মৌসুমী: আমাদের ব্যক্তিগত মালেনা - অধ্যায় ২
তিন।
“এবার কাজের কথায় আসি,” মৌসুমী চশমাটা পরে নিয়ে বললেন। “ইফতি, শুটিং লোকেশন আর কস্টিউম নিয়ে তোমার কী পরিকল্পনা?”
ইফতি তার ডায়েরি খুলে বলল, “ম্যাডাম, আমরা উত্তরার ৮ নম্বর সেক্টরে একটা পুরোনো আমলের বিশাল ডুপ্লেক্স বাড়ি ফাইনাল করেছি। বাড়িটার মধ্যে এক ধরনের ক্লাসিক আর রাজকীয় আভা আছে, আবার কিছুটা নির্জনতাও আছে। ওখানে আপনার আর আয়ানের ফ্ল্যাট সেট করা হবে। আর চুরির দৃশ্য এবং পুরান ঢাকার রিকনস্ট্রাকশন সিনগুলো আমরা সত্যি পুরান ঢাকার 'মায়ের দোয়া স্টোর' আর তার আশপাশের গলিগুলোতে শুট করব—একদম রিয়েল লোকেশনে, মধ্যরাতে।”
“উত্তম,” মৌসুমী মাথা নাড়লেন। “তবে মিসেস রেহানার কস্টিউম আর মেকআপ নিয়ে আমার কিছু নিজস্ব ভাবনা আছে। আমি চাই এই চরিত্রটিকে যেন একদম খাঁটি, মাটিঘেঁষা অথচ আভিজাত্যপূর্ণ মনে হয়।”
“আপনার আইডিয়াটা শুনতে চাই ম্যাম,” ইফতি বলল।
“আমরা কোনো মেকআপ প্রলেপ দিয়ে আমার বয়স ঢাকার চেষ্টা করব না,” মৌসুমী সোজাসুজি বললেন।
“চোখের কোণের হালকা ভাজ, চিবুকের নিচের মাতৃত্বের ছাপ—এগুলোই হবে মিসেস রেহানার শক্তি। আমি সাধারণ সুতি বা তাঁতের শাড়ি পরব—যেমন ধরো সুতি জামদানি, টাঙ্গাইলের সুতি শাড়ি। ব্লাউজগুলো হবে একটু ঢোলা আর মার্জিত। গহনা বলতে হাতে থাকবে শুধু মেহগনি বা কাঠের চুড়ি, না হয় একটা মোটা বাউটি। আর চোখে থাকবে একটা চওড়া ফ্রেমের চশমা, যা আমি থ্রিলারের সময় নাকের ডগায় নামিয়ে আনব। মেকআপ হবে একদম মিনিমাল—বলতে পারো অলমোস্ট নো-মেকআপ লুক। দর্শকরা যেন আমাকে স্ক্রিনে দেখে কোনো ফ্যান্টাসির নায়িকা না ভাবে, তারা যেন মনে করে—এ তো আমাদেরই পাশের বাসার একজন বিদুষী, শান্ত কিন্তু প্রখর বুদ্ধিমতী আন্টি!”
