পুরনো কথা - অধ্যায় ৫
**পর্ব ৯**
সকালের আলো এখনো নরম, পর্দার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকছে। করিম সাহেব অনেক আগেই বেরিয়ে গেছেন—ক্যাম্পের মিটিংয়ের জন্য। বাড়ির সামনে গাড়িটা দাঁড়িয়ে, ইঞ্জিন চালু। গনেশ ড্রাইভারের সিটে বসে আছে, হাত স্টিয়ারিং-এ, চোখ সামনে। কিন্তু তার মুখে একটা অদ্ভুত শান্তি।
দরজায় দাঁড়িয়ে লায়লা বেগম সাদিয়াকে নার্গিসের কোলে তুলে দিয়ে কায়নাতের হাত ধরলেন।
“সাবধানে যাস মা। রিয়াজকে খুব সাবধানে ধরিস। ও এখনো দুর্বল।”
কায়নাত মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
“চিন্তা করবেন না মা। আমি সব সামলে নেব।”
সাদিয়া নার্গিসের কাঁধে মাথা রেখে “মা… মা…” বলে ডাকছে। কায়নাত একবার মেয়ের গালে চুমু খেয়ে গাড়ির দিকে এগোল।
গাড়ির পেছনের দরজা খুলে সে উঠে বসল। দরজা বন্ধ হতেই একটা ভারী নিঃশ্বাস পড়ল তার বুকে। গনেশের সঙ্গে এক গাড়িতে বসতে হবে—এই চিন্তাটাই তার গলা চেপে ধরছে। সে জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে বসল, যেন গনেশকে দেখতেই চায় না।
গাড়ি চলতে শুরু করল। রাস্তার শব্দ, টায়ারের ঘর্ষণ, আর মাঝে মাঝে হর্নের আওয়াজ। কিন্তু গাড়ির ভেতরটা নিস্তব্ধ।
গনেশ মাঝে মাঝে রিয়ারভিউ মিরর দিয়ে পেছনে তাকাচ্ছে। প্রথমবার, দ্বিতীয়বার… তৃতীয়বার। চোখ দুটো যেন কায়নাতের মুখের ওপর আটকে যাচ্ছে।
কায়নাত একবার চোখ তুলে দেখে ফেলল। তার চোখে চোখ পড়তেই গনেশ দ্রুত সামনে তাকাল, কিন্তু খুব দেরি হয়ে গেছে।
কায়নাতের মুখ লাল হয়ে উঠল। রাগে, অস্বস্তিতে, আর একটা গভীর ঘৃণায়। তার স্বামী ছাড়া কারো চোখ তার দিকে এভাবে আটকে থাকবে—এটা তার কাছে অসহ্য।
সে রেগে গিয়ে, গলা নিচু করে কিন্তু ধারালো স্বরে বলে উঠল—
“সামনের দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালান।”
একটু থেমে, আরও ধীরে ধীরে, প্রায় ফিসফিস করে যোগ করল—
“বেহায়া পুরুষ।”
গনেশের ঠোঁটের কোণে একটা হালকা হাসি ফুটে উঠল। সে সামনে তাকিয়ে থেকেই, শান্ত কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল—
“আপনাকে কে দেখছে? আমি তো মিরর দিয়ে পেছনের গাড়ি লক্ষ্য করছি। রাস্তা তো ভিড়।”
কথাটা শুনে কায়নাতের শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে আর কিছু বলতে পারল না। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। গাল দুটো জ্বলছে, হাত দুটো কোলে মুঠো হয়ে আছে। গাড়ির ভেতরটা আরও ভারী হয়ে উঠল। দুজনের মাঝে আর একটা কথাও হল না।
হাসপাতালে পৌঁছে গাড়ি থামতেই কায়নাত দ্রুত নেমে পড়ল। রিয়াজের ওয়ার্ডে ঢুকে সে দেখল, রিয়াজ বিছানায় বসে আছে—মুখে হালকা হাসি, চোখে একটা অপেক্ষা।
কায়নাত তার কাছে গিয়ে হাত ধরল।
“কেমন লাগছে আজ? অনেক দিন পর বাড়ি যাবে।”
রিয়াজ তার হাত চেপে ধরে বলল,
“অনেক ভালো লাগছে। এই বিছানায় শুয়ে শুয়ে বোর হয়ে গিয়েছিলাম। এখন বাড়িতে ফিরব… সাদিয়ার কাছে যাব।”
কায়নাত হাসল, চোখে পানি চলে এল। সে রিয়াজের কপালে চুমু খেল।
তারপর রিয়াজের চোখ গিয়ে পড়ল দরজার কাছে দাঁড়ানো গনেশের দিকে। গনেশ মুখটা একটু ঘুরিয়ে রেখেছে, যেন ছায়ায় লুকোতে চাইছে।
রিয়াজ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল—
“কে ইনি?”
