মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ২২
পঞ্চদশ অধ্যায়
কলেজের অ্যানুয়াল কালচারাল ফেস্টের আর মাত্র দু'দিন বাকি।
পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে এখন একটা উৎসবের আমেজ। চারদিকে ব্যস্ততা, মেইন বিল্ডিংয়ের চারদিকে ব্যানার ফ্লেক্স লাগানোর কাজ চলছে, করিডোরগুলোতে স্টুডেন্টদের ব্যস্ত আনাগোনা, অডিটোরিয়াম থেকে রিহার্সালের অগোছালো বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ ভেসে আসছে।
করিডোরে করিডোরে পোস্টার, অডিটোরিয়াম থেকে ভেসে আসা সাউন্ড চেকের অস্পষ্ট আওয়াজ আর স্টুডেন্টদের দলবেঁধে ছোটাছুটি। সব মিলিয়ে একটা জমজমাট পরিবেশ।
কিন্তু এই প্রবল কোলাহলের মাঝেও বিদিশা চ্যাটার্জী থুড়ি, মিস বিদিশা গাঙ্গুলির মনের ভেতর একটা অদ্ভুত, দমবন্ধ করা অস্বস্তি কাজ করছে।
আর সেটার কারণ হলো, অয়ন।
গত তিনদিন ধরে অয়ন আক্ষরিক অর্থেই বিদিশার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। সে বিদিশার পেশাগত পরিসর থেকে নিজেকে এমনভাবে গুটিয়ে নিয়েছে, যেন বিদিশা নামক মানুষটির কোন অস্তিত্বই তার জীবনে নেই। সে ইচ্ছে করে বিদিশাকে এড়িয়ে চলছে না বরং বিদিশা ঠিক যেটা চেয়েছিলেন সেই নিখুঁত, যান্ত্রিক 'প্রফেশনাল ডেকোরাম' বজায় রাখছে।
তিনদিন আগের কথা,
সকাল এগারোটা। সেদিন সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাস নিয়ে মেন করিডোর দিয়ে নিজের কেবিনের দিকে ফিরছিলেন বিদিশা। হাতে একগাদা ফাইল, ফেস্টের কাজের চাপ প্রচুর।
সেই সময় করিডোরের উল্টোদিক থেকে আসছিল অয়ন। তার কাঁধে একটা ব্যাগ, হাতে কয়েকটা বই।
বিদিশার বুকের ভেতর মাতৃসত্তাটা এক মুহূর্তের জন্য একটু নড়েচড়ে উঠল। গত পরশু কেবিনে ওইরকম ধমক দেওয়ার পর থেকে অয়নের সাথে তার আর কোনো কথা হয়নি।
বিদিশার মাতৃসত্তা অবচেতনে আশা করেছিল যে, অয়ন অন্তত একবার তার দিকে তাকাবে। হয়তো তার চোখে অভিমান থাকবে, রাগ থাকবে অথবা অপরাধবোধ থাকবে। একজন মায়ের বকুনি খাওয়ার পর ছেলে যেমন মুখ গোঁজ করে থাকে, সেরকম কিছু একটা।
একটা মায়ের মন তো সেটাই আশা করে।
কিন্তু অয়ন বিদিশাকে আসতে দেখে করিডোরের একপাশে সরে গিয়ে দাঁড়াল, ঠিক যেমন একজন অত্যন্ত বাধ্য, সাধারণ ছাত্র একজন সিনিয়র প্রফেসরের জন্য রাস্তা ছেড়ে দেয়। বিদিশা যখন তাকে ক্রস করছেন, অয়ন একটুও মাথা তুলল না।
"গুড মর্নিং, ম্যাম।"
গলার স্বরে কোনো আবেগ নেই, কোনো ওঠানামা নেই, কোনো তিক্ততাও নেই। একদম পারফেক্ট, মেপে বলা দুটো শব্দ। চোখে কোনো আই-কন্ট্যাক্ট নেই। কথাটা বলেই সে একই ছন্দে হেঁটে চলে গেল, ঠিক যেমন কোনো অপরিচিত, সাধারণ ছাত্র তার ডিপার্টমেন্টের একজন টিচারকে উইশ করে চলে যায়।
বিদিশা থমকে গেলেন। এই 'ম্যাম' ডাকটার মধ্যে কোনো পরিচিতির লেশমাত্র ছিল না।
"গুড মর্নিং," বিদিশা কোনোমতে উত্তর দিয়ে নিজের কেবিনের দিকে এগিয়ে গেলেন।
অয়ন একবারের জন্যও ফিরে তাকালো না। সে বিদিশাকে ইচ্ছে করে এড়িয়ে যাচ্ছে না, কিন্তু বিদিশা যেটা চেয়েছিলেন; 'প্রফেশনাল ডেকোরাম', সেটা সে আক্ষরিক অর্থে এমন নিখুঁতভাবে পালন করছে যে বিদিশার নিজেরই বুকটা আজ কেমন যেন ফাঁকা লাগছে।
কেবিনে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে ডেস্কে বসে পড়লেন বিদিশা। একটা অচেনা অনুভূতি তার মনকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। তার ছেলে তাকে আক্ষরিক অর্থেই একজন 'অচেনা মানুষ' হিসেবে ট্রিট করছে, এটা তার মনে বারবার কাঁটার মতো বিঁধছিল।
বিদিশার প্রখর ব্যক্তিত্বের আড়ালে থাকা চিরন্তন মাতৃসত্তা আজ এক নির্মম আঘাতের সম্মুখীন হলো। তার মনে একটা চাপা অপরাধবোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, "আমি কি সেদিন বড্ড বেশি রূঢ় ব্যবহার করে ফেলেছিলাম?"