“ওয়ান্ডারফুল!” ইফতি উত্তেজিত হয়ে খাতায় দ্রুত নোট লিখে নিল।
“ম্যাডাম, আপনি যেভাবে ক্যারেক্টারটাকে ওউন করছেন, এতে গল্পটার প্রাণ একশো গুণ বেড়ে গেল।”
“আর ইহানের পোশাক?” মৌসুমী ইহানের দিকে তাকালেন।
“ও পরবে সাধারণ গ্রাফিক টি-শার্ট, আলগা শার্ট, আর ঢোলা জিন্স। কানে এয়ারপডস ঝুলবে সবসময়,” ইফতি বলল।
“গুড। visual contrast-টা খুব সুন্দর হবে,” মৌসুমী মন্তব্য করলেন।
“একটি দৃশ্যে যখন সুতি শাড়ি পরা বায়ান্ন বছরের এক পরিণত নারী আর টি-শার্ট পরা একুশ বছরের তরুণ পাশাপাশি হেঁটে কোনো ক্রাইম সিন পরীক্ষা করবে, সেই ফ্রেমটাই দর্শককে আটকে রাখবে।”
কথা চলতে চলতে ঘড়ির কাঁটা রাত নটার ঘর ছুঁল। টেবিলে কফির কাপগুলো খালি হয়ে এসেছে। পরিবেশ জুড়ে এখন এক ধরনের ইতিবাচক আর সৃষ্টিশীল কাজের উত্তেজনা। দীর্ঘ তিন দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে মৌসুমী কত শত চরিত্র করেছেন! ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’-এর সেই চপল বালিকা রেশমি থেকে শুরু করে ‘মেঘলা আকাশ’-এর প্রতিবাদী নারী, ‘দেবদাস’-এর চিরন্তন চন্দ্রমুখী কিংবা ‘খায়রুন সুন্দরী’র গ্রামীণ ট্র্যাজিক নায়িকা। তিনি প্রেমিকা হয়েছেন, বিরহী স্ত্রী হয়েছেন, আদর্শ মা হয়েছেন, আবার কখনো রূপালী পর্দার আইকন হয়েছেন।
কিন্তু আজ, ৫২ বছর বয়সে এসে, তিনি অনুভব করছেন—এই ‘মিসেস রেহানা’ চরিত্রটি তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। এখানে তাকে কোনো পুরুষ তারকার ছায়াতলে থাকতে হচ্ছে না, কিংবা কোনো কৃত্রিম গ্ল্যামার প্রদর্শন করতে হচ্ছে না। এখানে তাঁর প্রধান অস্ত্র হবে তাঁর জীবনলব্ধ মেধা, অভিজ্ঞতার ভার, এবং রূপালী পর্দায় নিজের স্থান পুনর্দখল করার এক নীরব আত্মবিশ্বাস।
রেস্তোরাঁর বাইরে তখন হালকা টিপ টিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। শীতে আর্দ্র ঢাকার রাস্তাগুলো সোডিয়াম বাতির আলোয় ভিজে চকচক করছে। সবাই টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল।
আজিম চৌধুরী হাত বাড়িয়ে বললেন, “ভাবি, আপনার এই সম্মতি পুরো প্রজেক্টটাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল। আমরা আগামী মাসের ১৫ তারিখ থেকেই ফ্লোরে যাচ্ছি।”
“আমার শুভকামনা রইল আজিম ভাই। আশা করি আমরা ভালো একটা কাজ উপহার দিতে পারব,” মৌসুমী হাত মেলালেন।
ইহান আবার নিচু হয়ে বিনীতভাবে হাত জোড় করল। “ম্যাম, আমি আজ রাতে স্ক্রিপ্টটা আবার নতুন করে পড়ব। আপনার সাথে অভিনয় করার সুযোগ পাওয়াটা আমার জীবনের সেরা উপহার।”
মৌসুমী ইহানের কাঁধে হাত রাখলেন। এক ধরনের মাতৃসুলভ অথচ পেশাদার উষ্ণতায় বললেন: “স্ক্রিপ্টটা স্রেফ মুখস্থ কোরো না ইহান, আয়ানের মনস্তত্ত্বটা বোঝার চেষ্টা করো। মনে রেখো, আমাদের স্ক্রিন কেমিস্ট্রিটা কিন্তু খুব সূক্ষ্ম হতে হবে। আমরা বন্ধু, আবার একে অপরের বুদ্ধির প্রতিযোগীও। তোমার তোপসে যেন আমার ফেলুদাকে সমানে সমানে টক্কর দিতে পারে। তৈরি থেকো কিন্তু!”
ইহান হাসল। এবার তার চোখে কোনো শঙ্কা ছিল না, ছিল এক তরুণ অভিনেতার অদম্য প্রত্যয়। “আমি শতভাগ তৈরি, ম্যাম।”
চার।
রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে মৌসুমী তাঁর মার্সিডিজ গাড়ির পেছনের আসনে গিয়ে বসলেন। চালক খোকন ড্রাইভিং সিটে বসে ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করল, “ম্যাডাম, সোজা গুলশানের বাসায় যাব?”
