মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৬২

Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-72560-post-6283150.html#pid6283150

Posted on Sun Aug 09 2026 by RockyKabir (Profile)

680 words / 3 min read

Parent
অর্জুন ফুটপাতে দাঁড়িয়ে দু-সেকেন্ড চিন্তা করল। তারপর পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করল। ফোনটা তিনবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে হালকা শোরগোল আর হিন্দি গানের আওয়াজ ভেসে এল। "হ্যালো লাহিড়ীদা! হ্যাপি ক্রিসমাস!" উল্টোদিকের লোকটির গলায় বাংলা আর হিন্দির অদ্ভুত মিশ্রণ। “হ্যাঁ প্যারাডিক, তোমাকেও।” অর্জুন ফুটপাতের একপাশে চেপে দাঁড়িয়ে বলল। 'প্যারাডিক' পূর্ব কলকাতার একজন পুরানো ইনফর্মার। পুলিশ আর অপরাধী, দুটো জগতেরই খবর তার নখদর্পণে।  “বলো, হঠাৎ ফোন ? কোন বড় শিকার মিলল নাকি?” “প্যারাডিক, আমার হাতে একদম সময় নেই।”  অর্জুন নিচু স্বরে কিন্তু কড়া গলায় বলল।  “একুশে ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবারের কথা মনে করো। সন্ধে সাড়ে সাতটা থেকে আটটার মধ্যে বাইপাসে রুবি আর পরমার মাঝের র‍্যাম্পে যে স্কোডা এক্সিডেন্টটা হয়েছিল...... পোর্টের শিশির রায় আর তার ওয়াইফের।” ওপাশে হঠাৎ নীরবতা নেমে এল। বাজনার শব্দটা যেন এক নিমেষে দূরে চলে গেল। প্যারাডিক বোধহয় একটু আড়ালে গেল। “ওই কেসটা তো পুলিশ ক্লোজ করে দিয়েছে। ড্রাইভিং লিকেজ, মদ খেয়ে গাড়ি চালানো। প্রাইভেট কারের ওপর ট্রাকের চাপ নেই।” “আমি জানি পুলিশ কী রিপোর্ট দিয়েছে।”  অর্জুন বিরক্ত হয়ে বলল।  “তুমি আমাকে বলো, স্পটে কী ছিল? ওটা তো তোমার এরিয়ার মধ্যেই পড়ে। বাইপাসের ওই ক্রসিংটায় কলকাতা পুলিশের অনেকগুলো হাই-রেজোলিউশন ক্যামেরা আছে। ঐদিন সবকটা মেনটেন্যান্সের জন্য বন্ধ ছিল।” "লাহিড়ীদা...ফোনে এসব কথা নয়। তবে একটা কথা বলে রাখি। অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার আগে দশ মিনিট ধরে একটা সিলভার রঙের টয়োটা ফরচুনার, স্কোডাটাকে ফলো করছিল। ইস্ট ট্রাফিক গার্ডের একজন এএসআই নিজের চোখে দেখেছে, কিন্তু তার মুখ সেলোটেপ দিয়ে আঁটা। “ঐ গাড়ির নাম্বারটা জোগাড় করতে পারবে ?” “মাফ করো লাহিড়ীদা, আমি নিজের প্রাণ হাতে নিয়ে ঘুরি না।"  প্যারাডিক সোজা বলে দিল। “তবে ওই রাতে বাইপাসের ক্রসিংয়ে ডিউটিতে যে সার্জেন্ট ছিল, দেবাশীষবাবু, সে এখন ইএম বাইপাসের ওই একই বিটে ডিউটিতে আছে। ওনাকে গিয়ে ধরো। তবে আমার নাম নিও না। আর হ্যাঁ, আমার ক্রিসমাসের বকশিস কিন্তু পাওনা রইল।” “পেয়ে যাবে। রাখছি।”  অর্জুন ফোন কেটে দিল। সে রাস্তার ধারে একটা চায়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। হাতটা একটু কাঁপছে। না, ভয়ে নয়, রক্ত গরম করা উত্তেজনায়।  সুব্রত চক্রবর্তী যা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তার চেয়ে ঘটনা অনেক বেশি গভীর।  