মায়ের প্রেম - অধ্যায় ২৮
আটাশ
সেদিন রাতে ঘুম আসতে দেরি হয় আমার । মা লক্ষ করে ব্যাপারটা । বলে -কিরে? তোর পেটে কি এখনো ব্যাথা হচ্ছে নাকি ? ঠিক করে বলতো পেট খারাপ হয়েছে না কি আমাশা হয়েছে ? পেট কুন কুন করছে কি?
আমি বলি -না না । আসলে বোধয় পেটটা একটু গরম হয়ে গেছে তাই ঘুম আসছেনা ।
মনে একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি উদ্ভব হয় । চুমকিদির শাসানি শুনে ভেতরে ভেতরে বেশ ভয় হয় আবার একটা অদ্ভুত আনন্দের চোরা স্রোত মনের মধ্যে বইতে থাকে এটা ভেবে যে নীলাঞ্জনা ওর কোন বান্ধবীকে বলেছে যে আমাকে নাকি ওর খুব ভাল লাগে । নীলাঞ্জনা চোখ ধাঁধানো সুন্দরী না হলেও দেখতে শুনতে বেশ ভাল । ফর্সা, ঘরোয়া, শারীরিক গঠন একটু মোটার দিকে, কিন্তু আর মুখটা একবারে জগদ্ধাত্রী ঠাকুরের মতো মিষ্টি । টানা টানা চোখ দুটো সত্যি মন কেমন করে দেয় ।
নীলাঞ্জনা আমার সাথে তরুণ বাবুর কাছে সায়েন্স পড়া ছাড়াও আমার সাথে অমর বাবুর কাছেও ইংরেজি পরে । একই ব্যাচ । ফলে রোজই আমার সাথে ওর দেখা হয় । একদিন টিউশন কামাই করলে আমরা একে ওপরের কাছে থেকে নোট এক্সচেঞ্জ করি । সেই সুত্রেই আমার সাথে ওর একটু বেশি গল্প হয় । তবে আমি কিন্তু কোনদিন বুঝতে পারিনি যে নীলাঞ্জনা আমাকে মনে মনে পছন্দ করে । সত্যি নীলাঞ্জনার মতো একটা মেয়ের সাথে প্রেম করতে পারলে বেশ হতো । এর পরেই চুমকিদির শাসানির মনে পরে । কে জানে বাবা কি ঘোঁট পাকাবে ও । বলেছে নীলাঞ্জনাকে নাকি দেখে নেবে । কি দেখে নেবে? নীলাঞ্জনা তো চুমকিদি কে চেনেইনা, ওকে পাত্তাও দেবেনা নীলাঞ্জনা । এই সব চিন্তা করতে করতে সেদিন আমার ঘুমাতে প্রায় রাত আড়াইটে বেজে যায় ।
পরের দিন দুরুদুরু বক্ষে তরুণ স্যারের বাড়ি টিউশন নিতে যাই । তরুণ স্যারের কাছে এক একটা ব্যাচে প্রায় ১০- ১২ জন করে পড়ে । ওখানে আমরা সবাই মাটিতে বসে পড়াশুনো করি এমনকি তরুণ স্যারও আমাদের সঙ্গে মাটিতেই বসেন । উনি শুধু একটা ডিজাইন করা আসুনে বসেন আর আমাদের জন্য মাটিতে দুটো বেশ বড় বড় মাদুর পাতা থাকে । আমাদের ব্যাচে আরো বেশ কতগুলো মেয়ে পড়ে বলে নীলাঞ্জনা ওদের সাথেই বসে । কিন্তু ইংরেজি স্যার অমরবাবুর বাড়িতে টিউশন নিতে গেলে আমরা পাশাপাশি বসি , কারণ ওখানে এক একটা বাচে মাত্র পাঁচ ছয় জন করে পড়ে, তাছাড়া ওই ব্যাচে আর কোন মেয়ে নেই । সেদিন