খুব শখ তাই না! - অধ্যায় ৪
বাবুকে বলতে প্রথমে না করে দিল। আসলে ওর ওখানে যেতে নাকি ভালো লাগে না। আসলে সত্যিই তাই। কিছুই তো নেই। ওখান থেকে মুল শহরের দূরত্ব প্রায় ৪০কিলোমিটার। গ্রাম্য পরিবেশ। ওখানে গেলে মনে হবে যেন যুগ এখানে থমকে আছে। তবে আমি যে কদিন থাকি মাসির সঙ্গে তার চাষের দেখাশুনো ও গল্প করেই সময় কাটিয়ে দিই। তাই আমার অতো মনে হয় না। কিন্তু বাবুর মন সেখানে বসবে কিনা এটাই চিন্তার। যাইহোক, ওকে বলে কয়ে রাজি করলাম।
যাওয়ার আগে পল্টুর মার কাছে বাড়ির চাবি ও দেখভালের কথা বলে আসলাম। এক সপ্তাহ মতো থাকার কথা মাথায় রেখে আমি আর বাবু বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু তখন কি জানতাম যে এই বাড়ির সঙ্গে আমার সম্পর্ক এখানেই ইতি টানবে। আমার জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হবে। আবার নতুন করে আমাকে সেইসব কিছু করে যেতে হবে যা আজ কুড়ি বছর ধরে করে এসেছি। সেই গল্পই আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।
আমি বরাবরই সাজতে ভালবাসি। আজকে আমি নীল পাড়ের একটা শাড়ি আর সোনালি রঙের একটা ব্লাউজ পরলাম। স্বামী তো নেই অন্তত ছেলেটা দেখেও প্রশংসা করুক। মাথায় চওড়া করে সিঁদুর দিলাম। আমাকে দেখে বাবু বলল:"তুমি যা সেজে উঠেছ যেই দেখবে তারা কিন্তু তোমাকে আমার স্ত্রীই মনে করবে।"
আমিও লাজুক হেসে উত্তর দিলাম:"তাহলে তো ভালই হবে। অন্তত তোর মনে যে আমাকে বউ হিসাবে পাবার শখ আছে সেটা পুরণ হবে। আর আমাকে ওতো সুন্দরও দেখাচ্ছে না বুঝলি। ওটা তোর মনের ভাব।" বলতে বলতে মুখের মেকআপ সারলাম।
"কি যে বলো না তুমি! ঠিক আছে, দেখে নিও। আমরা তো লম্বা রাস্তায় যাচ্ছি। রাস্তায় কত মানুষ আমাদেরকে স্বামী স্ত্রী মনে করে দেখে নিও।"
"ঠিক আছে দেখা যাবে।"
পুরো আসার পথে বাবু আমার সঙ্গে এইসব নোংরা নোংরা কথা দিয়ে আমার মনকে হাসিখুশি রেখেছে। যখন কেউ আমাদের দিকে তাকায় বাবু তখন আমার কানে কানে বলে ওঠে:"দেখো ওই লোকটা কিন্তু তোমাকে আমার বউ ভাবছে।"
কথাটা একেবারে মিথ্যেও নয়। কারণ ট্রেনে বসার সময়ও কয়েকজন পুরুষ এবং মহিলাও আমাকে শুনিয়ে বলে উঠল:"বউদি একটু বসতে দেবেন।" এমন কথা শুনে বাবু আমাকে দেখিয়ে চোখ নাচিয়ে কথা বলে।
বিকেল নাগাদ আমরা মাসির বাড়ি পৌঁছে গেলাম। আমাদেরকে দেখে মাসি খুব খুশি হল। মাসির বাড়িতে তিনটে ঘর আছে। যার একটাতে মাসি নিজে থাকে আর বাকি দুটোতে জিনিসপত্রে ঠাসা। এবার দেখছি ওপর তলায় একটা ঘর বানিয়েছে। এছাড়া মাসির বাড়িতে একটা কাজের লোক বিশু ও তার বউ ফুলি যে রান্না করে তারা থাকে। আমরা এসে ব্যাগপত্তর রেখে হাত মুখ ধুয়ে বসলাম।
"মাসি তুমি যে বলছিলে তোমার শরীরটা খারাপ কিন্তু এখন দেখছি তুমি তো বেশ ভালোই আছো।"
"আসলে তোদেরকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছিল। তাই আমি তোকে আসতে জেদ করছিলাম।"
"আমি আবার ভাবলাম, না জানি তোমার কি হল! আগামীতে আমার সঙ্গে খবরদার এমন ইয়ার্কি করবে না বলে দিচ্ছি। তুমি জানো আমি কত চিন্তায় ছিলাম?"
