গোধূলি আলো'র গল্পগুচ্ছ - অধ্যায় ৬৭
ভাবছিলাম আরো একবার দাঁড়াবো মায়ের সামনে। কিন্তু দোটানায় পড়ে সেটা আর হয়ে ওঠে নি। তার কিছুক্ষণ পরেই বোনেরা বাড়ি ফিরে আসলো। তারপর তো আর সেই মুডটাই রইলো না। নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। আমার 11 বছর বয়সী বোন তিথি যখন দুপুরের খাবার খেতে ডাকলো তখন বলে দিলাম ক্ষিদে নেই। আজ খাবো না। ও চলে যাবার পর ভেবেছিলাম মা হয়তো এসে ডাকবেন আমাকে। কিন্তু সেটি আর ঘটলো না। হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙলো পড়ন্ত বিকেলে। বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে ল্যাপটপে একটা মুভি দেখতে বসলাম। বাইরে যাবার মুড ছিল না আজ। মুভি দেখতে দেখতে হঠাৎ রিদম আমার ঘরে আসলো এক বাটি নুডুলস নিয়ে। আমি সেটাও ফিরিয়ে দিলাম। ভাবলাম, এবার হয়তো মা আসবেই। কিন্তু সে এলো না। হতাশায় ল্যাপটপটা বন্ধ করে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। সন্ধ্যার রক্তিম আভা মিলিয়ে গিয়ে তখন চারদিকে ঘন আঁধার নেমেছে। সেই অন্ধকারের সাথে যেনো আমার মনের আঁধার একাকার হয়ে যেতে লাগলো। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম জানালার গ্রিল ধরে। আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ মায়ের কন্ঠ শুনে চমক ভাঙলো। তিনি বললেন, কি শুরু করেছ এসব? দুপুরে খাবার খেলে না, বিকেলের নাস্তাও ফিরিয়ে দিয়েছ!
আমি তার দিকে একবার তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে বললাম, আমি না খেলে কার কী যায় আসে?
মা বললেন, কেন এভাবে কষ্ট দিচ্ছ নিজেকে?
আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, আমার কষ্টে কার কী যায় আসে?
মা স্নিগ্ধ কন্ঠে বললেন, তোমার অভিমানের কারণটা জানতে পারি?
আমি আবারও কিছু সময় চুপ থেকে বললাম, তখন ওভাবে চলে যেতে বললে কেন আমায়?
মা বললেন, কারণ তোমার কথার কোনো জবাব ছিল না আমার কাছে।
আমি সাহস সঞ্চয় করে বললাম, লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে আমারও ভালো লাগে না। কিন্তু নতুন যে অনুভূতি আমার মনের ভেতর এসেছে তা থেকে পুরোপুরি নিজেকে ফিরিয়ে রাখাটা আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
মা ক্ষীণকণ্ঠে বললেন, তাহলে আমাকে কি করতে হবে? তোমার সামনে স্বেচ্ছায় নিজেকে নগ্ন মেলে ধরতে হবে?
আমি মরিয়া হয়ে বললাম, না না। তা কোনোভাবেই নয়। শরীরটা আমার কাছে বড় নয়। আমার অনুভূতিগুলো তুমি বুঝতে পারলে আর সাপোর্ট দিলেই আমি খুশি আপাতত।
মা বললেন, সেটা কীভাবে সম্ভব?
আমি ধীরে ধীরে বললাম, সবার সামনে আমাদের সম্পর্ক মা-ছেলের মতো থাকলেও যখন আমরা দুজন একাকী থাকবো তখন সম্পর্কটা হবে প্রেমিক -প্রেমিকার মতো। শারীরিক সম্পর্ক নাই বা হলো আপাতত। কথাবার্তাটা যেনো প্রেমময় হয়।
মা কিছুক্ষণ নীরবে থেকে বললেন, এটুকু পেলেই তুমি খুশি?
আমি বললাম, হ্যাঁ আপাতত এর চেয়ে বেশি কিছু চাই না। তারপর এভাবে চলতে চলতে যদি পরস্পরের প্রতি আস্থা এবং নির্ভরতা চলে আসে তখন শারীরিক ব্যাপারটা ভেবে দেখা যাবে। তবে কখনোই তোমার ওপর কোনো জোর করবো না আমি।
মা আবারো অনেকক্ষণ নীরবতা পালন করে ধীরে ধীরে বললেন, ঠিক আছে। চেষ্টা করে দেখবো। এখন কিছু খেয়ে নাও। আমিও দুপুর বেলা থেকে খাই নি কিছু।
আমি দিশেহারা হয়ে বললাম, সেকি? এর কোনো মানে হয়? চলো শিগগির বিকেলের নাস্তা করে নেয়া যাক।