The Barter System - অধ্যায় ২৯

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-74260-post-6297474.html#pid6297474

🕰️ Posted on Thu Aug 27 2026 by ✍️ andygarfield (Profile)

🏷️ Tags:
📖 3777 words / 17 min read

Parent
(...continuation of the Chapter) রাহুল তখন ইন্দিরার ওপর পুরোপুরি ভর দিয়ে শুয়ে আছে, ওর চওড়া বুকটা ইন্দিরার বুকের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে সেঁটে আছে। সেই অবস্থাতেই, রাহুলকে নিজের ওপর রেখেই, ইন্দিরা খুব সন্তর্পণে বিছানার চাদর ঘেঁষে নিজের শরীরটাকে একটু নিচের দিকে পিছলে নামিয়ে আনলেন। এই সামান্য স্থান পরিবর্তনের ফলে তাঁর মুখটা এখন রাহুলের সেই মসৃণ, প্রায় রোমহীন এবং সুগঠিত বুকের ঠিক ওপরে এসে স্থির হলো। তিনি সেখানেও ওই একই তীব্রতায় চুমু খেতে লাগলেন। "আমার সোনা ছেলেটা..." ইন্দিরা চুমুর ফাঁকে ফাঁকে ফিসফিস করতে লাগলেন, "কত বড় হয়ে গেছে... কত স্ট্রং হয়ে গেছে..." তারপর, এক চরম, অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে, ইন্দিরা নিজের ঠোঁটদুটো রাহুলের বুকের বাঁ দিকের ছোট, শক্ত বৃন্তটার ওপর রাখলেন এবং অত্যন্ত আলতো করে সেটা চুষতে শুরু করলেন। "মাআআআ!! আআআহহহ!!" রাহুল যেন একটা ইলেকট্রিক শকে লাফিয়ে উঠল। ও হাসতে হাসতে, ছটফট করতে করতে বিছানায় এদিক-ওদিক গড়াতে শুরু করল। "উফ্ মা!! বড্ড কাতুকুতু লাগছে... তুমি কী করছ মা... ছাড়ো... হা হা হা... প্লিজ মা..." ছেলের এই ছটফটানি আর খিলখিল হাসি দেখে ইন্দিরা মুহূর্তের জন্য নিজের মুখটা ওপরে তুললেন। তাঁর চোখেমুখে তখন এক অপরিসীম ভালোবাসা আর চরম প্রশ্রয়ের হাসি। তিনি একটু কপট অভিমানের সুরে, আদুরে গলায় বললেন: "বা রে! মা-কে ওখানে করার সময় কিছু না, আর মা করলেই দোষ?" কথাটা বলেই তিনি আবার নিজের মুখটা ওর বুকের ওপর নামিয়ে নিয়ে সেই একই জায়গায় আরও একটু জোরে আদর করতে লাগলেন। "উফ্ মা... হা হা হা... আমি মরে যাব... আহ্... মা..." রাহুলের হাসি আর গোঙানির শব্দগুলো ভোরের ওই নিস্তব্ধ ঘরে এক অদ্ভুত, মায়াবী সিম্ফনি তৈরি করতে লাগল। ধীরে ধীরে ইন্দিরার আদরের তীব্রতা আর আবেগ এক বন্য, অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় পৌঁছাতে লাগল। তাঁর জিভটা রাহুলের বুকের পেশিগুলোর ওপর দিয়ে এক উত্তপ্ত লাভাস্রোতের মতো পিছলে যেতে লাগল। চুমু খেতে খেতে তিনি আবার রাহুলের ঘাড় আর কাঁধের কাছে উঠে এলেন। তাঁর শ্বাস তখন বড্ড ভারী, তাঁর মগজের ওপর থেকে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ যেন হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁর মুখটা রাহুলের চওড়া কাঁধের ওপর একটা রুদ্ধশ্বাস, পাগলাটে পথ তৈরি করল। তিনি ওকে এমন এক সর্বগ্রাসী তীব্রতায় চুমু খাচ্ছিলেন, যা ক্রমশ এক চরমতম অধিকারবোধের রূপ নিচ্ছিল। আর ঠিক সেই চরম ঘোরের মাথায়, যখন তাঁর মাতৃত্ব আর নারীত্বের সমস্ত সংজ্ঞা একাকার হয়ে গেছে, ইন্দিরা নিজের দাঁত দিয়ে রাহুলের কাঁধের ওই নরম ত্বকের ওপর একটা বন্য, অধিকারের কামড় বসিয়ে দিলেন। "আআআহহহহ!" রাহুলের মুখ থেকে একটা তীক্ষ্ণ, যন্ত্রণার আর্তনাদ ছিটকে বেরোলো। এই শব্দটা ইন্দিরার মগজে যেন এক বালতি বরফ-ঠান্ডা জল ঢেলে