কায়নাতের শরীরটা একবার কেঁপে উঠল। সে দ্রুত বলল,
“ও… রমজান। গাড়ি চালিয়ে এনেছে। বাবা রেখেছে, নতুন কাজের লোক।”
রিয়াজ আরেকটু তাকিয়ে রইল। তার মাথার ভেতর কোথাও একটা ঝলক—একটা গুলির শব্দ, রক্ত, আর সেই চোখ। কিন্তু স্মৃতিটা ধরা দিল না। শর্ট টার্ম মেমোরি লসের কারণে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেছে। সে মাথা নাড়ল।
“আচ্ছা… চিনতে পারছি না।”
গনেশ নিঃশব্দে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
একটু পর নার্স এল। হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে।
“এক মাস অন্তত এটা ব্যবহার করতে হবে। হঠাৎ দাঁড়ালে ব্যথা হতে পারে, পা দুর্বল। সাবধানে নিয়ে যাবেন।”
রিয়াজ হুইলচেয়ারে বসল। কায়নাত তার পেছনে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রাখল। গনেশ এগিয়ে এসে হুইলচেয়ার ঠেলতে লাগল।
কায়নাতের চোখ গিয়ে পড়ল গনেশের হাতের ওপর—যে হাতটা একদিন রিয়াজের দিকে বন্দুক তাক করেছিল। আজ সেই হাতই রিয়াজকে ঠেলছে।
তার গলা শুকিয়ে গেল।
সে মনে মনে বলল—
“এ লোকটা… আমাদের সবকিছু নষ্ট করে দিতে এসেছে। আর আমি কিছুই করতে পারছি না।”
**পর্ব ১০**
হাসপাতালের করিডর থেকে গাড়ি পর্যন্ত পথটা ছোট, কিন্তু কায়নাতের কাছে যেন অসীম লম্বা। রিয়াজ হুইলচেয়ারে বসে আছে, কাঁধে একটা হালকা শাল। কায়নাত তার পেছনে দাঁড়িয়ে হুইলচেয়ার ঠেলছে, আর গনেশ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে—হাত দুটো পেছনে জড়ানো, চোখ নিচু।
কায়নাত রিয়াজকে হুইলচেয়ার থেকে তুলতে যাচ্ছিল গাড়িতে। তার হাত রিয়াজের কোমরের নিচে ঢোকাতেই গনেশ এক পা এগিয়ে এল।
কায়নাতের গলা শক্ত হয়ে গেল। সে চোখ তুলে তাকাল গনেশের দিকে—চোখে তীব্র বিরক্তি।
“এসেছেন সাহায্য করতে, নাকি শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে?”
গনেশের ঠোঁটে একটা ক্ষীণ, নিয়ন্ত্রিত হাসি। সে তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এল।
“ও আচ্ছা, ছোট সাহেবা। ধরছি।”
দুজনে মিলে রিয়াজকে তুলল। গনেশের হাত রিয়াজের পিঠের নিচে, কায়নাতের হাত কাঁধের নিচে। রিয়াজের ওজনটা যেন গনেশের জন্য কিছুই না—সে এক হাতে সামলে নিল।
গাড়িতে তুলে, বাড়ি ফেরার পুরো পথটা নিস্তব্ধ। বাড়ির দরজায় পৌঁছে একই দৃশ্য—গনেশ রিয়াজকে কোলে তুলে ভেতরে নিয়ে গেল।
---
রাতের ডিনার টেবিল। অনেক দিন পর পুরো পরিবার একসাথে। রিয়াজ মাঝখানে বসে, হাসছে। লায়লা বেগমের চোখে পানি আর হাসি মিশে আছে। করিম সাহেব চুপচাপ খাচ্ছেন, মাঝে মাঝে ছেলের দিকে তাকাচ্ছেন। কায়নাত রিয়াজের পাশে, তার হাত ধরে রেখেছে।
লায়লা বেগম হঠাৎ গলা তুললেন—
“রমজান!”
