নিষিদ্ধ নীল দংশন - অধ্যায় ৯
----- পর্ব ৭.১ -----
শহরের যান্ত্রিক জীবনে থিতু হতে আঁখির দুদিন লেগে গেল। জমানো কাপড় কাঁচা, ঘর মোছা আর রান্নার ঝক্কি সামলে শরীরটা আজ বড্ড ম্যাজম্যাজ করছে। দুপুরে পেটপুরে খেয়ে ফ্যানের নিচে গা এলিয়ে দিতেই যেন রাজ্যের অলসতা ভর করল। পাশে অতুল অঘোরে ঘুমাচ্ছে; ওর কলেজ সকাল সকাল হওয়ায় দুপুরের এই সময়টা বাসাতেই থাকে। মিলন অফিসে আর মনিরা এখনো কলেজ-কোচিংয়ের যাঁতাকলে। এই নিরিবিলি দুপুরটায় আঁখি নিজের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেল। বিছানায় শুয়ে সিলিং ফ্যানের ঘোরার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আঁখির মনটা হঠাৎ ডুব দিল বছর তিনেক আগের সেই সময়টায় যে সময়ে কবির ওর জীবনে এসে প্রথম ওকে স্বামীর অগোচরে পরপুরুষের সাথে মিলিত হওয়ার অভিজ্ঞতা দেয়।
শহুরে জীবনের একঘেয়েমিতে অভ্যস্ত আঁখির জীবনে কবীরের আগমন ঘটেছিল খুব নিঃশব্দে, কিন্তু তার প্রভাব ছিল প্রলয়ঙ্করী। মনিরা আর অতুল তখন ছোট, দুজনেই একই কিন্ডারগার্টেনে পড়ত। প্রতিদিন আঁখিকে টিফিন হাতে নিয়ে কলেজের বারান্দায় অপেক্ষা করতে হতো। ঠিক তখনই তার সাথে প্রথম দেখা কবীরের। কবীর ছিল তার ছেলের জন্য টিফিন নিয়ে আসা একজন পরিপাটি ব্যবসায়ী।
প্রথম প্রথম সাধারণ হাই-হ্যালো আর বাচ্চাদের পড়ালেখা নিয়ে কথা হলেও, কবীর খুব কৌশলে আঁখির সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছিল। কবীরের ছেলে আর মনিরা একই ক্লাসে পড়ার সুবাদে তাদের দেখাসাক্ষাৎটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক দৈনন্দিন রুটিন। কবীর মানুষ হিসেবে ছিল প্রচণ্ড ধুরন্ধর। সে জানত কীভাবে একটা নারীর মনের অন্দরমহলে ঢুকতে হয়। কবীরের কথা বলার ভঙ্গি আর মাঝে মাঝে হালকা রসিকতা আঁখিকে এক অদ্ভুত মোহের জালে জড়িয়ে ফেলত।
প্রতিদিন টিফিন দেওয়ার ওই অল্প একটু সময়ের মধ্যেই কবীর এমন কিছু সুক্ষ্ম সংকেত দিত—কখনো আলতো আঙুলের ছোঁয়া, আবার কখনো নিচু স্বরে আঁখির শাড়ির রঙের প্রশংসা—যা আঁখিকে সারাদিনের জন্য অস্থির করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। বাসায় ফিরে যখন আঁখি একা থাকত, তখন তার মাথায় কবীরের সেই সম্মোহনী হাসিটা বারবার ফিরে আসত। সে বুঝতে পারছিল, সে এক ভয়ংকর আকর্ষণের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
কবীরের বুদ্ধিমত্তা ছিল প্রখর। সে জানত কীভাবে আগুনের আঁচ বজায় রেখেও ধোঁওয়া আড়াল করতে হয়। আঁখিকে বশ করার জন্য সে দামী কিন্তু বড় কোনো উপহার বেছে নিত না, বরং এমন কিছু দিত যা হাতের মুঠোয় লুকিয়ে রাখা যায় এবং সবার অগোচরেই বিনিময় করা সম্ভব। কবীর আলতো করে আঁখির হাতের তালুতে গুঁজে দিত ছোট ছোট সব প্যাকেট। কোনোদিন কবীর পারফিউমের ছোট একটা কাঁচের শিশি দিত। আঁখি সেটা আঁচলের আড়ালে লুকিয়ে বাসায় নিয়ে