দিল। তিনি এক লহমায় তাঁর ওই অনিয়ন্ত্রিত, উন্মত্ত ঘোর থেকে বাস্তবে ছিটকে ফিরে এলেন। তিনি বুঝতে পারলেন ভালোবাসার চরম আতিশয্যে তিনি ঠিক কী করে ফেলেছেন। তাঁর ভেতরের সেই বন্য প্রেমিকা নিমেষে উধাও হয়ে গিয়ে সেখানে আবার তাঁর সেই চিরচেনা, উদ্বিগ্ন মাতৃসত্তা ফিরে এল। "ওহ গড!! সোনা... আমি কি তোকে ব্যথা দিয়ে ফেললাম?" ইন্দিরা প্রায় ডুকরে কেঁদে ওঠার মতো গলায় বলে উঠলেন। তিনি রুদ্ধশ্বাসে রাহুলের কাঁধের ওপরের ওই জায়গাটার দিকে তাকালেন। সেখানে একটা গাঢ়, লালচে-নীল দাগ—এক প্রগাঢ় 'লাভ বাইট' ফুটে উঠেছে। "আই অ্যাম সো সো সরি, বাবু... আমি... আমি একদম ইচ্ছে করে করিনি... ওহ গড..." ইন্দিরা কাঁপাকাঁপা হাতে ওই দাগটার ওপর আলতো করে আঙুল ছোঁয়ালেন, তাঁর গলা ভয়ে কাঁপছে। "জায়গাটা তো একদম লাল হয়ে গেছে... রক্ত বেরোয়নি তো? না... থ্যাঙ্ক গড..." তিনি খুব সাবধানে রাহুলকে নিজের শরীরের ওপর থেকে সরিয়ে দিয়ে বিছানায় উঠে বসলেন। তড়িঘড়ি নিজের শাড়ির আঁচলটা দিয়ে অনাবৃত বুকটাকে ঢেকে ফেললেন। তাঁর চোখেমুখে এক প্রবল অপরাধবোধ আর মাতৃসুলভ উদ্বেগ। এই দাগটা নেহাতই কোনো সাধারণ আঘাতের চিহ্ন নয়। এটা তাঁর অন্তহীন, অন্ধ এবং সর্বগ্রাসী ভালোবাসার এক জ্বলন্ত মোহর। এই দাগটি যেন নিঃশব্দে প্রমাণ করে যে তাঁর ভেতরের মাতৃসত্তা আসলে কোনো শুষ্ক, সামাজিক শৃঙ্খলার খোলসে আটকে থাকার মতো বিষয় নয়; বরং এটাই হলো মাতৃত্বের সবচেয়ে আদিম, নিখাদ এবং প্রগাঢ়তম রূপ—যেখানে স্নেহের আতিশয্যে একজন মা তার নিজের নাড়ি-ছেঁড়া ধনকে নিজের অস্তিত্বের সাথে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে নিতে চায়। সন্তানকে ভালোবাসার এই অমোঘ, বন্য প্রকাশ তাঁর নিজের কাছে এক পরম সত্য হলেও, তাদের এই নিজস্ব স্বর্গের বাইরে থাকা ওই রূঢ়, হিসেবি পৃথিবীর চোখে এই আদরের চিহ্নটাই যে এক ভয়ংকর বিপদের অশনিসংকেত, তা বুঝতে ইন্দিরার এক মুহূর্তও দেরি হলো না। "সোনা, তুই একদম চিন্তা করিস না, এটা এমন কিছু সিরিয়াস নয়। শোন..." ইন্দিরা অত্যন্ত নরম, যত্নশীল মায়ের গলায় নির্দেশ দিতে শুরু করলেন। তিনি নিজের ব্লাউজটা হাতে নিয়ে দ্রুত গায়ে গলালেন। "তোর টি-শার্টটা পরে নে। তারপর এক্ষুনি নিচে যা, গিয়ে ফ্রিজ থেকে আইস প্যাকটা নিয়ে আয়, ঠিক আছে? তোকে ওই জায়গাটাতে কোল্ড কমপ্রেস করতে হবে। তারপর একটু আর্নিকা জেল লাগিয়ে নিবি, দেখবি খুব তাড়াতাড়ি ব্যথাটা কমে যাবে। আমার বাথরুমের ক্যাবিনেটেই আর্নিকা জেল রাখা আছে। একদম চিন্তা করিস না বাবু... উফ্ ভগবান, আমি এটা কী করে করতে পারলাম..." রাহুল মায়ের এই অপরাধবোধ আর প্যানিক দেখে একটু হাসল। ও ইন্দিরার একটা হাত ধরে খুব মোলায়েম গলায় ওকে শান্ত করার চেষ্টা করল: "ইটস ওকে মা, তুমি যা বলছ তাই করব। প্লিজ তুমি নিজের ওপর রাগ কোরো না। আমার সত্যিই খুব বেশি ব্যথা লাগেনি।" ছেলের এই মিষ্টি, পরিণত কথাটা শুনে ইন্দিরার চোখদুটো আবার জলে ভরে এল। তিনি আবেগতাড়িত গলায় বলে উঠলেন: "ওহ সোনা... তুই এত সুইট কেন রে?" তিনি এগিয়ে গিয়ে রাহুলকে আরেকবার অত্যন্ত মমতায়, আলতো করে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। "একদম দেরি করিস না সোনা, ওকে? যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বরফটা