সিনথিয়ার গোপন ডায়েরি - অধ্যায় ৪৮

Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-75417-post-6327447.html#pid6327447

Posted on Tue Sep 29 2026 by midnightkalamkar (Profile)

2905 words / 13 min read

Parent
: «অর্ণব» ভোরে ঘুম ভাঙল সিনথিয়ার — চোখ খুলেই মনে পড়ল, আজকের পর আর একটা দিন। কিছুক্ষণ শুয়ে রইল সে। সিলিং ফ্যানটা ঘুরছে — এই ফ্যানের নিচে কত রাত কেটেছে। পড়ার টেবিলে এখনো গোছানো বই — ফিজিক্সের গাইডটা, যার ভেতর একসময় লুকিয়ে ছিল একটা ছোট্ট বাটন ফোন। সে হাসল মনে মনে — সেই ফোনটা এখন ভাঙা, টুকরোগুলো কোথায় ফেলেছিল মনে নেই। একটা যুগ মনে হয়। ঘরের কোণে রাখা ব্যাগটা আধা গোছানো। জামাকাপড়, বই, মায়ের জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া আচারের বয়াম, শীতের একটা চাদর — রংপুরে শীত বেশি, মা বারবার বলেছেন। বাবা কাল রাতে ব্যাগের চেনটা তিনবার টেনে দেখেছেন — ঠিকমতো বন্ধ হয় কিনা। যেন চেন ঠিক থাকলেই মেয়ে ঠিক থাকবে। সিনথিয়া বিছানায় বসে ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে রইল। রংপুর মেডিকেল কলেজ। নামটা এখনো অচেনা লাগে — কাগজে সুন্দর, বুকে ভারী। ঢাকা ছেড়ে যাওয়া। এই গলি, এই ছাদ, এই শহর — যেখানে তার আঠারো বছরের সব গোপন লুকিয়ে আছে। ভালো-মন্দ, আলো-অন্ধকার — সব। মা: "উঠেছিস? আয়, নাস্তা কর।" সিনথিয়া: "আসছি মা।" রান্নাঘর থেকে ভাজা পরোটার গন্ধ আসছে। মা আজ স্পেশাল নাস্তা বানাচ্ছেন — যেন মেয়ে যুদ্ধে যাচ্ছে, পেট ভরে না খাইয়ে ছাড়বেন না। সিনথিয়া হাত-মুখ ধুয়ে টেবিলে বসল। বাবা খবরের কাগজের আড়াল থেকে তাকালেন। বাবা: "আজ কোথায় যাবি?" সিনথিয়া: "নাবিলার বাসায়। ওর মা আজ বাইরে — সারাদিন ওর সাথেই থাকব।" বাবা: "হুম।" — কাগজটা নামিয়ে রাখলেন — "বাসের টিকিটটা ব্যাগের ভেতরের পকেটে রেখেছি। হারাস না।" সিনথিয়া: "হারাব না বাবা।" বাবা: "আর শোন — ওখানে গিয়ে... মন দিয়ে পড়বি। ডাক্তার হওয়া সহজ না।" সিনথিয়া: "জানি বাবা।" বাবা: "তোর মা কাল রাতে কেঁদেছে। আমাকে বলিস না যে বলেছি।" সিনথিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। সিনথিয়া: "বাবা..." বাবা: "যা। দেরি হয়ে যাবে।" — তিনি আবার কাগজ তুলে নিলেন, কিন্তু চোখ কাগজে নেই — জানালার বাইরে, দূরে কোথাও। বাবা আর কিছু বললেন না। কিন্তু উঠে যাওয়ার সময় তার মাথায় হাত রাখলেন — এক মুহূর্ত। এই মানুষটা কম কথা বলে, কিন্তু এই একটা ছোঁয়ায় সব বলা হয়ে গেল। সিনথিয়ার গলা ধরে এল। নিজের ঘরে ফিরে সিনথিয়া দেয়ালগুলোর দিকে তাকাল। পড়ার টেবিলের কোণায় এখনো একটা দাগ — কলমের। ক্লাস নাইনে রাগ করে খোঁচা দিয়েছিল। জানালার