সুন্দর শহরের ঝাপসা আলো - অধ্যায় ৯৯

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-20547-post-4823849.html#pid4823849

🕰️ Posted on Tue May 31 2022 by ✍️ Jupiter10 (Profile)

🏷️ Tags: None
📖 2139 words / 10 min read

Parent
দীনবন্ধু সঞ্জয়ের দিকে এগিয়ে যায়। সেই ছোট্ট ভাগ্নে এখন এক লম্বা চওড়া ফর্সা নবযুবক। মাথায় তার থেকেও সামান্য ঊঁচু। আজ যেন তার খুশির বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। সঞ্জয় ছোটমামার পা ছুঁয়ে প্রণাম করে। বড়মামা ও মেজোমামাকে সে কোনওদিন দেখেনি। শুনেছে তার জন্মের আগেই বড়মামা অপঘাতে গত হয়েছিলেন। মেজোমামা তার জন্মের প্রায় পরপরই। মামা বলতে এই ছোটমামাকেই সে চেনে। এই অকৃত্রিম মানুষটা তার আরেকজন শুভাকাঙ্ক্ষী।  মার পরেই। সেবারে এই ছোটমামাই তার কষ্টের উপার্জন তাকে দিয়েছিলো জয়েন্টের ফর্ম ফিলাপ এবং বই কেনার জন্য। তার জীবনে আজ পর্যন্ত যা কিছু সাফল্য এই মানুষগুলোর জন্যেই।  এই সব ঋণ কোনওদিনও শোধ করার নয়। সঞ্জয়কে নিজের বুকে আঁকড়ে ধরে দীনবন্ধু। চোখ ছলছল করে তার। “অনেক বড় হয়ে গেছে আমার ভাগ্নেটা,” খুব গর্বের সঙ্গে ঊচ্চারণ করে, সঞ্জয়ের বুদ্ধিদীপ্ত চোখ দুটির দিকে তাকায় সে। “চাকরি পেয়েছ? আর কি পড়াশোনা করবে বলে ছিলে যেন? করেছো?” “হ্যাঁ”। মামার চোখের দিকে তাকায় সঞ্জয়। হাসি মুখে বলে, “চাকরি পেয়েছি মামা। আর তোমার দেওয়া টাকা দিয়েই এঞ্জিনিয়ারিং এর বই কিনে ছিলাম…”।   “ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছো? ইঞ্জিনিয়ার হয়েছো?” ভাগ্নের কথার মাঝখানে তার দুই বাহু চেপে ধরে অবাক স্বরে প্রশ্ন করে দীনবন্ধু।   “হ্যাঁ মামা”, বিনম্রভাবে উত্তর দেয় সঞ্জয়। ভাগ্নের কথা শুনে দীনবন্ধুর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে। সে সঞ্জয়ের হাত ধরে তার স্ত্রীর কাছে নিয়ে যায়।উঁচু স্বরে বলে, “দেখেছো চন্দনা! আমাদের ভাগ্নে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে এখন বড় জায়গায় চাকরি পেয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব হয়েছে আমার ভাগ্নে!” চাপা কল থামিয়ে চন্দনা তাদের দিকে তাকায়। বালতির মধ্যে রাখা শীতল জল নিয়ে সুমিত্রা নিজের পায়ে ঢালে। সেও মুখ তুলে দাদা এবং ছেলের দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি তার। চন্দনা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলে, “হ্যাঁ…। দেখেছো! আমি আমার সেই ছোট্ট ছেলেটাকে চিনতেই পারিনি…।