মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ২০
চতুর্দশ অধ্যায়
কলেজের মেইন বিল্ডিংয়ের পেছনে পুরনো ছায়ানট ঘেরা একটা চত্বর আছে। জায়গাটা কলেজের পেছনের দিকে, বেশ নিরিবিলি, চারদিকে বড় বড় মেহগনি গাছের ছায়া। সাধারণ স্টুডেন্টরা সচরাচর এদিকে ঘেঁষার সাহস পায় না, জায়গাটা ওদের আনাগোনার বাইরে।
কারণ এখানে বিক্রম মালহোত্রা এবং তার গ্যাংয়ের একচেটিয়া রাজত্ব। এখানে বলে রাখা ভালো যে 'স্পোর্টস কোটা' হলেও কেউ কোনদিন বিক্রমকে খেলার মাঠে ঘাম ঝরাতে দেখেনি। তার বাবার অঢেল প্রতিপত্তি আর টাকার গরমই ছিল বিক্রমের আসল যোগ্যতা; যার প্রভাবে কোনো নিয়ম বা শাসন কোনদিন তার আয়েশি রাজত্বকে স্পর্শ করার সাহস পায়নি।
একটা পুরনো, বিশাল শিরীষ গাছের ছায়ায় রাখা কংক্রিটের বেঞ্চের ওপর পা তুলে আয়েশ করে বসে ছিল বিক্রম। দুপুরের কড়া রোদটা বিশাল শিরীষ গাছের পাতা ছুঁয়ে নিচে পড়ছে। বাতাসে একটা ভ্যাপসা গরম আর তার সাথে মিশে আছে দামি সিগারেটের তামাকের গন্ধ। কংক্রিটের বেঞ্চটার ওপর দুই পা তুলে দিয়ে বিক্রম এমনভাবে হেলান দিয়ে বসে আছে, যেন এই চত্বরটা ওর নিজের বাড়ির ড্রয়িংরুম । তার চোখে রে-ব্যান, শার্টের হাতা কনুই অবধি গোটানো। বিক্রমের ডান হাতের দুই আঙুলের ফাঁকে ধরা একটা দামি ফ্রেঞ্চ সিগারেট। সে একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়াটা রিং করে ওড়াল।
সামনে দাঁড়িয়ে রকি, সামির। তাদের চোখেমুখে ঔৎসুক্য। বিক্রমের ঠোঁটের কোণে একটা হাসি লেগে আছে। সেই হাসিতে কোনো নিরীহভাব নেই, বরং তার জায়গায় আছে অহংকার।
"ভাই, তুই তো কাল অনেকক্ষণ ছিলি কেবিনে। কী বুঝলি? মালটা কি আদৌ গলবে, নাকি শুধু শুধু টাইম ওয়েস্ট?"
সামির একটা লাইটার হাতে নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে জিজ্ঞেস করল।
বিক্রম হাতের সিগারেটটা বেঞ্চের হাতলে একবার ঠুকল। ছাইটা ঝরে পড়ল মাটিতে।
"টাইম ওয়েস্ট? মালহোত্রারা কখনো ফালতু জায়গায় ইনভেস্ট করে না, সামির", বিক্রম চিবিয়ে চিবিয়ে বলল।
"তোরা মালটাকে বাইরে থেকে দেখছিস। একটা কড়া, অহংকারী অঙ্কের টিচার। কিন্তু কাল কেবিনের ভেতর আমি ওই প্রফেশনাল মুখোশটার পেছনে এক চিলতে দুর্বলতা দেখেছি।"
রকি একটু ঝুঁকে এল। "কীসের দুর্বলতা ভাই?"