পর্দাটা মা নতুন লাগিয়েছিলেন গত বছর — এই পর্দার আড়ালে কত রাত ফোনে ফিসফিস করে কথা বলেছে। দেয়ালে টাঙানো ছোট্ট আয়নাটা — যার সামনে দাঁড়িয়ে কতবার নিজেকে দেখেছে, সাজিয়েছে, কেঁদেছে। সব রেখে যেতে হবে। এই ঘরটা কাল থেকে খালি পড়ে থাকবে — মা হয়তো রোজ ঝাড়ু দেবেন, বাবা হয়তো দরজাটা বন্ধ করে রাখবেন। সিনথিয়া টেবিলে হাত বুলাল — ধুলো নেই, মা মুছে রেখেছেন। সিনথিয়া: "মা, আমি বেরোচ্ছি!" মা: "সাবধানে যাস। আর শোন — দুপুরে খেয়ে আসিস। না খেয়ে ফিরলে খবর আছে।" মা প্লেটে আরেকটা পরোটা তুলে দিলেন। মা: "অর্ণব আসবে?" সিনথিয়া এক মুহূর্ত থামল। সিনথিয়া: "হুম। নাবিলার বাসায়। ওর মেসে ওর ভাই এসেছে তো — তাই।" মা: "ভালো ছেলে।" — মা চা ঢালতে ঢালতে বললেন — "তোর বাবার মতো — কম কথা, বেশি মন।" সিনথিয়া: "মা!" মা হাসলেন। কিন্তু হাসির নিচে ভেজা চোখ। মা: "তাড়াতাড়ি ফিরিস। কাল ভোরের বাস।" সিনথিয়া: "ফিরব মা।" বেরোনোর সময় মা দরজায় দাঁড়িয়ে রইলেন — হাতে একটা প্যাকেট গুঁজে দিলেন। মা: "এটা নাবিলার জন্য। পিঠা বানিয়েছি। আর শোন —" — মা তার গাল ছুঁলেন — "ওখানে গিয়ে... নিজের যত্ন নিস। ঠিকমতো খাবি।" সিনথিয়া: "নেব মা।" মা: "আর অর্ণবকে বলিস — মাঝে মাঝে বাসায় আসতে। ওকে দেখলে ভালো লাগে।" সিনথিয়ার বুকটা মোচড় দিল। মা কিছুই জানেন না — আবার সব জানেন। সিনথিয়া: "বলব মা।" বেরোনোর সময় মা দরজায় দাঁড়িয়ে রইলেন — যতক্ষণ দেখা গেল। সিনথিয়া গলির মোড় ঘুরে একবার ফিরে তাকাল — মা তখনো দাঁড়িয়ে। হাত নাড়ল। মা হাত নাড়লেন। রিকশায় বসে সিনথিয়া ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ছোট্ট বাক্সটা ছুঁয়ে দেখল — মায়ের দেওয়া কানের দুল, রংপুরে পরার জন্য। আর তার গলায় — কিছু নেই এখনো। সেটা আজ পাবে। অর্ণব বলেছিল, তার জন্য একটা জিনিস আছে। রিকশা চলছে। ঢাকা পাশ দিয়ে যাচ্ছে — চেনা দোকান, চেনা গলি। কলেজের গেটটা পেরিয়ে গেল — এক মুহূর্তের জন্য বুকটা কেঁপে উঠল। এই গেট দিয়ে কতবার ঢুকেছে — ভয়ে, আশায়, অপরাধবোধে। প্রিন্সিপালের ঘরের জানালাটা দূর থেকে দেখা গেল। সিনথিয়া চোখ সরিয়ে নিল। ওই অধ্যায়টা খোলা রইল — কিন্তু আজ না। আজ শুধু ভালোবাসার দিন। পার্কের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে পড়ল — অর্ণবের সাথে প্রথম ডেটের পরের সেই বিকেলগুলো। ফুচকাওয়ালার দোকানটা এখনো আছে। সিনথিয়া হাসল। এই শহরের প্রতিটা ইটে তার পায়ের ছাপ — আর কাল থেকে এই শহর তাকে ছাড়াই চলবে। হঠাৎ মনে হলো ডায়েরির কথা। সেই গোপন ডায়েরি — যেখানে এই শহরের সব গল্প লেখা। রংপুরে গিয়ে কি নতুন ডায়েরি শুরু করবে? নাকি এটাই চলবে? সে ঠিক করল — নতুন