লাগিয়ে নে।" তিনি দরজার দিকে পা বাড়ালেন, তারপর একবার ঘাড় ঘুরিয়ে সতর্ক করে বললেন, "আর সোনা... ঘর থেকে বেরোনোর আগে অবশ্যই একটা টি-শার্ট গায়ে দিয়ে নিস, ওকে? তোর বাবা উঠে পড়তে পারে। আমি এখন ঘরে যাচ্ছি। ব্রেকফাস্টের সময় দেখা হবে, ঠিক আছে সোনা?" দরজাটা একটা মৃদু 'ক্লিক' শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল। ঘরের ভেতর তখন কেবল ভোরের সেই স্নিগ্ধ আলো, আর রাহুলের কাঁধে জেগে থাকা এক অমোঘ, সর্বগ্রাসী অধিকারের চিহ্ন। ১৪.২. অসমাপ্ত দহন কোনো উপাদেয় খাবারের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকলে, তা একেবারেই না পাওয়ার চেয়ে যদি সামান্য একটুখানি চেখে দেখার সুযোগ মেলে, তবে সেই না-পাওয়ার ক্ষুধা যেন আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একেই বলে 'জাইগারনিক এফেক্ট'—যেখানে কোনো অসমাপ্ত অভিজ্ঞতা মানুষের মনে এক প্রবল আকুলতা তৈরি করে এবং সেই অভিজ্ঞতাটি সম্পূর্ণ করার জন্য এক ব্যাকুল অস্থিরতা বা মরিয়া ভাব জাগিয়ে তোলে। গত সোমবার ভোরের সেই অভাবনীয় এবং রুদ্ধশ্বাস আদরের পর থেকে রাহুল এবং ইন্দিরা—দুজনের মনের অবস্থাই ঠিক ওই তত্ত্বের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেদিন ভোরের সেই লগ্নটি ছিল এক পরম প্রাপ্তির মুহূর্ত, কিন্তু একই সাথে তা যেন রয়ে গিয়েছিল এক অসমাপ্ত আখ্যান হয়ে। সেই যে উন্মত্ত, ঘর্মাক্ত আলিঙ্গনের মাঝে ইন্দিরা নিজের সর্বগ্রাসী অধিকারবোধের বশবর্তী হয়ে রাহুলের কাঁধে নিজের ঠোঁট আর দাঁতের এক প্রগাঢ় মোহর এঁকে দিয়েছিলেন, সেই দাগটা গত কয়েকদিনে সময়ের নিয়মে এবং ওষুধের প্রলেপে অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। লালচে-নীলচে সেই কালশিটে এখন ত্বকের রঙের সাথে মিশে গিয়ে এক ফ্যাকাসে, হলদেটে রূপ নিয়েছে। কিন্তু ওই দাগটা শরীর থেকে মুছে গেলেও, মা ও ছেলের মনের ভেতরে একে অপরের সান্নিধ্য পাওয়ার যে আগুনটা সেদিন জ্বলে উঠেছিল, তা বিন্দুমাত্র নেভেনি; বরং না-পাওয়ার হতাশায় তা আরও প্রখর হয়েছে। মুশকিল হলো, রূঢ় বাস্তব তার নিজের নিয়মেই চলে। সোমবারের পর থেকেই আবার সেই যান্ত্রিক, একঘেয়ে রুটিনের যাঁতাকল শুরু হয়ে গেছে। রাহুলের সেমিস্টারের ক্লাস শুরু হয়েছে, পড়ার চাপ বাড়তে শুরু করেছে। অন্যদিকে ইন্দিরার ইউনিভার্সিটিও পুরোদমে চলছে; পর পর লেকচার, পিএইচডি স্কলারদের গাইড করা, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ মিটিং—সব মিলিয়ে তাঁর দম ফেলার ফুরসত নেই। কিন্তু এই সমস্ত ব্যস্ততার চেয়েও তাদের মাঝখানে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে নিশ্ছিদ্র দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটাই মানুষ—সুব্রত সেন। অফিসের রেনোভেশনের কারণে তিনি এখন পুরোপুরি 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' করছেন। মানুষটা যেন এক ভারী, নির্লিপ্ত এবং অবচেতন মেঘের মতো সারাক্ষণ এই বাড়ির ছাদের ওপর ঝুলে আছেন, যার উপস্থিতি মা ও ছেলের মাঝখানের ওই তৃষ্ণার্ত বাতাসটাকে সারাক্ষণ ভিজিয়ে রাখলেও, এক ফোঁটা শান্তির বৃষ্টি নামতে দিচ্ছে না। এই দমবন্ধ করা প্রতীক্ষা, সারাক্ষণের স্নায়বিক