আমি একটু আগেই তরুণ স্যারের বাড়ি পৌঁছে যাই । নীলাঞ্জনার অপেক্ষায় বেশ কিছুক্ষন বসে থাকার পরে দেখি ব্যাগ পিঠে করে ও আসে । কিন্তু ও ঘরে ঢুকতেই বুঝতে পারি কিছু একটা হয়েছে । ও আমাকে দেখেই মুখ ফিরিয়ে নেয় তারপর অন্য মেয়েদের পাশে বসে খাতা খুলে কি সব যেন টুকতে থাকে। আমি বুঝি নিশ্চই কিছু হয়েছে । তরুণ বাবুর ওখানে টিউশন নেওয়া হয়ে গেলে আমি স্যারের বাড়ির গেটের সামনে নীলাঞ্জনার বেরনোর জন্য অপেক্ষা করি । একটু পরেই নীলাঞ্জনাও বেরয় । কিন্তু আমাকে দেখেও পাত্তা না দিয়ে পাশ দিয়ে চলে যায় । বুঝতে পারিনা কি হচ্ছে ব্যাপারটা । অথচ চুমকিদির কথা মতো নীলাঞ্জনা আমাকে মনে মনে চায় । সে তার এক বান্ধবীকে এই কথা বলেছে । তাছাড়া আমি আর নীলাঞ্জনা স্যারের বাড়ি থেকে টিউশন নেবার পর বেশ কিছুটা পথ এক সঙ্গে সাইকেল চালিয়ে আসি । আমি নীলাঞ্জনার পিছু নিই । ও আমাকে পেছনে আসতে দেখে সাইকেলের স্পিড বাড়ায় । আমি ওকে ডাকি, বলি -এই নীলাঞ্জনা একটু দাঁড়া , তোর সঙ্গে আমার কথা আছে । ও রাস্তার একপাশে সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়ায় । আমি ওর কাছে পৌঁছে ওকে জিজ্ঞেস করি -হ্যাঁরে কিছু হয়েছে? তুই আজ যেন আমাকে দেখেও না দেখার ভান করছিস ?
নীলাঞ্জনা আমাকে শক্ত মুখে বলে -আমি জানতাম না যে তুই এতো বাজে বাজে মেয়ের সাথে মিশিস । আমি জানতাম তুই খুব সরল আর সাধাসিধে ছেলে । সেই জন্যই আমি তোর সাথে বন্ধুত্ত্ব করেছিলাম ।
আমি বলি -কি সব যা তা বলছিস ? কার সাথে মিশি আমি ?
নীলাঞ্জনা চোয়াল শক্ত করে বলে -তোর ওই চুমকি আমাকে ফোন করে কি সব বাজে বাজে কথা বলেছে জানিস তুই ?
আমি এবার বেশ ঘাবড়ে যাই, বলি -কি বলছে তোকে চুমকিদি ?
-বলেছে আমি যদি তোর সাথে গল্প করি তাহলে ও লোক দিয়ে আমার মুখে অ্যাসিড মেরে দেবে ।
আমি বলি -আরে ওর কথা ছাড়, ও মেয়েটা পাগলী, তুই ওর কথা বিশ্বাস করিসনা । ও অনেককেই ওরকম করে ভয় দেখায়, ওর অনেক বয়ফ্রেন্ড আছে, কাউকেই অন্য মেয়ের সাথে কথা বলতে দেয়না ।
নীলাঞ্জনা বলে -তাহলে তুই স্বীকার করছিস যে তুই ওর অনেক বয়ফ্রেন্ডের মধ্যে একজন ।
আমি বলি -না রে বাবা না , আমি ওর কিচ্ছু নই । তুই কি জানিস ও আমার থেকে এক বছরের বড় আর ও এখন কলকাতায় থাকে ।
নীলাঞ্জনা এবার একটু অবাক হয় । বলে -কলকাতায় থাকে? তাহলে তোর সাথে ওর কি আছে ?