খাতা, নতুন শহর। কিন্তু পুরোনো খাতাটা সাথে নেবে। ওটা তার আঠারো বছরের সাক্ষী — ভালো-মন্দ সব। কেউ কোনোদিন পড়বে না, কিন্তু সে জানবে — ওই পাতাগুলোয় সে বেঁচে ছিল, পুরোটা। নাবিলার বাসার গলিতে ঢুকতেই বুকটা মোচড় দিল। কত স্মৃতি এই গলিতে — কতবার এই দরজায় টোকা দিয়েছে, কত রাত এই বাড়িতে কাটিয়েছে। কালকের পর — কে জানে কবে আবার। দরজা খুলল নাবিলা নিজে। চোখ লাল — কাঁদছিল, স্পষ্ট। কিন্তু মুখে হাসি টেনে রেখেছে। নাবিলা: "এলি! আয় আয়।" সিনথিয়া ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই নাবিলা জড়িয়ে ধরল। শক্ত করে। দুজনের কেউ কথা বলল না কিছুক্ষণ। শুধু নাবিলার কাঁধ কাঁপছে — চাপা কান্না। সিনথিয়া: "এই... কাঁদছিস কেন?" নাবিলা: "কাঁদছি না। চোখে কিছু পড়েছে।" সিনথিয়া: "আমার কাঁধে মাথা রেখে চোখে কিছু পড়ে?" নাবিলা হেসে ফেলল — কান্না আর হাসি একসাথে। নাবিলা: "তুই না গেলে হয় না?" সিনথিয়া: "ডাক্তার হতে হবে তো।" নাবিলা: "এখানে থেকে ডাক্তার হ। ঢাকায় মেডিকেল নেই?" সিনথিয়া: "তুই জানিস — মেরিটে এটাই পেয়েছি।" নাবিলা: "জানি।" — সে চোখ মুছল — "তবু বলতে ইচ্ছে করে।" সিনথিয়া: "মা কোথায়?" নাবিলা: "খালার বাসায় গেছে। সন্ধ্যের আগে ফিরবে না। আজ বাড়ি শুধু আমাদের।" ড্রয়িংরুমে চা বানাতে বানাতে নাবিলা বকবক করছিল — জোর করে হালকা থাকার চেষ্টা। পুরোনো অ্যালবামটা বের করে আনল — দুজনের ছোটবেলার ছবি। নাবিলা: "দেখ, এই ছবিটা মনে আছে? ক্লাস ফাইভে পিকনিক। তুই কাঁদছিলি কারণ তোর জুতো কাদায় ডুবে গেছিল।" সিনথিয়া: "আর তুই হাসছিলি। বান্ধবী না শত্রু!" নাবিলা: "আমি তোর জুতো ধুয়ে দিয়েছিলাম পরে। ভুলে গেছিস?" সিনথিয়া: "ভুলিনি।" একটা ছবিতে দুজনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে — দাঁত পড়া হাসি। সিনথিয়া ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। কত সহজ ছিল সব। নাবিলা: "শোন, রংপুরে গিয়ে ভুলে যাস না আমাকে। ডাক্তার হয়ে গেলে তো আর চিনবিই না।" সিনথিয়া: "চুপ কর।" নাবিলা: "সত্যি বলছি! ওখানে গিয়ে নতুন বন্ধু হবে, নতুন জীবন — আমি তো পুরোনো খবরের কাগজ হয়ে যাব।" সিনথিয়া তার হাতটা ধরল। সিনথিয়া: "তুই আমার রাত, মনে আছে? রাত কখনো পুরোনো হয় না।" নাবিলার হাত থামল। চোখে পানি চিকচিক করছে — এবার আর লুকোল না। নাবিলা: "মনে আছে। সব মনে আছে।" নাবিলা হঠাৎ উঠে ভেতরের ঘরে গেল। ফিরে এল একটা সুন্দর মোড়কে ঢাকা প্যাকেট নিয়ে। নাবিলা: "এটা তোর জন্য।" সিনথিয়া: "এখন আবার কী?" নাবিলা: "খুলে দেখ।" মোড়ক খুলতেই — একটা নতুন ডায়েরি। গাঢ় নীল মলাট, পাতাগুলো খালি। প্রথম পাতায় নাবিলার হাতে লেখা — "রংপুরের গল্প। শুধু