চাপ আর রোজকার একঘেয়ে রুটিনের যাঁতাকলে পড়ে তাঁরা দুজনেই একটা খুব সাধারণ, অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন। আর মাত্র কয়েকদিন পর, এই সামনের রবিবারেই রাহুলের কুড়িতে পদার্পণ। বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বরের তিন তারিখের রাত। রোজকার মতো নিয়মমাফিক, নীরবতায় মোড়া ফ্যামিলি ডিনার শেষ করে তিনজনেই নিজেদের ঘরে চলে গেছেন। ইন্দিরার শোবার ঘরের পরিবেশটা এখন বেশ শান্ত। তিনি নিজের স্টাডি-ডেস্কের সামনের আরামদায়ক চেয়ারটায় বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছেন। আগামীকালের শিডিউল চেক করার জন্য তিনি গুগল ক্যালেন্ডারটা খুলেছিলেন; চোখ বোলাতে বোলাতেই তাঁর দৃষ্টি হঠাৎ থমকে গেল রবিবারের তারিখটার ওপর। সেখানে একটা নীল রঙের ব্লকে অটোমেটেড রিমাইন্ডার জ্বলজ্বল করছে: "Rahul's birthday"। স্ক্রিনের ওই ছোট লেখাটার দিকে তাকাতেই ইন্দিরার শান্ত, গম্ভীর চোখদুটো এক লহমায় এক অনাবিল, স্নিগ্ধ আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তাঁর বাবুসোনাটা... তাঁর নিজের নাড়ি-ছেঁড়া ধনটা দেখতে দেখতে কুড়ি বছরে পা দিতে চলেছে! কিন্তু সেই আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই এক গভীর, তীক্ষ্ণ অপরাধবোধ তাঁর বুকের ভেতরটায় খোঁচা মারল। তিনি কেমন মা? নিজের একমাত্র সন্তানের জন্মদিনটা তাঁর মাথা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে গিয়েছিল? তাঁকে কি না গুগল ক্যালেন্ডারের রিমাইন্ডার দেখে মনে করতে হচ্ছে যে তাঁর ছেলের জন্মদিন আসছে! ল্যাপটপের আলোয় ইন্দিরার ফর্সা, অভিজাত মুখের রেখাগুলোতে এক সূক্ষ্ম বিষণ্ণতা ফুটে উঠল। অবশ্য, এই ভুলে যাওয়ার পেছনে তাঁর নিজের কাজের চাপের চেয়েও বোধহয় এই বাড়ির নিরুত্তাপ পরিবেশটাই বেশি দায়ী। সুব্রত মানুষটাই এমন। তাঁর ওই চরম প্র্যাক্টিক্যাল, হিসেবি আর ব্যবসায়িক মগজে জন্মদিন পালনের মতো বিষয়গুলো নেহাতই সময় আর অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। সুব্রতর সাথে এই সুদীর্ঘ সংসার জীবনে থাকতে থাকতে ইন্দিরা নিজেও যেন নিজের মনটাকে ওই একই যান্ত্রিক তরঙ্গে বেঁধে ফেলেছিলেন; জন্মদিনটাকে আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু... তাঁর ওই শক্ত, কেতাদুরস্ত এবং গম্ভীর মুখোশের ঠিক পেছনেই হৃদয়ের যে একটা নরম, গোপন কুঠুরি আছে—যেখানে তিনি শুধু একজন মা, যেখানে তাঁর ছেলের প্রতি এক অন্ধ, নিঃশর্ত ভালোবাসার রত্নভাণ্ডার লুকোনো আছে—সেই কুঠুরির দরজাটা মাঝে মাঝেই সামান্য ফাঁক হয়ে যেত, তা এই 'বার্টার সিস্টেম' নামক চুক্তির খেলা শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই। তিনি প্রতি বছর রাহুলের জন্মদিনে ওই মেপে চলা রুটিনের মাঝেই একটুখানি নিজের মতো করে মাতৃত্বের ছোঁয়া মিশিয়ে দিতেন। অন্তত এই একটা দিন, যতই কাজ থাকুক না কেন, তিনি নিজের হাতে রাহুলের সবথেকে পছন্দের পদগুলো রান্না করতেন, আর অবশ্যই নিয়ম করে বানাতেন বাঙালির সেই চিরায়ত স্নেহের প্রতীক—মায়ের হাতের পায়েস। এবারও তিনি ঠিক সেটাই করবেন। কিন্তু এবছর... এই সমস্ত নতুন, রুদ্ধশ্বাস আর বন্য অনুভূতির আদানপ্রদানের পর, তাঁর মন চাইছিল ছেলেটার জন্য আরও অনেক কিছু করতে। অনেক, অনেক বেশি কিছু। 