আমি বলি -চুমকিদি তো আগে এখানে ওর মা বাবার কাছে থাকতো তারপর বদসংগে পরে যায় বলে ওর মা বাবা ওকে কলকাতায় ওর মাসির বাড়ি পাঠিয়ে দেয় ।
নীলাঞ্জনার শক্ত চোয়াল এবার একটু নরম হয় । বলে -কি বাজে মেয়েরে বাবা, আমাকে ইংরেজিতে কি অসভ্ভো অসভ্ভো গালি দিচ্ছিল জানিস ? আমার তো এটা ভেবেই রাগ হয়ে গিয়েছিল যে তুই এরকম একটা বাজে মেয়ের সঙ্গে মিশিস ।
আমি বলি -না রে বাবা না , মুখ চেনা , সেরকম নয় ।
নীলাঞ্জনার মুখে এবার হাঁসি ফোটে ।বলে -ও তাই বল, একতরফা প্রেম ।
এর পর আমরা পাশাপাশি সাইকেল চালাতে চালাতে আবার অন্য দিনের মত বাড়ি ফিরি । পরের দিন আবার ইরেজি স্যারের বাড়িতে দেখা হয় আমাদের । নীলাঞ্জনা আজ একটু বেশিই গল্প করে আমার সাথে । টিউশন শেষ হয়ে যাবার পরও আমরা একসাথে গল্প করতে করতে ফিরি । আমাদের ফেরার পথে একটা ছোট পার্ক পরে। নীলাঞ্জনা বলে -এই টুবলু , চল ওই পার্কে একটু বসবি? তোকে আমার একটা কথা বলার আছে ।
আমি বলি -হ্যাঁ চল ।
বুকের ভেতর দুম দুম করে ঢাক বাজতে থাকে । কি জানি নীলাঞ্জনা কি বলবে ? আমরা সাইকেল স্ট্যান্ড করে পার্কের একটা সিমেন্ট বাঁধানো ধাপিতে বসি । অমরবাবুর কাছে আমরা টিউশন নিতে যাই ভোরে । ওনার ব্যাচ স্টার্ট হয় সকাল সাড়ে ছটা থেকে, চলে সকাল আটটা পর্যন্ত । এই সময় পার্কে তাই কোন লোকজন নেই ।
নীলাঞ্জনা আমাকে বলে -টুবলু তোর এমন কোন মেয়ে বন্ধু আছে যাকে তুই ভালবাসিস ?
আমি বলি -না আমার সেরকম কেউ নেই যাকে আমি ভালবাসি ।
নীলাঞ্জনা এবার বলে -দেখ কিছুদিন থেকেই একটা কথা তোকে বলবো বলবো ভাবছি কিন্তু বলতে পারছিনা । আমি আমার এক বান্ধবীকে বলেছিলাম আমার মনের কথাটা । সে বললো যে ভাবেই হোক তোকে জানিয়ে দিতে । দেখ আমার তোকে খুব ভাল লাগে । কেন জানিনা । বেশ কয়েক মাস ধরেই বুঝতে পারছি ব্যাপারটা । তুই কোন কারনে একদিন স্যারের কাছে পড়তে না এলে আমার কি রকম যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে । তোর সাথে খুব গল্প করতে ইচ্ছে করে । তোর সাথে এদিক ওদিক ঘুরতে যেতেও খুব ইচ্ছে করে । মনে হচ্ছে আমি তোকে ভালবাসি । তোর কি আমার ব্যাপারে এরকম মনে হয় ?
আমার মনটা ওর কথা শুনে আনন্দে নেচে ওঠে । বলি -হ্যাঁ রে, আমারো তোকে খুব ভাল্লাগে, তোর সাথে আমারো খুব গল্প করতে ইচ্ছে হয় । নীলাঞ্জনা আমার চোখে চোখ রেখে বলে -তুই আমাকে ভালবাসবি টুবলু ? দেখ আমার তো বাবা নেই , আমার বাবা আমাদের কে ছেড়ে চলে গেছেন । উনি মাকে ছেড়ে অন্য আর একজনকে বিয়ে করেছেন । আমার মা একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে কোন রকমে আমি আর আমার বোনের খরচ চালান । প্লিজ আমাকে কোন দিন ঠকাস না । যদি আমাকে তোর কোন দিন ভাল না লাগে তাহলে যাস্ট একবার আমাকে বলে দিস, আমি নিজেই সরে যাব তোর কাছ থেকে । কিন্তু প্লিজ ভালবাসার মিথ্যে অভিনয় করিস না কোনদিন আমার সাথে । বাবাকে হারানোর দুঃখ অনেক কষ্টে সহ্য করেছি আমি । কিন্তু পছন্দের মানুষের ঠকানো সহ্য করতে পারবোনা । দেখ আমরা এখন খুবই ছোট। এখন আমরা বন্ধুই থাকি। পরে বড় হলে যদি আমাদের দুজন দুজনকে এখনকার মতোই ভাল্লাগে তাহলে আমরা আরো এগোবো কেমন ?