“হাঁ খোকন, বাসায় চলো। তবে একটু ধীরে যেও,” মৌসুমী ক্লান্ত ভঙ্গিতে সোফাসেটের মতো আরামদায়ক গাড়ির সিটে হেলান দিলেন।
গাড়িটি ধীরে ধীরে পার্কিং লট ছেড়ে গুলশান এভিনিউয়ের মূল সড়কে গিয়ে পড়ল। বাইরে ঢাকার রাত এখন আরও নিঝুম আর রহস্যময় রূপ ধারণ করেছে। কাঁচের জানালায় হালকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এসে জমছে। সোডিয়ামের হলুদ আলো আর ফুটপাতের আধুনিক ক্যাফেগুলোর রঙিন নিয়ন সাইনবোর্ডের আলো এসে গাড়ির ভেতরে আলো-ছায়ার এক অদ্ভুত মায়াজাল বুনে চলেছে।
মৌসুমী শাড়ির আঁচলটা একটু গায়ে জড়িয়ে নিলেন। কপালে হাত দিয়ে চশমাটা সামান্য ওপরে তুললেন। তাঁর মনে স্মৃতি আর ভাবনার এক বিশাল মিছিল বয়ে যাচ্ছিল। জীবনটা সত্যিই কত অদ্ভুত এবং বৈচিত্র্যময়!
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন তিনি কিশোরী বয়সে বিটিভির রূপচর্চার অনুষ্ঠান বা বিজ্ঞাপন দিয়ে বিনোদন জগতে পা রেখেছিলেন, কিংবা যখন ১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহানের ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রে প্রথমবার সালমান শাহর হাত ধরে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেছিলেন—তখন কি তিনি ভেবেছিলেন তিন দশক পর ঢাকার চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
সেই সোনালী দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও তাঁর বুকটা হালকা কেঁপে ওঠে। সালমান শাহ, জসিম, রাজীব, রাজ্জাক স্যার, মান্না ভাই—কত কত মহীরুহ ছিলেন তাঁর চারপাশে! এফডিসির সেই সুবিশাল ফ্লোরগুলোতে দিনরাত শত শত মানুষের কোলাহল থাকত, ক্যামেরার লাইট ফুটত, একটার পর একটা ঐতিহাসিক সিনেমার জন্ম হতো।
তারপর সময় গড়িয়েছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সিনেমা বদলেছে, আবার সেলুলয়েডের সেই আবেগও অনেকখানি হারিয়ে গেছে। মাঝখানের সময়টায় কত রাজনৈতিক টানাটানি, শিল্পী সমিতির নোংরা নির্বাচন, জায়েদ খানের অনভিপ্রেত বিতর্ক, আর ওমর সানির সাথে পারিবারিক জীবন নিয়ে সংবাদমাধ্যমের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘাটাঘাটি—এসব তাঁর হৃদয়কে ভীষণভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে। অনেক সময় তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো আর কোনোদিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন না। হয়তো চিরতরে রূপালী পর্দা থেকে বিদায় নিয়ে দূরে কোথাও নিভৃত জীবন কাটাবেন।
কিন্তু শিল্পীর কি কোনোদিন সত্যি বিদায় হয়?