গনেশ দরজার কাছ থেকে এগিয়ে এল। মাথা নিচু।
“বড় সাহেবা ডেকেছিলেন?”
লায়লা বেগম হাসিমুখে বললেন,
“হ্যাঁ, ডেকেছিলাম। আজ আমাদের সাথে বসে খাও। অনেক দিন পর আমার ছেলে ফিরেছে। আজ একটু উৎসবের মতো করি।”
গনেশ অভিনয় করে পিছিয়ে গেল এক পা। তার গলায় একটা নকল লজ্জা।
“না বড় সাহেবা… এটা কীভাবে সম্ভব? আমি তো স্টাফ। এসব আমার জন্য না।”
কায়নাতের প্লেটে চামচ থমকে গেল। তার গলা পর্যন্ত উঠে এল রাগ। এই অভিনয়টা তার কাছে অসহ্য। সে চোখ তুলে গনেশের দিকে তাকাল—চোখে ঘৃণা আর অসহায়ত্ব মিশে। কিন্তু কিছু বলতে পারল না। লায়লা বেগম আবার জোর করলেন। গনেশ শেষমেশ একটা চেয়ার টেনে বসল—দূরের কোণায়, যেন খুব অনিচ্ছুক।
খাবার শেষ হল।
লায়লা বেগম রিয়াজের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“রমজান, রিয়াজকে বেডরুমে দিয়ে আসো তো। ও এখনো দুর্বল।”
করিম সাহেব শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলেন। কিছু বললেন না।
গনেশ উঠে দাঁড়াল। তার বিশাল শরীর রিয়াজকে কোলে তুলে নিল—যেন কোনো শিশু। রিয়াজ একটু লজ্জা পেয়ে হাসল। গনেশ ধীরে ধীরে বেডরুমের দিকে এগোল। পেছনে কায়নাত হুইলচেয়ার ঠেলে আসছে—চোখ নিচু, ঠোঁট টিপে।
বেডরুমে রিয়াজকে বিছানায় শুইয়ে দিল গনেশ। রিয়াজ হাত বাড়িয়ে বলল,
“ধন্যবাদ, রমজান।”
গনেশ নম্র গলায়, চোখ নিচু করে বলল—
“ধন্যবাদের কিছু নেই, ছোট সাহেব। আপনি আমার মালিক। আমি সেবা তো করবই।”
কথাটা শুনে কায়নাতের শরীরে যেন আগুন জ্বলে উঠল। তার হাত কাঁপছে। গনেশের এই নকল ভক্তি, এই অভিনয়—সবকিছু তার কাছে বিষের মতো।
গনেশ বেরিয়ে যেতে যাচ্ছিল। কায়নাত রিয়াজের কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“আমি একটু আসছি।”
দরজার বাইরে, করিডরের অন্ধকার কোণায় গনেশ দাঁড়িয়ে। কায়নাত দ্রুত এগিয়ে গেল। গলা নিচু, কিন্তু কাঁপছে রাগে।
“ভালো সাজো?”
গনেশ ঘুরে তাকাল। তার চোখে সেই চেনা ছায়া—শান্ত, কিন্তু বিদ্রূপময়।
কায়নাত আরও এগিয়ে এল।
“তোমার আসল রূপ আমি জানি।”
গনেশ একটু হাসল। গলা নামিয়ে, ধীরে ধীরে বলল—
“ভালো সাজার কী? আর আপনি কেন আমার এত পিছু নিয়েছেন? স্বামী অক্ষম বলে কি… আমার সাথে কিছু করতে চান?”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই কায়নাতের হাত উঠে গেল। একটা জোরালো চড় পড়ল গনেশের গালে। শব্দটা করিডরে প্রতিধ্বনিত হল।
কায়নাতের চোখ লাল, গলা কাঁপছে।
“Mind your language! আমি একজন ভদ্র ঘরের মেয়ে। আর একজনের বউ।”
গনেশ গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চোখে কোনো রাগ নেই। শুধু একটা গভীর, ঠান্ডা হাসি।
সে ধীরে ধীরে বলল—
“জানা আছে।”
তারপর পিছিয়ে গেল। পা ফেলে ফেলে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
কায়নাত দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত কাঁপছে। চোখে আগুন। বুকের ভেতরটা পুড়ছে।