সুন্দর শহরের ঝাপসা আলো - অধ্যায় ১৮
পরবর্তী পর্ব
মামারবাড়ি ফিরে এসে সারাদিন তন্ময় ভাবে কেটে যায় সঞ্জয়ের। শুধু মায়ের সুন্দরী মুখ আর যোনির দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে আসছিলো।
মা কে ভালোবাসতে ইচ্ছা করছে। মায়ের সমীপে থাকার ইচ্ছা জাগছে। ওর মা শুধু ওরই।
মায়ের জন্য অন্তত তাকে একজন বড়ো মানুষ হয়ে দেখাতে হবে ওকে।
সেদিনটা ওর মায়ের কথা মনে করেই পেরিয়ে গেলো..।
রাতের বেলা শোবার সময় সে মলয়ের কাছে না শুয়ে নিজের মায়ের কক্ষে চলে যায়।
সুমিত্রা নিজের বিছানা তৈরী করার সময় দেখে দরজার সামনে ওর ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
সুমিত্রা একটু আশ্চর্য হয়। সে সারাদিন সঞ্জয়কে কেমন উদাসীন খেয়ালে দেখেছে ।সে ভাবে ছেলের কি এখানে মন খারাপ হচ্ছে। সে কি বাড়ি যেতে চাইছে।
নিজের স্নেহ ভরা ভালোবাসা দিয়ে সঞ্জয় কে ডেকে উঠে“সোনা, মাকে কিছু বলবে..?”
সঞ্জয় একটু ভারী গলায় বলে “মা আমি তোমার কাছে শুতে চাই...!!”
সুমিত্রা ছেলের কথা শুনে মুচকি হাঁসে,তারপর বলে “হ্যাঁ এইতো বিছানা তৈরী করে নি তারপর আমরা মা ছেলে মিলে শুয়ে পড়ব কেমন..। মলয় দাদার কাছে ঘুমোতে ভালো লাগছে না বুঝি?”
সঞ্জয় শুধু একটু মায়ের সান্নিধ্য চায় । সে ভাবতেও পারেনি যে মা ওকে তার কাছে শোবার অনুমতি দেবে। কারণ সেই কোন ছোটবেলার পর থেকে আর মায়ের সাথে শোবার সবার সৌভাগ্য হয়ে উঠেনি..।
আজ সে মায়ের কাছে শুয়ে মায়ের আদর খেতে চায়।
সঞ্জয় কিছুক্ষন চুপ করে থাকার পর বলে “না মা তেমন নয়...। আসলে আমার জানি না কেন তোমার জন্য মন খারাপ করছে..”।
ছেলের কথা টা শোনার পর সুমিত্রা ওকে নিজের কাছে টেনে বুকে জড়িয়ে নেয়।
স্নেহের স্বরে বলে “কেন সোনা এইতো আমি আছি তোর কাছে....মায়ের জন্য কেন মনখারাপ করবে..আমি তো কোথাও যায়নি..”।
সঞ্জয় ওর মায়ের দুই বাহুতে আলিঙ্গন রত অবস্থায় অনেকটা তৃপ্তি পায়। যেন কত শতাব্দীর পর মায়ের কাছে থেকে ঐরকম বুক ভরা ভালোবাসা সে পাচ্ছে।
সে এখন বুঝতে পারছে ওর মা ওকে ঠিক কতখানি ভালোবাসে।
মা যেমন তাকে বকাঝকা করে সেইরকম আদরও তাকে করতে পারে ।
মায়ের বুক থেকে নিজেকে পৃথক করতে চায়না সঞ্জয়। সেও নিজের হাত দিয়ে মায়ের ব্লাউজ এ ঢাকা পিঠে হাত দিয়ে চেপে ধরে।
মায়ের শরীর অতীব কোমল। আর এক মিষ্টি সুবাস আছে মায়ের গায়ের মধ্যে।
যেন সে এক অমূল্য তৃপ্তি অনুভব করছে।
সে আবার মা কে প্রশ্ন করে। বলে “মা তুমি আমায় ছেড়ে কোথাও চলে যাবে না তো...”।
সুমিত্রা ছেলেকে আলিঙ্গন করে বলে “না রে সোনা মা তোকে ছেড়ে কোথায় যাবে..? মা যে তোকে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে”।
নিজের মায়ের মুখে এই ভালোবাসার কথা শুনে সঞ্জয়ের বিশ্বাস হয়না। মা কি সত্যি বলছে যে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মা ওকেই ভালোবাসে...।
সঞ্জয় আবার ওর মাকে শক্ত করে ধরে নেয়। তারপর বলে “মা আমি তোমার জন্য সবকিছু করতে রাজি আছি। তোমার হাঁসি। তোমার খুশির জন্য আমি অনেক ভালো করে পড়াশোনা করবো...তোমার স্বপ্ন পূরণ করবো মা”।