'থপ!' হঠাৎ পেছন থেকে আসা একটা ভারী শব্দে ইন্দিরার চিন্তার সুতোটা ছিঁড়ে গেল। তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে বিছানার দিকে তাকালেন। সুব্রত এতক্ষণ বিছানায় একপাশে কাত হয়ে শুয়ে জেমস ক্লিয়ারের 'অ্যাটমিক হ্যাবিটস' বইটা পড়ছিলেন। শব্দটা বইটা বন্ধ করে বেডসাইড টেবিলের ওপর রাখার। সুব্রত চশমাটা খুলে পাশে রাখলেন, তারপর মাথার কাছের বালিশটা ঠিক করে নিয়ে পুরোপুরি শুয়ে পড়লেন। গায়ের ওপর হালকা চাদরটা টেনে নিতে নিতে তিনি অত্যন্ত যান্ত্রিক, অভ্যস্ত গলায় বললেন, "গুড নাইট।" "গুড নাইট," ইন্দিরাও ঠিক ততটাই যান্ত্রিক, রুটিনমাফিক একটা উত্তর দিলেন। একটা অস্ফুট, দীর্ঘশ্বাস তাঁর গলা থেকে বেরিয়ে এল। তিনি আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে ঘুরে গিয়ে আগামীকালের মিটিংয়ের পয়েন্টগুলো দেখতে শুরু করলেন। আরও বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেছে। রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। আগামীকালের মিটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কয়েকটা ইমেইলের রিপ্লাই দেওয়া শেষ করে ইন্দিরা ল্যাপটপের ঢাকনাটা নামিয়ে রাখলেন। ঘাড়ের পেছনের পেশিগুলো একটু শক্ত হয়ে এসেছে, চোখের পাতায় একটা মন্থর ঘুম-ঘুম ভাব। বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সুব্রত ততক্ষণে নিয়মিত শ্বাসের সাথে ঘুমের অতলে তলিয়ে গেছেন। ঠিক এই সময়টাতে, গত কয়েকটা দিনের মতোই, ইন্দিরার মনটা অবচেতনভাবে ওই লম্বা করিডোরটা পার হয়ে চলে গেল রাহুলের বন্ধ দরজার ওপারে। ছেলেটা এখন কী করছে? নিশ্চয়ই জেগে আছে। হয়তো কালকের ক্লাসের পড়া তৈরি করছে। ইন্দিরার বুকের ভেতরটা এক অজানা, অবাধ্য তৃষ্ণায় টনটন করে উঠল। তাঁর খুব ইচ্ছে করছিল পা টিপে টিপে উঠে গিয়ে একবার রাহুলের ঘরে উঁকি মারতে। কিন্তু তিনি জানেন, সেটা একেবারেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। সুব্রত যদি কোনো কারণে টের পেয়ে যান, তাহলে হাজারটা অপ্রীতিকর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। আর কোনো উপায় না দেখে তিনি টেবিলের ওপর থেকে নিজের ফোনটা তুলে নিলেন। অন্তত মেসেজ করে তো দেখা যায় ছেলেটা কী করছে। হয়তো ওরও নিজের জন্মদিনের কথা বিন্দুমাত্র মনে নেই। হোয়াটসঅ্যাপটা খুলে তিনি রাহুলের চ্যাটবক্সে ঢুকলেন। **ইন্দিরা:** "রাহুল, ঘুমিয়ে পড়েছিস?" করিডোরের ওপারে, নিজের নিভৃত ঘরে রাহুল তখন বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আগামীকালের কেমিস্ট্রি ক্লাসের নোটসগুলো রিভাইস করছিল। কিন্তু ওর মগজটাও ঠিক ওর মায়ের মতোই একই ফ্রিকোয়েন্সিতে ঘুরপাক খাচ্ছিল। চোখের সামনে কেমিক্যাল ইকুয়েশনগুলো ভাসলেও, ওর অবচেতন মন জুড়ে কেবলই লেপ্টে ছিল মায়ের গায়ের সেই চেনা সুবাস, সেই নরম, ফর্সা ত্বকের উষ্ণতা। হঠাৎ ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠে মেসেজ টোনটা বাজতেই ওর নিস্তেজ চোখদুটোয় এক লহমায় একটা খুশির ঝিলিক খেলে গেল। মায়ের মেসেজ। **রাহুল:** "না মা, কালকের ক্লাসের জন্য একটু পড়ছিলাম।" ইন্দিরার ঠোঁটের কোণে একটা