্যটাই দেখবে। তারপর বর্তমানের রানীকে মিলিয়ে নেবে।
এই মুহূর্তেও তাই করলো।
রানীর চোখে সেই ভয় আছে কি না, মুখে সেই শূন্যতা আছে কি না, শরীর আবার কুঁকড়ে আছে কি না, রাজীব এক ঝলকে দেখে নিলো। তারপর বুঝলো, না, রানী এখন ঠিক আছে। অন্তত এই মুহূর্তে ঠিক আছে।
রানী ও খেয়াল করেছে , ভাই এর দৃষ্টি , সে কিছুটা আঙ্কনফর্টেবল ফিল করে আবার একটু নড়েচড়ে বসে , চোখ নামিয়ে নেয় ।
তারপরই রাজীবের চোখে পড়লো রানীর অবস্থান। রহিমের বিছানার পায়ের কাছে বসে আছে। আর জয় দাঁড়িয়ে আছে খুব কাছেই।
এবার রাজীবের দৃষ্টি সামান্য থামলো।
রাজীব যতক্ষণ ঘুমিয়েছে, মরার মতো ঘুমিয়েছে। সেই ঘুমে স্বপ্নও ছিল না। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগে যে চিন্তাটা মাথায় ছিল, সেটা আবার একবার উঁকি দিলো।
তবে এই মুহূর্তে রাজীব সেটা নিয়ে তেমন ভাবলো না।
ঘুমানোর আগে নিজেকেই তো বলেছে, রানীর প্রতি তার বিশ্বাস আছে। জয়কে হয়তো আগের মতো বিশ্বাস করতে পারছে না, কিন্তু রানীর উপর তার বিশ্বাস এখনো অটুট। নিজের বোনকে নিয়ে এমন ভাবনা দুর্বল মুহূর্তের ভাবনা ছাড়া আর কিছু নয়।
তাই রাজীব সেই ভাবনাকে আর জায়গা দিলো না। ওর সামনে এখন অন্য কাজ আছে।