সুমিত্রা নিজের ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে “হ্যাঁ সোনা আমি জানি তো তু্ই মায়ের জন্য সবকিছু করতে রাজি আছিস..। এবার ঘুমিয়ে পড় সোনা অনেক রাত হয়েছে ..”।
মায়ের পাশে শুয়ে মাকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় আবার সঞ্জয় সে দিনের কথা টা বলে ফেলে “জানো মা আমি সেদিন মামীর কাছে শুয়ে ছিলাম তখন মামীর দুধ খেয়েছিলাম..”।
সুমিত্রা ছেলের মুখে কথাটা সোনা মাত্রই একটু অবাক হয়ে ওঠে এবং ওর পিঠে আলতো করে একটা থাপ্পড় মেরে হেঁসে বলে “ধ্যাৎ পাগল তুই তো অনেক বড়ো ছেলে হয়ে গিয়েছিস...। এখন দুধ খায় নাকি..”।
সঞ্জয় বলে “হ্যাঁ মা তবে আমি না বুঝেই খেয়ে ছিলাম..”।
সুমিত্রা বলে “আচ্ছা ঠিক আছে মামীরই তো দুধ খেয়েছিস। মামী ও তোর মায়ের মতো..”।
সঞ্জয় বলে “হ্যাঁ মা মামী খুব ভালো তাই আমাকে উনি দুধ খেতে দিয়েছেন..”।
সুমিত্রা আবার ছেলেকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে “বেশ এবার ঘুমিয়ে পড় সোনা । অনেক রাত হয়েছে..”।
সঞ্জয় ওর মাকে শক্ত করে আলিঙ্গন করে খুব তাড়াতাড়ি সুখ নিদ্রায় ঢোলে পড়লো।
সে স্বপ্ন দেখলো কলকাতার সেই উঁচু ইমারতের কোনো একটা রুমের মধ্যে ওর মা বিছানায় বসে আছে আর সঞ্জয় ওর মায়ের কোলের মধ্যে মাথা রেখে সেই মুহূর্ত টাকে অনুভব করছে। এক সুখ এবং তৃপ্তির অনুভব। মায়ের নরম হাত ওর মাথার ঘন চুলের মধ্যে বিলি কেটে যাচ্ছে। মায়ের মুখে একটা খুশি হাঁসি। যেন ওরা সবকিছু পেয়েছির রাজ্যে অবস্থিত।
পরদিন সকালবেলা ওর যখন ঘুম ভাঙে তখন দেখে মা পাশে শুয়ে নেই।
বাইরে বেরিয়ে মলয়ের সাথে দেখা করে। এবং তৈরী হয়ে নেয় গরু পালে যাবার জন্য।
এদিকে সুমিত্রা নিজের কাজ করতে করতে বৌদি চন্দনা কে জানায় যে ওরা আগামীকাল কলকাতা ফিরে যেতে চায়।
সেটা শোনার চন্দনার মন ভারী হয়ে আসে। বলে “কি বলছো বোন অনেক দিন পর এখানে এলে আর এতো তাড়াতাড়ি চলে যাবে বলছো..”।
সুমিত্রা বলে “না বৌদি এখানে থাকার তো খুব ইচ্ছা হচ্ছে কিন্তু কি করবো আমার ওখানেই তো সবকিছু ছেলের কলেজ। স্বামী...”।
চন্দনা, সুমিত্রা কে মিনতি করল আরও কিছুদিন থাকার জন্য কিন্তু সুমিত্রা তাকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করালো । বলল “বৌদি আবার আসবো আমি কিন্তু আমাকে এভাবে আর আটকে রেখো না..”।
চন্দনা শান্ত হয়। সুমিত্রার কথা মেনে নেয়।
সেদিন বিকেলবেলা সঞ্জয় আর মলয় আবার খেলাধুলা করার জন্য মাঠে চলে যায়।
তার কিছুক্ষন পরেই মলয়ের বাবা একগাদা সবজি শসা, উচ্ছে, ঝিঙে নিয়ে ঘরের সামনে এসে হাজির হয়।
চন্দনা বাইরে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করে “কি গো এতো সবজি পাতি নিয়ে তুমি কোথায় যাবে..?”
দীনবন্ধু বলে “এগুলো নিয়ে আমি আড়ৎ চললাম শহরের আড়ৎ। আজ সন্ধেয় বেরোলে কাল ভোরে বিক্রি করতে পারব... “।
চন্দনা বলে “তুমি শহর যাচ্ছ আর এদিকে তোমার বোন ও কাল কলকাতা ফিরে যাবে বলছে..”।
বউয়ের কথা শুনে দীনবন্ধু ওর বোনের কাছে চলে যায় তারপর বলে “কি রে বোনটি কাল তুই চলে যাবি বলছিস..!!”