ছোটবেলা থেকেই ছেলেটা বড্ড অভিমানী।
কিন্তু পরক্ষণেই 'বিদিশা গাঙ্গুলির' শিক্ষিকাসত্ত্বা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, "যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। অয়ন নিজের গণ্ডি আর সীমা বুঝতে শিখছে। বাস্তব পৃথিবীটা তো আর মা-ছেলের সস্তা আবেগ দিয়ে চলবে না। বড় তো হচ্ছে, আর কবে শিখবে ?"
কিন্তু অবচেতনে সেই সূক্ষ্ম অপরাধবোধ তার ভেতরের নরম মাতৃসত্তাটাকে কুরে কুরে খেতে লাগল। এই দূরত্বটুকু বিদিশার নিজেরই তৈরি করা, সেজন্যই অয়নের ওই আচরণ, বিদিশাকে ভেতর থেকে সামান্য হলেও অস্থির করে তুলল। ওই অচেনা, অস্বস্তিকর অনুভূতিটা তার মগজের এক কোণায় লেপ্টেই রইল।
বর্তমান সময়
দুপুর দুটো। বিদিশার কেবিন।
টেবিলের ওপর ফেস্টের হাজারটা বিল, স্পনসরশিপ ফর্ম আর ভেন্ডারদের কোটেশন ছড়ানো। কাজের মারাত্মক চাপ। বিদিশা একটা পেন দিয়ে কপালে হালকা মাসাজ করছিলেন।আজ ভেতরে ভেতরে তিনি একটু আনমনা।
এমন সময় দরজায় টোকা দিয়ে ভেতরে ঢুকল বিক্রম। তার হাতে একটা খোলা ল্যাপটপ। পরনে একটা হালকা নীল রঙের শার্ট, চুলগুলো পারফেক্টলি সেট করা। মুখে সেই ট্রেডমার্ক 'গুড বয়' ইনোসেন্স।
"সরি টু ডিস্টার্ব ইউ, ম্যাম, ফাইনাল পেমেন্ট শিডিউল আর স্টেজের থ্রি-ডি লেআউটটা রেডি করে এনেছি", বিক্রম অত্যন্ত প্রফেশনাল গলায় বলল। তার গলা বরাবরের মতোই মোলায়েম, সম্ভ্রমপূর্ণ।
বিদিশা নিজের মনের অস্থিরতাটাকে জোর করে সরিয়ে রেখে একটু হাসলেন।
"এসো বিক্রম। দেখি কী শিডিউল করেছ।", বিদিশা সোজা হয়ে বসলেন।
সাধারণত বিক্রম ডেস্কের ওপাশে বসেই ল্যাপটপ ঘুরিয়ে কাজ দেখায়। কিন্তু আজ সে তা করল না। সে ডেস্কের পাশ দিয়ে হেঁটে, একদম বিদিশার চেয়ারের পাশে এসে দাঁড়াল।
বিদিশা একটু অবাক হলেন, কিন্তু কিছু বলার আগেই বিক্রম ল্যাপটপটা বিদিশার চোখের সামনে টেবিলে রেখে একটু ঝুঁকে এল।
ফেস্টের একদম দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বিক্রম এবার তার 'গুড বয়' ইমেজের আড়ালে খুব সন্তর্পণে বিদিশার 'পার্সোনাল স্পেস' বা ব্যক্তিগত সীমানা ভাঙার খেলাটা শুরু করে দিয়েছে।
ল্যাপটপের স্ক্রিনে কিছু একটা দেখানোর অছিলায় বিক্রম বিদিশার খুব কাছে ঝুঁকে পড়ল। তার বাঁ হাতটা বিদিশার চেয়ারের হাতলের একদম গা ঘেঁষে ডেস্কের ওপর রাখা। বিক্রমের শরীর থেকে একটা কড়া ফ্রেঞ্চ কোলন আর পুরুষালি উত্তাপ বিদিশার নাকে এসে ধাক্কা মারল। তাদের দুজনের শরীরের মধ্যে দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। বিক্রমের শ্বাস-প্রশ্বাস বিদিশার ঘাড়ের খুব কাছে অনুভূত হচ্ছে।
বিদিশার নারীসত্তা এক মুহূর্তের জন্য সজাগ হয়ে উঠল। একটা অদ্ভুত অস্বস্তি তাকে গ্রাস করল। ছেলেটা বড্ড বেশি কাছে চলে আসছে না ? একটা ছাত্রের তো একজন শিক্ষিকার এতটা কাছাকাছি আসার কথা নয়!
