মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৪৬

Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-72560-post-6250604.html#pid6250604

Posted on Sun Jun 28 2026 by RockyKabir (Profile)

1058 words / 5 min read

Parent
তুমি গেছিলে তোমার ইগোকে স্যাটিসফাই করতে। তোমার ভেতরের একটা সাময়িক রাগ, একটা হতাশা মেটানোর জন্য তুমি নিজেকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিলে। এটাকে সাইকোলজির ভাষায় 'ট্যানট্রাম' বলে। একটা ছোট বাচ্চা যখন তার পছন্দের খেলনা পায় না, তখন সে যেমন হাত-পা ছুঁড়ে কান্নাকাটি করে, তুমিও সেদিন ঠিক সেটাই করতে গিয়েছিলে। জাস্ট একটা স্পয়েলড বাচ্চার ট্যানট্রাম! এটা জীবনযুদ্ধ নয়।" অয়নের মনে হলো কেউ যেন তার গালে সজোরে, তার মায়ের চেয়েও জোরে একটা থাপ্পড় মারল। তবে এবার চড়টা গালে নয়, ওর ইগোতে এসে লাগল। লজ্জায়, অপমানে তার কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। সে চোখ নামিয়ে নিল। তার রাগ, ভিকটিম-কমপ্লেক্স এক লহমায় ধুলোয় মিশে গেল। ওখানে চেয়ারে বসেই হঠাৎ করে অয়নের একটা রূঢ় উপলব্ধি হলো। সে আজ অবধি জীবনে অভাব কাকে বলে সেটা টের পায়নি। ওর প্রিভিলেজ, ওর ব্যাকগ্রাউন্ড সবকিছু এক নিমেষে ওর চোখের সামনে নগ্ন হয়ে গেল। হ্যাঁ, ওর মনে কষ্ট আছে, দুঃখ আছে। কিন্তু, রৌণকের মতো পেটের দায়ে তো ওকে নিজের রক্ত ঝরাতে হচ্ছে না! খিদের জ্বালা কী জিনিস সেটা অয়ন জানে না। ছোটবেলা থেকে ও যখন যা চেয়েছে সেটাই পেয়ে এসেছে, দামী পোশাক, দামী জুতো, সেরা খাবার, সেরা ফেসিলিটিজ... অয়ন কখনো অভাবের মুখোমুখি হয়নি। খিদের কারণে কখনো তার শরীর অবশ হয়ে আসেনি, প্রিয়জনের ওষুধের প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে টাকার অভাবে কখনো  সে কাউকে গুমরে গুমরে কাঁদতে দেখেনি। ওকে কখনো জীবনের সাথে যুঝতে হয়নি। দারিদ্র কী জিনিস সেটাই ও জানে না। সত্যিই তো, সে আসলে নিজের রাগ মেটানোর একটা জায়গা খুঁজছিল! তার মায়ের অবহেলার কষ্ট, রৌণকের জীবনযুদ্ধের কষ্টের কাছে, মায়ের ওষুধের টাকা জোগাড়ের জন্য ওর প্রাণপণ লড়াইয়ের কাছে তুচ্ছ, হাস্যকর ! রৌণকের স্ট্রাগলের সাথে ওর কষ্টের কোন তুলনাই হয় না। এতদিন অয়ন নিজের কষ্টটাকে অনেক বড় করে দেখে এসেছে। সেখানে রৌণক একদম চুপচাপ ছিল। অয়ন উপলব্ধি করল পৃথিবীটা অনেক অনেক বড়। বহু মানুষ শুধু বেঁচে থাকার জন্যই প্রতিনিয়ত মুখে রক্ত তুলে লড়াই করে চলেছে। কিন্তু, সেজন্য তারা কখনো হতোদ্যম হয়ে লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে পালায় না। তারা নিঃশব্দে নিজের জীবনযুদ্ধ লড়ে যায়। সে জায়গায় গত পঁচিশদিন ধরে, ও নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভিকটিম ভেবে আসছিল। ফুটবল মাঠে নেমে সতীর্থ ফুটবলারের শিন-বোনে লাথি মারার কথা চিন্তা করতে করতে অয়নের মাথাটা পুরোপুরি বুকের কাছে ঝুঁকে গেল। সে আর মিস্টার