সুন্দর শহরের ঝাপসা আলো - অধ্যায় ১০৬
পাঁচিলের দরজাটায় তাড়াহুড়োতে খিল লাগানো হয়নি। তাই বুঝি ঝড় ঝাপটায় খুলে গিয়েছিলো। হঠাৎ এক কালো এবং রুগ্ন মানুষ সেই খোলা দরজা দিয়ে দাওয়ার সামনে এসে দাঁড়ায়। মানুষটি হাঁটুর উপর ধুতি এবং গায়ে পাঞ্জাবী পরা। এক হাতে বাঁশের লাঠি এবং অন্য হাতে বড় হাতল ওয়ালা ছাতা মাথার উপর মেলে দেওয়া।
সে দীনবন্ধুদের বড় ঘরের দিকে দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে, “ মাঠ তো জলে ভরে গেলো রে দীনু! যাবি নাকি?”
লোকটার কথা শুনে চন্দনা এবং দীনবন্ধু দুজনেই উঁকি মেরে তাকায়।বৃদ্ধ নগেন সর্দার। বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি অতিক্রম করেছে। কিন্তু চাষের নেশা এখনও আছে পুরোদমে। সারাদিন মাঠেই পার করে। ঘরে বৃদ্ধা বউ ছাড়া আর কেউ নেই। ছেলেপুলে হয়নি তার।
“ওহ নগেন কাকা”, বলে বেরিয়ে আসে দীনবন্ধু। চন্দনাও তাকে ডাক দেয়, “ভেতরে এসো নগেন খুড়ো। চা খেয়ে যাও”।
বৃদ্ধ ওখানে দাঁড়িয়েই হাতের ইশারায় না করে দেয়, “চা খেয়েই এলুম রে মা”। সে দীনবন্ধুর দিকে তাকায়, “বলি জলে মাঠ তো ভরে গেলো রে। ফসল গুলো সব পচে যাবে। তা ফাওড়া নিয়ে যাবি নাকি?”
“আমিও সেই রকম ভাবছিলাম গো কাকা। চলো তোমার সঙ্গে কাজটা বাগিয়ে নিই। নইলে আমার বিশ হাজার টাকা জলে যাবে”। দীনবন্ধু চন্দনার কাছে আসে, “কই গো আমার বর্ষাতিটা বের করে দাও তো। আমি ফাওড়া কোদাল বের করে আনি”।
সে আবার বড় ঘরে ঢোকে। চন্দনা ততক্ষণে চালের ফাঁকে থেকে বর্ষাতি পেড়ে ফেলেছে। বর্ষাতি পরে কোদাল নিয়ে দীনবন্ধু বেরিয়ে যায়। ।
সুমিত্রা ও সঞ্জয় নিচে নেমে আসে, “দাদা চলল কোথায় বৌঠান?”
“তোমার দাদা এখন মাঠে যাবে। জল ভরে গিয়েছে মাঠে। তারপর কত পাথর পড়লো বলতো!” চন্দনা বলে। তারপর সুধোয়, “তোমরা উপরে কি করছিলে?”
সুমিত্রা হাসে, “ছেলেকে আমাদের গাঁয়ের কালবৈশাখী দেখাচ্ছিলাম। কলকাতায় এই সব কোথায় দেখা যায়?”
“ছোটমামা কি আজ ফিরবে না নাকি?” সঞ্জয় জিজ্ঞেস করে।
চন্দনা বলে, “আজ মনে হয় সে ফিরবে না গো বাপধন। তোমার মামা খুব চাষ পাগল মানুষ। ওর ফসলের ক্ষতি হোক, এ কখনও সে হতে দেবে না”।
মুখ নামায় সঞ্জয়, “ওহ! আমি তো ভাবলাম আজ আমরা মজা করে খিচুড়ি খাব। বৃষ্টি মানেই খিচুড়ি!”