"তৃষ্ণা, ভাই। প্রচণ্ড তৃষ্ণা," বিক্রম সিগারেটের ছাইটা বেঞ্চের গায়ে ঘষে ঝেড়ে ফেলল।
"আমি শিওর, মালটার পার্সোনাল লাইফে কোনো বড় ভ্যাকুয়াম আছে। কাল যখন আমি একটু ঝুঁকে ওর পারফিউমের প্রশংসা করলাম না, আমি স্পষ্ট দেখলাম ওর চোখদুটো এক সেকেন্ডের জন্য কেমন আনস্টেডি হয়ে গেল। গালের কাছে একটা লালচে আভা ফুটে উঠল।"
বিক্রম অত্যন্ত নিচু তারে, রসালো গলায় বর্ণনা দেওয়া শুরু করল।
"লাস্ট দু-সপ্তাহে আমি বাজেট কমিটির বাহানায় জাস্ট ফিল্ডিং সাজাচ্ছিলাম। কাল কেবিনে বসে আমি প্রথমবার ওর দিকে সুতোটা ছুঁড়লাম। আর বিলিভ মি, মাছ টোপ গিলেছে।"
"ভাই, তুই কি সিরিয়াসলি বলছিস? মালটা সত্যিই তোর কথায় পটছে?", সামির চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল।
"পটছে মানে? আমি জাস্ট সুতোটা একটু ঢিলে ছেড়েছি আর মাছটা নিজের থেকেই বঁড়শির দিকে এগিয়ে আসছে।"
রকি একটু অবাক হয়ে বলল, "কিন্তু বস, আমরা তো শুনেছিলাম মিস গাঙ্গুলি হেভি প্রাউড! কাউকে পাত্তাই দেয় না। অ্যাটিটিউড দেখে মনে হয় পুরো কলেজটাকে নিজের জুতোর তলায় রাখে। সে তোর টোপ গিলেছে?"
বিক্রম একটা ছোট, অহংকারী হাসি হাসল।
"অ্যাটিটিউডটা শুধু বাইরের খোলস, সামির। ভেতরে ভেতরে এই ধরনের মেয়েছেলেরা ভীষণ ডেসপারেট হয়। জাস্ট ঠিক জায়গায় ট্রিগারটা প্রেস করতে হয়।"
সামির চোখ বড় বড় করে সব শুনছিল, "সত্যি?"
"অ্যাবসোলিউটলি," বিক্রম সিগারেটের ছাই ঝেড়ে একটা ছোট শ্বাস নিল, যেন কোনো অত্যন্ত উপাদেয় খাবারের স্বাদ মনে করার চেষ্টা করছে।
তারপর নিজের দুই হাত দিয়ে বাতাসে একটা নারীশরীরের শেপ আঁকল। তার চোখে একধরনের আদিম উল্লাস খেলা করছে।
"কাল ও একটা ওয়াইন-রেড রঙের শাড়ি পরেছিল। শাড়িটা ওর বডির সাথে এমনভাবে সেঁটে ছিল না! এসির হাওয়ায় যখন ও আমার দিকে ঝুঁকে ফাইলের হিসেব দেখাচ্ছিল...ওর শাড়ির আঁচলটা একটু সরে গিয়েছিল। জাস্ট এক ঝলক। উফফ! যা ফিগার না মাইরি! মাই গড! আমার তো প্যান্টের ভেতরটা জাস্ট লোহা হয়ে গিয়েছিল।"
বিক্রম কথাটা শেষ করে একটা কামার্ত আওয়াজ করল।
সামির আর রকি নোংরাভাবে হেসে উঠল।
"তারপর কী হলো বস? তুই কিছু বললি না?"
"ভাই, আমি তো জাস্ট পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার তো মনে হচ্ছিল কালকেই কেবিনের দরজা বন্ধ করে ডেস্কের ওপর ফেলে..." বিক্রম হাসতে হাসতে রকির কাঁধে একটা চাপড় মারল।
"বাট পেশেন্স ইজ দ্য কি। নিজের রূপ এবং মেধা নিয়ে ওর একটা মারাত্মক অহংকার আছে। যে মেয়ের ইগো যত বড়, তাকে নিজের ফাঁদে ফেলার রাস্তাটাও তত সোজা। মিস গাঙ্গুলি মনে করছে, সে নিজের চারপাশের সবকিছু কন্ট্রোল করছে। ওর ওই ইন্টেলেকচুয়াল ইগোটাকে আমি রোজ একটু একটু করে মাসাজ করছি।
আমার ওই মেপে মেপে বলা কথা, কাজের প্রতি ফেক ডেডিকেশন, সবকিছু ওর প্রফেশনাল ইগোর আড়ালে একটা ট্রাস্ট তৈরি করেছে। ও ভাবছে আমি একটা বাধ্য, ইনোসেন্ট স্টুডেন্ট যে ফেস্ট নিয়ে খুব ডেডিকেটেড। ওর ওই প্রফেশনাল, ইন্টেলেকচুয়াল ইগোর আড়ালে ও আমাকে একটা সেফ-জোন দিয়ে ফেলেছে।
আর কিছুদিন। জাস্ট আর কয়েকটা দিন। তারপর ওই শাড়ির ভাঁজ আমি খুলবই। দ্যাটস মাই গ্যারান্টি। আমার বিছানায় শুয়ে গোঙানো ছাড়া ওর কাছে আর কোনো রাস্তা থাকবে না। ফেস্টের আগে বা ফেস্টের রাতেই... ।"
বিক্রমের এই ঠান্ডা মাথার, সাইকোপ্যাথিক কথাবার্তা শুনলে যেকোনো সাধারণ মানুষের গা গুলিয়ে উঠবে। সে বিদিশাকে একজন মানুষ নয়, স্রেফ একটা শিকার, একটা ট্রফি হিসেবে তুলে ধরছে তার বন্ধুদের কাছে।
সামির আর রকি নোংরাভাবে হেসে উঠল। "গুরু, তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে তুই এক মাসের আগেই বাজি জিতে যাবি!"