আমি বলি -ঠিক আছে । তারপর ওখান থেকে উঠি আমরা, ফেরার সময়ও গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরি আমরা । সেদিন মনটা দারুন খুশি খুশি লাগে আমার । মনে হয় যেন পৃথিবীর রংটা বদলে গেছে , এই পৃথিবীর সব কিছুই যেন বড় রঙিন ।
পরের দিন তরুণ স্যারের কাছে গিয়ে দেখি নীলঞ্জনা আসেনি । বুঝতে পারিনা কি হয়েছে । খুব চিন্তা হয় ওর জন্য । ওকে ফোন করি । কিন্তু ও ফোন তোলেনা । পরের দিন ইরেজি স্যারের বাড়িতে গিয়েও শুনি নীলাঞ্জনা আসবেনা । বুঝতে পারিনা ঠিক কি ব্যাপার ? সেদিনও ওকে ফোন করি কিন্তু ও ফোন তোলেনা । আগের দিন এতো কথা হলো অথচ নীলাঞ্জনা এরকম করছে কেন বুঝতে পারিনা । এক সপ্তাহ মতো পরে জানতে পারি নীলাঞ্জনা তরুণ বাবু আর অমর বাবু দুজনের কাছেই ব্যাচের সময় চেঞ্জ করে নিয়েছে । মানে ও অন্য ব্যাচে আসে । এই বার যেন ঈশান কোন মেঘ দেখতে পাই আমি । তরুণ বাবুর ছেলের কাছ থেকে জেনে নিই কোন ব্যাচে আসছে ও । সেই মত একদিন তরুণবাবুর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকি । ব্যাচ শেষ হলে নীলাঞ্জনা বেরোয়। বেরিয়েই আমাকে দেখে থমকে দাঁড়ায় । আমি রাস্তার অন্য দিকে দাঁড়িয়ে ছিলাম । নীলাঞ্জনা একটু অপেক্ষা করে অন্য ছেলে মেয়েদের চলে যাবার । তারপর এক হাতে সাইকেল ধরে রাস্তা পেরিয়ে আমার কাছে আসে ।
আমি বলি -কি হল রে? তুই আমার ফোন ধরছিসনা , ব্যাচও চেঞ্জ করে নিয়েছিস শুনলাম । কি হয়েছে তোর , সেদিন তোর সাথে এতো কথা হলো তারপর থেকে তুই উধাও ।
নীলাঞ্জনা কিছু বলেনা, কিন্তু ওর চোখে জল টলটল করে ওঠে । বলে -তুই আমাকে সেদিন সত্যি কথা বলিসনি টুবলু ।
আমি বলি -আমি কি সত্যি কথা বলিনি তোকে নীলাঞ্জনা ?
নীলাঞ্জনা বলে -তুই আমাকে বলিসনি যে তুই চুমকির মাল ।
আমি বলি -কি ? কার মাল ?
নীলাঞ্জনা বলে -তোর সাথে যে দিন পার্কে বসে কথা হলো তার পরের দিন তরুণ বাবুর কাছে পড়তে আসার সময় আমাদের পাড়ার সামনেই তিনটে ছেলে আমাকে ঘিরে ধরে । ওরা আমার বেরনোর জন্য অপেক্ষা করছিল । আমাকে ঘিরে ধরে মোটরবাইকে করে গোঁ গোঁ করে আমার চার পাশে চক্কর দেয় । বলে "চুমকির মালের দিকে নজর দিলে তোকে আমরা তুলে নিয়ে গিয়ে রেপ করে তোর বাড়ির সামনে ফেলে দিয়ে যাব" । আমি বলি "তোমারা কে ? কেন আমার সাথে এরকম করছো" ?
ওরা নোংরা নোংরা গালি দেয় আমাকে, বলে "খানকি মাগি সেটা তোর জানার দরকার নেই । শুধু এটা জেনে রাখ যে আজ তোকে আমরা লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম । শুধরে যা নাহলে ভাল হবেনা তোর । কোন সাহসে তুই চুমকির মালের দিকে হাত বাড়িয়েছিস । কি ভেবেছিস তুই? চুমকি কলকাতায় থাকে বলে সেই সুজগে তুই চুমকির মাল তুলে নিবি "?
