মায়ের প্রেম - অধ্যায় ৩২
বত্রিশ
আমি বললাম -তা তোমাদের বিয়ের ব্যাপারে কি কিছু দিন ঠিক হয়েছে ?
মা বলে না এখনো ঠিক হয় নি । তবে তোর পরীক্ষা হয়ে গেলে এমাসের শেষের দিকে আমাদের আশীর্বাদটা সেরে ফেলার ইচ্ছে আছে আমার ।
আমি বলি -মা আশীর্বাদে কি হয় ?
-ওই ছেলের বাড়ির লোকজন মানে বাবা মা মেয়েকে আশীর্বাদ করে আবার মেয়ের বাড়ির লোকজন একই ভাবে ছেলেকে আশীর্বাদ করে । ধান দুব্বো আর মিষ্টি দিয়ে আশীর্বাদ করতে হয় । তারপর অনেকে আংটি বদল করে । ব্যাস.... তারপর একসঙ্গে আন্তীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে একটু খাওয়া দাওয়া । এই আর কি ?
আমি বলি -এখানে হবে তো ওই সব ?
মা বলে -না না , এখানে ওসব হলে আমাদের বিল্ডিঙের সবাই হাসাহাসি করবে । এখানে সবাই আমাদের কে চেনে তো । তাই ওই ব্যাপারটা তোর মাসির বাড়ি থেকে করতে চাইছি ।
আমি বলি -বাহ্ পরীক্ষার পর তাহলে আমার আবার মাসির বাড়িও আর একবার ঘোরা হয়ে যাবে ।
আমার কথা শুনে মায়ের মুখটা কেমন যেন একটু নিষ্প্রভ হয়ে যায় ।
মা বলে -তুই যদি রাগ না করিস তাহলে তোকে একটা কথা বলি
আমি বলি -বল ?
মা বলে -তুই আমার সঙ্গে গেলে তোর ঠাকুমা এখানে একা কি করে থাকবে বল ? তুই তোর ঠাকুমার কাছে থাকলেই ভাল হয় । তোকে রান্না বান্নার ঝামেলা করতে হবেনা । পিকুদাদের রান্নার মাসিটা তোদের তিনবেলা খাবার করে দিয়ে যাবে ।
আমি চুপ করে যাই মায়ের কথা শুনে । মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়
মা বলে -আর সত্যি কথা বলতে কি আমি চাইনা তুই আমার আশীর্বাদ দেখিস । আমি তো চেয়েছিলাম ওসব না করে একবারে রেজিস্ট্রি করে নিতে আর তারপর দুবাড়িতে মিলে একসঙ্গে একটা রিসেপ্শান দিয়ে দিতে । এই বয়েসে ওই সব আশীর্বাদ, বিয়ের সময় গায়ে হলুদ, শুভ দৃষ্টি , এসবের কোন দরকার ছিলনা । ওসব যাদের প্রথম বিয়ে হচ্ছে তাদের জন্য ঠিক আছে । আমি দু বাচ্চার মা আমার কি ওসব আর ভাল লাগে বল? কিন্তু পিকুর মার আবার সব নিয়ম কানুন পালনের ইচ্ছে । আসলে ওর একমাত্র ছেলের বিয়ে তো । জাস্ট রেজিস্ট্রি করে জয়েন্ট রিসেপশান দিয়ে দিলে ওদের আন্তীয়স্বজনরা নানা কথা শোনাবে ।
আমি বলি -তোমাদের রেজিস্ট্রি কবে হবে তাহলে ?
মা বলে -ওই আশীর্বাদের দিনই সই সাবুদ সব হয়ে যাবে ।
আমি বলি -ঠিক আছে মা, আমি বাড়ি থাকবো আর ঠাকুমাকে দেখবো , তুমি কোন চিন্তা কোরনা ।
মা বলে -তুই রাগ করলিনা তো ? লক্ষী সোনা ছেলে আমার | একটু আমার অসুবিধাটা বোঝ | তবে তুই চিন্তা করিস না । পিকুতো হানিমুনে আমাকে নিয়ে গোয়া যাবে বলেছিলো । আমি বারণ করেছি ওকে ,বলেছি তার চেয়ে বরং চল তুমি আমি তোমার মা রিঙ্কি টুবলু সকলকে নিয়ে পুরি ঘুরে আসি । সকলে এক সঙ্গে জগন্নাথ দেবের মন্দিরে পুজো দেব, সুমুদ্রে চান করবো, খুব মজা হবে ।
আমি বলি -তাহলে ঠাকুমা তখন কার কাছে থাকবে ?