এটা প্রফেশনাল 'পার্সোনাল স্পেস'-এর ইনভেশন। বিদিশার শরীরটা এর প্রতিক্রিয়ায় একটু শক্ত হয়ে গেল, তার ভ্রু কুঁচকে গেল। তিনি নিজের চেয়ারটা একটু পিছিয়ে নেওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। তিনি সামান্য একটু পিছিয়ে যাওয়ার বা বিক্রমকে সরে দাঁড়াতে বলার জন্য মুখ খুলতে যাবেন...
"ম্যাম, এই রো-তে দেখুন", বিক্রম অত্যন্ত সিরিয়াস এবং প্রফেশনাল একটা টোনে বলে উঠল।
"সাউন্ড সিস্টেমের ট্যাক্সটা কি জিএসটি ইনক্লুসিভ ধরব, নাকি এক্সক্লুসিভ? আমার মনে হয় এক্সক্লুসিভ ধরলে বাজেটটা পঁচিশ হাজার ওভারশুট করবে। লাস্ট ইয়ারের অডিটে এই জায়গাটাতেই প্রবলেম হয়েছিল। আপনি কী বলেন?"
বিক্রমের এই নিরস এবং নিখুঁত প্রফেশনাল প্রশ্নে বিদিশার ভেতরের অস্বস্তিটা এক লহমায় নিজের প্রতি একটা লজ্জায় পরিণত হলো।
বিদিশা মনে মনে নিজেকেই ধমক দিলেন, "হোয়াট ইজ রং উইথ মি? আমি কি প্যারানয়েড হয়ে যাচ্ছি? অয়ন সেদিন যে সব আজেবাজে কথা বলে গেল, সেইসব শুনে আমার মাথাটাও খারাপ হয়ে গেছে! ছেলেটা জাস্ট কাজের জন্য ঝুঁকে বাজেট দেখাচ্ছে আর আমি আজেবাজে চিন্তা করছি!"
নিজের ইগো আর বিক্রমের ওই নিখুঁত 'ভদ্র' ইমেজের কারণে বিদিশা নিজের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সঠিক ইঙ্গিতটাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করলেন।
তিনি চেয়ারটা না পিছিয়ে, ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে মন দিলেন।
"ওরা জিএসটি আলাদা করেই অ্যাড করেছে, বিক্রম। তুমি টোটাল অ্যামাউন্টটা এই কলামে বসিয়ে দাও", বিদিশা ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বললেন।
"রাইট, ম্যাম। আমি ঠিক করে দিচ্ছি," বিক্রম অত্যন্ত বাধ্য ছেলের মতো ল্যাপটপের কিপ্যাডে কয়েকটা ফিগার টাইপ করল।
টাইপ করার সময় তার কনুইটা 'ভুল করে' খুব সামান্য, প্রায় পালকের মতো বিদিশার বাহু ছুঁয়ে গেল। বিদিশা সেটাকে কাজের ব্যস্ততার অঙ্গ হিসেবেই মেনে নিলেন।
টাইপ করতে করতে বিক্রম তার মোলায়েম, সিরিয়াস গলায় বলে উঠল, "ম্যাম, গেস্ট ব্যান্ডের পারফরম্যান্সটা কি ছ'টার সময় রাখব, নাকি সাউথ-উইংয়ের লাইটিংয়ের কাজটা শেষ হওয়ার পর সাড়ে ছ'টায় রাখলে বেটার হয়? আপনার কী মনে হয়?"
"সাড়... সাড়ে ছ'টাই বেটার হবে। লাইটিং চেক করাটা আগে জরুরি," বিদিশা ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিলেন।
"পারফেক্ট, ম্যাম। আমি তাহলে এটাই লক করে দিচ্ছি," বিক্রম একটা অত্যন্ত নিষ্পাপ হাসি দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
বিক্রম ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই একটা অদৃশ্য হাসি হাসল। তার প্ল্যান সাকসেসফুল। সে বিদিশার পার্সোনাল স্পেসে ঢুকে পড়েছে, অথচ বিদিশা তাকে বকতে বা সরাতে পারলেন না।
ল্যাপটপটা নিয়ে ডেস্কের ওপাশে গিয়ে বসতে বসতে বিক্রমের চোখের তারায় একটা ক্রুর উল্লাস নেচে গেল।
সে খুব ভালো করেই জানে সে কী করছে। কাজের মোড়কে সে একটা অত্যন্ত অহংকারী মেয়েছেলের চারপাশের অদৃশ্য দেওয়ালটা ভাঙার কাজ শুরু করে দিয়েছে।
ব্যক্তিগত সীমানার প্রথম দেওয়ালটা এই স্পেস ইনভেশনটা বিদিশাকে অবচেতনে অস্বস্তিতে ফেলছে, অথচ তার প্রফেশনাল ইগোর জন্য তিনি সেটা মুখে বলতেও পারছেন না।
এদিকে একই সময়ে, মেইন বিল্ডিংয়ের ক্যাফেটেরিয়ার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল চন্দ্রিমা সেন।
তার চোখে আজ প্রাডার সানগ্লাস নেই বটে তবে চোখের দৃষ্টিতে একটা ধারালো জেদ আছে। গত পরশুর ম্যাচের পর অয়নের ওই চরম অবহেলা চন্দ্রিমাকে পাগল করে তুলেছে। তবে সে হাল ছাড়ার পাত্রী নয়। চন্দ্রিমা সেন কোনোদিন কোনো ছেলের কাছে রিজেক্টেড হয়নি আর এই ফার্স্ট ইয়ারের ইডিয়টটা তাকে এমনভাবে ট্রিট করেছে যেন সে আক্ষরিক অর্থেই 'অদৃশ্য' !