প্রধানের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারল না। মিস্টার প্রধান একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি চায়ের কাপটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে একটা চুমুক দিলেন। "অয়ন, ভেবেচিন্তে বল, তুমি কি বক্সিংটাকে সিরিয়াসলি নেওয়ার কথা ভেবেছ? তুমি কি চাও বক্সিংকে তোমার ক্যারিয়ার বানাতে?" মিস্টার প্রধানের গলার স্বরটা একটু নরম। অয়ন মুখ তুলল, সে উত্তর দিতে অপারগ। "আমি... আমি জানি না স্যার", অয়নের গলায় স্বভাববিরুদ্ধ অসহায়তার সুর ফুটে উঠল। "আমি জাস্ট... আমার মাথাটা কাজ করছিল না। আমার মনে হচ্ছিল আমার ভেতরটা ফেটে যাবে।" মিস্টার প্রধান কাপটা নামিয়ে রেখে একটু সামনের দিকে ঝুঁকলেন। "ঠিক আছে, অয়ন। আমি তোমার পরিস্থিতিটা বুঝতে পারছি", তারপর মিস্টার প্রধান এমন একটা কথা বললেন, যাতে অয়ন চমকে উঠল। "তুমি যদি চাও, তবে তুমি সপ্তাহে একদিন... শুধুমাত্র শুক্রবার সন্ধেবেলা... আয়রন ফিস্ট ক্লাবে গিয়ে প্র্যাকটিস করতে পারো।" অয়ন সটান মুখ তুলে মিস্টার প্রধানের দিকে তাকাল। তার চোখে চরম বিস্ময়। রৌণকও চমকে মাথা তুলে তাকিয়েছে। "কী... কী বলছেন আপনি?" অয়নের গলা দিয়ে অস্ফুট স্বর বেরিয়ে এল। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। "তুমি চাইলে আয়রন ফিস্ট ক্লাবে যেতে পার।" মিস্টার প্রধান অত্যন্ত শান্তভাবে, কিন্তু কর্তৃত্বের সুরে বললেন। "তবে সপ্তাহে শুধু একদিন। তুমি ওখানে নিজের স্ট্যামিনা আর কোর স্ট্রেংথ তৈরি করতে যাবে। তোমার ক্ষিপ্রতা বাড়াবে, যাতে মাঠে তোমার ফুটওয়ার্ক আরো বেটার হয়ে ওঠে। তুমি হয়তো জানো না, বক্সিং অথবা মার্শাল আর্টের প্র্যাকটিস একজন ফুটবলারের ট্রেনিংয়ে দুর্দান্ত সাহায্য করতে পারে।" মিস্টার প্রধান এবার প্রফেশনাল ভাবে অয়নকে বোঝাতে শুরু করলেন। "ফুটবলারের জন্য বক্সিং ?", অয়ন ভুরু কুঁচকাল। "হ্যাঁ", মিস্টার প্রধান শান্তভাবে ব্যাখ্যা করা শুরু করলেন। "বক্সিং তোমার কোর স্ট্রেংথ, ক্ষিপ্রতা (agility) আর স্ট্যামিনাকে এমন একটা লেভেলে নিয়ে যেতে সক্ষম, যা কেবল ফুটবল ট্রেনিং করে মেলা সম্ভব নয়। একজন বক্সারের ফুটওয়ার্ক একজন ফুটবলারের মতোই ফাস্ট হতে হয়। অন্যদিকে, মার্শাল আর্টস তোমায় ব্যালেন্স রিকভারি, পেরিফেরাল ভিশন, ফোকাস, ক্ষিপ্রতা এগুলো বাড়াতে সাহায্য করে। তুমি হয়তো জানো না, ফুটবল সম্রাট পেলে ক্যারাটে আর জুডো প্র্যাকটিস করতেন।ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ফুটবলার ওয়েইন রুনি ফুটবলে আসার আগে ছোটবেলায় সিরিয়াস বক্সিং করতেন। জ্লাটান ইব্রাহিমোভিচের মতো গ্রেট স্ট্রাইকার তায়কোন্ডোতে ব্ল্যাক বেল্ট ছিলেন। মার্শাল আর্ট আর বক্সিংয়ের ক্রস-ট্রেনিং তোমার ফিজিক্যাল স্ট্রেংথ তো বাড়াবেই, সাথে তোমার ওই ধ্বংসাত্মক রাগটাকেও একটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসবে।" অয়ন চুপচাপ ওনার কথাগুলো শুনছিল। তার ধারণা ছিল