প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। নিজের ছেলের এই শৃঙ্খলার প্রতি তাঁর বরাবরই একটা আলাদা দুর্বলতা আছে। **ইন্দিরা:** "ওহ, ঠিক আছে। তাহলে আর কথা বাড়াচ্ছি না, মন দিয়ে পড় সোনা।" একজন দায়িত্বশীল মা এবং কড়া প্রফেসরের মতো তিনি ছেলের পড়াশোনাটাকেই অগ্রাধিকার দিলেন। রাহুল ফোনটা নামিয়ে রাখতে গিয়েও পারল না। ওর ভেতরের সেই না-পাওয়ার হাহাকারটা আঙুলের ডগায় এসে ভর করল। **রাহুল:** "আমি অলরেডি অনেকক্ষণ ধরে একটানা পড়ছি মা, মাথা আর কাজ করছে না। বাকিটা কাল সকালে ক্লাসের আগে দেখে নেব।" ইন্দিরা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড থমকালেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন না কী রিপ্লাই দেবেন। ছেলেটার হয়তো এখন ফোন ঘেঁটে সময় নষ্ট করার চেয়ে চোখ বুজে একটু রেস্ট নেওয়াটা বেশি জরুরি। তিনি কিছু টাইপ করার আগেই দেখলেন স্ক্রিনে আবার মেসেজ ঢুকছে। **রাহুল:** "মা, আমি আর জাস্ট নিতে পারছি না। আই অ্যাম মিসিং ইউ সো মাচ। বাবা সারাক্ষণ বাড়িতে বসে আছে, আমি তোমার সাথে পাঁচটা মিনিট শান্তিতে কথাও বলতে পারি না, আর জড়িয়ে ধরা তো অনেক দূরের কথা। মা... বাবা তো ঘুমিয়ে পড়েছে... তুমি কি প্লিজ একবার আমার ঘরে আসবে?" ছেলের এই কাঙালের মতো আকুতি পড়ে ইন্দিরার বুকের বাঁ দিকটা মুচড়ে উঠল। তাঁর নিজেরও তো একই অবস্থা। কিন্তু তিনি পরিণতমনস্কা, তাঁকে তো ঝুঁকির দিকটা মাথায় রাখতেই হবে। **ইন্দিরা:** "আমি বুঝতে পারছি সোনা। মা সব বোঝে। কিন্তু তুই তো জানিস, এখন যাওয়াটা একদমই সেফ নয়। তোর বাবা বাড়িতে থাকলে আমি রিস্ক নিতে পারব না।" **রাহুল:** "মা, তাহলে কাল খুব ভোরে আসবে? ঠিক সোমবারের মতো? আমি ৫:৩০-টায় অ্যালার্ম দিয়ে রাখব, ঠিক উঠে পড়ব মা, কোনো অসুবিধে হবে না।" ইন্দিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর ভেতরে যতই ইচ্ছা থাকুক, মায়ের কর্তব্যবোধ তাঁকে আটকাল। **ইন্দিরা:** "না না সোনা, আমি তোকে সবসময় কী বলি মনে নেই? অন্তত আট ঘণ্টার ঘুম তোর জন্য খুব জরুরি। বিশেষ করে এখন সেমিস্টার চলছে, তোর রুটিন ঠিক রাখাটা মাস্ট। তুই এমনিতেই অনেক রাত অবধি জাগিস, সেটা ঠিক আছে, কিন্তু সেক্ষেত্রে এত ভোরে ওঠার কোনো দরকার নেই।" রাহুল আর কোনো তর্ক করল না, শুধু একটা বিষণ্ণ মুখের ইমোজি (?) পাঠিয়ে দিল। ইন্দিরা বুঝতে পারলেন ছেলেটার মনটা পুরোপুরি ভেঙে গেছে। ওকে একটু চাঙ্গা করার জন্য, আর পরিস্থিতিটা হালকা করার জন্য তিনি একটা চপল, আদুরে মেসেজ টাইপ করলেন। **ইন্দিরা:** "ওরম দুঃখ দুঃখ মুখ করে থাকলে চলবে সোনা? সামনে কী আসছে, মাথায় আছে?" রাহুলের মেসেজ আসতে একটু সময় লাগল। ও হয়তো সত্যিই বুঝতে পারেনি। **রাহুল:** "কী আবার? এক্সাম তো এখনও কয়েক সপ্তাহ দেরি আছে মা..." ইন্দিরা নিজের ঘরে বসে শব্দ করে হেসে ফেললেন। ছেলেটা সত্যিই একটা আস্ত পাগল। **ইন্দিরা:** "দূর পাগল! তোর কি মনে হয়, আমি সারাক্ষণ খালি হয় পরীক্ষা, নয় অ্যাসাইনমেন্টের ডেডলাইন—এইসব নিয়েই জ্ঞান দিই? আমি কি এতটাই বোরিং আর খিটখিটে মা?" **রাহুল:** "তাহলে কীসের কথা বলছ মা?" **ইন্দিরা:** "আমার বাবুটার যে জন্মদিন! এই রবিবার।" রাহুল ওর নিজের বিছানায় বসে নিজের কপালেই একটা হালকা