"নেহা, শোন," চন্দ্রিমা তার কফির গ্লাসে স্ট্র দিয়ে নাড়তে নাড়তে বলল।
"আজ বিকেলে কলেজ টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ আছে না?"
"হ্যাঁ। থার্ড ইয়ার ইকোনমিক্সের সাথে। কেন বল তো? তুই কি আবার মাঠে যাবি নাকি?" নেহা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
চন্দ্রিমার ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
"মাঠে যাব না। কিন্তু ম্যাচ শেষে ওই অয়ন চ্যাটার্জী কোথায় যায়, কী করে, তার পুরো রুটিন আমার চাই। ও আমাকে ইগনোর করে খুব সস্তায় পার পেয়ে গেছে বলে ভাবছে। বাট হি হ্যাজ নো আইডিয়া, ও কার লেজে পা দিয়েছে।"
চন্দ্রিমা নিজের পারফেক্ট ম্যানিকিওর করা নখগুলো দিয়ে কফির গ্লাসটা শক্ত করে ধরল।
আজ ফাইনাল ম্যাচের পর সে অয়নকে ধরবেই। এমন জায়গায় ধরবে, যেখান থেকে ওই অহংকারী ছেলেটা তাকে ইগনোর করে পালাতে পারবে না।
বিকেলবেলা, কলেজ গ্রাউন্ড
বিকেলের পড়ন্ত রোদ কলেজের স্পোর্টস বিল্ডিংয়ের ছাদের কার্নিশে এসে ঠেকেছে।কলেজের পেছনের ফুটবল মাঠে তখন বিকেলের আলো ম্লান হয়ে এসেছে। ইন্টার-ডিপার্টমেন্টাল টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ সদ্য শেষ হয়েছে। থার্ড ইয়ার ইকোনমিক্সকে হারিয়ে ফার্স্ট ইয়ার ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
ফেস্টের প্রস্তুতির জন্য মাঠের গ্যালারি আজ প্রায় ফাঁকাই ছিল। হাতেগোনা কয়েকজন দর্শক আর ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের ছেলেদের উল্লাসের মাঝেই রেফারি জয়ী দলের হাতে ট্রফিটা তুলে দিয়েছেন।
এবারের টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় অয়ন চ্যাটার্জী।
আজ সে একাই দুটো গোল করেছে। কিন্তু তার মুখে জয়ের কোন আনন্দ নেই। তার কপালে ঘাম, হাঁটুতে ধুলো আর কাদার দাগ আর বুকের ভেতর সেই একই জমাট বাঁধা শূন্যতা।
সতীর্থরা যখন ট্রফি নিয়ে লাফালাফি করছে, অয়ন নিঃশব্দে ভিড় থেকে বেরিয়ে নিজের কিটব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। সে এখন একটু একা থাকতে চায়।
মেইন বিল্ডিংয়ের পেছনে অবস্থিত মাঠের পাশ দিয়ে হেঁটে পুরোনো, ছায়ানট ঘেরা ড্রেসিংরুমের করিডোরটার দিকে এগিয়ে গেল সে। জায়গাটা বেশ স্যাঁতসেঁতে আর নির্জন।
স্পোর্টস বিল্ডিংয়ের ড্রেসিংরুমের দিকের এই করিডোরটা বেশ সংকীর্ণ আর অন্ধকার।টিউবলাইটের আলো এখানে টিমটিম করে জ্বলছে।
অয়ন একাই হেঁটে আসছিল ড্রেসিংরুমের দিকে। ঘামে ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে করিডোরে ঢুকে একটা বাঁক ঘুরতেই তার পা থমকে গেল।
দেওয়ালে হেলান দিয়ে, দু'হাত বুকের কাছে ক্রস করে দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রিমা সেন। আজ তার পরনে একটা ব্ল্যাক হাই-ওয়েস্ট জিন্স আর মেরুন রঙের একটা স্লিভলেস টপ। ঠোঁটে ডার্ক রেড লিপস্টিক।
তার পারফেক্ট, গ্ল্যামারাস ফিগারটা এই পুরোনো, স্যাঁতসেঁতে করিডোরে যেন একটা অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করেছে। তার পারফিউমের দামি, কড়া সুবাস ঘামের গন্ধকে ঢেকে দিচ্ছে। চন্দ্রিমা দু'হাত বুকের কাছে ক্রস করে, একটা পা সামান্য এগিয়ে, ঠিক যেন একটা শিকারির মতো দাঁড়িয়ে আছে। যেন আজ সে পালানোর কোন রাস্তা অয়নকে দিতে নারাজ।
অয়ন এক সেকেন্ডের জন্য চন্দ্রিমার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে কোনো চমক নেই, কোনো বিরক্তিও নেই। তারপর নিজের দৃষ্টি সম্পূর্ণ নামিয়ে নিয়ে, কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে চন্দ্রিমার পাশ কাটিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য একটু বাঁ-দিকে সরল।
কিন্তু চন্দ্রিমাও সমান ক্ষিপ্রতায় এক পা বাঁ-দিকে সরে অয়নের রাস্তা পুরোপুরি ব্লক করে দিল।
"কংগ্র্যাচুলেশনস, ফাইনালি চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু হিরো তো দেখছি সেলিব্রেট না করেই পালাচ্ছে।" চন্দ্রিমার গলার আওয়াজে নিস্তব্ধ করিডোরটা গমগম করে উঠল। ওর অহংকারী গলার স্বরে কোনো উষ্ণতা নেই, বরং তার জায়গায় আছে একরাশ ধারালো বিদ্রুপ আর প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জ।
"খেলাটা তুমি সত্যিই ভালো খেলো। কিন্তু তোমার ম্যানারস আর অ্যাটিটিউড নিয়ে একটু কাজ করা দরকার, অয়ন চ্যাটার্জী"।
অয়ন এবার সরাসরি চন্দ্রিমার চোখের দিকে তাকাল।
"এক্সকিউজ মি। তুমি আমার রাস্তা আটকাচ্ছ।"
"হ্যাঁ, আটকাচ্ছি, আমি তোমার সাথে কথা বলছি। কী ভাব নিজেকে ? ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো?"