যেত। পকেটে করে আনা একটি নামী ব্র্যান্ডের লিপস্টিক যখন কবীর আঁখির হাতে দিত, তখন আঁখির আঙুলে তার স্পর্শ লাগত। কবীর ফিসফিস করে বলত, "এই রঙটা তোমার ঠোঁটে বেশ ভালো মানাবে।" কোনো একদিন হয়তো ছোট একটা মখমলের থলে। ভেতরে নিখুঁত কারুকাজের দুল। মিলন ভাবত আঁখি তার জমানো টাকা দিয়ে কিনেছে, কিন্তু আঁখি জানত এটা কবীরের দেওয়া 'শিকল', যা তাকে কবীরের দিকে আরও টেনে নিচ্ছে।
আঁখিও এই খেলাটা বেশ উপভোগ করতে শুরু করল। কবীরের দেওয়া সেই ছোট ছোট উপহারগুলো সে কেবল গ্রহণই করেনি, বরং সেগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে কবীরকে এক গোপন সংকেত পাঠাতে লাগল। সে জানত, শরীরী ভাষায় কবীরকে উত্তর দেওয়াই ছিল সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। যেদিন কবীর দামী কোনো লিপস্টিক উপহার দিত, আঁখি পরদিন ঠিক সেই গাঢ় রঙের ছোঁয়া ঠোঁটে বুলিয়ে কলেজে যেত। কবীর যখন সেই রাঙানো ঠোঁটের দিকে তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসত, তখন আঁখির সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যেত। কখনো কবীরের দেওয়া কাজল দিয়ে চোখ দুটোকে মায়াবী করে তুলত আঁখি। সেই চোখের ইশারায় থাকত এক নীরব স্বীকৃতি—"আমি তোমার দেওয়া সজ্জায় সেজেছি, এখন আমাকে তোমার মনের মতো করে দেখে নাও।" এমনকি কবীরের দেওয়া সেই খুদে পারফিউমের ঘ্রাণ যখন আঁখির শরীর থেকে চুয়ে কবীরের নাকে পৌঁছাত, পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবির ফিসফিস করে বলত, "সুগন্ধটা তোমার শরীরে মিশে আজ নেশা ধরিয়ে দিচ্ছে," তখন আঁখি লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করত।
এই গিফটগুলো ব্যবহার করার মাধ্যমে তাদের মধ্যে এক ধরণের অলিখিত চুক্তি হয়ে গিয়েছিল—আঁখি নিজেকে কবীরের কাছে ধীরে ধীরে সঁপে দিচ্ছে, আর কবীর তার ধুরন্ধর বুদ্ধি দিয়ে আঁখির শরীরের প্রতিটি ভাঁজে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য তৈরি হচ্ছে।
কবীরের ধূর্ততা ছিল আকাশচুম্বী। সে খুব সচেতনভাবেই আঁখির সাথে মোবাইলে কোনো প্রকার যোগাযোগ এড়িয়ে চলত। সে জানত, আঁখিকে পুরোপুরি বশ করার আগে যদি কোনোভাবে সম্পর্কের অবনতি ঘটে বা আঁখি ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায়, তবে চ্যাটিং বা কললিস্টের প্রমাণগুলো তার নিজের বিরুদ্ধেই বুমেরাং হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই ডিজিটাল কোনো চিহ্ন না রেখে সে কেবল সরাসরি চোখের ইশারা আর ওই ছোট ছোট উপহারের ওপরই ভরসা করত। তার এই নীরব চাল আঁখির মনে এক ধরণের রহস্যময় নিরাপত্তা তৈরি করেছিল, যা তাকে অজান্তেই কবীরের আরও গভীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। কবীর জানত, প্রমাণহীন এই নিষিদ্ধ আকর্ষণই আঁখিকে একদিন কোনো এক নির্জন ঘরে তার বাহুবন্দি হতে বাধ্য করবে।