মুনমুন সেন - খোলা মনের মহিলা.. - অধ্যায় ৩৩
মিসেস সেন যখন গেস্ট হাউসের দিকে হাঁটছিলেন, আকাশ হঠাৎ করে কালো মেঘে ঢেকে গেল। গুমোট হাওয়ায় আমগাছের পাতা উড়ে আসে তাঁর পায়ের কাছে। মোল্লা ইসমাইল তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বললেন, "ম্যাডাম, আজ খুব বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে। গেস্ট হাউসের আশেপাশে তো কোনো বাড়ি-ঘর নেই। দাঁড়ান, আমি কাউকে বলছি আপনাকে পৌঁছে দিতে... অসুবিধা হলে কে সাহায্য করবে?"
মিসেস সেন জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আসলে একটু ভয়ই লাগছে। এত নির্জন জায়গায়..."
ইসমাইল সজোরে হেসে উঠলেন, "না না, ম্যাডাম, ভয় পাওয়ার কিছু নেই! আমাদের গ্রামে চোর-ডাকাত নাই। তবে... বৃষ্টিতে পথ ভিজে পিচ্ছিল হয়ে যাবে। রহিম!"
একটি বয়স্ক লোক ছুটে আসে—লুঙ্গি পরা, হাতে গামছা। "একে দিয়ে দিচ্ছি, ওর গরুর গাড়িতে আপনাকে পৌঁছে দেবে। যদি কোনো সমস্যা হয়, রহিমই সাহায্য করবে। আর... এই নিন!" বলেই ইসমাইল একটা পুরনো কেরোসিন ল্যাম্প বাড়িয়ে দিলেন। "বিদ্যুৎ চলে গেলেও কাজে লাগবে।"
মিসেস সেন ধন্যবাদ জানিয়ে ল্যাম্পটা নিলেন। ঠিক তখনই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল—টপটপ করে প্রথম ফোঁটা, তারপরই মুষলধারে। রহিম ছাতা ধরতে গেল, কিন্তু ঝড়ো হাওয়ায় ছাতা উল্টে গেল!
ইসমাইল সজোরে হেসে উঠলেন, "না না, ম্যাডাম, ভয় পাওয়ার কিছু নেই! আমাদের গ্রামে চোর-ডাকাত নাই। তবে... বৃষ্টিতে পথ ভিজে পিচ্ছিল হয়ে যাবে। রহিম!"
এক বয়স্ক লোক ছুটে এলো—লুঙ্গি পরা, কোমরে গামছা বাঁধা, মুখে পানের পিক ফেলে আসছেন যেন। "একে দিয়ে দিচ্ছি," ইসমাইল বললেন, "ওর গরুর গাড়িতে আপনাকে পৌঁছে দেবে। যদি কোনো সমস্যা হয়, রহিমই সাহায্য করবে। আর... এই নিন!" বলেই একটা পুরনো কেরোসিন ল্যাম্প বাড়িয়ে দিলেন। "বিদ্যুৎ চলে গেলেও কাজে লাগবে।"
মিসেস সেন ল্যাম্পটা নিতে গিয়ে লক্ষ করলেন, রহিমের হাত কাঁপছে। তাঁর চোখে একটা অদ্ভুত ভয় মিশ্রিত কৌতূহল।
ঠিক তখনই—প্লাট! প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়ল মিসেস সেনের নাকে। মুহূর্তেই আকাশ ফেটে জল পড়তে শুরু করল। রহিম তড়িঘড়ি গরুর গাড়িটা সামনে আনলেন—কাঠের চাকা, বাঁশের চালা, গরুটা দেখতে ভারী ক্লান্ত।
"চড়ুন ম্যাডাম!" রহিম গামছা দিয়ে সিটটা মুছতে মুছতে বললেন।
গাড়িতে উঠতেই মিসেস সেনের শাড়ির আঁচল পিছলে গেল কাদায়। রহিম তৎক্ষণাৎ গামছাটা পাতলেন পা রাখার জায়গায়। "ওই যে... সাবধানে..."
গাড়ি চলতে শুরু করতেই বিদ্যুৎ চলে গেল পুরো গ্রামে। অন্ধকারে শুধু শোনা যাচ্ছে গরুর খুরের শব্দ আর রহিমের ডাক—"হুঁশ হুঁশ!"
পথে একটা বাঁশের সাঁকো পার হতে গিয়ে গাড়িটা হেলে পড়ল বিপজ্জনকভাবে। মিসেস সেন চেপে ধরলেন পিছনের বাঁশের খুঁটিটা। "আরে বাবা!"
রহিম লাফিয়ে নেমে গরুর লাগাম টেনে ধরলেন। "ম্যাডাম, নেমে পড়ুন! গাড়ি উল্টে যাবে!"
বৃষ্টিতে ভিজে, কাদায় পিছলে, তারা শেষমেশ গেস্ট হাউসে পৌঁছালো। রহিম ল্যাম্প জ্বালিয়ে দিলেন বারান্দায়। আলোয় দেখা গেল—তাঁর লুঙ্গি একদম পানি-ভর্তি, গামছাটা এখন নিংড়ানো কাপড়।
"আপনি... ঘরে ঢুকবেন না?" মিসেস সেন জানালা থেকে ভেতরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বললেন।
রহিম পেছন পেছন ঢুকলেন। বাইরে বজ্রপাত হল। বিদ্যুতের লাইন থেকে স্পার্ক ছিটকে পড়ল গাছের ডালে। কেরোসিন ল্যাম্পের আলোয় রহিমের মুখে দেখা গেল এক অদ্ভুত শান্ত ভাব।
"আপা, এই গ্রাম গরিব হলে কি হবে, এখানে ভয়ের কিছু নেই।" রহিম বললেন, গলায় এক ধরনের নিশ্চিন্ততার সুর। "যদিও এই অঞ্চল একদম নির্জন। তবে আল্লার দোয়ায় খুব ভালো গ্রাম।"
কেরোসিন ল্যাম্পের আলোয় ঘরটায় আধো অন্ধকার। বাইরে ঝুম বৃষ্টি পড়ছে, ভেতরে দুজনের দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস। মিসেস সেনের শরীর থেকে ঘামের গন্ধ মিশছে রহিম চাচার গামছার নোংরা গন্ধের সাথে।
- চলবে।....