ক্যামেরার লেন্সের পিছনের সেই এক অদৃশ্য টান—যা রক্তে একবার মিশে গেলে সারাজীবন থেকে যায়। আজ এই ৫২ বছর বয়সে এসে, যখন তরুণ পরিচালক ইফতি তাঁর হাতে এই 'অর্বান ডিটেকটিভ' এর স্ক্রিপ্ট তুলে দিল, তখন মৌসুমী অনুভব করলেন—তাঁর ভেতরের সেই ঘুমন্ত অভিনেত্রীটি আবার জেগে উঠেছে।
তিনি আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেলেন। না, তিনি আর ২০ বছরের সেই চপল গ্ল্যামারাস ‘রেশমি’ নন। তিনি ৩০ বছরের সেই স্লিম সুগঠিত ফিগারের রূপসী সুন্দরীও নন। কিন্তু আজ এই ৫২ বছর বয়সে, এই ৭৬ কেজি ওজনের ভরাট শরীরে, এই ‘Regal Fuller Frame’-এর আভিজাত্যে তিনি যে মহিমা আর তেজ ধারণ করেন—তা তাঁর ২০ বছর বয়সের রূপের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বরং এতে যোগ হয়েছে অভিজ্ঞতার এক গভীর রাজকীয় দীপ্তি।
দর্শকরা এখন আর তাঁকে স্রেফ সুন্দর একটা মুখের জন্য পর্দায় দেখবে না। দর্শকরা দেখবে কীভাবে বায়ান্ন বছরের এক পরিণত গৃহিণী তার তীক্ষ্ণ মগজ, শান্ত উপস্থিতি আর অসাধারণ অভিনয় ক্ষমতা দিয়ে অপরাধ জগতের জটিল রহস্যের জট খুলে ফেলে। আর তার পাশে থাকবে একুশ বছরের এক তরুণ, যার সাথে তার সম্পর্কের রসায়ন বাংলা চলচ্চিত্রে এক সম্পূর্ণ নতুন ধারা তৈরি করবে।
গাড়িটি তখন গুলশান-২ এর সিগনাল পেরিয়ে তাঁর বাড়ির গলির দিকে বাঁক নিচ্ছিল। রাস্তার পাশে সারি সারি বড় মেহগনি আর কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো টিপ টিপ বৃষ্টিতে ভিজছে। সোডিয়াম লাইটের ম্লান আলো এসে পড়েছে গাছের ভেজা পাতাগুলোর ওপর।
মৌসুমী জানালার কাঁচটি এক ইঞ্চি নিচে নামালেন। ভেজা মাটির আর হালকা শীতের এক মিষ্টি সুবাস গাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল। বাতাস এসে স্পর্শ করল তাঁর কপাল আর গাল। তিনি গাড়ির সিটে আরেকটু সোজা হয়ে বসলেন। ডান হাতটি দিয়ে কাঁচের ওপর জমে থাকা বাষ্পটুকু হালকা করে মুছে দিলেন।
কাঁচের গায়ে ভেসে উঠল তাঁর নিজের সুস্পষ্ট প্রতিবিম্ব। গাঢ় নীল জামদানি, চশমার ফাঁক দিয়ে প্রখর দুটি চোখ, আর মুখে এক অপার্থিব আত্মবিশ্বাসের রেখা। তিনি নিজেকে দেখলেন। এক লহমার জন্য মনে হলো, তিনি এখন আর আরিফা পারভিন জামান মৌসুমী নন—তিনি এখন ‘মিসেস রেহানা’। যে নারী কোনো বাধা মানে না, যে নারী জীবনের বায়ান্নতম বসন্তে এসেও নতুন করে পৃথিবীকে জয় করতে জানে।
গাড়ির কাঁচে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে তিনি বিড়বিড় করলেন, “তদন্ত শুরু হোক তবে।”
অধ্যায় ২: প্রদীপের নিচে ও অদ্ভুত শিহরণ
এক।
উত্তরের ভিআইপি রোডের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা সেই পুরোনো ডুপ্লেক্স বাড়িটিতে তখন কাজের তুলকালাম পরিবেশ। চারপাশের বিশাল ট্রাইপড, চারকোল ব্ল্যাক রিফ্লেক্টর, শত শত গজ লম্বা মোটা ক্যাবল আর মেকআপ ভ্যানের ব্যস্ততায় পুরো এলাকাটা একটা অস্থায়ী স্টুডিওর রূপ নিয়েছে। শীতের সকালের নরম রোদ তখনও ডুপ্লেক্সের লাল ইটের দেয়ালে পুরোপুরি নামেনি, অথচ শুটিং ফ্লোরে পারদের পারদ চড়ছে।
পরিচালক ইফতি তাঁর প্রফেশনাল ড্রপ-ডাউন মনিটরের সামনে ঝুঁকে বসে আছেন। গলায় সাউন্ড ট্র্যাকিং হেডফোন ঝুলছে। হঠাৎ তিনি চড়া গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, “কাট! গুড শট! পারফেক্ট টাইম! লাভলি!”