চন্দ্রিমার তীক্ষ্ণ গলাটা করিডোরের নিস্তব্ধতা চিরে দিল।
বলতে বলতে চন্দ্রিমা এক পা এগিয়ে এল। তাদের দুজনের মধ্যে দূরত্ব এক হাতেরও কম। চন্দ্রিমার দামী পারফিউমের গন্ধ অয়নের নাকে এসে ধাক্কা মারল। অয়নের ঘামে ভেজা, পুরুষালি শরীরের উত্তাপটা চন্দ্রিমা এখন স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে।
তার গলায় এবার একটু অহংকারী, তীক্ষ্ণ সুর।
"তুমি কি কালা, নাকি মেয়েদের দেখলে ভয় পাও? আগের দিন জল অফার করলাম, ইগনোর করে চলে গেলে। আজ উইশ করছি, তাও সেম অ্যাটিটিউড! হোয়াট ইজ ইওর প্রবলেম ?
শোনো, তোমার এই অ্যারোগ্যান্ট, ডার্ক বয় ইমেজটা হয়তো অন্য মেয়েদের ইমপ্রেস করে, বাট আই অ্যাম চন্দ্রিমা সেন। আমি যা চাই, সেটা..."
"তুমি কে আর তুমি কী চাও, তাতে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই", নিচু গলায় অয়ন উত্তর দিল।
"পুরো ক্যাম্পাসের ছেলেরা আমার একটা অ্যাটেনশন পাওয়ার জন্য কুকুরের মতো ঘোরে।"
চন্দ্রিমা এবার সরাসরি অয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলল।
"সেদিন সাইডলাইনে আমি তোমাকে নিজে থেকে জল অফার করলাম আর তুমি এমন ভাব করে চলে গেলে যেন আমি একটা ইনভিজিবল ডাস্টবিন! তোমার এত ইগো কিসের ?"
অয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মুখটা পাথরের মতো শক্ত। সে খুব ধীরে ধীরে চোখ তুলে চন্দ্রিমার দিকে তাকাল। সে একদৃষ্টে চন্দ্রিমার এই ফুঁসতে থাকা, দাম্ভিক রূপটার দিকে তাকিয়ে রইল। চন্দ্রিমার ফর্সা, মসৃণ কাঁধ, তার রূপ, তার কমলা লেবুর কোয়ার মতো ফোলা ঠোঁট, কোনো কিছুই অয়নের মনে আঁচড় কাটতে পারল না।
অয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে চন্দ্রিমার বুকের ভেতরটা আবার ছ্যাঁত করে উঠল। ওই নিস্পৃহ চোখদুটোতে আজকেও কোনো ফিলিংস নেই। তার বদলে আছে শুধু একরাশ বিরক্তি।
"আমার ইগোর কোন সমস্যা নেই।"
অয়নের গলাটা এতটাই ঠান্ডা যে চন্দ্রিমার মনে হলো তার গায়ে কেউ এক বালতি বরফজল ঢেলে দিয়েছে।
"তোমার নামের ওই ট্যাগটা আর ওই ইগোটা তোমার ওই 'কুকুর'দের কাছে গিয়ে দেখাও। আমার কাছে তোমার কোনো অস্তিত্ব নেই। তুমি আমার কাছে জাস্ট এই করিডোরের আরেকটা ইট বা পিলারের মতো একটা অবজেক্ট। রাস্তা ছাড়ো।"
কথাটা চন্দ্রিমার কানে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল। 'অস্তিত্ব নেই'! 'পিলার বা অবজেক্ট'!
অপমানে চন্দ্রিমার ফর্সা গালদুটো লাল হয়ে গেল, সে রাগে কাঁপতে লাগল। নিজের জায়গা থেকে সে একটুও সরল না, উল্টে তার চোখদুটো আরও ধারালো হয়ে উঠল।
অয়ন তাকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু চন্দ্রিমা নিজের ডান হাতটা করিডোরের দেওয়ালে রেখে অয়নের পথ আটকে দিল।
"রাস্তা ছাড়ব না। কী করবে? গায়ে হাত দেবে?", সে একটা ব্যঙ্গাত্মক হাসি হাসল।
"জেনে রাখো, চন্দ্রিমা সেনকে ইগনোর করে কেউ চলে যেতে পারে না। তুমি হয়তো জানো না আমি কে..."