অর্জুন দ্বিতীয় ডায়ালটা করল স্টেটসম্যানের পলিটিক্যাল বিটের জুনিয়র রিপোর্টার, দেবোত্তমকে।  ছেলেটা নতুন এসেছে, কিন্তু পলিটিক্যাল লিডার আর আমলাদের হাঁড়ির খবর জোগাড় করায় তার জুড়ি মেলা ভার। দেব ফোন তুলল দ্বিতীয় রিংয়েই।  “হ্যাঁ অর্জুনদা! প্রেস কনফারেন্স শেষ? সামন্ত কেসে তো কিছু মিলল না শুনলাম, পোস্টমর্টেম তো হার্ট অ্যাটাক বলে দিয়েছে!” “সামন্ত কেস ছাড় দেব।" অর্জুন সোজা কাজের কথায় এল।  “তোকে আমি একটা ডেডলাইন দিচ্ছি। কাল সকাল আটটার মধ্যে আমাকে দুটো ভাইটাল ইনফরমেশন এনে দিতে হবে। পারবি?” দেবোত্তম একটু থমকাল।  “কাল সকাল আটটা? অর্জুনদা, আজ পঁচিশে ডিসেম্বর! কাল হাফ স্টাফ লিভে থাকবে সবাই। আচ্ছা। কী লাগবে বলো তো?” “প্রথমত, পোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান শিশির রায়ের পার্সোনাল অ্যান্ড অফিশিয়াল ফোন নম্বরের গত এক সপ্তাহের সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড)। আই নো এটা ইল্লিগাল, কিন্তু তোর টেলিকম বিটের ইনফর্মারকে ব্যবহার কর। টাকা যা লাগবে আমি পার্সোনাল ট্রাভেল অ্যালাউয়েন্স থেকে দেব। আর দ্বিতীয়ত...”  “শিশির রায় আর ওনার স্ত্রী অমৃতা রায়ের ব্যাংকের পার্সোনাল অ্যাকাউন্ট থেকে গত ছয় মাসে কোনো প্রাইভেট শিপিং কোম্পানির অ্যাকাউন্টে টাকা লেনদেন হয়েছে কি না? অথবা কোনো শিপিং কোম্পানি ওনার অ্যাকাউন্টে কোনো মোটা অ্যামাউন্ট ট্রান্সফার করেছে কি না?” দেবোত্তম ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,  “অর্জুনদা, শিশির রায় তো ভেন্টিলেশনে। ওই কেসটা তো ট্রাফিক এক্সিডেন্ট...” “ট্রাফিক এক্সিডেন্ট কি না, সেটা কাল সকালের মধ্যে তুই আর আমি ঠিক করব।”  অর্জুন শক্ত গলায় বলল।  “আমার সিডিআর-এর টপ ফাইভ ফ্রিকোয়েন্ট নম্বর চাই। বিশেষ করে একুশে ডিসেম্বর বিকেল চারটে থেকে রাত আটটার মধ্যে কার কার সঙ্গে শিশির রায়ের কথা হয়েছিল। পারবি?” “চেষ্টা করছি অর্জুনদা। সিডিআরের লোকটাকে ধরতে পারলে আজ রাতের মধ্যেই পেয়ে যাব। তবে রিস্ক আছে।” “রিস্ক না নেবার মতো খবর হলে সেটা স্টেটসম্যানের প্রথম পাতায় ছাপা হয় না দেবোত্তম।” অর্জুন বলল।  “আই অ্যাম ওয়েটিং ফর ইউর কল।” অর্জুন ফোনটা পকেটে রেখে চায়ের ভাঁড়টা মাটির ভাঁড় ফেলার ঝুড়িতে ছুঁড়ে মারল। শীতের সকালের কলকাতা এখন বেশ ঝলমলে। পার্ক স্ট্রিটের মুখে ক্রিসমাসের পার্ক আলোয় সাজানো হচ্ছে, সাধারণ মানুষ পরিবার নিয়ে ভিক্টোরিয়া আর আলিপুর চিড়িয়াখানার দিকে ছুটছে। চারদিকে আনন্দের পরিবেশ। কিন্তু, ওর কাছে রক্তাভ মনে হতে লাগল।  ও ঘড়ির দিকে তাকাল, বেলা পৌনে বারোটা বাজে। সে বাইপাসের দিকে যাওয়ার জন্য একটা হলুদ ট্যাক্সিকে হাত দেখিয়ে থামাল।  তদন্ত সবে মাত্র শুরু হয়েছে আর অর্জুন লাহিড়ী ভালো করেই জানে, যে খবরের ভেতরে রক্তের গন্ধ থাকে, সে খবর বেশিদিন চাপা রাখা যায় না।
Parent