"বাজি তো আমি জিতবই," বিক্রমের চোখে এখন এক হিমশীতল আত্মবিশ্বাস।
"ও যতই ফায়ারব্র্যান্ড হোক না কেন, আমার ওই 'গুড বয়' আর 'রেস্পেক্টফুল স্টুডেন্ট'-এর মুখোশটা ধরতে পারেননি।"
কয়েকঘন্টা আগে আজ সকালবেলা
কলকাতার চ্যাটার্জী বাড়ির সকালটা আজ অন্যদিনের চেয়ে একটু আলাদা।
মাস্টার বেডরুমের লাগোয়া বিশাল ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বিদিশা।
আজ তিনি একটা সি-গ্রিন রঙের হালকা সিল্কের শাড়ি পরেছেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বিদিশা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে শাড়ির কুঁচিগুলো ঠিক করছিলেন।
তার সদ্য স্নান করা, খোলা চুল থেকে দামি শ্যাম্পুর একটা স্নিগ্ধ সুবাস সারা ঘরে মায়াজালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বিদিশা একটু ঝুঁকে আয়নার খুব কাছাকাছি গিয়ে অত্যন্ত যত্ন নিয়ে ঠোঁটে একটা গাঢ় শেডের লিপস্টিক লাগালেন। তারপর নিজের চোখে একটু কাজল টেনে পিছিয়ে এসে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে একটা আলতো, তৃপ্তির হাসি হাসলেন।
সেই হাসিতে আজ আর কোন ক্লান্তি নেই, আছে এক স্বাধীন, আত্মবিশ্বাসী নারীর দীপ্তি। তার চোখের নিচের সেই কালশিটে পড়া বিষাদটা যেন জাদুমন্ত্রে উধাও হয়ে গেছে। একটা আলাদা গ্লো, একটা সতেজ আভা তার পুরো মুখমণ্ডলকে ভরিয়ে রেখেছে।
ওদিকে বাড়ির ড্রয়িংরুমে অরুণ সোফায় বসে খবরের কাগজের আড়ালে মুখ লুকিয়ে আছেন। তার চোখের দৃষ্টি খবরের পাতায় স্থির, কিন্তু মন অন্য কোথাও পড়ে আছে।
ঠিক সেই সময় সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন বিদিশা।
অরুণ কাগজের পাশ দিয়ে অত্যন্ত সন্তর্পণে, লুকিয়ে তার দিকে আড়চোখে তাকালেন।
বিদিশার চুলগুলো অত্যন্ত পরিপাটি করে বাঁধা। তার চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে একটা পিচ রঙের লিপস্টিক, যা তার ফর্সা ত্বককে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। তার শরীর থেকে শ্যাম্পুর আর দামী পারফিউমের স্নিগ্ধ গন্ধ ভেসে আসছে।
অরুণের চোখের সামনে বিদিশা ড্রয়িংরুমের বিশাল আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। নিজের শাড়ির আঁচলটা আরেকবার ঠিক করে নিলেন, তারপর ঠোঁটের কোণে একটা আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটিয়ে নিজের পার্সটা তুলে নিলেন।
অরুণের মনে একটা কুৎসিত সন্দেহের পোকা নড়াচড়া করে উঠল।
বিদিশা কলেজে কী করে ? রোজ এত পরিপাটি হয়ে সেজেগুজে কলেজে যায়? এই রূপ, এই সাজগোজ অন্য কারও জন্য? স্টাফরুমের কোনো পুরুষ কলিগ? নাকি অন্য কেউ?