তাই ভাবছিলাম ছোট ঠাকুরঝির সঙ্গে এই দামাল ছেলেটা কে?” চাপা কলের পাড় থেকে চন্দনা সরে এসে সঞ্জয়ের কাছে দাঁড়ায়। হাত উঁচু করে সঞ্জয়ের মাথায় হাত বোলায়, “কত বড় হয়ে গেছো আমার সেই ছেলেটা! তা এতো বড় যখন হয়েছো,মামীকে একবারও দেখার ইচ্ছা হয়নি তোমার? এখন তো রাস্তাঘাটও চিনতে পারবে…। চলে আসতে পারতে মামীর কাছে…”। সঞ্জয় ঘাড় নিচু করে মামীর চরণ স্পর্শ করে, “হ্যাঁ মামী। খুব ইচ্ছা হতো তোমাদের সঙ্গে দেখা করার। কিন্তু মা বলেছিল মামাকে, ছেলেকে সফল করেই মা তোমাদের চোখের সামনে দাঁড়াবে”। চন্দনা সঞ্জয়কে আদর করে। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় তার, “আর কই? আমার শাড়ি কই? সেবারে আমি বলেছিলাম তুমি বড় হলে,বড় চাকরি পেলে আমার জন্য ভালো শাড়ি কিনে এনে দেবে”। মামীর কথা শুনে সঞ্জয় হাসে, “শাড়ি এনেছি মামী।তোমার জন্য। মামার জন্য। মলয় দার জন্য…”। চন্দনা খুশি হয়ে দু’হাত তুলে সঞ্জয়কে আশীর্বাদ করে। সঞ্জয় জিজ্ঞেস করে, “আর মলয়দা কোথায় মামী? তাকে তো দেখতে পাচ্ছি না”। ছেলের নাম শুনেই একদম চুপ করে যায় চন্দনা। মুখ নামিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে সে। কিন্তু চাপা আবেগ উত্তেজনা ফুটে ওঠে তার সারা শরীরে। সঞ্জয়,সুমিত্রা একে অপরের মুখ চাওয়া চায়ি করে। সুমিত্রা আবার প্রশ্ন করে, “হ্যাঁ বৌদি আমার ভাইপোটি কোথায়?” একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে চন্দনা তাদের ব্যাগপত্র নিয়ে ঘরে ঢোকে, “সে অনেক কথা গো ছোট ঠাকুরঝি। তোমরা এই এলে একটু বস। বিশ্রাম কর। তারপর বলছি”। বৌদির শুকনো গলার স্বরে সুমিত্রা তখুনি বুঝে ফেলে ব্যাপার গোলমেলে। সে তার দাদার দিকে তাকায়।  দীনবন্ধুও চোখ নামায়। গোয়াল ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। বাড়ির পরিবেশ যেন ঝট করে চুপসে যায়।  বহুদিন পর দাদা বৌঠানকে কাছে পেয়ে খুশীতে আত্মহারা হবে ভেবে ছিল। কিন্তু তাদের চোখ মুখের মধ্যে কেমন একটা চাপা বেদনা লক্ষ্য করে সে। তাদের শরীর ভেঙ্গে পড়েছে। মুখ শুকিয়ে গেছে। কথাবার্তার মধ্যে হতাশা ধরা পড়েছে। বিশেষ করে তার দাদার। দাদার তার থেকে মাত্র চোদ্দ বছরের বড়। সবে চুয়ান্ন হবে।  এই বয়েসের পুরুষের শরীরে আজকাল প্রচুর তেজ। কিন্তু দাদা কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়েছে। সেই কঠোর পরিশ্রমী মানুষটাকে কেমন দুর্বল লাগছে দেখে। ছোড়দার কাছে কোনও সদুত্তর না পেয়ে সুমিত্রা তাই বৌদির দিকে এগিয়ে যায়, “কি হয়েছে বলনা বৌঠান?” চন্দনার কাঁধ ছুঁয়ে বলে সে। চন্দনা কোনও কথা না বলে নত মুখে ভেতর ঘরে যায়।  সেখানের এক কোণে রাখা মাটির হাঁড়ি থেকে আঁখের গুড় বের করে একখানা কাঁসার পাত্রে রাখে। ওদিকে দীনবন্ধু গোয়াল থেকে বেরিয়ে এসে একখানা খেজুর পাতা দিয়ে বোনা তালাই ঘরের মেঝেতে পেতে দেয়। সঞ্জয়কে সেখানে বসতে বলে। তারপর কোথা থেকে একটা ছোট্ট টেবিল ফ্যান এনে তার সামনে চালিয়ে দেয়। ফ্যানের ঝোড়ো হাওয়া সঞ্জয়ের মুখে এসে লাগে। চন্দনা আঁখের গুড়ের সঙ্গে জল মিশিয়ে দুটো কাঁসার গ্লাসের মধ্যে ঢেলে সঞ্জয় ও সুমিত্রাকে দেয়। গ্রামে বানানো বিশুদ্ধ আঁখের গুড়ের শরবৎ খেয়ে সঞ্জয়ের বড় তৃপ্তি হয়। কিন্তু সুমিত্রা সেই জল এখনও মুখে ঠেকায় নি। তার মন হঠাৎ কেমন বিষণ্ণ।     