স্বপ্নের ভালোবাসা - অধ্যায় ২৮
একই বাড়িতে মুখ গোমড়া করে রইলাম আমরা দুজন। চয়নের সদ্যজাত সন্তান রইলো তার নানা নানীর কাছেই। বিষয়টি আমি মানতে পারছিলাম না। আমাদের বংশের সন্তান কেনো অন্য কোথাও থাকবে? কিন্তু এ ব্যাপারে চয়নকে কিছু বলতেও সাহস হচ্ছিল না। এভাবেই কাটলো কিছুদিন। এক সময় আমি আর সইতে না পেরে এক বিকেলে চয়নের ঘরে গেলাম। গিয়ে দেখলাম খালি গায়ে, একটা ট্রাউজার পরে সে ঘুমাচ্ছে। আমি নিঃশব্দ পায়ে ধীরে ধীরে ওর শিয়রের কাছে বসলাম। ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে ওর চুলে বিলি কাটতেই সে জেগে গেলো। আমার দিকে চোখ মেলে বললো, তুমি? আবার এসেছো?
সময়ের ফাঁকে তার উন্মত্ততা কিছুটা কমেছে বলে মনে হলো। আমি এই সুযোগটার সদ্ব্যবহার করতে চাইলাম। কান্নারুদ্ধ কন্ঠে বললাম, আমার অপরাধ আমি স্বীকার করছি। তার জন্য যা শাস্তি হয় দাও কিন্তু এভাবে দূরে সরিয়ে রেখো না আমাকে। আমি আর সইতে পারছি না। এভাবে আমাকে কষ্ট দিলেই কি যে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে সে ফিরে আসবে? এরচেয়ে নামাজ পড়ে তার জন্য দোয়া করলে সেটা কাজে দেবে। আর যে দুনিয়াতে এসেছে তার কথা ভাবো। বাবা, দাদী থাকতে সে কেনো নানা নানীর কাছে পড়ে থাকবে? সে এই বংশের সন্তান। এই বাড়ি তার আসল ঠিকানা।
চয়ন কিছু সময় চুপ থেকে বললো, এই পাপের ঠিকানায় তাকে আনতে মন সায় দেয় না। তার চেয়ে নানা নানীর কাছেই থাকুক। মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসবো।
আমি এবার একেবারে হু হু করে কেঁদে দিয়ে বললাম, মা হয়ে কি তোমার পায়ে পড়বো? এতো বড় শাস্তি আমাকে দিও না।
চয়ন গম্ভীর গলায় বললো, তাহলে কী করবো? সেখানকার এতো ভালো পরিবেশ থেকে এই পঙ্কিল পরিবেশে তাকে টেনে আনবো?
আমি কাঁদতে কাঁদতেই বললাম, সেখানকার পরিবেশ যে এতো ভালো সেটা তুমি বুঝলে কীভাবে? বাইরে থেকে কী সবকিছু ঠিকমতো বোঝা যায়? বাইরে থেকে দেখলে আমাদের মা-ব্যাটার ভেতরেই কী এমন সম্পর্কের কথা কেউ ভাবতেও পারবে? পাপাচার দুনিয়ার কোথায় নেই বলো? কিন্তু বাইরে থেকে সেটা বোঝা যায় না।
চয়ন এবার কিছু না বলে চুপ করে রইলো। আমি বুঝলাম যে কাজ হচ্ছে। কান্নার পরিমাণটা আরো বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, দাদী থাকতে মায়ের অভাব বুঝতে পারবে না তোমার ছেলে। আর তুমি বাবা তো আছোই। আমরা দুজন মিলে আমাদের সন্তানকে সুন্দরভাবে মানুষ করে তুলবো। চলো কালই দুজনে গিয়ে নিয়ে আসি ওকে।
চয়ন এবারও চুপ করে রইলো। আমি একদৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, কিছু বলছো না যে!
চয়ন চিন্তিত মুখে বললো, আমাকে একটু ভাবতে দাও।
এতো কাকুতি মিনতির পরেও সে সহসা সিদ্ধান্ত নিতে পারলো না দেখে আমি হতাশ হয়ে কোনো কথা না বলে সেখান থেকে চলে গেলাম। সে রাতে তার সাথে আর কোনো কথা হলো না। সকালেও সে নীরবে অফিসে চলে গেলো। আমি বুঝলাম যে, এতো সহজে তার মন গলবে না। মনমরা হয়ে রইলাম সারা দিন। দুপুরে কোনো রকমে মুখে দুটো গুঁজে ঝিম মেরে শুয়ে রইলাম বিছানায়। ঘুমাতে চাইলেও ঘুম আসছিল না। কোনো অনুভূতিই কাজ করছিল না। বিকেলের দিকে কলিংবেলের আওয়াজে বুঝলাম চয়ন এসেছে। মুখ ভার করে দরজা খুলে দেখলাম, সামনে চয়ন দাঁড়িয়ে আর তার কোলে টাওয়েল দিয়ে মোড়ানো একটা ফুটফুটে বাচ্চা। আমার প্রথম নাতি। আবেগে কিছু বলতে বা করতে পারছিলাম না। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। তাই দেখে চয়ন হেসে বললো, কেমন সারপ্রাইজ দিলাম! কী ব্যাপার? ঘরে ঢুকতে দেবে না নাকি? আমি পুতুলের মতো সরে গিয়ে বললাম, হ্যা হ্যা এসো। ভেতরে এসো বাবুকে নিয়ে। চয়ন ভেতরে ঢুকতেই আমি ছো মেরে বাবুটাকে নিজের কোলে নিয়ে বললাম, এটা এখন আমার বাচ্চা। এখন থেকে আমার কাছেই থাকবে সব সময়। এর ওপর আমারই সবচেয়ে বেশি অধিকার।
চয়ন মুচকি হেসে বললো, আর বাচ্চার বাবার বুঝি কোনো অধিকার নেই?
আমিও স্নিগ্ধ একটা হাসি দিয়ে বললাম, আছে। কিন্তু মায়ের চাইতে কম।
চয়ন আমার দিকে এগিয়ে এসে তার ডান বাহুতে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, সত্যিই! তোমার কোলে বাবুকে দেখে অনেক ভালো লাগছে। আল্লাহ যা করেন তার পেছনে ভালো কোনো উদ্দেশ্য থাকে। যা ঘটেছে তার পেছনেও হয়তো ভালো কিছুই লুকিয়ে আছে।
আমি ওর ঘাড়ে মাথা ঠেকিয়ে বললাম, হ্যা। তাই অতীতের কথা ভুলে গিয়ে এখন বর্তমান আর ভবিষ্যতের কথা ভাবাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
চয়ন আমার কপালে চুমু দিয়ে ডান হাতে বাবুর গালে আদর করতে করতে বললো, হুম।
এভাবেই নতুন বাবুকে নিয়ে ছেলের সাথে একেবারে স্বামী-স্ত্রীর মতো নতুন অধ্যায় শুরু করলাম আমি।
সমাপ্ত।