নীলাঞ্জনা কাঁদতে থাকে এবার। বলে -আমার কপালটাই খারাপ ।
আমি বলি -শোন নীলাঞ্জনা, ও তোকে ভয় দেখতে ওর কোন বন্ধু ফন্ধু কে পাঠিয়েছে । ওর বস্তির ছেলেদের সাথেও খুব ওঠা বসা ছিল এখানে থাকার সময় । তাদেরই কাউকে বলে এসব করিয়েছে ।
নীলাঞ্জনা বলে -আমি তোদের হাউসিং সোসাইটির একটা মেয়েকেও তোর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছি পরশু দিন । ওর দিদি চুমকির খুব বন্ধু । সেও আমাকে বললো যে আমাদের হাউসিং সোসাইটির সব মেয়েরা জানে টুবলু চুমকির মাল । আমি কি করে জানবো বল? আমি তো আর তোদের ওই হাউসিং সোসাইটির দামি ফ্ল্যাটে থাকিনা । আমি আমার মা আর বোন একটা ছোট দু কামড়ার ভাড়া বাড়িতে থাকি । আমরা খুব গরীবরে টুবলু , সত্যি খুব গরিব । আমি ওই চুমকির সাথে পারবোনা । এই বলে নীলাঞ্জনা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে ।
আমি বলি -নীলাঞ্জনা তুই কি সব যা তা বলছিস । আমার সাথে চুমকিদির কিছু নেই ।
এবার ঘাঁক করে চাঁচিয়ে ওঠে নীলাঞ্জনা , বলে -নেই তো তোর জন্য ওরকম পাগলামি করছে কেন মেয়েটা ? কোন মেয়ে এরকম কেন করবে যদি সে জানে তার প্রেম এক তরফা ।
আমি নীলাঞ্জনাকে শান্ত গলায় বোঝতে যাই যে ও যা ভাবছে তা ঠিক নয় । নীলাঞ্জনা কোন কথা শোনেনা আমার, বলে -তোর সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ । আমার সাথে আর কোনদিন কথা বলবিনা তুই ।
আমি শেষ চেষ্টা করি একবার , বলি -নীলাঞ্জনা তুই একবারটি আমার কথা ঠান্ডা মাথায় শোন ।
নীলাঞ্জনা শোনেনা । বলে -আমি ওই চুমকির ছবি দেখেছি । আমাকে আমার ওই বান্ধবী ওর ফেসবুক লিংকটা পাঠিয়েছে । আমি ওর প্রোফাইল চেক করেছি । ওর মতো সুন্দরী মেয়ে আমাদের বাঙালিদের মধ্যে বড় একটা দেখা যায়না । আমি ওর সাথে তোকে নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে পারবোনা । আমি জানি ওরকম সুন্দরী মেয়েকে না বলে কোন পুরুষমানুষ বেশিদিন থাকতে পারেনা । হয়তো তুই এখন আমাকে সত্যি বলছিলি কিন্তু আমি জানি আজ বা কাল তুই ঠিক আমাকে ছেড়ে যেতিস । ওই রকম সুন্দরী বড় লোকের মেয়েকে উপেক্ষা করা কারুর পক্ষেই সম্ভব নয় । আর তুই কি ওর ফেসবুকে রিলেশানশিপ স্ট্যাটাসটা দেখিস নি ?