"তুমি কে, সেটা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই", অয়ন অত্যন্ত নির্মমভাবে তার কথা মাঝপথেই কেটে দিল।
"আমার প্রবলেম হলো এমন মানুষ, যারা ভাবে পুরো পৃথিবীটা শুধু তাদের চারপাশে ঘোরে। সরে দাঁড়াও"।
"আর তুমি যে গেমটা খেলছ, সেটা আমার সাথে খেলার চেষ্টা করো না। আমার প্রায়োরিটি আলাদা। সো প্লিজ, নিজের আর আমার সময় নষ্ট কোরো না।"
শান্তভাবে কথাটা বলে অয়ন আর দাঁড়াল না। নিজের কাঁধের জোরে চন্দ্রিমার হাতটা হালকাভাবে সরিয়ে দিয়ে ড্রেসিংরুমের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর নিঃশব্দে, ঘাড় না ঘুরিয়ে সোজা ড্রেসিংরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
চন্দ্রিমা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এভাবে কেউ কখনো তার সঙ্গে কথা বলেনি।
'আমার প্রায়োরিটি আলাদা' - কথাটা চন্দ্রিমার কানে বাজতে লাগল। মানে কী ?
কিসের কথা বলে গেল ? ফুটবল না এই অ্যারোগ্যান্ট, হ্যান্ডসাম ছেলেটার জীবনে অন্য কোনো মেয়ে আছে?
আস্তে আস্তে চন্দ্রিমার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এল। অয়ন তাকে 'অস্তিত্বহীন' বলেছে এই শব্দটাই ওর মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। অপমানে, রাগে তার শরীর থরথর করে কাঁপছে।
অয়ন চ্যাটার্জী কী ওকে কোন সহজলভ্য ট্রফি ভাবছে ? নিজেকে কী ভাবে সে ?
সে স্থির ভাবে অয়নের চলে যাওয়া পথের দিকে এক মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে রইল।
"প্রায়োরিটি আলাদা ? আই উইল সি টু ইট, অয়ন চ্যাটার্জী। তুমিও রক্ত-মাংসের মানুষ, পাথর নও।", চন্দ্রিমা নিজের মনে বিড়বিড় করল।
তারপর নিজের অবিন্যস্ত চুলগুলো এক ঝটকায় পেছনে ঠেলে দিয়ে করিডোর ধরে দৃপ্ত পায়ে হেঁটে গেল।
সন্ধ্যাবেলা, মেন অডিটোরিয়াম
বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধে নামছে। কলেজের বিশাল মেন অডিটোরিয়ামে ফেস্টের প্রস্তুতির জন্য অডিটোরিয়ামে তখন জোরকদমে লাইটিং চেক হচ্ছে।
বাইরে দিনের আলো প্রায় নিভে এসেছে। বিশাল, ছড়ানো অডিটোরিয়ামটার ভেতরটা অন্ধকার। শুধু স্টেজের ওপর থেকে কয়েকটা হাই-ভোল্টেজ স্পটলাইট আর রঙিন লেজার লাইট চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে। বাতাসে একটা পুরোনো কাঠের স্টেজ আর থিয়েট্রিক্যাল স্মোকের হালকা গন্ধ।
স্টুডেন্টদের খুব একটা ভিড় নেই, কয়েকজন টেকনিশিয়ান দূরে কন্ট্রোল প্যানেলে কাজ করছে।
কালচারাল ফেস্টের ফাইনাল লাইটিং চেক চলছে।
অডিটোরিয়ামের ঠিক মাঝখানের সারিতে, প্যাসেজের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন বিদিশা। আজ তার পরনে একটা অফ-হোয়াইট রঙের সফট সিল্কের শাড়ি, যার পাড়ে সরু সোনালি কাজ। তার পাশে, খুব সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আছে বিক্রম মালহোত্রা। বিক্রম তাকে ফাইনাল লাইটিং অ্যারেঞ্জমেন্টের অ্যাপ্রুভাল নেওয়ার জন্য ডেকে এনেছে।
অন্ধকার অডিটোরিয়ামের বিশালতা আর স্পটলাইটের এই মায়াবী আলো পুরো পরিবেশটাকে একটা অদ্ভুত, সিনেমাটিক রূপ দিয়েছে।
"ম্যাম, ওই ব্লু স্পটলাইটগুলো কি মেন স্টেজের ব্যাকগ্রাউন্ডের জন্য ঠিক আছে, নাকি ওখানে ওয়ার্ম হোয়াইট দেব?" বিক্রম খুব প্রফেশনাল গলায় জিজ্ঞেস করল।
বিদিশা ঘাড় উঁচু করে ওপরের ট্রাসের দিকে তাকালেন। স্পটলাইটের আলো তার ফর্সা, মসৃণ মুখে এসে পড়েছে। ওপরের দিকে তাকানোর ফলে তার গলার খাঁজটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