ঘরের মেঝেতে তালাইয়ের একপাশে সঞ্জয়, অপর পাশে সুমিত্রা এবং চন্দনা বসে আছে। দীনবন্ধু ঘরের দুয়োর আগলে বসে পড়ে। সে তার হাতের হুঁকোটার কল্কেতে আবার আগুন জ্বালিয়ে নেয়। চন্দনা, সুমিত্রার দিকে তাকিয়ে বলে, “তুমি জলটা খেয়ে নাও ঠাকুরঝি তারপর বলছি”। সুমিত্রা জলের গ্লাসে চুমুক দিয়ে চন্দনার দিকে চিন্তিত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। চন্দনা ফোঁস করে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলে, “তোমার ভাইপো বিয়ে করেছে গো!!”। বৌদির কথা শুনে সুমিত্রার চোখে হাসির ঝলকানি, “ভাইপো বিয়ে করেছে! সেতো ভালো কথা বৌদি। সেতো খুশির খবর”। চন্দনার গলা কান্নায় ভিজে, “সে দেখাশোনা করে বিয়ে করেনি বোন। পরের গ্রামের মেয়েকে পালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো”। “বলো কি বৌঠান?” সুমিত্রা তত আশ্চর্য হয়না। গ্রামে এসব লেগেই থাকে। শাড়ির আঁচল দিয়ে চন্দনা শব্দ করে নাকের শ্লেষ্মা ঝেড়ে মোছে,“হ্যাঁ গো বোন; সে এক ভীষণ কেলেঙ্কারি। গুণধর ছেলে আমার ভিন গাঁয়ের মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যায়। আর এদিকে মেয়ের বাবা ভাইরা পুলিশে নালিশ করে। আমাদের ছেলে নাকি তাদের মেয়েকে অপহরণ করেছে! পুলিশ আসে আমাদের ঘরে …” “তারপর?” সঞ্জয় উৎসুক। দীনবন্ধু গুড়ুক গুড়ুক শব্দ করে হুঁকো টেনে চন্দনার উত্তর দেওয়ার আগেই বলে, “তারপর আর কি? তারপর আমাদের গ্রামের হাই ইকলেজের হেড মাস্টারের ছেলে নির্মল চাটুজ্যে বাড়িতে ছেল। ছুটিতে। সে নাকি কলকাতায় ওকালতি করে।  সেই তো পুলিশদের সামলায়। তিনি বলেন, মেয়ের কত বয়স? বাইশ বছর? ছেলের কত বয়স? সাতাশ? তা তারা দুজনেই সাবালক। ঠিক কিনা? “তাতো বটেই!” সঞ্জয় বলে। সঞ্জয়ের ছোটমামা বলতে থাকে, “তবে? দুই সাবালক যুবক যুবতী  পাইলেছে তো ছেলের মা বাবাকে নিয়ে তোমাদের কি? একথাটা আমাদের নির্মল বলতেই পুলিশগুলার মুখে কথাটি নাই। ” “তারপর পুলিশ চলে গেল?” সঞ্জয় সোৎসাহে প্রশ্ন করে। “হাঁ বাবা,” হুঁকো থেকে মুখ তুলে দাঁত বের করে হাসে দীনবন্ধু। সুমিত্রা লক্ষ্য করে ছোড়দার দাঁত গুলো যেন ফাঁকা হয়ে গেছে। বাম দিকের মাড়ির একটা দাঁত পড়ে গেছে, অন্যটির রঙ এখন সম্পূর্ণ কালো।   