চাপড় মারল। সত্যি তো! **রাহুল:** "ওহ্ হ্যাঁ, তাই তো! আমার তো জাস্ট মাথাতেই ছিল না ব্যাপারটা।" **ইন্দিরা:** "যাই হোক সোনা, তুই কিন্তু রবিবারের পর থেকে আর টিনএজার নোস। দেখতে দেখতে কুড়ি বছরের একটা আস্ত যুবক হয়ে গেলি। চোখের সামনে আমার ছেলেটা এত বড় হয়ে যাচ্ছে ভাবলেই কেমন যেন অদ্ভুত লাগে। তা, এবছর নিজের জন্মদিনটা নিয়ে তোর কী ফিলিং হচ্ছে বল তো? কোনো স্পেশাল প্ল্যান আছে নাকি মাথায়?" **রাহুল:** "জন্মদিন নিয়ে আমার এমনিতেও কোনো এক্সাইটমেন্ট নেই। কী-ই বা আর স্পেশাল হবে? প্রতি বছর যা হয়, এবারও তাই হবে... সেই একই রুটিন, একই বোরিং দিন।" রাহুলের এই নিস্পৃহ, হতাশ মেসেজটা পড়ে ইন্দিরার বড্ড মায়া হলো। এই ছেলেটা সত্যিই এই বাড়িতে কোনো আনন্দ, কোনো সেলিব্রেশনের উষ্ণতা পায়নি কোনোদিন। তিনি একটু অভিমানের ভান করে টাইপ করলেন। **ইন্দিরা:** "ওহ আচ্ছা! তার মানে প্রতি বছর জন্মদিনে মায়ের হাতের ওই স্পেশাল রান্না, আর ওই পায়েস... ওগুলোর কোনো দামই নেই তোর কাছে? ওগুলো তোর কাছে বোরিং? ঠিক আছে, তাহলে এ বছর আর আমি কিচ্ছু রাঁধব না।" মায়ের এই অভিমানী মেসেজটা দেখে রাহুল এক সেকেন্ডে সোজা হয়ে বসল। ও তড়িঘড়ি ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে শুরু করল। **রাহুল:** "আরে না না মা! অফকোর্স নট! তুমি কী সব বলছ! তোমার হাতের ওই রান্নাটাই তো জন্মদিনের বেস্ট পার্ট। ওটা ছাড়া তো আমার জন্মদিনই হবে না! তুমি এবারও বানাবে তো মা? প্লিজ?" ইন্দিরা মুচকি হেসে রিপ্লাই দিলেন। **ইন্দিরা:** "অবশ্যই বানাব সোনা। তুই যখন এত করে রিকোয়েস্ট করছিস, তখন তোর এই বোরিং মা-কে তো রান্নাঘরে ঢুকতেই হবে। বল কী খাবি? সেই আগের বারের মতো বাসন্তী পোলাও আর মাটন কষা?" **রাহুল:** "হ্যাঁ মা! একদম ওই মেনুটাই। আর সাথে তো ওই ঘন করে বানানো পায়েসটা, কাজু আর কিশমিশ দেওয়া। জাস্ট ভাবলেই আমার জিভে জল চলে আসছে।" **ইন্দিরা:** "হুমম, দেখতে পাচ্ছি আমার পেটুক ছেলেটার নজর কোথায়। ঠিক আছে, মা তোর জন্য স্পেশাল করে সব বানিয়ে দেবে। তুই শুধু মায়ের বাধ্য ছেলে হয়ে থাকবি।" চ্যাটটা এবার খুব সহজ, ঘরোয়া এবং আদুরে একটা খাতে বইতে শুরু করল। মা আর ছেলের এই ডিজিটাল নৈকট্যটুকু যেন তাদের মাঝখানের ওই কয়েকটা ঘরের ব্যবধান মুছে দিচ্ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে, খুব মসৃণভাবে, রাহুলের মেসেজের সুরটা একটু পালটে গেল। **রাহুল:** "মা... শুধু যদি বাবা এই উইকেন্ডে বাড়িতে না থাকত, তাহলে কত মজাই না হতো, তাই না?" মেসেজটা পড়ে ইন্দিরার কপালে সামান্য ভাঁজ পড়ল। তিনি জানেন রাহুলের এই ফ্রাস্ট্রেশনের কারণ কী, কিন্তু তবুও একজন মা হিসেবে তিনি এই ধরনের মন্তব্য প্রশ্রয় দিতে পারেন না। **ইন্দিরা:** "না সোনা, তোর বাবাকে নিয়ে ওভাবে কথা বলতে নেই। মানুষটা হয়তো বাইরে থেকে একটু গম্ভীর, তাঁর এক্সপ্রেশনগুলো হয়তো একটু অন্যরকম, কিন্তু উনি ভেতরে ভেতরে তোকে খুব ভালোবাসেন রে বাবু। তোর ভালোর জন্যই তো উনি সারাদিন এত খাটেন।" **রাহুল:** "সরি মা... আমি আসলে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি। লাস্ট কয়েকটা দিন আমার সত্যিই খুব কষ্টে কাটছে। তোমাকে চোখের সামনে দেখেও ছুঁতে না পারার কষ্টটা