সত্যিটা লিখবি।" সিনথিয়ার চোখ ভিজে উঠল। সিনথিয়া: "তুই..." নাবিলা: "তোর পুরোনো ডায়েরিটা তো শেষ। নতুন শহর, নতুন ডায়েরি। আর শোন —" — সে তার হাত চেপে ধরল — "ওখানে যা-ই হোক, এই ডায়েরিতে লিখবি। আর আমাকে পড়তে দিবি — যখন দেখা হবে।" সিনথিয়া: "প্রমিজ।" দুজনে আবার জড়িয়ে ধরল। এই মেয়েটা — তার রাত, তার সবচেয়ে পুরোনো গোপন। কাল থেকে ফোনে কথা হবে, কিন্তু এই ছোঁয়া — কবে আবার? ঠিক তখনই দরজায় টোকা। দুজনে একসাথে তাকাল। নাবিলা দ্রুত চোখ মুছে উঠল। নাবিলা: "এসেছে।" দরজা খুলতেই অর্ণব। হাতে একটা ছোট প্যাকেট। মুখে হাসি — কিন্তু চোখে সেই ভার, যেটা গত কদিন ধরে দুজনের মধ্যেই জমে আছে। অর্ণব: "ভেতরে আসতে পারি?" নাবিলা: "ঢং করিস না, আয়।" তিনজনে ড্রয়িংরুমে বসল। নাবিলা চা এগিয়ে দিল — সাথে বিস্কুট। কিছুক্ষণ স্বাভাবিক কথা — রংপুরের হোস্টেল, ক্লাস কবে শুরু, বাস না ট্রেন। অর্ণব বলল, সে খোঁজ নিয়েছে — রংপুরে শীত বেশি, ভালো শাল কিনে দেবে। নাবিলা বলল, সে প্রতি সপ্তাহে চিঠি লিখবে — কাগজের চিঠি, খামে ভরে। নাবিলা: "ফোন তো আছেই। কিন্তু চিঠির মজা আলাদা। তুই হোস্টেলে বসে পড়বি — আমার হাতের লেখা।" সিনথিয়া: "তোর হাতের লেখা তো ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের মতো। পড়তে পারব তো?" নাবিলা: "এই!" অর্ণব হাসল। এই দুজনকে একসাথে দেখে তার ভালো লাগে — সিনথিয়ার জীবনের এই অংশটা সে চেনে, বোঝে। অর্ণব: "তোরা দুজন... একসাথে থাকলে আমি তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে যাই।" নাবিলা: "তুই তো তৃতীয় ব্যক্তিই। আমরা ফার্স্ট আর সেকেন্ড।" সিনথিয়া: "নাবিলা!" তিনজনে হেসে উঠল। কিন্তু হাসির নিচে — প্রতিটা কথার নিচে চাপা কান্না। অর্ণব বারবার সিনথিয়ার দিকে তাকাচ্ছে — যেন মুখস্থ করে নিচ্ছে। নাবিলা: "আচ্ছা তোরা বস। আমি ছাদে যাই — কাপড় তোলা হয়নি।" সিনথিয়া: "আমি আসি তোর সাথে?" নাবিলা: "না না, তুই বস। আমি একাই পারব।" — দরজার কাছে গিয়ে ফিরে তাকাল, চোখে দুষ্টুমি আর পানি একসাথে — "আর হ্যাঁ, আমার ঘরটা খালি আছে। জানালা বন্ধ করে দিস।" অর্ণব: "নাবিলা!" নাবিলা: "কী? আমি তো ছাদে যাচ্ছি!" — হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল। ঘরে নীরবতা নামল। শুধু ফ্যানের শব্দ। অর্ণব চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল। সিনথিয়া তার দিকে তাকাল — এই ছেলেটা, যে কিছু জানে না, যে শুধু ভালোবাসে। বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। অর্ণব: "ঘরে যাবি?" সিনথিয়া মাথা নাড়ল। বুকের ভেতর ধুকধুক — অদ্ভুত এক উত্তেজনা আর বিষাদ একসাথে। উঠে নাবিলার ঘরের দিকে হাঁটল দুজনে। করিডোরটা ছোট, কিন্তু আজ লম্বা লাগছে। নাবিলার ঘরের দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল — বিছানা গোছানো, জানালায় পর্দা। দরজা বন্ধ করে জানালার পর্দা টেনে দিল সিনথিয়া। ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেল — শুধু পর্দার ফাঁক দিয়ে এক চিলতে রোদ এসে পড়েছে মেঝেতে। দরজায় ছিটকিনি দিল — শব্দটা ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো। নাবিলার বিছানায় পাশাপাশি বসল। কেউ কিছু বলল না। অর্ণব তার হাতটা তুলে নিল নিজের হাতে — আঙুলে আঙুল জড়াল। অর্ণব: "কাল চলে যাবি।" সিনথিয়া: "হুম।" অর্ণব: "রংপুর... কত দূর, জানিস?" সিনথিয়া: "জানি।" অর্ণব: "আমি গুনেছি — বাসে সাত ঘণ্টা।" সিনথিয়া হেসে ফেলল — চোখে পানি নিয়ে হাসি। সিনথিয়া: "তুই পাগল।" অর্ণব: "তোর জন্য পাগল।" — সে তার দিকে ফিরল — "শোন, একটা কথা বলি?" সিনথিয়া: "বল।" অর্ণব: "দূরত্বটা শুধু রাস্তার। বুঝলি? রাস্তা সাত ঘণ্টার, কিন্তু আমি — আমি এখানেই থাকব।" — সে তার বুকে হাত রাখল — "এখানে।" সিনথিয়ার চোখ ভিজে উঠল। সিনথিয়া: "অর্ণব..." অর্ণব: "আমি আসব, জানিস? ছুটিতে, লম্বা উইকএন্ডে — বাসে চেপে চলে যাব। তুই শুধু হোস্টেলের গেটে দাঁড়িয়ে থাকবি।" সিনথিয়া: "গেটে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের ওয়ার্ডেন বকবে।" অর্ণব: "তাহলে গেটের বাইরে। রাস্তায়। আমি তোকে দেখলেই চিনব — ভিড়ের মধ্যে।" সিনথিয়া: "কীভাবে?" অর্ণব: "তুই হাসবি। তোর হাসি আমি চোখ বন্ধ করেও চিনি।" সিনথিয়া আর পারল না — তার বুকে মুখ গুঁজে দিল। অর্ণব তাকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে — যেন ছেড়ে দিলেই উড়ে যাবে। তার চুলে নাক ডুবিয়ে গভীর নিঃশ্বাস নিল — এই গন্ধটা মনে রাখতে হবে। সিনথিয়া: "আমার ভয় করছে, অর্ণব।" অর্ণব: "কীসের ভয়?" সিনথিয়া: "নতুন শহর। নতুন মানুষ। হোস্টেলের রুমমেট কেমন হবে, কে জানে। আমি... আমি যদি বদলে যাই?" অর্ণব: "তাহলে আমি নতুন তোকেও ভালোবাসব।" — সে তার চুলে হাত বুলাল — "তুই ডাক্তার হবি, সিনথিয়া। আমার সিনথিয়া ডাক্তার হবে — ভাবতেই বুকটা ভরে যায়।" সিনথিয়া: "তোর স্বপ্ন?" অর্ণব: "আমার স্বপ্ন তুই। বাকিটা তোর স্বপ্নের সাথে হাঁটব।" — একটু থেমে — "আর শোন, আমি এবার সিরিয়াসলি পড়ব। ভালো রেজাল্ট করব। তুই ডাক্তার, আমি... আমি তোর যোগ্য হব।" সিনথিয়া: "তুই আমার যোগ্য এমনিতেই।" অর্ণব: "তবু। তোর জন্য আরো ভালো হতে চাই।" সিনথিয়া: "তুই এখন কী করবি? ভার্সিটি?" অর্ণব: "হুম। সেকেন্ড ইয়ার শেষ হলে... ভাবছি। তুই ডাক্তার হবি — আমি পাশে থাকব, যেভাবেই হোক।" — সে হাসল — "হয়তো রংপুরেই চাকরি খুঁজব একদিন।" সিনথিয়া: "পাগল! ঢাকা ছেড়ে?" অর্ণব: "তুই যেখানে, সেখানে। এটাই তো ভালোবাসা, না?" সিনথিয়া তার হাতটা আরো শক্ত করে ধরল। এই ছেলেটার ভালোবাসায় কোনো শর্ত নেই, কোনো হিসাব নেই। তার নিজের জীবনে এত হিসাব, এত গোপন — আর এই একটা মানুষ, যে শুধু দেয়। সিনথিয়া: "আমি প্রতিটা রাতে ফোন করব। হোস্টেলের ছাদে উঠে।" অর্ণব: "আমি মেসের ছাদে উঠে শুনব। দুই ছাদ, এক আকাশ।" সিনথিয়া: "কবি হয়ে গেছিস!" অর্ণব: "তোর প্রেমে পড়ে।" কিছুক্ষণ চুপচাপ — শুধু দুজনের নিঃশ্বাস। তারপর অর্ণব পকেট থেকে ছোট্ট একটা বাক্স বের করল। অর্ণব: "এটা তোর জন্য।" সিনথিয়া: "কী এটা?" অর্ণব: "খুলে দেখ।" বাক্স খুলতেই — একটা রুপোর চেইন, সাথে ছোট্ট একটা লকেট — হার্ট আকৃতির। ভেতরে খোদাই করা — দুটো অক্ষর। সিনথিয়ার নিঃশ্বাস আটকে গেল। সিনথিয়া: "অর্ণব... এটা তো..." অর্ণব: "পরিয়ে দিই?" — সে চেইনটা তুলে তার গলায় পরিয়ে দিল, পেছনে হুক আটকে — "এটা পরে থাকবি। ওখানে। যখন মন খারাপ হবে, এটা ছুঁয়ে দেখবি — মনে হবে আমি কাছে আছি।" সিনথিয়া লকেটটা মুঠোয় চেপে ধরল। ধাতুটা ঠান্ডা, কিন্তু বুকটা গরম। সিনথিয়া: "খুলব না। কখনো না।" অর্ণব: "প্রমিজ?" সিনথিয়া: "প্রমিজ।" সে লকেটটা খুলে ভেতরে দেখল — খোদাই করা দুটো অক্ষর: অ আর স। সিনথিয়া: "অর্ণব আর সিনথিয়া।" অর্ণব: "হুম। যেখানেই যাস, আমরা একসাথে।" সে তার দিকে তাকাল — এই মুখ, এই চোখ। কালকের পর কতদিন দেখবে না। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। সে নিজেই এগিয়ে গিয়ে তার ঠোঁটে ঠোঁট রাখল। প্রথম চুমুটা নরম — বিদায়ের স্বাদ। তারপর গভীর — যেন সময়কে আটকে রাখতে চায়। অর্ণবের হাত তার পিঠে, তার কোমরে — সাবধানে, যেন ভেঙে যাবে। সিনথিয়া তার শার্টের বোতামে হাত দিল। অর্ণব: "সিনথিয়া... নাবিলা..." সিনথিয়া: "ছাদে। আসবে না।" — সে ফিসফিস করল — "আজ... শেষবার না। কিন্তু... অনেকদিনের জন্য শেষ। আমাকে... ভালোবেসে যা।" অর্ণব আর বাধা দিল না। শার্টটা খুলে ফেলল। সিনথিয়া তার বুকে হাত রাখল — ধুকধুক শব্দ, দ্রুত। তার নিজের কামিজের বোতাম খুলতে খুলতে সে কাঁপছিল — ভয়ে না, আবেগে। বিছানায় শুয়ে দুজনে — ধীরে, খুব ধীরে। কোনো তাড়া নেই, কোনো ক্ষুধা নেই — শুধু ভালোবাসা। অর্ণব তার কপালে, চোখে, ঠোঁটে চুমু খেল — প্রতিটা চুমুতে যেন লিখে রাখছে। তার গলায়, কাঁধে — নরম। সিনথিয়া তার গলায় হাত জড়িয়ে টেনে নিল কাছে। তার বুকের লোমে আঙুল ডুবিয়ে দিল — এই স্পর্শটা, এই উষ্ণতা। সিনথিয়া: "ভালোবাসি।" অর্ণব: "আমিও। খুব।" তাদের মিলন হলো — নরম, গভীর, চোখে চোখ রেখে। অর্ণব প্রতিটা মুহূর্তে তার মুখ দেখছিল — যেন এই মুখটা হারিয়ে না যায়। মাঝে মাঝে