গোধূলি আলো'র গল্পগুচ্ছ - অধ্যায় ১২৬
বাবার বিছানার পাশে আমি আর মা মুখোমুখি বসলাম। কেউ কারো দিকে তাকাতে পারছিলাম না। বাবা ধীরে ধীরে বলে চললেন, আমার তো সময় আর বেশি দিন নেই। তোমাদের সবাইকে সুখী আর থিতু দেখে যেতে পারলে মরেও শান্তি পেতাম। কিন্তু তোমরা কেউই তো সামনে আগাচ্ছ না।
আমি আর মা দুজনেই চুপ করে রইলাম। বাবা কিছু সময় থেমে আবার বললেন, এভাবে নির্লিপ্ত থাকলে হবে না। তোমাদের সামনে এগোতে হবে।
বলেই তিনি মায়ের ডান হাতখানা তুলে আমার হাতে তুলে দিলেন। মুখে বললেন, বাবা আমার বৌকে আমি আজ তোমার হাতে তুলে দিলাম। ওকে সারা জীবন আগলে রেখো। সেই সাথে ওর সন্তানদেরও নিজের সন্তান মনে কোরো।
মা দেখলাম অস্বস্তিতে মাথা নিচু করে আছে। তার নীরবতা আমাকে সাহস জোগালো। আমি ধীরে ধীরে বললাম, আপনি যা চান তাই হবে বাবা।
বাবা এবার আহ্লাদে গদগদ হয়ে বললেন, এই তো ছেলের মতো ছেলে। আমি খুব শিগগির তোমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করবো। আমি নিজেই বিয়ে পড়াবো। তোমার ভাইবোনরা হবে বিয়ের সাক্ষী। আমার মৃত্যুর পর তোমরা নতুন কোনো জায়গায় গিয়ে একেবারে সামাজিক ভাবে স্বামী স্ত্রী হিসেবে বাস কোরো। এখন যাও, আমার ঘরের বারান্দায় গিয়ে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে সম্পর্কটাকে সহজ করে নাও। আমি উঠে বাবার ঘরের বারান্দায় চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পরে মাও আসলো। কিন্তু কোনো কথা বললো না। জানালার গ্রিল ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। আমি সাহস সঞ্চয় করে বললাম, এভাবে চুপ করে থাকলে চলবে?
মা মৃদু স্বরে বললো, কি বলবো?
আমি বললাম, নতুন সম্পর্কের কথা। সামনের অনাগত দিনগুলোর কথা।
মা আস্তে করে বললেন, ওসব নিয়ে এখনো কিছু ভাবি নি।
আমি বললাম, কিন্তু ভাবতে তো হবে। খুব বেশি দেরি নেই সবকিছু পরিবর্তনের।
মা কিছু সময় চুপ থেকে বললেন, যখন যেটা সামনে আসবে তখন সেটা নিয়ে ভাবা যাবে।
আমি বললাম, ঠিক আছে। তবে বাচ্চাদের নিয়ে বেশ চিন্তিত আমি। ওরা আমাকে বাবা হিসেবে মেনে নিতে পারবে তো?
মা বললো, অভ্যেস হয়ে যাবে হয়তো এক সময়।
আমি বললাম, হয়ে গেলেই ভালো। ভবিষ্যতের সবকিছু ভাবতে আমার এতো ভালো লাগে! তোমার কেমন লাগে ভাবতে?
মা মৃদুস্বরে বললেন, এখনো তো ভাবি নি।
আমি বললাম, তাহলে ভাববে আজ রাত থেকে।
মা আস্তে করে বললেন, ঠিক আছে। এখন যাই। রাতের রান্না বাকি আছে। বলেই তিনি বারান্দা থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি কিছুক্ষণ তার গমণপথের দিকে তাকিয়ে বারান্দার গ্রিল ধরে তারাভরা আকাশের দিকে তাকালাম।
দুদিন পরেই বাবা আমাদের বিয়ে পড়িয়ে দিলেন। আমার ভাই হলো আমার পক্ষের সাক্ষী আর বোন হলো মায়ের পক্ষের সাক্ষী। বিয়ে পড়ানো শেষ করে বাবা মায়ের হাত আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, তোমরা আজ থেকে স্বামী-স্ত্রী। সারা জীবন সুখে সংসার কোরো। তবে আমার একটা কথা রেখো। তোমাদের যে দুটি সন্তান আছে তাদেরকেই ঠিক ভাবে মানুষ কোরো সারা জীবন। আর কোনো সন্তান নিয়ো না।
শুনেই আমি চমকে উঠলাম। মাকে সানন্দে বিয়ে করেছি। ভাইবোনকেও সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছি খুশিমনে। কিন্তু তাই বলে আমার নিজের ঔরসজাত কোনো সন্তান আসবে না পৃথিবীতে! এও কি মেনে নেয়া যায়?