“তা বেশ তো! খিচুড়ি করা যাবে না হয়। আমি চাল বেছে রেখেছি। আমার মলয়টা খিচুড়ি খেতে খুব ভালবাসে।
“ছোটমামা রাতে খাবে না?” সঞ্জয় কিন্তু কিন্তু করে। সে সাধাসিধে সরল মানুষটাকে বড্ড ভালবাসে। মামার প্রতি তার কৃতজ্ঞতারও অন্ত নেই।
“না বাবা, তোমার ছোটমামা নগেন খুড়োর বাড়িতে খেয়ে নেবে রাতে। খুড়ো আর খুড়ি আমাদের নিজের পরিবারের মত ভালবাসে,” চন্দনা বলে।
“তাহলে আমি রাঁধব এখন। এই বাবু তুই যা তো! তোর মলয়দাকে ডেকে নিয়ে আয়। সবাই মিলে খাব। দারুণ হবে,” সুমিত্রা খুব উৎসাহিত হয়।
দুঃখ করে চন্দনা, “ও আসবে না গো বোন। আমাকেই যেতে হবে খাবার নিয়ে। খাইয়ে আসতে হবে”।
সুমিত্রা বলে, “তা বেশ। চলো আমরা রেঁধে নিই। তুমি যাবে বাবুকে সঙ্গে করে। মলয় ভাইপোকে খাইয়ে আসবে”।
রান্নার মধ্যে খিচুড়ি এমন এক ব্যঞ্জন যা সুমিত্রা ভালো রান্না করে। গার্লস হোস্টেলে থাকাকালীন মেয়েরা হাত চেটে খেত। মার হাতে রান্না খিচুড়ি সঞ্জয়েরও ভীষণ পছন্দের।
এখনও আলো আসেনি। সন্ধ্যার অন্ধকারে হ্যারিকেনের আলোয় সবজি কাটতে শুরু করে ননদ বৌঠান মিলে।বাগানের পুঁইশাক, কুমড়ো এবং আলু দিয়ে একখানা চচ্চড়ি বানানো হয়। খিচুড়ি বানানো হয় সুমিত্রার জানা পদ্ধতিতেই। কিন্তু এখানে গরম খিচুড়ি নামানোর আগে তাতে দেশী ঘি ঢেলে দেওয়া হয়। আর তাতেই স্বাদ গন্ধ দুটোই বেড়ে যায় কয়েক গুণ।
সন্ধ্যা সাতটা বাজবে তখন। রান্না শেষ করে তারা। চন্দনা একটা বড় মাপের পাত্রের মধ্যে খিচুড়ি এবং বাটির মধ্যে তরকারি নিয়ে তার উপর থালা ঢাকা নিয়ে বেরিয়ে আসে।
সুমিত্রা, সঞ্জয়কে নির্দেশ দেয়, “তুইও যা মামির সঙ্গে। আর খাবারটা তুই হাতে নে”।
মা’র আদেশ মতো সঞ্জয় তাই করে।
চন্দনা হাতে টর্চ নিয়ে এবং সঞ্জয় খাবার নিয়ে বেরোয়।
“মা, আমরা যাব, আর আসব। তুমি দরজার খিল দিয়ে রেখো কিন্তু!” বেরোতে বেরোতে আগে সঞ্জয় সুমিত্রাকে সতর্ক করে।
“হ্যাঁ রে বাবা! হ্যাঁ, রাখব খন, অত চিন্তা করিস নাতো! এটা আমারই গ্রাম। এখানে কোন ভয় নেই,” সুমিত্রা হেসে বলে।
সঞ্জয় চন্দনা বেরিয়ে পড়ে। এক কিলোমিটারের মত গ্রামের রাস্তা। দিনের বেলা হাঁটলে দশবারো মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়। কিন্তু বর্ষণের পর রাস্তার এখানে ওখানে জল জমে আছে। রাস্তা সামান্য পিছল। তার ওপর রাতের বেলা। ছোটমামির হাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্যে সঞ্জয় লম্বা লম্বা পায়ে না হেঁটে ধীর পায়ে হাঁটছিল। তাই মলয়ের বাড়ি পৌঁছতে প্রায় পঁচিশ মিনিটের মত লাগল। ঘরের দাওয়ার সিঁড়িতে মাদুর পেতে একলা খালি গায়ে বসে বিড়ি টানছিল মলয়। তার পিছনে ঘরের দরজা সামান্য খোলা। দক্ষিণ কোণে টিম টিম করে জ্বলছে প্রদীপ শিখা। খোলা দরজা পাল্লার ফাঁক দিয়ে প্রদীপের আলো বাইরে বেরিয়ে