"ওয়ার্ম হোয়াইট-টাই বেটার হবে, বিক্রম। ব্লু-টা একটু বেশিই ড্রামাটিক লাগছে", বিদিশা ওপরের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিলেন।
"ঠিক আছে, ম্যাম। আমি চেঞ্জ করতে বলে দিচ্ছি।"
বিক্রম বিদিশার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। অডিটোরিয়ামের অন্ধকার আর তাদের দুজনের শারীরিক নৈকট্য ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না।
"ম্যাম, দেখুন... ওই সাউথ উইংয়ের স্পটলাইটটা বোধহয় একটু অফ-সেন্টার হয়ে আছে", বিক্রম স্টেজের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল। তার গলার স্বর এই বিশাল, ফাঁকা অডিটোরিয়ামে একটা অদ্ভুত ইকো তৈরি করছিল।
বিদিশা ঘাড় উঁচু করে ওপরের দিকে তাকালেন। লাইটের ফোকাসটা বুঝতে গিয়ে তিনি একটু বেশিই পেছনের দিকে হেলে গেলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তটায় একটা সূক্ষ্ম বিপত্তি ঘটল।
সারাদিনের ব্যস্ততা আর ছোটাছুটির কারণে বিদিশার বাঁ-কাঁধে আটকানো শাড়ির আঁচলের পিনটা আগে থেকেই একটু আলগা হয়ে ছিল। ঘাড় উঁচু করে পেছনের দিকে হেলতেই পিনটা হঠাৎ করে খুলে গেল। বিক্রমের চোখ কিন্তু সেইসময় ওপরের লাইটের দিকে ছিল না, তার দৃষ্টি আটকে ছিল বিদিশার ওপর। কিন্তু, বিদিশা সেটা লক্ষ্য করেননি।
শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে খসে পড়ার উপক্রম হলো। আঁচলটা সরে গেলেই তার ব্লাউজের নেকলাইন আর স্তনের খাঁজ পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে পড়বে।
বিদিশা চমকে উঠে নিজের বাঁ হাতটা কাঁধের দিকে নিয়ে যাবেন, তার আগেই বিক্রম ঝাঁপিয়ে পড়ল।
"ম্যাম, জাস্ট আ সেকেন্ড..." বিক্রমের গলাটা হঠাৎ করে একটু নিচু, একটু বেশিই মোলায়েম শোনাল।
যেন সে জাস্ট একটা দুর্ঘটনা থেকে তার শিক্ষিকাকে বাঁচাতে চাইছে।
বিদিশা চমকে মুখ নামানোর আগেই বিক্রম তার শক্ত, পুরুষালি হাতটা বিদিশার ফর্সা, মসৃণ কাঁধের একদম কাছে নিয়ে গেল।
"আপনার পিনটা খুলে যাচ্ছে..."
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই বিক্রমের আঙুলগুলো অত্যন্ত দক্ষভাবে বিদিশার শাড়ির আঁচলের পিনটা ধরে ফেলল। কিন্তু পিনটা আটকে দেওয়ার অছিলায়, একটা অত্যন্ত নিখুঁত, মেপে করা 'ভুল' করল বিক্রম।
তার আঙুলের উল্টোদিকটা, তার পুরুষালি হাতের রুক্ষ রোমগুলো বিদিশার গলার ঠিক নিচের উন্মুক্ত, স্পর্শকাতর ত্বকের ওপর দিয়ে আলতো করে, পালকের মতো ছুঁয়ে গেল।
একটা উষ্ণ, পুরুষালি হাতের ওই অপ্রত্যাশিত করা স্পর্শ বিদিশার ঘাড়ে লাগতেই যেন একটা তীব্র বিদ্যুৎতরঙ্গ খেলে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই তা ঘাড় থেকে শুরু করে মেরুদণ্ড বেয়ে একটা প্রবল শিহরণ নামিয়ে আনল। তার শ্বাস এক মুহূর্তের জন্য গলায় আটকে গেল। শরীরটা রিফ্লেক্স অ্যাকশনে পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠল।
তিনি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে।
গলার কাছে বিক্রমের আঙুলের ওই উষ্ণ, রুক্ষ স্পর্শের অনুভূতিটা তখনো জ্বালার মতো লেগে আছে।
'এটা কোনো অ্যাক্সিডেন্ট নয়' - একজন পরিণত নারী হিসেবে বিদিশার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বারবার তাকে জানান দিতে লাগল। বিদিশার চোখদুটো ততক্ষণে বিস্ময়ে আর চরম অস্বস্তিতে বড় বড় হয়ে গেছে।
তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
ছেলেটা তার গায়ে হাত দিল?