"আচ্ছা বাবা ঠিক আছে। তা বাবু রাস্তায় তোদের কোনো অসুবিধা হয়নি তো?"
"না না মাসি। তেমন কিছু না। আসলে খুব দূর তো তাই একটু সময় লেগে যায়।"
"হ্যাঁরে জবা তোর ছেলেটা কিন্তু হেবি দেখতে হয়েছে। কিছু কাজটাজ করে নাকি?"
"না মাসি সেভাবে এখনো কিছু করে না। শুধু ফাজলামি ছাড়া।" আমি বাবুর দিকে তাকালাম। ও চুপচাপ বসে আছে।
"ফাজলামি আবার কি করে শুনি?"
"ওই সারাদিন আমার পিছনে লেগে থাকে। আমাকে জ্বালাতন করে।"
"ওরকম হয়। মা ছেলের ভিতর এসব হয়। ছেলে মার সঙ্গে ইয়ার্কি করবে না তো কার সঙ্গে করবে?"
"হ্যাঁ সে জন্যই তো করে। তা বাবুর মনে আবার অনেক রকম শখও আছে। বুঝলে মাসি?"
"এই বয়সে সবার মনেই শখ থাকে। তোর মুখে দেখছি এর নামে শুধুই অভিযোগ। কোথায় এতটা পথ ক্লান্ত হয়ে এসেছে দু চারটে ভালো কথা বলে ছেলের মন ভালো করবে তা নয় শুধু শুধু ছেলেটার বদনাম গেয়ে বেড়াচ্ছিস তুই।"
"আচ্ছা বাবা করলাম না বদনাম। এখন তো এসেছি সপ্তাহ খানেক তোমার কাছে থাকলেই বুঝতে পারবে আমার ছেলেটা কত ভালো। বাদ দাও ওসব কথা। মাসি তুমি ওপরতলায়ও ঘর বানিয়েছ নাকি?"
"হ্যাঁ রে বানিয়েই ফেললাম। আমার কাছে আসার মতো তো কেউ নেই। তুইই যা আসিস আর জামাই। জামাই আসলে তো পাশের ঘরেই তোদের থাকতে দিতাম। আমার তো এই ঘর ছাড়া ঘুমই আসে না। তাই তোদের থাকার জন্যই ওপরে ঘরটা বানালাম। নিচের ঘরগুলো তো অনেক পুরনো। তাই ওপরতলায় একেবারে নতুন করে বানাতে হল।"
"ভালো করেছ মাসি। আমার তো বাবুর জন্য চিন্তা হচ্ছিল। ওর আবার একটু খোলামেলা জায়গা পছন্দ। তা ওপরে সব ফিটিং টিটিং করা আছে নাকি?"
"গিয়ে একবার দেখে আয় না। তোর ভাল লাগবে। তবে বাবু ওপরে থাকবে। তুই আর আমি এক জায়গায় শোব।"
মাসির ঠোঁটে মুচকি হাসিতে আমার মুখেও হাসি দেখা দিল।
মাসির সঙ্গে ওপর তলায় এসে সত্যিই ভালো লেগে গেল। ওপরতলার অর্ধেক জায়গা জুড়ে একটাই কামরা বানানো হয়েছে। ওপরেই বাথরুম রয়েছে। ঘরের ভিতর দামি খাট পালঙ্ক ড্রেসিং টেবিল আলমারি সব রয়েছে। মাসিকে উদ্দেশ্য করে বললাম:"মাসি তুমি তো থাকবে না। তাহলে এত খরচ করার কি দরকার!"
"তোদের জন্যই করেছি রে। আমি তো দেখেছি তোরা যখনই আসিস কদিন যেতে না যেতেই যাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠিস। তাই এই ব্যবস্থা করলাম। যাতে করে তোদেরও এই মাসির বাড়িটা নিজের বাড়ি বলে মনে হয়। আর এই হতভাগা মাসিটার কাছে যেন বেশি সময় ধরে থাকতে পারিস।"
মাসি যেন একটু ভাবুক হয়ে পড়ল।
"না গো মাসি তুমি ওরকম ভেবো না। আমি তো এ জন্যই তোমার কাছে সব সময় ঘুরে যাই।"