এই প্রশ্নগুলো অরুণের মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল।
এই নারী... এই আত্মবিশ্বাসী, রূপসী, স্বাধীন মহিলা কি সত্যিই তার স্ত্রী? বিদিশার চোখেমুখে একটা আলাদা দীপ্তি, একটা আনন্দের আভা, অরুণের মেলাতে কষ্ট হচ্ছে। অরুণের বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত অনুভূতিতে তোলপাড় হচ্ছিল। সে নিজের মনের ভেতরে উঁকি মেরে সেই অনুভূতিটার পরিচয় জানবার চেষ্টা করল। কিন্তু, সাহসের অভাব তাকে সেই অনুমতি দিল না।
ইতালির সেই রাতের মুছে যাওয়া স্মৃতি যা তাকে আজও ধাওয়া করে, যার জন্য প্রায়ই নিজেকে বারবার ব্যর্থ, কাপুরুষ মনে হয়— সেই সবকিছুর যুগলবন্দী একটা অদৃশ্য শেকল হয়ে অরুণের সত্তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল।
একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে, কাপুরুষের মতো আবার খবরের কাগজের আড়ালে অরুণ নিজের মুখটা লুকিয়ে ফেলল।
বিদিশা নিজের পার্সটা তুলে নিয়ে একবারও অরুণের দিকে না তাকিয়ে, হাই-হিলের খটখট শব্দ তুলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
অরুণ কাগজটা নামিয়ে রেখে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফির কাপটা হাতে তুলে নিল। তার মনে হলো, সে যেন এক জীবন্ত মমি, যার চোখের সামনে দিয়ে জীবন প্রতিদিন একটু একটু করে তার হাতের মুঠোর ফাঁক দিয়ে বালির মতো ঝুর ঝুর করে খসে পড়ছে।
দুপুর দুটো, মেন বিল্ডিংয়ের তিনতলা, বিদিশার কেবিন
মেন বিল্ডিংয়ের থার্ড ফ্লোরের ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টের করিডোর ধরে অয়ন দ্রুত পায়ে, প্রায় ছুটতে ছুটতে বিদিশার কেবিনের দিকে আসছিল। জুতো আর মেঝের ঘর্ষণে একটা কর্কশ শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পুরো ফ্লোরে। ওর চোখমুখ লাল, নিঃশ্বাস দ্রুত পড়ছে, চুলগুলো এলোমেলো।
অয়নের মনের ভেতরে একটা বিশাল ঝড় বয়ে চলেছে। এইমাত্র ক্যাফেটেরিয়ার পাশ দিয়ে আসার সময় বিক্রমের বন্ধুদের মুখে সে অস্পষ্টভাবে, নোংরা ফিসফিসানি শুনেছে। যদিও সে পুরো কথাটা শুনতে পায়নি, কিন্তু বিক্রমের নাম আর তার মায়ের প্রসঙ্গটা তার কানে ঠিকই পৌঁছেছে। তার মাথার ভেতর রক্ত ফুটছে। বিক্রমকে এর মূল্য চোকাতেই হবে।
কিন্তু, আপাতত সে তার দেবীতুল্য মাকে এই লম্পটটার ব্যাপারে আগাম সতর্ক করে দিতে চায়। সে জানে বিদিশা অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। কিন্তু, নতুন জায়গায় এখনও সবাইকে চিনে উঠতে পারেননি।সেজন্য হয়তো তিনি মুখোশের আড়ালে ধূর্ত বিক্রমের আসল চেহারাটা ধরে ফেলতে পারছেন না। বিদিশাকে বাঁচানোর জন্য অয়ন সবরকম পন্থা নেবে। কিন্তু তার আগে তাকে সতর্ক করে দিতে হবে। দেরি করলে চলবে না।
দ্রুত হাঁটার চোটে ওর কপালে ঘামের সূক্ষ্ম বিন্দু জমেছে। তিনতলার শেষ প্রান্তে বিদিশার কেবিনের দরজার সামনে এসে ও হঠাৎ থমকে দাঁড়াল।
বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে, হৃৎপিণ্ডটা যেন পাঁজরের হাড় ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের আলুথালু শ্বাস আর অবাধ্য উত্তেজনাকে বশ করার চেষ্টা করল সে। তারপর একটা দীর্ঘ, গভীর শ্বাস নিয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে দরজায় নক করল।
কেবিনের দরজা অর্ধেক ভেজানো।
"কাম ইন।"
অয়ন দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। ভেতরে এয়ার কন্ডিশনারের একটানা, একঘেয়ে গুনগুন শব্দ।
বিদিশা ডেস্কে বসে ফার্স্ট ইয়ারের অ্যাসাইনমেন্ট চেক করছিলেন। কালচারাল ফেস্টের কাজগুলো তাকে রীতিমতো প্রেশারে রেখেছে। তার জন্য যাতে ক্লাসের পড়ানোয় ফাঁক যাতে না থাকে সেজন্য তিনি সদা সতর্ক।
অয়নকে দেখে তার হাত এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে এল।
"তুমি? এখানে? কী ব্যাপার ?"
