মা ও ছেলের গল্প - অধ্যায় ২০
( পর্ব - 26 ) p {
} আসিফ হনহন করে হেঁটে গিয়ে রাস্তার মোড়ের একটা কালভার্টের ওপর বসল। পিঠের যে জায়গাগুলোতে হাতপাখার বাড়ি পড়েছিল, সেগুলো তখনো চনচন করে জ্বলছে। আসিফ যন্ত্রণায় পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে মনে মনে ভাবল, " আমার কি কোনো সম্মান নেই?" রাগে আর অপমানে সে ঠিক করল, আজ রাতে সে আর কোনোভাবেই বাসায় ফিরবে না।
p {
} ওদিকে আসিফ ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর রাবেয়া বেগমের রাগ মুহূর্তের মধ্যে ভীতিতে রূপ নিল। ঘড়ির কাঁটা যখন রাত ১০টা পার হলো, তখন তাঁর বুকটা আশঙ্কায় কাঁপতে লাগল। তিনি ছটফট করতে করতে বারবার দরজার বাইরে গিয়ে উঁকি দিতে লাগলেন। রাগ যতই থাকুক, ছেলের ওপর কোনো বিপদ এলো কি না—এই চিন্তায় রাবেয়া বেগমের চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে লাগল।
p {
} তিনি আর থাকতে না পেরে কাঁপতে কাঁপতে নিজের ফোনটা হাতে নিলেন এবং আসিফের নম্বরে ডায়াল করলেন।
p {
} কালভার্টের ওপর বসে থাকা আসিফের পকেটে হঠাৎ ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে 'মা' লেখাটি দেখে তার অভিমানী মনটা আরও ভারী হয়ে উঠল। সে ধীরহাতে ফোনটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরল, কিন্তু নিজে কোনো কথা বলল না।
p {
} ওপাশ থেকে রাবেয়া বেগমের প্রচণ্ড কান্নাভেজা এবং আকুল কণ্ঠ ভেসে এলো। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "আসিফ! তুই কোথায় আছিস বাবা? তুই যা বলবি আমি তাই করব, তুই যেভাবে থাকতে বলবি আমি সেভাবেই থাকব। আর কখনো তোর ওপর এভাবে রাগ করব না, হাতও তুলব না। দোহাই তোর, এই রাতের বেলা আমাকে একা ফেলে রাখিস না, জলদি বাড়ি ফিরে আয় বাবা!"
p {
} মায়ের মুখ থেকে "তুই যা বলবি তাই করব" এই অসহায় আত্মসমর্পণটি শোনার পর আসিফ তার অভিমানী ও জেদি ভাবটা বজায় রেখে ফোনের স্পিকারে অত্যন্ত স্পষ্ট ও গম্ভীর গলায় বলল, "শোনো, এই রাবেয়া বেগম! তুমি যে কথায় কথায় হাতপাখা দিয়ে আমাকে চটাচট পিটিয়ে দিলে, আমার কি কোনো সম্মান নেই? আজ থেকে আমি তোমাকে আর মা বলে ডাকব না। আজ থেকে তোমাকে 'রাবেয়া বেগম' বলেই ডাকব। যদি এই শর্তে রাজি থাকো, তবেই আমি বাড়ি ফিরব, নাহলে আজ রাতে আমি আর আসছি না!"
p {
} ফোনে ছেলের মুখ থেকে সরাসরি এমন নাম ধরে ডাকার ঘোষণা শুনে রাবেয়া বেগম এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। নিজের ২৭ বছরের ছেলের মুখে "এই রাবেয়া বেগম" ডাক শুনে তাঁর ৪৫ বছরের গম্ভীর মনে এক অদ্ভুত ধাক্কা লাগল। কিন্তু এই মাঝরাতে ছেলের নিরাপত্তা আর তাকে ঘরে ফেরানোর ব্যাকুলতা তাঁর সমস্ত সামাজিক নিয়ম আর নিয়মানুবর্তিতার চেয়ে অনেক বড় হয়ে দাঁড়াল।
p {
} তিনি চোখের জল মুছে, অত্যন্ত লজ্জিত অথচ ভীষণ নরম গলায় ফোনে বললেন, "আচ্ছা বাবা আচ্ছা, তুই আমাকে মা না ডেকে আজ থেকে 'রাবেয়া বেগম' বলেই ডাকিস। তুই যেভাবে খুশি ডাক, আমি কিচ্ছু মনে করব না। তুই যা বলবি আমি তাই শুনব। শুধু এই রাতের বেলা আর বাইরে থাকিস না বাবা, জলদি ঘরে ফিরে আয়।"
p {
} মায়ের এই নিঃশর্ত ও আবেগময় আত্মসমর্পণ শোনার পর আসিফের ভেতরের সমস্ত রাগ আর জেদ এক সেকেন্ডে জল হয়ে গেল। সে ফোনটা পকেটে পুরে দ্রুত পায়ে বাসার দিকে রওনা হলো।
p {
} সিঁড়ি দিয়ে হনহন করে উঠে সে যখন ঘরের মেইন দরজার সামনে এলো, দেখল দরজাটা খোলাই আছে। সে ভেতরে পা রাখতেই দেখল রাবেয়া বেগম ড্রইংরুমের সোফায় একা বসে ছটফট করছেন এবং তাঁর চোখ দুটো কান্নায় লাল হয়ে আছে।
p {
} আসিফ সটান মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে মিষ্টি এক সুরে ডাক দিল, "কী গো রাবেয়া বেগম? দরজার সামনেই তো চলে এলাম!"
p {
} নিজের ছেলের মুখে নিজের নাম ধরে এমন স্পষ্ট উচ্চারণ শুনে রাবেয়া বেগমের পুরো মুখটা মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। ৪৫ বছর বয়সী এক গম্ভীর ও রাগী মায়ের মুখে এমন শিশুর মতো লজ্জা আসিফ আগে কখনো দেখেনি। তিনি লজ্জায় চোখ দুটো নিচু করে, শাড়ির আঁচলটা একটু আঙুলে জড়াতে জড়াতে ফিসফিস করে বললেন, "তুই... তুই সত্যি সত্যি আমাকে নাম ধরে ডাকলি আসিফ? কেমন যেন অদ্ভুত শোনাচ্ছে রে বাবা!"
p {
} আসিফ মুচকি হেসে মায়ের আরেকটু কাছে এগিয়ে গেল। সে বলল, "কেন রাবেয়া বেগম? ফোনে তো তুমি নিজেই রাজি হলে। এখন লজ্জা পেলে তো চলবে না!"
p {
} ছেলের এমন আদুরে ও রসিকতা ভরা "রাবেয়া বেগম" ডাক শুনে মায়ের মনের ভেতরের সব ভয় আর কান্না নিমেষেই ধুয়ে মুছে গেল। তিনি আর নিজের মুখে রাগ ধরে রাখতে পারলেন না। লজ্জা মাখানো এক চিলতে চওড়া হাসি তাঁর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল। তিনি আসিফের পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, "পাকা ছেলে কোথাকার! তুই যা খুশি ডাক, শুধু আমার চোখের সামনে শান্তিতে থাক, তাতেই আমার সুখ।"
p {
} তারপর কি হলো জানতে হলে লাইক রেপু দিন।"