ফ্লোরে জমে থাকা নীরবতা নিমেষেই ভেঙে গেল। ক্রু মেম্বারদের স্বস্তির নিঃশ্বাস আর সহকারী পরিচালকদের ব্যস্ত দৌড়ঝাঁপ শুরু হলো আবার।
দৃশ্যটা ছিল স্ক্রিপ্টের অন্যতম প্রাণবন্ত একটা অংশ। গল্পে মিসেস রেহানা (মৌসুমী) তাঁর বারান্দার টিপয়ে চা খেতে খেতে খবর পেয়ে নিচে নেমে এসেছেন। কারণ, তাঁর সহকারী ‘আয়ান’ (ইহান) পাড়ার এক সন্দেহভাজন লোকের পেছনে গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে নিজের ফোনে ইনস্টাগ্রাম লাইভ চালু করে বসে আছে!
পর্দার দৃশ্যে মৌসুমী চশমাটা নাকের এক সেন্টিমিটার ডগায় নামিয়ে এনে, গাঢ় নীল রঙের সুতি শাড়ির আঁচলটা কোমরে শক্ত করে পেঁচিয়ে আয়ানকে রীতিমতো শাসন করছিলেন। স্ক্রিপ্টে নির্দিষ্ট কিছু সংলাপ ছিল ঠিকই, কিন্তু টেক নেওয়ার মাঝপথে মৌসুমী নিজের ভেতর থেকে এক অদ্ভুত ‘ইম্প্রোভাইজেশন’ (Improvisation) বা স্বতঃস্ফূর্ত সংলাপ যুক্ত করে দিলেন।
তিনি চোখের চশমাটা আর একটু নামিয়ে, এক হাত কোমরে রেখে কড়া গলায় বললেন, “আচ্ছা আয়ান, তোমাদের এই জেন-জি জেনারেশনের আসল সমস্যাটা কী বলো তো? তোমরা কি পাড়ার চোর ধরবে নাকি ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে নিজেদের ফলোয়ার বাড়াবে? চোর ধরাটা কি কোনো রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস যে লাইভ করে সবাইকে জানাতে হবে?”
ঘটনার আকস্মিকতায় কাস্টিং ডিরেক্টর হয়তো ঘাবড়ে যেতেন, কিন্তু ইহান মোটেও দমে গেল না। সেও তাত্ক্ষণিকভাবে স্ক্রিপ্ট ছেড়ে চরিত্রের ভেতরে ঢুকে গেল। সে নিজের আইফোনটা একহাতে উঁচিয়ে ধৃষ্টতার সাথে হাসল, “আন্টি, আপনার ধারণাই নেই! ফলোয়ারই তো আসল পাওয়ার! আপনি এনালগ যুগের মানুষ, বুঝবেন না—এটা হলো ডিজিটাল সার্ভেইল্যান্স! চোরও এখন আমার লাইভ দেখে ভয়ে আত্মসমর্পণ করবে।”
পুরো ফ্লোরে হাসির রোল উঠল। লাইটম্যান, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে প্রোডাকশন বয় পর্যন্ত কেউ নিজেদের হাসি চেপে রাখতে পারল না। গত ২৫ দিন ধরে এই উত্তরার সেটে টানা শুটিং চলছে। এই পঁচিশ দিনে মৌসুমী আর ইহানের কাজের সম্পর্কটা যেন একদম জমে ক্ষীর হয়ে উঠেছে। প্রথম দিন গুলশানের ‘দ্য অলিভ গার্ডেন’ রেস্তোরাঁয় ইহানের মধ্যে যে প্রাথমিক আড়ষ্টতা বা কিংবদন্তি অভিনেত্রীর সামনে দাঁড়ানোর ভীতিটুকু ছিল, তা যেন উত্তাপ পেয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। এখন সে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে মৌসুমীর মেধা আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সাথে পাল্লা দিয়ে সংলাপ ছুড়ে দেয়।
শুধুমাত্র পর্দার সামনের দৃশ্যেই নয়, পর্দার পেছনে অর্থাৎ অন-সেট আর অফ-সেটেও তাদের মধ্যকার এই রসায়ন পুরো ইউনিটের সবচেয়ে বড় বিনোদন আর আলোচনার খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