সঞ্জয় ও চন্দনার পায়ের শব্দ পেয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাদের আগমন পথের দিকে তাকায় সে। মা ও তার সঙ্গে পিসতুতো ভাই সঞ্জয়কে দেখে থ’ হয়ে যায় সে। চটপট উঠে দাঁড়িয়ে বিড়ি দাঁতে চেপে ধরে লুঙ্গির কষি বাঁধে দুই হাত দিয়ে। ভাবতেও পারেনি এই রাতে তাকে দেখতে আসবে ওরা।
“ও মলুদা, দেখ, আমরা তোমার প্রিয় খাবার এনেছি!” মলয় উঠে দাঁড়াতেই সঞ্জয় বলে ওঠে।
চন্দনা কলকলিয়ে ওঠে, “হ্যাঁ রে মলু। ঘি খিচুড়ি! তুই খেতে ভালোবাসিস! ছোট পিসি তাই নিজের হাতে বানিয়ে পাঠিয়েছে”।
উত্তেজনা সামলে নিয়ে মলয় বলে, “আয় আয়, ভিতরে আয়। মা এস!” ঘরের ভিতরে ঢোকে সে।
সঞ্জয় ঘরে ঢুকে ভিতর নজর করে দেখে। দেয়ালে ইঁটের গাঁথনি। উপরে টালির ছাদ। ঘরের পশ্চিমদিকের দেয়ালে একটা লোহার শিক দেওয়া একটা খোলা জানালা। পুবদিকে দরজার পাশেও একটা লোহার শিক দেওয়া জানালা। তবে সে জানালা বন্ধ করে রাখা। উত্তরদিকের দেয়ালের গা ঘেঁষে একটা বড় শোবার চৌকি। চৌকিতে তোষক ও বিছানার চাদর পাতা। চৌকির মাথার কাছে একটা পুরোন কাঠের না রঙ করা টেবিল। টেবিলে জলের গ্লাস। টেবিলের পাশেই পশ্চিমের জনালার নিচের দেয়াল ঘেঁষে একটা মাদুর পাতা। মাদুরের পাশে বড় বড় দুটো মাটির হাঁড়ি। কাঁসার একটা বড় কলসি এবং দুটো বালতি। মেঝের প্রদীপের আলোয় কাঁসার বাসনগুলো ঝকঝক করছে। চৌকির পায়ের দিকে দুটো বড় বড় লোহার বাক্স পরপর রাখা। বাক্স দুটোর উপর তোষক ও লেপ কাঁথা ঢাই করে রাখা।
সঞ্জয় ঘরে ঢুকে সোজা টেবিলের কাছে গিয়ে ছোটমামিমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়ে বলে, “মামি, এখানে রাখি?”
চন্দনা বলে, “হ্যাঁ বাবা রাখ, ওখানেই রাখ,” তারপর ছেলের দিকে ফিরে বলে, “গরম গরম খেয়ে নে রে মলু। দ্যাখ খুব ভালো বানিয়েছে তোর ছোট পিসি”।
সঞ্জয় বলে, “হ্যাঁ দাদা। মা’র হাতের খিচুড়ি জগৎ সেরা। তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও আমরা ফিরে যাবো”।
“ঘরে দুষ্টু বুড়ো টার সঙ্গে আমার পিসিমণিকে একলা ফেলে রেখে এসেছিস। শিঘ্রি বাড়ি যা!”