বিদিশা পেনটা নামিয়ে রেখে জিজ্ঞেস করলেন।
বিদিশার গলায় কোনো মাতৃসুলভ উষ্ণতা নেই, আছে একজন কড়া প্রফেসরের বিরক্তি।
অয়ন দরজাটা পেছন থেকে বন্ধ করে দিল। এসির একটানা গুনগুন আওয়াজ আর বিদিশার সেই ল্যাভেন্ডার পারফিউমের গন্ধ কেবিনের পরিবেশটাকে একটা অদ্ভুত থমথমে রূপ দিয়েছে।
"মা... আই মিন, মিস গাঙ্গুলি। আমার একটা কথা ছিল"
অয়ন টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। তার হাত দুটো প্যান্টের পকেটে শক্ত করে মুঠি পাকানো।
"বলো। অ্যাকাডেমিক কোনো প্রবলেম?"
বিদিশা পেনটা নামিয়ে রেখে হাত দুটো বুকের কাছে ক্রস করে বসলেন। তার এই বডি ল্যাঙ্গুয়েজটাই দুজনের মধ্যে একটা অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দিল।
"অ্যাকাডেমিক নয়। এটা... এটা বিক্রম মালহোত্রাকে নিয়ে", অয়নের গলাটা একটু কেঁপে গেল।
বিক্রমের নাম শুনতেই বিদিশার মুখটা ইস্পাতের মতো কঠিন হয়ে গেল। তার চোয়াল শক্ত হলো, ভ্রু দুটো কুঁচকে উঠল।
"বিক্রমকে নিয়ে তোমার কী সমস্যা?"
অয়ন বুঝতে পারছিল না সে কীভাবে কথাটা বলবে। তার কথা আটকে যাচ্ছে। সে তো বিক্রমের সেই নোংরা ফ্যান্টাসি, ক্যাফেটেরিয়ার বাজির কথা নিজের মুখে উচ্চারণ করতে পারবে না!
যে মাকে সে মনে মনে পুজো করে। একটা ছেলে হয়ে সে কীভাবে তাকে বলবে যে কলেজের ছেলেরা তার শরীর নিয়ে বাজি ধরছে?
না।
অয়ন একজন ছেলে হয়ে নিজের মায়ের সামনে এই নোংরা, অশালীন শব্দগুলো উচ্চারণ করতে পারবে না। তার জিভ আড়ষ্ট হয়ে আসছে। সমাজ, সম্পর্ক আর নিজের ভেতরের অবদমিত কমপ্লেক্সিটি - সবকিছু মিলে তার গলা টিপে ধরেছে।
অয়নের গলার কাছে শব্দগুলো আবার দলা পাকিয়ে গেল।
"ছেলেটার নজর ভালো নয়..." অয়ন খুব কষ্ট করে, কোনরকমে বলতে শুরু করল।
"ওর ব্যাকগ্রাউন্ড খুব খারাপ। ওর মতলব অন্য, ও আপনাকে ফেস্টের নাম করে ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা করছে। প্লিজ, ওকে আপনি এত সহজে আপনার কেবিনে আসার পারমিশন দেবেন না।"
অয়ন কথাগুলো প্রায় এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল।
কথাগুলো শোনার পর কেবিনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা হিমশীতল নিস্তব্ধতা নেমে এল। শুধু এসির গুনগুন আওয়াজটা শোনা যাচ্ছে।
বিদিশা ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তার চোখদুটো এখন রাগে বড় বড় হয়ে গেছে, সঙ্গে মিশে আছে তীব্র বিরক্তি।
তার কলিগরা যখন বিক্রম নিয়ে তাকে সতর্ক করেছিল, যখন রাহুল বোস বিক্রম নিয়ে তাকে সতর্ক করেছিলেন, তখন বিদিশা সেগুলো ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
কিন্তু, আজ অয়নের মুখে সেই এক সাবধানবাণী শুনে তিনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। তার মনে হল অয়নকে তিনি যা করতে বারণ করেছিলেন ও সেটা আবার শুরু করে দিয়েছে - তার জীবন নিয়ে অনধিকারচর্চা। এখানে তিনি কারোর মা, কারোর স্ত্রী হিসাবে নয়, নিজের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে এসেছেন। কিন্তু সবাই মিলে যদি সবসময় তার বুদ্ধিমত্তাকে ছোট করে দেখে, নিজের ছেলে সারাক্ষণ ওর উপর ছড়ি ঘোরাতে চেষ্টা করে তাহলে সেটা কীভাবে সম্ভব ?