দুপুরের লাঞ্চ ব্রেকের সময় প্রতিদিন এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যেত। মৌসুমী সাধারণত এফডিসির বা বাইরের কোনো ক্যাটারিংয়ের ভারি বা মসলাদার খাবার খুব একটা পছন্দ করেন না। তিনি নিজের গুলশানের বাসার নিজস্ব বাবুর্চিকে দিয়ে টিফিন ক্যারিয়ারে করে হালকা সুস্বাদু খাবার আনাতেন। সরষে পাবদা, ছোট মাছের চর্চরি কিংবা কাঁচামরিচ দিয়ে ঝাল খাসির মাংসের ঝোল।
খাওয়া শুরুর সময় তিনি টেবিল থেকে ইহানকে ডেকে আনতেন। “ইহান, শোনো! ওই শুকনো রুটি আর পোল্ট্রি মুরগি খাওয়া বন্ধ করো। এদিকে এসো।”
ইহান হয়তো লাজুক মুখে এসে দাঁড়াত, “ম্যাম, না ঠিক আছে... আমি প্রোডাকশনের খাবারেই অভ্যস্ত।”
“চুপচাপ বসো!” মৌসুমী আদেশের সুর ফুটিয়ে নিজের টিফিন ক্যারিয়ারের বাটি থেকে বাসমতী চালের ধোঁয়া ওঠা ভাত আর পাবদা মাছের বড় পেটিটা ইহানের প্লেটে তুলে দিতেন। “এই বয়সে কঙ্কালের মতো শুকনো হয়ে থাকলে অভিনয় করবে কীভাবে? গায়ে মাংস-রক্ত না থাকলে স্ক্রিনে ব্যক্তিত্ব ফোটে না। খাও তো!”
ইহান বাধ্য ছেলের মতো খেতে বসত। আর খেতে খেতেই চলত আড্ডা। খাওয়ার পর পর ইহান আবার মৌসুমীকে শেখাতে বসত কীভাবে প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হয়।
“ম্যাম, আপনি ফেসবুকের পেজটা নিজে চালান না কেন?” ইহান ফোন বের করে দেখাত। “দেখুন, এই যে ইনস্টাগ্রামের নতুন ফিল্টারগুলো। আপনি একটা 'রিল' বানালে তো দেশে তোলপাড় পড়ে যাবে।”
মৌসুমী কফির কাপে চুমুক দিয়ে হসে ফেলতেন, “ওরে বাবাসে! তোদের এই ফিল্টার আর রিলসের মধ্যে আমি নেই। আমি ভাই পুরোনো আমলের মানুষ, সামনাসামনি পারফর্ম করতে ভালোবাসি। আমার ফেস-এ প্রকৃতির ফিল্টারই থাক।”
একদিন দুপুর থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। আউটডোর শট নেওয়ার কোনো উপায় ছিল না। ডুপ্লেক্সের চওড়া বারান্দায় সবাই প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে বসে চা খাচ্ছিল। বৃষ্টির পানিতে উত্তরার বাগানটা সবুজ থেকে আরও গাঢ় সবুজ রূপ নিচ্ছিল।
মৌসুমী খেয়াল করলেন, বারান্দার এক কোণে কাঁচের জানালার দিকে মুখ করে একাকী দাঁড়িয়ে আছে ইহান। তার হাতে একটা মোটা বাঁধাই করা বই আর কিছু খাতা। তার কপালে চিন্তার রেখা, হাত দুটো পকেটে গেঁথে সে একমনে বৃষ্টির ফোঁটার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে।
মৌসুমী চা-এর কাপটা হাতে নিয়ে ধীরপায়ে এগোেেন। তাঁর গাঢ় সবুজ সুতি শাড়ির আঁচলটা মেঝেশে সামান্য ঘষা খাচ্ছিল।
“কী হলো আমাদের ইয়াং ডিটেকটিভ সাহেব?” মৌসুমী কানের পাশ থেকে আলগা চুল সরিয়ে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “কোনো জটিল কেস সলভ করছ নাকি? নাকি পাড়ার চোর আবার লাইভ দেখে পালিয়ে গেল?”