চন্দনার মলয়ের খালি গায়ে জোরে এক থাপ্পড় কষায়। “অ্যাই আবার বাজে কথা! বলেছি না গুরু জন দিয়ে এমন বলতে নেই,” তার গলায় ক্রোধ।
সঞ্জয় বলে, “হ্যাঁ যাবো দাদা। তার আগে তুমি খেয়ে নাও। ছোটমামি আমার সঙ্গে যাবে তো”।
মলয় বলে, “তোর ছোটমামি আজ এখানেই থাকবে। কতদিন মা’র কোলে মাথা রেখে ঘুমাইনি বলতো!”
মলয়ের কথা শুনে সঞ্জয় খুশিতে লাফিয়ে ওঠে মনে মনে। তার পুরুষাঙ্গে সাড়া টের পায় সে। একদিকে ছোটমামা বেরিয়েছে ফসল আগলাতে আর একদিকে ছোটমামি থাকছে মলুদার ঘরে। আর ঘরে থাকবে শুধু সে আর প্রেয়সী।
সেও মলয়কে সায় দেয়, “হ্যাঁ দাদা। সে তো খুবই ভালো কথা। মামি তোমার কাছে থাকলে তোমার ভালো লাগবে। তাহলে আমি যাই?”
“যাই বলতে নেই, বলো আসি। কেমন?” চন্দনা মাথায় ঘোমটা টেনে তাকে এগিয়ে দিয়ে আসতে বেরোয়।
বেরিয়ে আসে সঞ্জয়। গেট খুলে বাইরে দাঁড়ায়। তার এখন খুব তাড়া,কোনমতে বাড়ি যেতে পারলে সে যেন শান্ত হয়। সে উড়তে পারলে বোধহয় সবচেয়ে ভাল হত। গেটের বিপরীতে দাঁড়িয়ে চন্দনা তাকে বলে, “তুমি সোজা রাস্তা ধরে বেরিয়ে পড় বাপধন। আর মা’কে বলো ছোটমামি আলো ফুটলেই চলে আসবে। সে যেন চিন্তা না করে”।
“হ্যাঁ ছোটমামি, আমি মাকে বলব’খন,” তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় সঞ্জয়। তারপর কাঁচা রাস্তা ধরে পুবমুখে সে যেন ছুটতে থাকে।
|| ১২ ||
চন্দনা ঘরে ঢুকেই বলে, “এভাবে আমাকে আঁটকে দিলি ওরা কি ভাববে বলতো?”
চালের উপরে কাঠে গোঁজা পাটের দড়ি বের করে আনে মলয়। সেটা নিয়ে বাইরে গেটে ভালো করে বেঁধে দিয়ে ফিরে আসে, “মাকে ছেলে নিজের ঘরে রেখেছে। তাতে কে কি বলবে?”
