গোধূলি আলো'র গল্পগুচ্ছ - অধ্যায় ৫৮
প্রথমবারের চেয়ে এবার যেনো আরো বেশি বিরক্ত হলাম। তীব্র স্বরে বললাম, কীভাবে হলো এটা?
মা মাথা নিচু করে বললেন, আমি ইচ্ছে করেই বাঁধিয়েছি পেট। তিনটাই ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছি তাই একটা মেয়ের বড্ড শখ ছিল। আর এখন তো আমাদের দিন ফিরেছে তাই আর একটা সন্তান নিতে কোনো সমস্যা নেই বলেই মনে হয়েছে।
আমি রাগত স্বরেই বললাম, কিন্তু আমাকে তো জানানো উচিত ছিল তোমার।
মা মিনমিন করে বললেন, সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেটা আমার ভুল ছিল।
আমি বললাম, হুম অবশ্যই ভুল ছিল। এখন সেই ভুলটাকে আর বাড়তে না দেয়াই ভালো।
মা একেবারে স্তব্ধ হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, তোমার সমস্যাটা কোথায় জানতে পারি?
মায়ের সামনে কীভাবে বিয়ের কথা বলবো তা নিয়ে বেশ অস্বস্তিতে ছিলাম। কিন্তু আমাকে না জানিয়ে পেট বাঁধানোর ব্যাপারে আমি এতোটাই বিরক্ত হলাম যে সব দ্বিধা সরে গেল। তবু আমার গলা যেনো কিছুটা কাঁপছিল। কোনো রকমে বলেই ফেললাম, আমি খুব তাড়াতাড়িই বিয়ে করতে যাচ্ছি একটা মেয়েকে। এমন সময়ে নতুন আর একটা বন্ধনে জড়ানোর ইচ্ছে নেই।
মা পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চল, নিষ্পলক হয়ে রইলেন। এমন কিছুর কথা হয়তো তিনি ভাবতেও পারেন নি। তারপর আস্তে আস্তে খাটের ওপর গিয়ে বসে অঝোরে কান্না শুরু করলেন। তা দেখে আমার ভেতরটাও দুমড়ে মুচড়ে উঠলো। আমি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললাম, আমি অনেক চেষ্টা করেছি তোমাকে নিয়ে পরিপূর্ণ সুখী হতে কিন্তু পারি নি। তোমাকে আমি মা হিসেবেই ভালোবাসি কিন্তু পরিপূর্ণ স্ত্রীর ভালোবাসা দেবার জন্য একজন আমার জীবনে চাই। তা না হলে আমি দম বন্ধ হয়ে মারা যাবো হয়তো। কিন্তু ভেবো না যে তাকে পেয়ে তোমাকে আর আমাদের সন্তানকে আমি ভুলে যাবো। তোমাদের দায়িত্ব আমি ঠিকভাবেই পালন করে যাবো। এখানে সবকিছু যেভাবে চলছে সেভাবেই চলবে।
মা কাঁদতে কাঁদতে ঝাঁঝালো স্বরে বলল, কেনো আমাদের অযথা পুষতে যাবে তুমি? আমাদের প্রয়োজন তো শেষ। এবার ছুড়ে ফেলে দাও আমাদের।
আমার ভেতরটা একেবারে কেঁদে উঠলো এবার। আমি ধীরে মায়ের পাশে গিয়ে বসে তার ডান হাতটা মুঠোয় নিয়ে বললাম, এভাবে কেনো বলছো? যৌন সঙ্গিনীর বাইরে তোমার সবচেয়ে বড় পরিচয় তুমি আমার মা। আর সৌমিক তো আমার ঔরসজাত সন্তান। তোমাদের আজীবন আমি বুকের ভেতর আগলে রাখবো।
বলেই আমি হাত বাড়িয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলাম। আর সেও আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে হু হু করে কেঁদে উঠলো।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে বেশ কয়েক দিন সময় লাগলো। তারপর একদিন রাতে মা বললো, আমাদের অনাগত সন্তান নিয়ে কি ভাবলে? ওকে কি কোনোভাবেই দুনিয়ার আলো দেখানো যাবে না?
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, আমি অনেক ভেবে দেখেছি। শুধু শুধু একটা প্রাণ ধ্বংস করে কী লাভ? তোমাদের দুজনার সাথে যদি আরো একজন থাকে তাতে বিশেষ কী ক্ষতি?
আমার কথা শুনে মা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
এদিকে আমি ঢাকার ভেতরেই ছোট আর একটা ফ্ল্যাট নিলাম। নীলিমার সাথে বিয়ে সম্পন্ন হবার পর তাকে সেখানেই তুললাম। সাভারে মায়ের কাছে সপ্তাহে একদিন শুধু শুক্রবারে যেতে লাগলাম। এতে মা যথেষ্ট অসন্তুষ্ট ছিল যা আমি বুঝতে পারতাম। কিন্তু সে মুখে কিছু বলতো না। তার দেখাশোনার জন্য একজন বাঁধা কাজের বুয়া রেখে দিলাম। গর্ভবতী মহিলা কখন কি ঘটে বলা তো যায় না। এভাবেই চলছিল দিন। বছর না ঘুরতেই মায়ের স্বপ্ন পূরণ করে কন্যা সন্তান এলো তার ঘরে। আর তার বুকেও আবার দুধ এলো।