ইহান চমকে পাশ ফিরল। মৌসুমীকে দেখে ম্লান একটু হাসল। সে জানালার গ্রিল ধরে বলল, “না ম্যাম... তেমন কিছু না। আসলে ভার্সিটির সেমিস্টার ফাইনালের একটা জটিল অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে আগামী সপ্তাহে। সাবজেক্টটা হলো—'মাস মিডিয়া অ্যান্ড সোসিও-কালচারাল চেঞ্জেস'। শুটিংয়ের টানা শিডিউলের কারণে কদিন ধরে বইতেই চোখ বোলানো হয়নি। কেস সলভ করার চেয়ে এই থিওরি সলভ করা যে কত কঠিন!”
মৌসুমী স্নেহের দৃষ্টিতে ছেলেটির দিকে তাকালেন। ২১ বছরের তরুণ—একদিকে রুপালি পর্দার জাদুকরী জগতে পা রাখার স্বপ্ন, অন্যদিকে বাস্তব জীবনের পড়াশোনা ও ডিগ্রির চাপ। এই বয়সের অনেক ছেলেই এত চাপের মুখে খেই হারিয়ে ফেলে। কিন্তু ইহান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
“নিয়ে এসো তো দেখি তোমার অ্যাসাইনমেন্টের টপিকটা,” মৌসুমী পাশের রতনের চেয়ারটা টেনে বসে বললেন। “আমার তো পড়াশোনা আর প্রাতিষ্ঠানিক থিওরি বহুকাল আগের, তবু দেখি—একজন অভিজ্ঞ অভিনেত্রী আর সমাজকে কাছ থেকে দেখা নারী হিসেবে তোমাকে কোনো সাহায্য করতে পারি কি না।”
সেদিন বিকেলে উত্তরের সেই ডুপ্লেক্সের বারান্দায় তৈরি হলো এক রূপকথার মতো দৃশ্য। একপাশে বসে আছেন বাংলা চলচ্চিত্রের তিন দশকের একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞী, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত মহাতারকা মৌসুমী—তাঁর পরনে রাজকীয় সবুজ শাড়ি, চোখে চশমা, আর তাঁর ঠিক সামান্য নিচে কার্পেটে হাঁটু গেড়ে বসে আছে ২১ বছরের এক শিক্ষানবিস তরুণ।
মৌসুমী তাঁকে নিজের জীবনের তিন দশকের অভিজ্ঞতা দিয়ে বোঝাচ্ছিলেন কীভাবে সমাজের রুচি বদলায়, কীভাবে নব্বইয়ের দশকের যৌথ পরিবারের মানসিকতা আজ ডিজিটাইজড একাকীত্বে রূপ নিয়েছে। তিনি কোনো পাঠ্যবইয়ের মুখস্থ বিদ্যা নয়, বরং জীবনের গভীর পর্যবেক্ষণ থেকে থিওরিগুলোকে ব্যাখ্যা করছিলেন। আর ইহান মুগ্ধ হয়ে খাতায় নোট নিচ্ছিল, মাঝে মাঝে যুক্তি দেখাচ্ছিল তার নিজস্ব আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে।
পরিচালক ইফতি দূরের একটা কোণ থেকে এই দৃশ্যটা দেখে থমকে দাঁড়ালেন। তিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের আইফোনটা বের করে সাইড-এঙ্গেল থেকে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে এক মিনিটের একটা ভিডিও আর কিছু অসাধারণ ক্যান্ডিড ছবি তুলে রাখলেন।
ইফতি মনে মনে বললেন, “এই কেমিস্ট্রি যদি সিনেমায় ফুটে ওঠে, তবে বাংলা চলচ্চিত্র নতুন কিছু দেখতে চলেছে। সিনেমার প্রমোশনে এই স্টিল পিকচারগুলো সোনা ফলাবে!”