মা ও ছেলের গল্প - অধ্যায় ২৫
( পর্ব - 31 )
রাবেয়া বেগম আসিফকে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে দেখে আর নিজের মনকে ধরে রাখতে পারলেন না। ছেলের আগের সমস্ত নোংরা ও কুরুচিপূর্ণ আচরণ একপাশে সরিয়ে রেখে, কেবল তার এই তীব্র রোদে কষ্ট পাওয়ার কথা চিন্তা করে মায়ের মন আবার আকুল হয়ে উঠল।
তিনি আসিফের পিছন থেকে অত্যন্ত নরম, মায়াবী আর কিছুটা ক্লান্ত গলায় ডেকে বললেন,
রাবেয়া বেগম : "থাক আসিফ, এই কড়া রৌদে আর বাইরে যেতে হবে না। দুপুরের সূর্য এখন মাথার ওপর, এই আগুনে রোদের মধ্যে আবার হেঁটে বাজারে গেলে তুই অসুস্থ হয়ে পড়বি বাবা। প্যাকেটটি ওখানেই রেখে দে।"
আসিফ দরজার কাছ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে মায়ের দিকে তাকাল। সে হাতের প্যাকেটটি আলতো করে চেপে ধরে অত্যন্ত কৌতূহলী ও নিচু গলায় বলল,
আসিফ : "কেন মা? তুমি এগুলো পরবে?"
আসিফের এই আকুল আর কৌতূহলী প্রশ্ন শুনে রাবেয়া বেগম চরম এক লজ্জায় ও দ্বিধায় পড়ে গেলেন। তাঁর ফর্সা মুখটা আবার একটু লাল হয়ে উঠল, কিন্তু ছেলের এই তীব্র কড়া রোদে বাজারে গিয়ে কষ্ট পাওয়ার কথা চিন্তা করে তিনি নিজের সমস্ত লজ্জা আর আড়ষ্টতা একপাশে সরিয়ে রাখলেন।
তিনি কাপড়গুলোর দিকে না তাকিয়ে, চোখ দুটো সামান্য নিচু করে অত্যন্ত মৃদু আর জড়তাহীন গলায় বললেন,
রাবেয়া বেগম : "তা... আমার ভালো লাগলে পরবো খন। তুই আর এই রোদের মধ্যে বাইরে যাওয়ার কথা চিন্তা করিস না। প্যাকেটটি ওখানেই আলমারিতে তুলে রাখ।"
আসিফ মায়ের মুখ থেকে এমন পরম প্রশ্রয় আর স্নেহের কথা শুনে এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তার ভেতরের এতক্ষণের ভয় আর অস্বস্তি নিমেষেই কেটে গেল। সে প্যাকেটটি গুছিয়ে আলমারিতে রাখতে রাখতে অত্যন্ত নরম আর বাধ্য ছেলের মতো সুরে বলল,
আসিফ : "আচ্ছা মা, তা আমি রেখে দিচ্ছি, তুমি পরে নিও।"
এই কথাটি বলার পর ঘরের ভেতরের সব থমথমে ভাব আর তীব্র লজ্জার আমেজ এক অনাবিল পারিবারিক শান্তিতে রূপ নিল। রাবেয়া বেগম ছেলের এই বাধ্য রূপ দেখে মনে মনে অনেক খুশি হলেন এবং তাঁর মুখের কোণে এক চিলতে চওড়া মাতৃত্বের হাসি ফুটে উঠল।
এই তীব্র গরমে ঘরের বাতাসেও যেন শরীরটা জুড়াচ্ছিল না। রাবেয়া বেগম আঁচল দিয়ে কপালের সামান্য ঘাম মুছতে মুছতে অত্যন্ত আনন্দিত ও উৎসাহী গলায় বললেন, "এখন চল আসিফ, অনেক দিন হয়েছে পুকুরের পানিতে গোসল করিনি। এই গরমে পুকুরের ঠাণ্ডা পানিতে একটু ডুব দিলে শরীর-মন দুই-ই জুড়াবে।"