“সেই মুখ কি রেখেছিস মলু। বউ নিয়ে পালালি। বাপ মায়ের মুখ পোড়ালি। বাপকে শত্রু বানালি। আর এখন…”।
হাত তুলে চন্দনার কথা থামায় মলয়। টেবিলের পাশে পশ্চিমের দেয়াল ঘেঁষে পেতে রাখা মাদুরের উপর বসে পড়ে। কোমরে গুঁজে রাখা বিড়ি বের করে লাইটার ধরায়, “সে সব পরের কথা। আর সঞ্জয় গেলো তো। দীনু বুড়োকে বললে রাগ করবে না”।
“তোর বাপ নেই ঘরে। মাঠ গেছে ফসল আগলাতে”।
বিড়িতে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে মলয়, “ওই মাঠেই যেন মরে বুড়োটা। সব ল্যাঠা চুকে যাবে”।
ছেলের কথায় কান না দিয়ে চন্দনা খাবার গুলো থেকে ঢাকা খোলে, “তাড়াতাড়ি খেয়ে নে মলয়। নইলে ঠাণ্ডা হয়ে গেলে ভালো লাগবে না”।
মা’র আদেশ মত মলয় বিড়ি নিভিয়ে ঘরের মেঝেতে পাটের আসন পাতে। কাঁসার জগ থেকে জল নিয়ে বাইরে বেরোয়। হাত ধোয়।মুখ কুলকুচি করে ফিরে আসে।
চন্দনা এক এক করে থালার মধ্যে খাবার গুলো সাজিয়ে রেখে ছেলের মুখের সামনে বাড়িয়ে দেয়। খাওয়া শুরু করার আগে মলয় তার মা’কে বলে, “তুমিও নিয়ে নাও গো। তুমিও না খেয়ে আছো দেখছি”।
ছেলের মুখোমুখি বসে চন্দনা বলে, “নাহ থাক! তুই আগে খেয়ে নে।তোর থেকে বাঁচলে আমি খাবো”।
উষ্ণ খিচুড়ির প্রথম গ্রাস মুখে তোলে মলয়, “আহ! ছোট পিসির রূপের মতোই তার রান্নার স্বাদ।কি মিষ্টি!!”
ছেলের কথা শুনে চন্দনার মুখ হালকা হাসিতে আলোকিত হয়, “হ্যাঁ রে মলু। তুই ঠিক বলেছিস। তাইতো সে আসার পর থেকে তারই উপর রান্নার দিকটা ছেড়ে দিয়েছি”।
মলয় সশব্দে আহার গ্রহণ করে।চন্দনা ক্ষণিক চুপ থাকার পর আবার বলে, “কিন্তু ভাগ্যটা বেচারির অনেক খারাপ রে”।
মুখে খাবার রেখে মলয় বলে, “ভাগ্য তো আমারও খারাপ গো। নইলে পিসিমণি তোমার সঙ্গে আমার ঘরে এসে এক রাত থেকে যেতো”।
দুঃখ প্রকাশ করে চন্দনা, “সে’তো জানলো। সাধের ভাইপো কি করেছে! কষ্ট পেয়েছে বেচারি। যতোই হোক আগে নিজের ভাই তারপর ভাইপো”।
“চুদির ভাই। বোনের গুদের লোভী,” মলয় গর্জন করে
“আবার মুখে খাবার নিয়ে অশৈলি কথা!” চন্দনা রেগে ধমক দেয় ছেলেকে।
আহার সম্পূর্ণ করে উঠে পড়ে মলয় উঠোনের বাম দিকে কুয়ো তলায় হাত ধুয়ে আসে। ছেলের অবশিষ্ট পাতে নিজের খাবার নিয়ে খেয়ে চন্দনা বাসন গুলো মাজতে বাইরে বেরোয়। মলয় টর্চ হাতে নিয়ে মার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে।
পশ্চিম দিকে মূল গাঁ থেকে সামান্য বিচ্ছিন্নে মলয়ের নিবাস। এখন রাত খুব একটা বেশি না হলেও চারিদিক নিস্তব্ধ। তার উপর আজকের বাদলা আবহাওয়া। ঘরের পূব দিকে রাস্তার ধারে বিদ্যুৎ খুঁটির মধ্যে ঝোলানো বাল্বের ধোঁয়াশা আলো চোখে এসে লাগে। কিন্তু পশ্চিম দিক ঘোর অন্ধকার। কিছু দূরেই বন শুরু হয়ে গেছে। তারপর ভিন গাঁ। তারপর ঝাড়খণ্ড রাজ্য। কুয়ো থেকে বেড়ার ওপারে কিছুই দেখা যায় না। অদূরে সারি সারি তাল গাছের ছায়ামূর্তি।