চন্দনা বলে ওঠে, “রাত দিন শুধু অশান্তির মধ্যে দিয়ে দিন কাটিয়েছি। পুলিশের শাসানি তো গেল। তা থেকে রেহাই পেতেই ছেলে একদিন বউ নিয়ে এসে বলে আমার সম্পত্তির ভাগ চাই! খুব যেন জমিদারের ব্যাটা একবারে”। “তারপর?” সুমিত্রা এতক্ষণে তার গ্লাসের সরবত চুমুক দিয়ে অর্ধেকটা খেয়ে ফেলে। চন্দনা বলে, “তারপর আবার কি? তোমার গুণধর ভাইপোও লেগে পড়ে এক দিকে। তোমার দাদাকে মারতে যায়। ঘর থেকে বেরোতে বলে। শুধু সে আর তার নতুন বউ নিয়ে এই ঘরে থাকবে”। “এমন কেন? তোমরা কি তাদের মেনে নাওনি? ঘরে তোল নি?”, সুমিত্রা আবার প্রশ্ন করে। “কেন তুলবো বলো? একমাত্র সাধের ছেলে ছিল আমার। যে ছেলেকে ধুমধাম করে বিয়ে দিয়ে ঘরে বউ নিয়ে  আসবো ভেবেছিলাম সেই ছেলেই আমার মান সম্মান খেলো”। চন্দনা আক্ষেপ করে। চন্দনা বলে চলে, “গ্রামে সালিশি সভা বসাল পঞ্চায়েত প্রধান। তার নির্দেশে ছেলের বৌমার জন্য আলাদা ঘর করে দিলাম আমরা। ওই গ্রামের পশ্চিম দিকে দেড় কাঠা জায়গা কিনে দিতে হল ঘর করার জন্য”। “জমি কেনার টাকা ছিল? অসুবিধা হয়নি তো?” সঞ্জয় পাশ থেকে প্রশ্ন করে। “নাগো যাদুমণি, ওই দেড় কাঠা জমি কিনতে আর ঘর বানাতে তিন কাঠা ধানী জমি বেচতে হয়েছে আমার,” দীনবন্ধুর গলায় আক্ষেপের সুর। “হুম” । সুমিত্রা জলের গ্লাসে চুমুক দেয়, “সেকি আসে এখানে? বৌমার সঙ্গে কথা হয় তোমাদের?” চন্দনা মুখ নামায়, “নাহ! তারপর থেকে ওদের সঙ্গে আর কোন রা কথা নেই। ওই দূর থেকেই দেখা হয়”। সুমিত্রা এবারে চন্দনার পাশে এসে বসে।তার বাম কাঁধে হাত রাখে, “ বিয়ের কত দিন হল বৌদি?” “এক বছর হতে চলল গো” । “এতো দিনে রাগ রোষ ঝেড়ে ফেলা উচিৎ বৌঠান। ছেলে বৌমাকে বুঝিয়ে ঘরে নিয়ে আসা উচিৎ ছিল তোমাদের”, সুমিত্রা পরামর্শ দেয়। “কক্ষনও না বোন। যে ছেলে এতো কষ্ট দিয়েছে। সে ছেলেকে কখনই আপন করে নেবো না”, ক্ষুব্ধ স্বরে বলে চন্দনা”। “বলতে নেই, কিছুটা দোষ আমাদেরও আছে…। মলয় তো অনেকবার বলেছিল তাকে বিয়ে দিতে। সে নাকি ওই মেয়ের সঙ্গে ভাব করতো। আমরাই শুনিনি”, দীনবন্ধু গলা ঝেড়ে বলে। চন্দনা উত্তেজিত হয়ে সুমিত্রার দিকে তাকায়, “তা কেন শুনবো বলতো বোন? ভাব ভালোবাসা করে বিয়ে দিলে কি পাবো বলতো? ছেলে মানুষ করার খরচা নেই? পরের মেয়েকে ঘরে তুলবো এমনি এমনি নাকি বলো?” “পরের মেয়ে, পরের টাকার লোভ করেই তো নিজের ক্ষতি হয়ে গেলো। বাপুতি জমি ক’টা বিনা কারণে বেচতে হল”, দীনবন্ধু দরজার পাল্লায় মাথা রেখে উপর দিকে তাকায়। সুমিত্রা উঠে দাঁড়ায়। ছেলের হাতে থেকে জলের গ্লাস টা এবং নিজের হাতের গ্লাসটা নিয়ে চাপা কলের দিকে এগোয়, “তবে দাদা এবার তাদের মানিয়ে নিয়ে ঘরে তোলা উচিৎ। আর কতদিন মন ভার করে থাকবে?”। বোনের কথা শুনে দীনবন্ধু হাঁফ ছেড়ে ঘরের চালের দিকে তাকায়। চন্দনাও রান্নাঘরে ঢোকে। দুপুরের রান্না একটু বেশি করে করতে হবে তাকে।   