আসিফ মায়ের কথার পিঠে মাথা নেড়ে একটু চিন্তিত গলায় বলল,
আসিফ : "ওখানে তো কাপড় পালটানোর জায়গা নেই মা। তুমি গোসল করে ভিজে জামাকাপড় পালটাবে কীভাবে? আমি তো ছেলে মানুষ।"
রাবেয়া বেগম আসিফের কথা শুনে মুচকি হাসলেন এবং অভয় দেওয়ার সুরে বললেন,
রাবেয়া বেগম : "আরে বোকা ছেলে! ওখানে এখন আর কেউ গোসল করে না। ঘাটটা একদম ফাঁকা থাকে, তাই কাপড় পালটানো নিয়ে তোকে অত চিন্তা করতে হবে না।"
আসিফ মায়ের কথা শুনে এক গাল হেসে উৎসাহী গলায় বলল,
আসিফ : "চলো তাহলে, দুজনে মিলেই গোসল করে আসি। এই কড়া গরমে পুকুরের ঠাণ্ডা পানিতে ডুব দিলে মন-প্রাণ একদম ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।"
ছেলের এই আনন্দ দেখে রাবেয়া বেগমের মনটাও খুশিতে ভরে উঠল। রাবেয়া বেগম আলমারি থেকে কাপড় বের করতে করতে আসিফের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও স্নেহভরা গলায় বললেন,
রাবেয়া বেগম : "আসিফ বাবা, তুই তোর এই শার্ট-প্যান্টটা পালটিয়ে আর একটা গামছা পরে নে। প্যান্ট পরে তো আর পুকুরের পানিতে ডুব দেওয়া যাবে না, ভারী হয়ে থাকবে। গামছা পরে নিলে গোসল করতে সুবিধা হবে।"
মায়ের এই চেনা ও চিরন্তন উপদেশ শুনে আসিফ মাথা নাড়ল এবং মায়ের কথা মতো নিজের ঘরের দিকে গেল পোশাক পালটে নেয়ার জন্য।
আসিফ পোশাক পালটে গামছা পরে এসে মায়ের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল,
আসিফ : "মা, তুমিও গা থেকে ভারী শাড়িটা খুলে শুধু ছায়া আর ব্লাউজ পরে পুকুরে নামো। শাড়ি পরে পানিতে নামলে কাপড় ভারী হয়ে যাবে, আর গোসল করতেও তোমার কষ্ট হবে।"
রাবেয়া বেগম আসিফের কথার পিঠে মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন। তিনি পরম স্নেহে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
রাবেয়া বেগম : "তুই ঠিকই বলেছিস বাবু, ভারী শাড়ি পেঁচিয়ে পানিতে নামলে কাপড় একদম চুবচুপে হয়ে থাকবে, সাঁতার কাটতেও সমস্যা হবে। আর শোন, গোসলে যাওয়ার আগে ঘর থেকে সাবান আর গা ডলনিটাও সাথে নিয়ে নিতে হবে। অনেক দিন পর পুকুরে নামছি, ভালো করে গা ধুয়ে নিলে শরীরটা একদম হালকা লাগবে।"
মায়ের এই চেনা ও চিরন্তন যত্নের কথা শুনে আসিফ এক গাল হাসল। সে দ্রুত বাথরুমের তাক থেকে সাবানের কেস আর গা ডলনিটা হাতে তুলে নিল। এরপর মা ও ছেলে দুপুরের কড়া রোদ মাড়িয়ে, গাছগাছালিতে ঘেরা বাড়ির পেছনের চেনা ও শান্ত পুকুরঘাটের দিকে ধীরপায়ে রওনা হলেন।
তারপর কি হলো জানতে হলে লাইক ও রেপুটেশন দিয়ে দিন।