বিদিশার মাথায় এটা একবারও এল না, যে অয়ন সেদিন রাতে ইতালিতে তাকে বাঁচিয়েছিল বলেই আজ তিনি এই চেয়ারটায় বসে আছেন। নয়তো, আজ তিনি কোথায় পড়ে থাকতেন তার কোন ঠিকঠিকানা থাকত না।
"মিস্টার চ্যাটার্জী"
বিদিশার গলার স্বরটা এতটাই তীক্ষ্ণ আর শীতল ছিল, যে অয়নের মনে হলো কেউ যেন তাকে চাবুক মারল।
"আমি কার সাথে মিশব, কাকে আমার কেবিনে আসতে দেব আর কাকে দেব না, সেটা সম্পূর্ণ আমার প্রফেশনাল এবং পার্সোনাল ডিসিশন। সেই শিক্ষা আমায় আপনার থেকে নিতে হবে না।"
অয়নের পায়ের তলার মাটিটা যেন এক মুহূর্তের জন্য সরে গেল। সে আশা করেছিল বিদিশা তাকে একটু হলেও গুরুত্ব দেবেন, তার উদ্বেগকে বুঝবেন। সে জায়গায় তার এই অপমান, ওর আর বিদিশার মাঝখানে হিমালয় সমান এক দূরত্ব তৈরি করে দিল। ওর বুকের ভেতরটা অপমানে আর অভিমানে দুমড়ে-মুচড়ে গেল, চোখের কোণটা একবার জ্বলে উঠলেও...
"কিন্তু আপনি বুঝতে পারছেন না! ও ভীষণ বাজে ছেলে! ও আপনাকে-" অয়ন মরিয়া হয়ে আবার বলতে গেল।
"স্টপ!"
বিদিশা ডান হাতটা তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন। "ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিটস। নিজের পড়াশোনায় মন দিন। আপনি আমার ব্যক্তিগত গার্ড নন। আমার নিজের ভালো-মন্দ বোঝার বয়স হয়েছে। আপনি কি আমাকে এতটা অক্ষম ভাবেন যে একটা একুশ বছরের ছাত্র আমাকে তার হাতের তালুতে রেখে নাচাবে আর আমি সেটা বুঝতে পারব না?"