থেমে তার চুল সরিয়ে দিচ্ছিল কপাল থেকে। সিনথিয়া তার ঠোঁট কামড়ে ধরল — শব্দ না বেরোয়, কিন্তু চোখের পানি বেরিয়ে এল। অর্ণব থামল। অর্ণব: "কাঁদছিস কেন?" সিনথিয়া: "কাঁদছি না... মানে, একটু।" — সে হাসল ভেজা চোখে — "থামিস না। প্লিজ।" অর্ণব তার চোখের পানি মুছে দিল বুড়ো আঙুলে, তারপর আবার — ধীরে, ভালোবেসে। সিনথিয়া তাকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে — এই মুহূর্তটাকে শরীরে গেঁথে নিচ্ছে। যখন শেষ হলো, দুজনে ঘামে ভেজা, নিঃশ্বাস ভারী — অর্ণব তার পাশে শুয়ে তাকে বুকে টেনে নিল। চাদরটা টেনে দিল দুজনের গায়ে। অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না। সিনথিয়া তার বুকে মাথা রেখে ধুকধুক শুনল। লকেটটা দুজনের মাঝে চাপা — ঠান্ডা ধাতু, গরম শরীর। অর্ণব তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল — ধীর, ছন্দময়। অর্ণব: "মনে আছে প্রথম দিন? লাইব্রেরিতে?" সিনথিয়া: "তুই বইটা পাড়তে গিয়ে আমার মাথায় ফেলেছিলি।" অর্ণব: "ফেলিনি! তুই নিজে টেনেছিলি।" সিনথিয়া: "মিথ্যুক।" অর্ণব: "তবু তুই আমার প্রেমে পড়লি।" সিনথিয়া: "ভুল করে।" দুজনে হাসল। পুরোনো স্মৃতি — ক্যান্টিন, ছাদ, বৃষ্টির দিন। কত কিছু পেরিয়ে এসেছে দুজনে। সিনথিয়া ভাবল — এই ছেলেটা তার জীবনের সবচেয়ে পরিষ্কার অংশ। বাকি সব অন্ধকারে, কিন্তু এটা — এটা আলো। সিনথিয়া: "এটা শেষ না, তাই না?" অর্ণব: "না। এটা শুধু... বিরতি। ইন্টারভ্যাল।" সিনথিয়া: "সিনেমার মতো?" অর্ণব: "হুম। সেকেন্ড হাফে আমরা আবার দেখা করব। প্রমিজ।" সিনথিয়া: "সেকেন্ড হাফে কী হবে?" অর্ণব: "তুই ডাক্তার হবি। আমি... আমি তোর পাশে থাকব। সাদা অ্যাপ্রন পরা তোকে দেখব — আর ভাবব, এই মেয়েটা আমার।" সিনথিয়া: "তোর?" অর্ণব: "আমার। শুধু আমার।" — সে তার হাতটা নিজের বুকে চেপে ধরল — "এই হৃৎপিণ্ডটা তোর নামে ধুকধুক করে। ডাক্তার হয়ে একদিন চেক করে দেখিস।" সিনথিয়া হেসে ফেলল — চোখে পানি, ঠোঁটে হাসি। সিনথিয়া: "চেক করব। স্টেথোস্কোপ দিয়ে।" অর্ণব: "আর আমি বলব — ডাক্তার সাহেবা, বাঁচান। প্রেমের রোগ হয়েছে।" সিনথিয়া: "প্রেসক্রিপশন দেব — রোজ একটা করে চুমু।" অর্ণব: "দিনে তিনবেলা হলে ভালো হয়।" সিনথিয়া: "তুই অপেক্ষা করবি তো?" অর্ণব: "তুই ফিরে না আসা পর্যন্ত। তারপরও।" সিনথিয়া: "আর যদি... আমি অনেকদিন না আসি?" অর্ণব: "তাহলে আমি যাব। বলেছি তো — বাসে চেপে।" সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। এই বুক, এই গন্ধ — কালকের পর সব স্মৃতি। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল — রংপুরে গিয়ে প্রতিটা রাতে এই মুহূর্তটা মনে করবে। হঠাৎ দরজায় টোকা — হালকা। দুজনে চমকে উঠল। নাবিলা: "এই... আমি নিচে নামছি। তোরা... হয়ে গেলে ডাকিস।" সিনথিয়া: "আসছি!" তাড়াহুড়ো করে জামা পরে নিল দুজনে। অর্ণব আয়নার সামনে চুল ঠিক করল। সিনথিয়া লকেটটা জামার ভেতরে লুকিয়ে নিল — বাইরে থেকে দেখা যাবে না, কিন্তু সে জানবে। ড্রয়িংরুমে নাবিলা বসে ছিল — মুখে সেই দুষ্টু হাসি। নাবিলা: "হয়ে গেল?" সিনথিয়া: "চুপ!" অর্ণব: "আমি... আমি এবার যাই।" তিনজনে দরজা পর্যন্ত এল। দরজার সামনে অর্ণব সিনথিয়ার দিকে তাকাল — যেতে ইচ্ছে করছে না, স্পষ্ট। অর্ণব: "কাল ভোরে... বাসস্ট্যান্ডে আসব?" সিনথিয়া: "ভোর পাঁচটা।" অর্ণব: "আসব।" সিনথিয়া: "ঘুম থেকে উঠতে পারবি তো?" অর্ণব: "তোর জন্য... সারারাত জেগে থাকব।" সিনথিয়া হাসল — তারপর হঠাৎ জড়িয়ে ধরল তাকে। দীর্ঘ, শক্ত আলিঙ্গন। নাবিলা পাশে দাঁড়িয়ে দেখল — চোখ সরিয়ে নিল, ওদের একান্ত মুহূর্ত। সিনথিয়া: "ফোন করবি রোজ।" অর্ণব: "রোজ। রাতে।" সিনথিয়া: "মিস করব।" অর্ণব: "আমিও। খুব।" নাবিলা এগিয়ে এসে দুজনকে একসাথে জড়িয়ে ধরল — তিনজনের আলিঙ্গন। নাবিলা: "এই, কাঁদবি না কেউ। এটা বিদায় না — ইন্টারভ্যাল। অর্ণবই তো বলল।" অর্ণব: "হুম। সেকেন্ড হাফ।" নাবিলা: "আর সেকেন্ড হাফে আমি থাকব — পপকর্ন নিয়ে।" তিনজনে হেসে উঠল — ভেজা চোখে হাসি। অর্ণব সিনথিয়ার কপালে একটা চুমু খেল, তারপর নাবিলার দিকে তাকিয়ে। অর্ণব: "ওর খেয়াল রাখিস।" নাবিলা: "ও আমার রাত। খেয়াল তো রাখতেই হবে।" অর্ণব গলি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে — সিনথিয়া দরজায় দাঁড়িয়ে দেখল। সে একবার ফিরে তাকাল, হাত নাড়ল। সিনথিয়া হাত নাড়ল। যতক্ষণ দেখা গেল, তাকিয়ে রইল। তারপর গলির মোড়ে মিলিয়ে গেল। হাতটা গলায় উঠল নিজে থেকেই — জামার ভেতরে লকেটটা ছুঁয়ে দেখল। ঠান্ডা, শক্ত, সত্যি। অর্ণবের হাতের গন্ধ এখনো তার আঙুলে। কাল ভোরে বাসস্ট্যান্ডে আবার দেখা হবে — শেষ দেখা, ঢাকার মাটিতে। পেছনে নাবিলার গলা — নরম। নাবিলা: "চলে গেল?" সিনথিয়া ফিরল। নাবিলা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে — চোখে পানি, ঠোঁটে হাসি। সিনথিয়া: "হুম।" নাবিলা এগিয়ে এসে তার হাত ধরল। নাবিলা: "আয়, ভেতরে আয়। চা বানাই। আর... আজ তুই কোথাও যাচ্ছিস না। আজকের দিনটা শুধু আমাদের।" সিনথিয়া: "মা বলেছে তাড়াতাড়ি ফিরতে।" নাবিলা: "মাকে আমি ফোন করে দিচ্ছি। আজ রাতটা আমার এখানে থাক। শেষ রাত — ঢাকায়।" সিনথিয়া তার দিকে তাকাল। সিনথিয়া: "শেষ রাত?" নাবিলা: "ঢাকায়।" — সে হাসল, চোখ ভেজা — "কাল তো চলেই যাবি। আজ... আজ শুধু আমরা। তুই আর আমি।" সিনথিয়া মাথা নাড়ল। হ্যাঁ। আজ শুধু তারা। আজকের রাতটা শুধু তাদের। (চলবে)
Parent