সুমিত্রা একটু ভারী গলায় বলে “হ্যাঁ গো দাদা..”।
দীনবন্ধু বলে “আর কিছুদিন থাক না বোন..”।
সুমিত্রা বলে “না গো দাদা...তোমার ভাগ্নের কলেজ শুরু হয়ে যাচ্ছে..আর অনেক দিন থাকা হয়ে গেলো এখানে, জানিনা তোমাদের জামাই এখন কি করছে, কেমন আছে ”।
দীনবন্ধু আর বোনকে বাধা দিতে পারল না।
সে বলল “আচ্ছা ঠিক আছে আমি কাল সকালে ফিরে এসে তোকে ট্রেন ধরিয়ে আসবো কেমন..”।
সুমিত্রা বলে “হ্যাঁ গো দাদা তাই করো..”।
দীনবন্ধু ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার কিছক্ষন পরই একদল ছেলে হুড়মুড়ি করে সেখানে এসে হাজির হলো। সুমিত্রা আর চন্দনা ব্যাপার টা বোঝার আগেই গদাই চন্দনা কে বলে উঠল “ও কাকিমা এক বালতি জল আনো মলয় আম গাছ থেকে পড়ে গিয়েছে, পায়ে চোট লেগেছে...”।
কথাটা সোনা মাত্রই ওদের মাথায় হাত।
সুমিত্রার ভয়ে একবার বুকটা কেঁপে উঠল, আগামীকাল ওরা কলকাতা ফিরে যাবে। আর এই মুহূর্তে সঞ্জয়ের যেন কিছু না হয় হে ভগবান..!!!
তড়িঘড়ি বাইরে বেরিয়ে দেখে সঞ্জয় আর একটা ছেলে মলয় কে কাঁধে ভর দিয়ে ঘরের দিকে টেনে নিয়ে আসছে।
দৃশ্যটা সুমিত্রা কে ক্ষনিকের জন্য চিন্তা মুক্ত করলেও, চন্দনা ব্যাকুল হয়ে ওঠে।
সে দেখে মলয় খুঁড়িয়ে হাঁটছে।
চন্দনা একপ্রকার কেঁদে উঠল। সে দৌড়ে গিয়ে ছেলের কাছে চলে গেলো। ক্রন্দনরত গলায় বলল “এটা কি হলো রে মলয় পায়ে আঘাত লাগলো কি করে..?”
মলয় ব্যথা তে কাতরাতে কাতরাতে বলে “ইয়ে মানে মা আমি আম গাছে উঠে ছিলাম আম পাড়তে তো সেখান থেকে স্লিপ করে নিচে পড়ে যায়..”।
ছেলের কথা শুনে চন্দনা কাঁদতে আরম্ভ করে দেয়। বলে “এবার আমি কি করবো কোথায় যাবো...তোর বাবাও তো ঘরে নেই একটু আগে শহর চলে গেলো..”।
সুমিত্রা তখন সামনে এসে চন্দনা কে আস্বস্ত করে। বলে “বৌদি গ্রামে তো ডাক্তার আছে...কাউকে দিয়ে একটু ডেকে পাঠাও না..”।
চন্দনা নিজের শাড়ির আঁচল মুখে দিয়ে সমানে কেঁদে যায়। কিছু বলে উঠতে পারেনা।
মলয় ওর মাকে দেখছিলো। সে বুঝতে পারছিলো মা ওকে কতো ভালোবাসে।
সে রাতে ও মায়ের সাথে অপকর্ম করতে গিয়ে ধরা পড়ার পর থেকে মা ওর উপর বেজায় রেগে ছিলো কিন্তু আজ ওর এই দশা হবার পর, মায়ের এইভাবে ভেঙে পড়া এবং কান্নাকাটি করা। ওকে একটা স্পষ্ট নির্দেশ দেয় যে ওকেও সমহারে মা কে সম্মান করা এবং মাকে ভালোবাসা উচিৎ।
মলয় এবার নিজের একটা হাত মায়ের মাথায় ঠেকিয়ে বলে “মা তুমি চিন্তা করোনা আমার তেমন চোট লাগেনি আমি এখুনি ঠিক হয়ে যাবো...। তুমি কেঁদোনা মা..”।
সুমিত্রা তখন গদাই কে নির্দেশ দেয় গ্রামের ডাক্তার কে ডেকে আনার জন্য।
সাথে সঞ্জয় কেউ পাঠিয়ে দেয়।
কিছুক্ষনের মধ্যেই ডাক্তার এসে হাজির হয়।
চন্দনা কে জিজ্ঞাসা করে কি হয়েছে...।
চন্দনা বলে “দেখুন না ডাক্তার মশাই আমার ছেলেটা আম গাছ থেকে পড়ে গিয়ে পায়ে আঘাত লাগিয়েছে..”।
ডাক্তার তারপর মলয়ের পা টা একটু এপাশ ওপাশ ঘুরিয়ে বলে “না হাড় টার ভাঙে নি তবে...সামান্য পেশিতে চোট লেগেছে..। আমি একটা ইনজেকশন দিয়ে দিচ্ছি..আর সাথে কিছু ঔষধ..দেখবেন তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে। আর রাতের বেলা একটু গরম জলে সেঁক দেবেন তাহলেই সেরে যাবে..”।