আমি বোকার মতো থাকিয়ে থাকি নীলাঞ্জনার দিকে চেয়ে । ও চোখের জল মুছতে মুছতে বিড়বিড় করে বলে -তোর কোন দোষ নেইরে টুবলু, আসলে আমার কপালটাই খুব খারাপ । আমার বাবা নেই , একটা মাত্র ছেলেকে ভালবাসলাম , তাও ওপর ওলার সহ্য হলোনা, একটা বড় লোকের দারুন সুন্দরী মেয়েকে দিয়ে কেড়ে নিলো তোকে আমার কাছ থেকে । সবাই বলছে ক্লাস সেভেন থেকেই নাকি তোকে বুক করে বসে আছে মাগীটা । সবাই জানে তুই চুমকির মাল শুধু আমিই জানিনা । আমি শুধু শুধু বোকার মতো তোর কথা ভেবে ভেবে .. .ফুঁপিয়ে ওঠে নীলাঞ্জনা। ...তারপর চোখের জল মুছতে মুছতে সাইকেলে চেপে চলে যায় ।
আমি হতবম্ভের মতো ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকি । ক্লান্ত হয়ে টোলতে টোলতে বাড়িতে ফিরে ধপ করে বিছনায় শুয়ে পড়ি ।
মা বলে -কি রে? শরীর খারাপ নাকি তোর ?
আমি বলি -না ,মাথাটা একটু ঘুরছে । তুমি ব্যাস্ত হয়োনা ,মনে হচ্ছে রোদ লেগে হয়েছে ।
মা বলে -দাঁড়া তোকে একটু নুন চিনি শরবত করে দিচ্ছি ।
আমি নিজের মোবাইলটা বার করে ফেসবুকে চুমকিদির নাম সার্চ করি । একটু চেষ্টা করতেই পেয়ে যাই ।
চুমকিদির ডাক নামে নেই প্রোফাইলটা । ভাল নামে আছে । কারিনা ব্যানার্জি । একগাদা ফটোতে ভর্তি ওর প্রোফাইল । বেশির ভাগই ফ্লিম ষ্টারদের ঢঙে তোলা । ফ্রেন্ড লিস্ট দেখি প্রায় দেড় হাজার ছাড়িয়ে গেছে ওর । বাপরে বাপ, আমার তো ফ্রেন্ড লিস্ট সবে মাত্র ১০০ পার হয়েছে । বেশির ভাগই ইয়ং ছেলে ওর ফ্রেন্ড লিস্টে । ও এক একটা ছবি পোস্ট করেছে আর তাতে অন্তত পাঁচশো সাতশো লাইক আর তিন চারশো কমেন্ট পরেছে । সবাই খালি ওর রূপের প্রশংসা করছে । "উফ তুমি কি সুন্দর" , "তোমার মতো সুন্দরী আমি কখনো দেখিনি" , "তোমার মা বা বাবার মধ্যে কেউ কি ইউরোপিয়ান "? 'তুমি ফিল্মে নাম না কেন"? "আই লাভ ইউ" , "তুমি কি আমাকে একটু ভাল বসবে" ?
কত রকমের সব কমেন্ট করছে লোকে । একটা মাঝ বয়সী লোক কমেন্ট করেছে , "আমি বিবাহিত ,আমার দুটো বাচ্চা আছে, কিন্তু তুমি রাজি হলে আমি তোমার সাথে এক কথায় ঘর ছাড়তে রাজি" । কয়েকটা কমেন্ট পরে তো গা ঘিনঘিন করে । এক জন লিখেছে 'আই ওয়ান্ট টু মেক ইউ প্রেগনেন্ট বেবি" । উত্তরে চুমকিদি লিখেছে "এস সোনা, আমাকে প্রেগনেন্ট করে যাও" । আর একজন লিখেছে "আমার নুনুটা একটু চুষবে তুমি লক্ষীটি ? চুমকি দি উত্তর দিয়েছে - "আমি জানিনা তুমি কোথায় থাক, কি কর? কিন্তু তোমার নুনুটা চুষে চুষে তোমার দুধ বার করতে পারলে আমার ভালোই লাগতো" ।
না আমি আর পড়তে পারিনা এসব নোংরা নোংরা কথা । ওর মা বাবা দেখেনা নাকি মেয়ের ফেসবুক প্রোফাইলের কি অবস্থা ? সবে ফেসবুকটা বন্ধ করবো বলে মোবাইলে হাত দিতে যাচ্ছি এমন সময় ওর প্রোফাইলের একটা অংশে চোখ চলে গেল । রিলেশনশিপ স্টেটাস - এনগেজেড উইথ সুপ্রতীম দাস ব্রাকেটে টুবলু । ও হ্যাঁ আপনাদের তো আগে বলাই হয় নি, আমার ভাল নাম সুপ্রতীম । সুপ্রতীম দাস ।
(চলবে )