না যে আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্সের ব্যাপারে মিস্টার প্রধানের এত জ্ঞান আছে। "এই দোজোতেও অনেক ফুটবলার আসে, যারা নিজেদের কোর স্ট্রেংথ, ফুটওয়ার্ক আর মেন্টাল টাফনেস বাড়ানোর জন্য  মার্শাল আর্টসের ট্রেনিং নেয়", মিস্টার প্রধান বললেন। "কিন্তু তারা কেউ প্রো-সার্কিটে ফাইট করে না।" কথা বলতে বলতে মিস্টার প্রধান একটু থামলেন, পরক্ষণেই ওনার চোখদুটো ধক করে জ্বলে উঠল। "কিন্তু... কোনো বক্সিং ম্যাচ নয়। নো ফাইট। তুমি শের সিংয়ের রিংয়ে কোনো অপোনেন্টের সাথে স্পারিং করবে না। তুমি শুধু প্র্যাকটিস করবে নিজের স্কিলগুলোকে বেটার করার জন্য। যদি তোমার মারার ইচ্ছে হয়, তুমি হেভি-ব্যাগে মারবে। আর যদি তোমার স্পারিং করার একান্তই দরকার হয়, সেটা তুমি রৌণকের সাথে করবে এবং সেটা আমার এই দোজোর নিয়মে, আমার সামনে।" অয়ন হতবাক হয়ে মিস্টার প্রধানের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখে কথা যোগাচ্ছে না। কী থেকে কী হয়ে গেল ! "কোচ সেনগুপ্ত... উনি জানতে পারলে..." অয়ন আমতা আমতা করে বলল। "উনি জানলে এটা মেনে নেবেন না আর যদি তুমি ওখানে আবার ফাইট করতে যাও তবে উনি সঙ্গে সঙ্গেই সে খবর পেয়ে যাবেন। আমি সে ব্যবস্থা করব। যদি তুমি আমার শর্ত মেনে চল তবে ওনার থেকে বক্সিং প্র্যাকটিসের তথ্যটা সম্পূর্ণ গোপন থাকবে। এটা তোমার, আমার আর রৌণকের মধ্যে একটা ডিল।" মিস্টার প্রধান শান্ত গলায় বললেন। অয়ন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে কয়েক সেকেন্ড মিস্টার প্রধানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনের ভেতর এখন আর কোনো দ্বন্দ্ব নেই। মাথার ভেতরটা অদ্ভুত রকম ফাঁকা লাগছে। চিন্তার কোনো কোলাহল নেই সেখানে। শেষবার কবে মনটা এমন হালকা লেগেছিল, সেটা সে কিছুতেই মনে করতে পারছে না। মায়ের বিশ্বাসঘাতকতা, অপমানের ক্ষত, বিক্রমের উপর ঘৃণা মুছে যায়নি, মুছবেও না। আজ মিস্টার প্রধান, অল্প কথায় ওর সামনে একটা আয়না দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। সেটার সামনে দাঁড়িয়ে অয়ন নিজের কাছে স্বীকার করল, হ্যাঁ এটাও ঠিক যে ও দীর্ঘদিন ধরে ও একটু একটু করে সর্বনাশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল ওর নিজের। কিন্তু... আর বেশি কিছু চিন্তা না করে অয়ন ধীরে ধীরে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওর মেরুদণ্ড একদম সোজা, চোখের দৃষ্টিতে অবাধ্যতার জায়গা নিয়েছে রেসপেক্ট। মিস্টার প্রধানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, অয়ন শান্ত, দৃঢ় গলায় বলল, "ইয়েস স্যার। ইট ইজ অ্যাবসলুটলি ক্লিয়ার। আমি আর বক্সিং রিংয়ে নামব না। আমি শুধু বক্সিং প্র্যাকটিস করব।" মিস্টার প্রধান কোন কথা না বলে একটু হাসলেন। অয়ন আর কোনো কথা না বাড়িয়ে, রৌণকের দিকে একবার আলতো করে মাথা ঝুঁকিয়ে অফিসঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
Parent