সঞ্জয় সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সুমিত্রার কাছে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বলে, “মা…আমি মলয় দার সঙ্গে দেখা করতে চাই। নতুন বৌদিমণির সঙ্গেও আলাপ করতে চাই”। সুমিত্রা তার দাদা বৌদির দিকে ঘাড় তুলে তাকিয়ে বলে, “তোর মামা মামী রেগে যাবে এতে?” সঞ্জয় অধৈর্য হয়, “উফ মা! মামীর কথা শুনে আমি যা বুঝলাম তাতে টিপিক্যাল গ্রাম্য সমস্যা ছাড়া আর কিছুই নয় এটা…। একটা সামান্য জিনিসকে বিরাট করে সিন ক্রিয়েট করা হয়েছে বুঝছো না?”   “হুঁ, সবই তো বুঝছি সোনা, কিন্তু তোর মামা মামীর অনুমতি ছাড়া আমি কিছু বলতে পারছি না কিন্তু”, সুমিত্রা সঞ্জয়কে বলে। “মামীকে বলো না!” আবদারের সুরে বলে সে। সুমিত্রা, “হ্যাঁ যাই” বলে চন্দনার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ইতস্তত ভাব নিয়ে বলে, “বৌদি তোমার ভাগ্নে বলছিল সে তার দাদার সঙ্গে দেখা করতে চায়”। রান্নাঘরে কাজের ফাঁকে চন্দনা সুমিত্রার দিকে তাকিয়ে বলে, “হ্যাঁ যাক না…। যাক। মলয় ওর দাদা। ওর সঙ্গে তো কিছু হয়নি। যাক। গ্রামের মাঝ রাস্তা দিয়ে পছি দিকে গেলেই সব শেষে ওর বাড়িটা দেখতে পাওয়া যাবে”। বৌদির কথা শুনে মুখের কাছে হাত তোলে, “আর বলছিলাম যে ছেলের জন্য আগামীকাল পুজো দেবো…”। “হ্যাঁ ভালো কথা তো”। চন্দনা রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, “কাল ভোর বেলা আমি আর তুমি মিলে পুজো দিয়ে আসবো। আমারও অনেক দিন সেখানে যাওয়া হয়নি গো…”। “হ্যাঁ কাল ভোরে যাবো কিন্তু পুজোর জিনিসপত্র কিনতে ভুলে গেছি বৌদি। আর এখন তো ভরা দুপুর!” সুমিত্রা  চিন্তিত মুখে বলে।   চন্দনা উঠনে এসে দাঁড়ায়, “তুমি চিন্তা করোনা ছোট ঠাকুরঝি। চান করে খাওয়া দাওয়া করে একটু জিরিয়ে নাও। তারপর বিকেলে তোমার দাদাকে আমি হাটে পাঠাচ্ছি। আজ বৃহস্পতি বার সারেঙ্গা গ্রামে হাট পড়ে…”।   বৌদির কথা শুনে সুমিত্রা উৎসাহিত হয়ে বলে, “ওমা! সারেঙ্গায় এখনও হাট পড়ে বুঝি? ভুলেই গিয়েছিলাম আজ বৃহস্পতিবার সেখানে সারাদিন হাট পড়তো। আমরা ছোট বেলায় কতবার গিয়েছি সেখানে”। চন্দনা হাসে, “হ্যাঁ গো বোন। ওখানে এখনও হাট পড়ে। তবে আগেকার মতো আর বড় করে পড়ে না। আগে তো প্রতি সপ্তাহে মেলার মতো হাট পড়তো বলো?”। “তাহলে দাদার সঙ্গে আমিও যাবো……”, সুমিত্রা উল্লাসে নিজের ইচ্ছাপ্রকাশ করে। চন্দনা হাসে, “আগে তো ঘরে ঢুকে বাক্সটাক্স গুছিয়ে গাছিয়ে সুস্থির হও!” সুমিত্রা হেসে সঞ্জয়কে ডাকে, “আয় বাবু, আমরা আগে আমার ঘরটায় সুটকেস দুটো রেখে গুছিয়ে বসি!” II ৩ II চাপা কলের শীতল জলে চান করে তাদের বড় আরাম হয়।  দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর সুস্থির হয়ে চারজনে ভিতরের ঘরে বসে গল্প করে। গল্প করতে করতে বেলা পড়ে আসে। সূর্যের সেই প্রখর তেজ আর নেই। করবী গাছটায় বসে একটা কোকিল বারবার ডাকে। করবী গাছের ছায়া দীর্ঘ হয়ে পড়েছে গোবর দিয়ে নিকোন উঠোনে।   