মা বলে -তোর দিদা আর তোর মাসিকে বলেছি কদিন আমাদের এখানে এসে থাকতে । তোর ঠাকুমার কোন অসুবিধে হবে না । আমি তো পিকুকে বলেছি নমিতাকেও নিয়ে চলো আমাদের সঙ্গে । আমাদের জন্য এতো করে মেয়েটা । ও গেলে তোর বোনকে ও সামলাতে পারবে । তবে ওর আবার ছেলে মেয়ে রেখে যাওয়া তো , জানিনা এক সপ্তাহের জন্য ছেলে মেয়ে ছেড়ে যেতে রাজি হবে কিনা ?
আমি বলি -আচ্ছা ,তোমার আশীর্বাদের সময় কি তুমি ওকে ছুটি দিয়ে দেবে ?
মা বলে -নারে, ওকে আমাদের সঙ্গে যেতে বলেছি তোর মাসির বাড়ি , চার দিনের তো ব্যাপার , ও রাজি হয়েছে , ওর শশুর শাশুড়ি ওর ছেলে মেয়েকে সামলে নেবে । ও না গেলে ওই হৈ হট্টগোলে রিঙ্কিকে সামলানো খুব মুশকিল হবে ।
আমি বলি -পিকুদাদের বাড়ি থেকে কে কে যাবে?
মা বলে -পিকু, ওর মা, ওর কাকা কাকিমা, আর ওদের ছোট মেয়ে তিন্নি । ওরা গাড়িতে করে যাবে আর আশীর্বাদ হয়ে গেলে গাড়িতেই ফিরে আসবে। গাড়িতে গেলে মনে হয়না পিকুর মার কোন অসুবিধে হবে । এখন তো উনি মোটামুটি ভালোই আছেন ।
আমি বলি -তুমি মাসির বাড়িতে কদিন থাকবে ?
আমার প্রশ্ন শুনে কেমন যেন মনে হল মা একটু অপ্রস্তুতে পরে গেল ,কিন্তু তড়িঘড়ি সামলে নিয়ে বলে -দেখি কদিন থাকা যায় ।
আমি বলি -তুমি যাবে কি ভাবে ?
মা বলে -আমি আর নমিতা ট্রেন ধরে প্রথমে হাওড়া স্টেশন চলে যাব । ওখানে তোর মামা আর মামি ট্যাক্সি নিয়ে আসবে তারপর আমাদের তুলে নিয়ে তোর মাসির বাড়ি চলে যাবে । মা তো এখন ওখানেই আছে ।
আমি বলি -আর ফিরবে কি ভাবে ?
মা বলে - আশীর্বাদের ঠিক পরের দিনই পিকুর কি যেন যেন একটা ব্যাবসার কাজ আছে কলকাতায়। ওর কাকা কাকিমা আর মা ওর কাকার গাড়িতেই বাড়ি ফিরে আসবে । কিন্তু পিকু ওর গাড়ি নিয়ে কলকাতায় ওর মামার বাড়ি চলে যাবে । ওখানে সেই রাতটা কাটিয়ে পরের দিন ওর কলকাতায় যে ব্যাবসার কাজটা আছে সেটা মেটাবে । ও সেই সব কাজ মিটিয়ে পরের দিন বা তারপরের দিন আমাদের কে তোর মাসির বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ফিরে আসবে ।
আমি বলি -ও আচ্ছা আচ্ছা । তা তুমি নমিতাদিকে বলেছো ?
তোর মা বলে -হ্যাঁ ওকে অনেক আগেই বলে রেখেছি । ও রাজি হয়েছে ।
সেদিন অনেক খোলাখুলি কথা হয় মা আর আমার মধ্যে তারপর আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ি ।
(চলবে)