অয়ন যেন পাথর হয়ে গেল।
'ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিটস', কথাগুলো তার মস্তিষ্কে হাতুড়ির মতো আঘাত করল। সে দেখল বিদিশার চোখে তার প্রতি কোনো বিশ্বাস নেই, বদলে আছে একরাশ চরম বিরক্তি।
"বিক্রম আমার ছাত্র, ও খুব হেল্পফুল। ও বাজেটের কাজ নিয়ে অত্যন্ত সিরিয়াস", বিদিশা অত্যন্ত কঠোর গলায় বললেন। তিনি একটুও থামলেন না।
কথা বলতে বলতে তার গলা আগের চেয়েও তীক্ষ্ণ, ধারালো হয়ে উঠল।
"আপনার এই সংকীর্ণ মানসিকতা আর অদ্ভূত ঈর্ষা আমায় সত্যিই অবাক করছে। আপনি হয়তো ভাবছেন আমি আপনার মা, তাই আমার ওপর আপনার একটা অধিকার আছে। কিন্তু এই ক্যাম্পাসের ভেতরে আপনি শুধুই ফার্স্ট ইয়ারের একজন স্টুডেন্ট।"
বিদিশা আবার নিজের চেয়ারে বসে পড়লেন।
"জেলাসি? ভিত্তিহীন?" অয়ন অস্ফুটে বলে উঠল, তার গলা দিয়ে যেন স্বর বেরোচ্ছে না।
অয়নের মনে হলো তার বুকের ভেতর কেউ একটা ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে সেটাকে মুচড়ে দিল। 'সংকীর্ণ মানসিকতা', 'জেলাস'! এই শব্দগুলো তাকে ভেতর থেকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল।
"আমার প্রফেশনাল লাইফ এবং আমি কার সাথে মিশব, সেটা নিয়ে আপনার মাথা ঘামানোর বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই", বিদিশা এবার একটা ফাইল টেনে নিয়ে আবার পেনের ঢাকনা খুললেন, যেন অয়নের অস্তিত্বটাই তার কাছে এখন বিরক্তিকর।
"আপনার এই 'চাইল্ডিশ জেলাসি' আমার প্রফেশনাল লাইফে ডিস্টার্ব করছে। ইফ ইউ হ্যাভ নাথিং এলস টু সে, ইউ মে লিভ।"
'চাইল্ডিশ জেলাসি', শব্দদুটো অয়নের কানে গলিত সীসার মতো ঢুকল। তার মা... তার দেবী... তাকে একজন অপরিপক্ব, হিংসুটে বাচ্চা ছেলে বলে অপমান করলেন? আর কার জন্য? ওই লম্পট, সাইকোপ্যাথ বিক্রম মালহোত্রার জন্য?
সে এই নারীটির পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য ইতালিতে নিজের হাতে একটা রাক্ষসকে খুন করতে গেছিল। আর, আজ সেই নারীটি তাকে একটা হিংসুটে বাচ্চা ছেলে বলে উড়িয়ে দিচ্ছে!
তার ভালোবাসা, সন্তান হিসাবে তার অধিকারবোধ, তার তীব্র প্রটেকটিভ ইনস্টিংক্ট - সবকিছুকে বিদিশা আজ তার জুতোর তলায় পিষে দিলেন। অপমান, রাগ আর চরম অসহায়তায় অয়নের চোখদুটো রক্তবর্ণ হয়ে উঠল। তার কপালের রগগুলো দপদপ করতে লাগল। কিন্তু সে আর একটা কথাও বলল না।
অয়ন বুঝতে পারল, সে যতই তার মাকে রক্ষা করার চেষ্টা করুক না কেন, বিদিশাকে বোঝানো অসম্ভব। বিদিশার কাছে এই মুহূর্তে তার পরিচয় শুধুই একজন অবাধ্য, অধিকার ফলানো ছেলের।
আর একটাও কথা না বলে সে বিদিশার চোখের দিকে শেষবারের মতো একবার তাকিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। তার চোয়ালের পেশিগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠেছে।
অয়ন যে পথ ধরে এসেছিল, সেই পথ ধরে ফিরে যাচ্ছে।
তার কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। "আপনি আমার ব্যক্তিগত গার্ড নন... চাইল্ডিশ জেলাসি... ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিটস..." কথাগুলো একটা লুপের মতো তার মাথায় বাজতে শুরু করেছে।
হাঁটতে হাঁটতে অয়ন কখন বাথরুমে চলে এসেছে সে নিজেই জানে না। খেয়াল হবার পর দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে অয়ন বাথরুমের দেওয়ালে একটা সজোরে ঘুসি মারল। তার হাতের হাড়গুলো ব্যথায় টনটন করে উঠল বটে, কিন্তু তার বুকের ভেতরের যন্ত্রণার কাছে এই ব্যথাটা কিছুই নয়। তার মা আজ একটা লম্পটের জন্য তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে।
এখন ওর কতটা অসহায় লাগছে সেটা ও কারোর সাথে ভাগ করে নিতে পারবে না। এই দমবন্ধ করা অনুভূতি, এই জ্বালা আজ ও অন্য কোথাও উগরে দেবে।
আজ বিকেলে কলেজের মাঠে ইন্টার-ডিপার্টমেন্টাল টুর্নামেন্টের সেমি-ফাইনাল ম্যাচ আছে। অয়নের মাথার ভেতর এখন শুধু একটাই চিন্তা ঘোরাফেরা করছে - ধ্বংস।