বিয়ে by Entertainment7 - অধ্যায় ২৩
আমি দিদিমার মুখের দিকে তাকিয়েই আছি।
দিদা- কি তাকিয়ে আছিস বলত... একবার ফোন করে দেখ, ভীষন টেনশন করছে ভেবেছে কিছু হয়েছে।
আমি- হ্যাঁ যাই
দিদা- আরে দাঁড়া, তুই এখানে কি করছিলি তোর মায়ের গায়ের উপর উঠে?
প্রশ্নটা আমাকে করলেও তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে। আমি একবার দিদিমার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে নিলাম। মাও কোন কথা বলছেনা। আমার বুকটা ধক করে উঠল প্রশ্ন শুনে।
দিদা- কিরে সুমি তুই কিছু বলছিসনা যে?
মা- মা ঐ..ঐ..ঐতো কিছুনা তো।
দিদা- কি ঐ ঐ ঐতো কিছুনা করছিস বলত?
আমি- আমি একটু আসছি সুপ্তিকে একটা ফোন করে।
দিদা- বোস এখানে, আমার উত্তর না দিয়ে পালাচ্ছিস অমনি....!
আমি- না না পালাব কেন ফোনটা করেই এখুনি আসছি।
মা- আমিও যাই সুমনারও ফেরবার সময় হয়ে গেল কিছু টিফিন বানাই, যাই।
দিদা- বোস.... তোরা কি লুকোচ্ছিস বলত আমার কাছে?
আমি তাড়াতাড়ি- কি লুকোবো?
দিদা মায়ের একটা হাত নিজের মাথায় তুলে নিয়ে- কি লুকোচ্ছিস সত্যি করে বল সুমি আমার দিব্যি।.... কেউ এতবড় একজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে তার মায়ের গায়ের উপর এভাবে শুয়ে থাকেনা। আমার মাথায় হাত দিয়ে মিথ্যে বলবিনা।
মায়ের চোখের জল পড়ছে আর আমি নিরুত্তর হয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছি। আমার নড়বার শক্তিও বোধয় কেউ কেড়ে নিয়েছে। মা হাতটা ছিনিয়ে নিয়ে নিজের মুখটা ঢেকে কাঁদতে শুরু করল।
দিদা- আমি কান্না নয় আমার প্রশ্নের উত্তর শুনতে চাইছি।
বলে মায়ের হাতদুটো ছিনিয়ে নিল। মা সঙ্গে সঙ্গে দিদিমাকে জড়িয়ে ধরতে চাইল। দিদা মায়ের কাধটা ধরে ঝাকিয়ে বলল
- আমি যেটা ভাবছি সেটা ঠিক?
মা সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে নেমে কাদতে কাদতে দিদিমার পায়ে পড়তে গেল। দিদিমা একটু সরে গিয়ে মায়ের কাঁধ ধরে তুলে অনবরত চড় মারতে লাগল। এবার আর আমি থাকতে পারলাম না। ছুটে দিদিমার পায়ে পড়ে বলতে লাগলাম
আমি- দিদা মায়ের কোন দোষ নেই সব দোষ আমার তুমি যা শাস্তি দেবার আমায় দাও মাকে কিছু বলোনা।
দিদিমা মাকে ছেড়ে আমার থেকে নিজের পা ছাড়িয়ে একটু দুরে সরে গেল
দিদা- তুই তো.... চুপই থাক। নিজের মায়ের সঙ্গে ছিঃ ছিঃ ছিঃ.... কেন রে সুপ্তি কি কম ছিল? আমরা তো তোদের বিয়েতেও রাজি ছিলাম। তাহলে কেন....
মা- মা আমিইইই....
বলে মেঝেতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। আমি সেদিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি গিয়ে মায়ের মাথাটা কোলে তুলে নিলাম।
আমি- মা তোমার কি হয়েছে কথা বলো চোখ খোল।
নিজের কান্না আর থামাতে পারছিনা। দিদিমাও ছুটে মায়ের মাথার কাছে বসে বলছে
দিদা- কি হল সুমি কথা বল...
তারপর উঠে ছুটে ডাইনিং থেকে জলের বোতল নিয়ে এসে মায়ের মুখের উপর জলের ছিটা মারতে থাকল। তারপর দুগালে আস্তে আস্তে চড় মেরে বলতে থাকল।
দিদা- চোখ খোল মা সুমি কথা বল আমার দিকে দেখ একবার।
দিদিমাও কাঁদোমাদো হয়ে গেছে। আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম
আমি- একবার তাকাও আমার দিকে মা....