সুমিত্রা তার সুটকেসটার চেন খোলে। দাদাবৌদির জন্যে দোকান ঘুরে ঘুরে যা উপহার গুলো তারা কিনেছে, তা দেখানোর জন্যে তার উৎসাহের শেষ নেই। লাল টুকটুকে শান্তিপুরী তাঁতের শাড়ি দেখে চন্দনা ভীষণ খুশি হয়। ঘর থেকেই দীনবন্ধুকে হাঁক দেয়, “ওগো দ্যাখো দ্যাখো বাপধন কি সুন্দর সুন্দর শাড়ি নিয়ে এসেছে আমার জন্য”। দীনবন্ধু গোয়াল ঘর থেকে সাইকেল বের করে উঠনের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে রেখে ঘরে প্রবেশ করে। সে মৃদু হেসে, “হুম” শব্দ করে বলে, “ হুম ভারী সুন্দর তো শাড়ি গুলো”। চন্দনা খুশি হয়ে বলে, “হ্যাঁ দ্যাখো। সেবারে বলে ছিলাম। চাকরি পেলে আমার জন্য নূতন শাড়ি কেনা হয়। ছেলে সেটা মনে রেখেছে”। সঞ্জয়ের মাথায় হাত বোলায় সে। দীনবন্ধুর দিকে তাকায়, “একখান শাড়ি আমি রাখবো। আর একখান শাড়ি বৌমার জন্য দিয়ে পাঠাবো”। বউয়ের কথা শুনে দীনবন্ধু কোন প্রত্ত্যুতর করে না। সুমিত্রা সঞ্জয়কে নির্দেশ দেয়, “আর দেখা মামার জন্য কি কি কিনেছিস তুই?” মা’র কথা শুনে সঞ্জয় মামার জন্য কেনা ধুতি পাঞ্জাবী এবং বাটা কোম্পানির কুয়ভাদিস চটি জোড়া বের করে। সেটা দেখে দীনবন্ধু এবং চন্দনা ভারি খুশি হয়। চন্দনা বলে, “জানো বাবু তোমার মামার বহুদিনের ইচ্ছা ছিল ভালো একখানা ধুতি পাঞ্জাবী কেনার। ভালো ধুতি পাঞ্জাবী কি আর এই পাড়াগাঁয়ে পাওয়া যায়!” তার ছোটমামা দীনবন্ধু সায় দেয়, “কলকেতায় যেতে হয় এসবের জন্যি।  তা জমিজিরেত ছেড়ে কলকেতায় যাবার সময় কই?” একটু থেমে দীনবন্ধু হেসে সঞ্জয়ের দিকে তাকায়, “তোমার জন্যি এই ইচ্ছাটা আমার পুরন হল…” চন্দনা দীনবন্ধুর দিকে তাকায়, “হ্যাঁ গো তুমি তো সেবারে বলেছিলে তোমার বাল্যবন্ধুর ছেলের বিয়েতে পরে যাবার মতো কোন ভালো পোশাক নেই। এই দ্যাখো তোমার ভাগ্নেই তোমাকে কত সুন্দর পোশাক কিনে দিলো!” দীনবন্ধু তৎক্ষণাৎ বলে, “আমি এইটাই তো ভাবছিলাম, আমি এটা পরেই পরের মাসে দিবাকরের ছেলের বিয়েতে যাব”। দীনবন্ধু সেই পাঞ্জাবী খানা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখে। সুমিত্রা বলে, “হ্যাঁ দাদা তুমি দেখে নাও। তোমার ফিটিংস ঠিক মতো হচ্ছে কিনা”। দীনবন্ধু মৃদু হেসে বলে, “ভাগ্নের দেওয়া কেনা বস্ত্র। কেন গায়ে হবে না?” সঞ্জয় এরপর মলয়ের জন্য জামা প্যান্টের পিস দুটো বের করে দেখায়। চন্দনা বাধা দেয়, “ওগুলো তুমি ওর কাছেই খোলো বাবা। এখানে বাবা মা দেখেছে শুনলে আবার ক্ষেপে না যায়”। মামীর কথা শুনে সঞ্জয় হাসে, “নতুন বিয়ে করে কি মলয়দা পাগল হয়ে গেছে নাকি?” চন্দনা জোর গলায় বলে, “হ্যাঁ তাই। পাগল তো সে ছিলই। এখন বৌয়ের পাল্লায় পড়ে আরও কত কিছুই না সে হয়ে গেছে”।
Parent