একটা ছাত্র তার শিক্ষিকার কাঁধে হাত দিয়ে পিন পরাতে পারে না! এটা প্রফেশনাল আর পার্সোনাল দুই ধরনের গন্ডিরই চরম উলঙ্ঘন।
তিনি এক পা পিছিয়ে গেলেন।
"হোয়াট আর ইউ..." বিদিশা একটা ধমক দেওয়ার জন্য মুখ খুললেন। শিক্ষিকা হিসাবে তার সম্মানবোধ তীব্রভাবে আঘাত পেয়েছে।
কিন্তু বিক্রম ততক্ষণে এক পা পিছিয়ে গেছে। তার মুখে সেই নিখুঁত, নিষ্পাপ, বাধ্য স্টুডেন্টের হাসি। তার চোখে কোনো লোলুপতা নেই, বডি ল্যাঙ্গুয়েজে কোনরকম ঔদ্ধত্য নেই।
"সরি ম্যাম। পিনটা একদম খুলে বুকের কাছে পড়ে যাচ্ছিল, তাই জাস্ট আটকে দিলাম। আই হোপ ইউ ডোন্ট মাইন্ড", বিক্রম অত্যন্ত বিনীত, ভদ্র গলায় বলল। তার গলার স্বরে এমন একটা স্বাভাবিক হেল্পফুল টোন, যে বিদিশার গলার কাছে ধমকটা দলা পাকিয়ে আটকে গেল।
বিদিশা থমকে গেলেন।
তিনি কী বলবেন? ছেলেটা তো তাকে সাহায্য করেছে। তার শাড়ির আঁচলটা সত্যিই খুলে যাচ্ছিল। সে তো কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে হাত দেয়নি, অন্তত তার আচরণে তাই মনে হচ্ছে। তাকে যদি এখন বিদিশা ধমক দেন, তবে সেটা কি ওভার রিঅ্যাক্ট করা হবে না?
বিদিশার ভেতরের নারীসুলভ ইনস্টিংক্ট কিন্তু চিৎকার করে বলছিল 'না! এই স্পর্শটার মধ্যে একটা খারাপ উদ্দেশ্য ছিল!'
অয়নের সেই সতর্কবাণীটা এক মুহূর্তের জন্য তার মাথায় বিদ্যুৎঝলকের মতো খেলে গেল।
কিন্তু বিদিশা জোর করে সেই চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললেন। নিজের ইগোকে রক্ষা করার জন্য তিনি নিজেকেই বোঝালেন, এটা জাস্ট একটা এক্সিডেন্ট। বিক্রম তাকে সাহায্য করেছে শুধুমাত্র।
"ইটস... ইটস ফাইন", বিদিশা কোনোমতে কথাটা বলে নিজের আঁচলটা ডান হাত দিয়ে একটু টেনে নিলেন। তার গলার কাছে বিক্রমের আঙুলের ওই আলতো স্পর্শের জায়গাটা তখনো অদ্ভুতভাবে শিরশির করছে। তিনি অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ করছেন।
"আর কোনো কাজ আছে এখানে?" বিদিশা নিজের গলার স্বরটাকে জোর করে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন।
"নো ম্যাম। দ্যাটস অল। আমি লাইটিংয়ের চেঞ্জটা বলে দিচ্ছি", বিক্রম অত্যন্ত ভদ্রভাবে মাথা নাড়ল।
"ঠিক আছে। আমি অফিসে যাচ্ছি", বিদিশা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। তিনি দ্রুত পায়ে অডিটোরিয়ামের মাঝের প্যাসেজ ধরে বাইরের দিকে এগোতে লাগলেন। তার হাই-হিলের খটখট শব্দটা অডিটোরিয়ামের মেঝেতে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তিনি বুঝতে পারছিলেন না কেন তার বুকের ভেতরটা এত দ্রুত লাফাচ্ছে।
তার এখন মনে হচ্ছে, এই ফেস্টটা যত তাড়াতাড়ি শেষ হয় ততই ভালো। এই ছেলেটার এত কাছাকাছি থাকাটা কেন যেন হঠাৎ করে তার কাছে খুব বিপজ্জনক বলে মনে হতে শুরু করেছে।
অডিটোরিয়ামের আলো-আঁধারিতে বিদিশা দেখতে পাননি যে মাথা নিচু করার সময় বিক্রমের ঠোঁটের কোণে একটা বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠেছিল।
বিক্রমের শিকারি মন উল্লাসে ফেটে পড়ছে। সে আজ আরেকটা গন্ডি ভেঙেছে আর বিদিশা তাকে আটকাতে বা বকতে পারেননি। বিক্রম খুব ভালো করেই জানে, একবার যদি কোনো নারীর শরীর আর মনের 'পার্সোনাল স্পেস'-এ ঢুকে পড়া যায় এবং সেই নারী যদি প্রতিবাদ করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই যুদ্ধের অর্ধেক জয় ওখানেই হয়ে যায়।
তার বিছানো জালে এই অহংকারী মেয়েছেলেটা এখন সম্পূর্ণভাবে আটকা পড়ে গেছে।
বিদিশা অডিটোরিয়াম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর, বিক্রম সেই অন্ধকার স্টেজের স্পটলাইটের নিচে একা দাঁড়িয়ে রইল।
সে তার ডান হাতটা, যে হাত দিয়ে সে একটু আগে বিদিশার মসৃণ ত্বক ছুঁয়েছিল, সেটা নিজের মুখের কাছে তুলে আনল।
"পারফিউমের গন্ধটা সত্যিই মারাত্মক, মিস গাঙ্গুলি", বিক্রম অন্ধকার অডিটোরিয়ামের শূন্যতায় ফিসফিস করে বলে উঠল।