তারপর মায়ের চোখ আস্তে আস্তে খুলল। মা আমাকে আর দিদিমাকে নিজের মাথার কাছে পেয়ে আবার কাঁদতে শুরু করল।
মা- মা আমি ওকে ভালবেসেফেলেছি।
দিদা- তুই জানিস তুই কি বলছিস?
মা- আমি জানি সুজন আমার ছেলে, কিন্তু আমি ওকে ছাড়া বাঁচবনা মা।
দিদা- হাঃ ভগবান এটা শোনার আগে কেন আমার মৃত্যু হলনা?... নাহ আমি আমার বাড়িতে এ অনর্থ হতে দিতে পারিনা। কেউ জানার আগে তোরা এবাড়ি ছেড়ে চলে যাবি। কাল যেন তোদের আমি আর না দেখি এবাড়িতে। আজ সুমনার ফেরার সময় হয়ে গেছে। হয়তো দেখে ফেলবে, ফিরে এল বলে... আমি কাউকে কিছু জানাবনা, আর কাল সুমনাকে আমি ম্যানেজ করে নেব।
বলে দরজার দিকে প্রস্থান করল। মা ঐঅবস্থাতেই চেঁচিয়ে কাঁদতে শুরু করল। আমারও খুব জোরে কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছিল। কিন্তু নিজেকে শান্ত রেখে মাকে চুপ করানোর জন্য মায়ের মুখটা আমার বুকে জড়িয়ে নিলাম। মাও আমাকে জড়িয়ে ধরল। কারন আমার মনে হল মায়ের কান্নার আওয়াজ মামী যদি শুনে ফেলে তাহলে ছুটে এসে সব জানতে পারবে, তখন আরেক কেলেঙ্কারি হবে। তাই মাকে চুপ করাতে থাকলাম। দিদিমা যে পথে গেছে সেখানে তাকিয়ে দেখলাম দিদিমার চোখের জল পড়েছে ফোটা ফোটা।
অনেক সময় কেটে গেছে আমি মায়ের মাথার পাশে বসে আছি, মা বিছানায় শুয়ে আছে চোখ বুজিয়ে। আমি মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। মা চুপ করে থাকলেও তার মধ্যে কি ঝড় চলছে বুঝতে পারছি কারন আমার মধ্যেও তো অনেক ঝড় চলছে। এঘরে কেউ আসেনি দিদিমা চলে যাবার পর থেকে। কিছুক্ষন পর মামী ডাকতে এল ডিনার করার জন্য, মাকে বলল
মামী- দিদি খাবে এস মা ডাকছে। মা বলল তোমার নাকি শরীর খারাপ! তাই ডিস্টার্ব করতে বারন করল। বলছি এখানে নিয়ে আসব নাকি খাবার?
মা ঝটপট উঠে- সুমনা কোথায়?
আমি- আরে আরে কি করছ...
যেহেতু দিদিমা কাউকে কিছু জানাবেনা বলে মায়ের শরীর খারাপ বলেছে। তাই আমিও মামীকে দেখাবার জন্য মাকে ঐ কথা বললাম।
মামী- সুমনা তো ঘরে পড়ছে।
মা- ওর খাওয়া হয়েছে?
মামী- হ্যাঁ ওকে খাইয়ে দিয়েছি।
মা- আর তোমাদের?
মামী- তোমার ছোটভাই ফিরলেই খাব।
মা- কখন আসবে?
মামী- দশমিনিটেই আসছে এসো।
আমি আর মা খাবার টেবিলে বসলাম।
কোথা থেকে কি যে ঘটে গেল তবু খেতে বসলাম। কেউ কোন কথা বলছিনা মামী আমাদের মা ছেলেকে পরিবেশন করছে। দিদিমাকে আমাদের ধারে কাছেও দেখতে পেলামনা। চিন্তা হচ্ছিল বোনকে নিয়ে, জানিনা মা কি চিন্তা করছে। খেতেও ভাল লাগছেনা এখন।
খাওয়া শুরু করিনি তখনো, মামা ফিরল দেখলাম। ডাইনিং পেরিয়ে নিজের ঘরে যাবার সময় একবার আমার দিকে দেখল তারপর বলল
- কিরে বাবু আজ এত তাড়াতাড়ি?
কোন উত্তর না দিয়ে মামার মুখে যে একটু হাসি সেটা চোরা চাহনিতেই বুঝলাম। মামা আর ঘরের দিকে পা না বাড়িয়ে নিজেই বসে পড়ল একটা চেয়ার টেনে আমাদের সাথেই। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে
-কিগো দিদি খাচ্ছো না কেন?