চন্দনা বাসন ধুয়ে ঘরে ঢোকে। মলয় মাদুরের উপর বসে পশ্চিম দেওয়ালে পিঠ রাখে। আবার কোমরে গোঁজা লুঙ্গি থেকে বিড়ি বের করে ধরায়। চন্দনা মাদুরের ডান কোণে দরজার মুখোমুখি বসে আছে ছেলের দিকে পিঠ করে। রাতে খাওয়ার পর চন্দনা সঙ্গে সঙ্গে বিছানা ধরে না। সে একটু নীরব বসে থেকে মনে মনে ইষ্ট দেবের উপাসনা করে। শরীর দুলিয়ে দুলিয়ে। নিঝুম রাত। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে চলেছে একনাগাড়ে। ব্যাঙ ডাকছে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ। বাইরে হালকা বিরামহীন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানালা দিয়ে বাতাসের তীব্রতা বাড়ল মনে হয়। টালির উপরেও বৃষ্টি ফোঁটা পড়ছে টিপির টিপির শব্দ করে।ঘরের টিমটিমে আলোতে ঘুম পায় চন্দনার। চোখ নিজের থেকেই বুজে আসে।
মলয় বিড়ির টান মন্থর করে উঠে দাঁড়ায়। ঘরের দরজাটা একবার খুলে চারপাশটা দেখে আবার লাগিয়ে দিয়ে খিল দেয় সে।
চৌকিতে উঠে মলয় উত্তর দিকের দেওয়াল ঘেঁষে শুয়ে পড়ে। চিৎ হয়ে। খালি গা তার। নীচে পরনে লুঙ্গি। সেটা হাঁটুর উপর থেকে মোড়া। এক পায়ের উপর পা রেখে শুয়ে ঘরের চালের দিকে চেয়ে ছিলো সে।
চন্দনাও চৌকিতে উঠে এসে ছেলেরডান পাশে বালিশে মাথা রেখে শোয়। শুয়ে সে ছেলের দিকে পাশ ফেরে। তার ডান হাত মলয়ের বুকের উপর রাখে, “অনেক খারাপ হয়ে গেছিস রে মলু”।
মার ঊষ্ণ হাত প্রায় বছরখানেক পর পর নিজের বুকে অনুভব করে মলয়ের শরীর শিরশির করে। দুই ঊরুর মাঝখানে স্থিত কামদণ্ডটা শক্ত হয়ে লুঙ্গিতে তাঁবু করে দাঁড়ায়।
চন্দনা ছেলের নগ্ন বুকে হাত ফেরায়, “আমার ডাগর ডুগুর ছেলেটা কেমন রোগা হয়ে গেছে…। হ্যাঁ রে মলয় বৌমা দেখাশোনা করে তোর?”
মলয় হাঁফ ছেড়ে উপর দিকে তাকায়, “হ্যাঁ করে তো। সময় মতো রেঁধে বেড়ে খাওয়ায়।ঘর আঙন পরিষ্কার রাখে। রাতে শরীর সুখ দেয়। আবার কি?”
“তাহলে এমন রোগা হয়ে গেছিস কেনো?” প্রশ্ন করে চন্দনা।
“ও তোমার মনে হচ্ছে। আমি ঠিকই আছি,” মলয় উড়িয়ে দেয়।
চন্দনা ডান হাত ছেলের বুক থেকে পেটের দিকে নিয়ে যায়, “হবে হয়তো। মার চোখ আলাদা হয় রে”।
মলয় চন্দনার দিকে পাশ ফেরে, “তাহলে বিয়ের শুরুতে মেনে নিলি না কেন?”
শুনে চন্দনার কথা যোগায় না। তারপর সম্বিত ফিরে পায়, “কেনো নেবো বলতো। কি পেলুম আমরা? বিয়ে করে কি দিলি তুই? উপরি ছিনিয়ে নিলি আমাদের কাছে থেকে!”
রাগ হয় মলয়ের, “গাঁয়ে আমার বয়সি ছেলেরা বিয়ে করে দু’তিনতে ছেলের বাপ হয়ে গেছে। আমি বলা সত্ত্বেও তোরা শুনলি না। আমার বিয়ে দিতে কত বার বলে ছিলেম বলতো?”