মা কোন সাড়াই দিচ্ছেনা। তারপর মামা যেন সবার উদ্দ্যেশে- আজ একটা সুখবর আছে।
তারপর মামীকে- রাধা,,মা কোথায়? একবার ডাকোনা...
আমি সরাসরি মামার দিকে তাকাতে পারছিনা মনে হচ্ছে যদি আমার চোখের ভাষা পড়ে ফেলে আমার মনের ভিতর কি চলছে বুঝে ফেলে। আমি চাইছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খেয়ে উঠে যেতে। কিন্তু মা একটা দানাও গালে তুলছেনা পুরো জড়োভরত। হঠাৎ মামীর কথায় মায়ের দিকে তাকালাম।
মামী- কিগো দিদি খাচ্ছনা কেন?
মা তবুও কোন কথা বলছেনা শুধু সামনে টেবিলের উপর রাখা থালার দিকে চেয়ে আছে আর চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়ছে। মায়ের চোখে জল দেখে আমারও ভীষন কষ্ট হচ্ছে হয়ত মামা বা মামী কেউই মায়ের চোখের জল দেখছেনা। তখনি মায়ের কন্ঠস্বর পেলাম কান্না ভেজা গলায়
মা- মা..
মামী- মা তোমাদের খেতে বললেন, উনি আরেকটু পর খাবেন বললেন।
মা একবার অনুরোধ করল মামীকে- রাধা একবার ডাকোনা মাকে..... প্লিজ।
মামী- আমি ডেকেছি উনি আসছেন দিদি।
একটুপর দিদিমা এল। মা নিজেই দিদিমাকে তার পাশের চেয়ারটাতে বসতে বলল। দিদিমা বসছেনা দেখে মা নিজেই বলল
- মা আজ একবার অন্তত শেষবারের মতো আমার পাশে বোসো।
মা দিদিমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল নিজের কথা শেষ করে। কিন্তু দিদিমা নিজের জায়গায় স্থির। অন্যদিকে চোখের দৃষ্টি কিন্তু চোখ ছলছল করছে। মা আরেকবার শেষ অনুরোধ করল
- প্লিজ মা আজ শেষবারের মতো আমায় একবার নিজের হাতে খাইয়ে দাও। আর কিচ্ছু চাইনা।
দিদিমা চোখের জল লুকোতে ছুটে চলে গেল রান্নাঘরে। সঙ্গে সঙ্গে মামার প্রশ্ন
- কি হয়েছে মায়ের? কাঁদছে কেন?আর দিদি তুমি এসব কি বলছ আজ শেষ না কিসব...
মা কোন কথা বলছেনা আর আমিও না, মামার দিকে তাকাতেও ভয় হচ্ছে। তবে মামার দিকে না তাকিয়েও মামার মধ্যের উদবেগটা বুঝতে পারছি আর সেটা হওয়ারই কথা।
মামা- রাধা তুমি তো কিছু বলো।
মামী- আমি কিছু জানিইনা তার কি বলব!!
মামা- বেশ তোমরা সবাই মুখে কুলুপ এঁটে চুপ করে থাকো।
বলে নিজেই উঠে রান্নাঘরে ঢুকে গেল। রান্নাঘরের পাশেই খাবার টেবিল থাকার ফলে আমার শোনার সুবিধা হল মামা আর দিদিমার কথা। কারন আমি তো জানি এখানে কারো থেকে উত্তর না পেয়ে দিদিমার কাছে গেছে মামা। মামীও দরজায় গিয়ে দাড়িয়েছে। আমি খাবার টেবিলে বসেই ওদের চেচামেচি শোনবার চেষ্টা করলাম চুপ করে। আর মা তো প্রথম থেকেই চুপ।
মামা- তোমাকে আমার দিব্যি মা কি হয়েছে আমাকে বলো।
মামার কথায় দিদিমা একেবারে ঝাঝিয়ে উঠল- কি বলব এ্যাঁ কি বলব?
মামা দিদিমার কথায় আশ্চর্য হল- কি ব্যাপার বলোতো মা....
দিদিমা- শুনতে চাস তবে শোন তোর দিদি আর তোর ভাগ্না দুজনে দুজনকে ভালবাসে।
মামা- হ্যাঁ তো এতে দোষের কি আছে...
দিদিমা- কেন তুই বুঝতে পারছিসনা বলত ওরা মা ছেলে হিসেবে নয় লাভারের মতো ভালোবাসে।
কথাগুলো বোধয় মামাকে বোঝাতে মামার উপর একটু চেচিয়েই উঠল দিদিমা।
তারপর বেশ কয়েকমিনিট সব চুপ। আমার কাছে তো মিনিটগুলো ঘন্টা মনে হতে লাগল। তারপর মামার শান্ত গলায় প্রশ্ন
- তুমি জেনেছই যখন তখন কিছু একটা সিদ্ধান্ত নিশ্চই নিয়েছ.... আর সেই সিদ্ধান্তটা কি?
দিদিমা একটু থেমে থেমে উত্তরটা দিল। দিদিমা- আমি.. ঠিক.. করেছি যে ওরা দুজন... এবাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। কারন এবাড়িতে অনর্থ হতে দিতে পারিনা।
মামা- মা এসব তুমি কি বলছ? তুমি কি পাগল হলে....
দিদিমা- আমাকে তোর পাগল মনে হচ্ছে? তোর খারাপ লাগছেনা কথাটা শুনে?
মামা একটু চুপ করে বলল- আমার তো সেদিনই খারাপ লেগেছিল গ্রামের বাড়িতেই....
বলতে বলতে থেমে গেল মামা।
দিদিমা- তার মানে তুই কি বলতে চাইছিস?
মামা- তুমি নিশ্চই বুঝে গেছ আমি কি বলতে চাই। কিন্তু ইচ্ছা করছেনা কিছু বলতে।
দিদিমা- তার মানে?
মামা- তার মানে তোমার ঐ মেয়েই না থাকলে আজ আমরা সবাই অনাথ হতাম। একমাত্র আমিই জানি সেদিন দিদির ভুমিকা কি ছিল। যে তোমায়, আমাদের, সবাইকে এক ছাতায় বেঁধে রাখতে সাহায্য করল আজ সেই মেয়েকেই ছুড়ে ফেলতে চাইছ, তোমার এই কথাই যদি শেষ হয় তবে আমিও এবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে রাজি দিদির সঙ্গে।
দিদিমা- না আমায় ছেড়ে যাস না খোকা....
মামা ততক্ষনে রান্নাঘরের দরজার বাইরে চলে এসেছে।
মামা- তাহলে ওদের কোথাও যেতে দিওনা।
দিদিমা- কিন্তু ওরা যে ভুল করেছে...
মামা- ওরা কোন ভুল করেনি আমি বলছি। আজ যদি ভুল হয় সেদিনও তো ভুল হয়েছিল। আমার যা বলার আমি বললাম এবার তোমার হাতে বাকি সব।
দিদিমা গুটি গুটি পায়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আমাদের টেবিলের পাশে এসে দাড়াল। মায়ের কাধে হাতটা রাখার সঙ্গে সঙ্গে মা বসে থাকা অবস্থাতেই দিদিমার কোমর জড়িয়ে ধরল। দিদিমাও বোধয় আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলনা মাকে বুকে জড়িয়ে নিল মায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে। আমার চোখও জলে ভর্তি হয়ে ঝাপসা হয়ে গেছে। একহাতে চোখের জল মুছে দেখি মামা কখন আমার পিছনে মামীর পাশে এসে দাড়িয়েছে আমার কাঁধে হাত দিয়ে। কিন্তু আমি তখনও বুঝতে পারলামনা ওরা রান্নাঘরের ভিতর কি নিয়ে কথা বলছিল।
মামা- যাক একটা সুখের খবর নিয়ে এসেছিলাম দুটো সুখের খবর পেলাম।
মামী- দুটো সুখের খবর কি?
মামা- এই যে মা দিদিকে জড়িয়ে আগলে রেখেছে এটা, আরেকটা হল আর কিছুদিন পরই একটা প্রমশন হতে চলেছে।
মামী- ওমা সত্যি?
মামা- হ্যাঁ মা সত্যি।
মামী- ধ্যৎ তুমি না...
মামার কথায় হাসি পেয়ে গেল। সবাই হেসে ফেললাম।
মামা- পরেরটা কিন্তু দুঃখের খবর হয়ে যাবে।
আমি- কেন গো মামা?
মামা- আরে খুব খিদে পেয়েছে যে।
দিদিমা চটপট- আমি নিয়ে আসছি তুই চেঞ্জ করে আয়।
মা তখনো দিদিমাকে জড়িয়ে আছে।
মামী- মা বসুন আমি নিয়ে আসছি।
দিদিমা- আমি সুমির সাথেই খাব শুধু তোমাদের খাবার নিয়ে চলে এস।
এরপর সবাই একসাথে খেলাম।
Story incomplete