তুমি বুঝবে না..." ছেলের এই আহত, বিষণ্ণ মেসেজটা ইন্দিরার বুকের ভেতরটা আবার মুচড়ে দিল। পরিস্থিতিটা একটু হালকা করার জন্য, এবং নেহাতই একটু মজার ছলে তিনি টাইপ করে ফেললেন একটা বেশ বিপজ্জনক প্রশ্ন। **ইন্দিরা:** "আচ্ছা বাবা, মানলাম। ধর যদি তোর বাবা বাড়িতে না থাকত, তাহলে তুই কী করতিস?" রাহুলের ঘর থেকে রিপ্লাই আসতে এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। যেন এই উত্তরটা ওর মগজে সারাক্ষণ তৈরিই ছিল। **রাহুল:** "আমি আবার তোমার সাথে চান করতাম, মা। আমি তোমাকে নিজের হাতে সাবান মাখিয়ে দিতাম, তোমাকে ধুয়ে দিতাম..." মেসেজটা স্ক্রিনে ফুটে উঠতেই ইন্দিরার শরীরটা যেন একটা তীব্র ইলেকট্রিক শকে কেঁপে উঠল। তাঁর হাতের তালু ঘেমে উঠল, আর ফর্সা মুখমণ্ডল এক লহমায় টকটকে লাল হয়ে গেল। তিনি বিন্দুমাত্র প্রত্যাশা করেননি যে রাহুল এত দ্রুত, এত সরাসরি এমন একটা চরম উত্তেজনাময় উত্তর দেবে। তাঁর নারীশরীরের আনাচেকানাচে সেই বাথরুমের পিচ্ছিল, বন্য স্মৃতির উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। তিনি বুঝতেই পারছিলেন না কী রিপ্লাই দেবেন। তাঁর প্রাজ্ঞ মগজ যেন ক্ষণিকের জন্য পুরোপুরি ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেল। আর কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে তিনি শুধু রাহুলের কথাটাই একটা প্রশ্নবোধক বাক্যে টাইপ করে পাঠিয়ে দিলেন। **ইন্দিরা:** "তুই... তুই আমার সাথে আবার স্নান করবি?" রাহুলের ঘর থেকে রিপ্লাই আসতে এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। **রাহুল:** "হ্যাঁ মা। তোমার কি মনে নেই সেই প্রমিসগুলোর কথা? আমি নিজের হাতে তোমাকে সাবান মাখিয়ে দেব, ভালো করে স্নান করিয়ে দেব... কতগুলো মাস কেটে গেল মা, আমরা তো ওটা আর করতেই পারলাম না। আর তুমিও তো বলেছিলে যে তোমার ইচ্ছে করে, মনে নেই?" ছেলের এই সরাসরিভাবে সব পুরোনো প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দেওয়ার পর ইন্দিরার বুকের ভেতরের প্রতিরক্ষার শেষ দেওয়ালটুকুও যেন ধসে পড়ল। তাঁর আঙুলগুলো কিপ্যাডের ওপর কাঁপছিল। অনেকক্ষণ পর, নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে তিনি স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়ার মতো, একটা প্রায় আত্মসমর্পণ করার ভঙ্গিতে মেসেজ লিখলেন। **ইন্দিরা:** "হ্যাঁ, আমার মনে আছে... দেখা যাক, ঈশ্বর চাইলে হয়তো হবে কোনোদিন। ওসব কথা আর ভাবিস না সোনা, যা ঘুমিয়ে পড় এবার।" কিন্তু রাহুল এখন আর থামার পাত্র নয়। ওর ভেতরের ওই না-পাওয়ার হাহাকারটা এবার একটা মরিয়া রূপ নিল। **রাহুল:** "মা, অন্তত তুমি কি এমন কোনো সময় বের করতে পারো, যেখানে আমরা দুজনে সামনাসামনি বসে একটু মন খুলে কথা বলতে পারি? একটা রিজনেবল অ্যামাউন্ট অফ টাইম? তুমি তো জানো মা, তুমি ছাড়া এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই যার সাথে আমি আমার মনের সব কথা শেয়ার করতে পারি..." ইন্দিরার বুকটা ভারী হয়ে এল। তিনি নিজেও তো ঠিক এটাই চান। কিন্তু উপায় কোথায়? সুব্রত যতদিন বাড়িতে আছে, এই চার দেওয়ালের ভেতর একান্তে কথা বলাটা প্রায় অসম্ভব। **ইন্দিরা:** "আমি তোর কষ্টটা বুঝতে পারছি সোনা। মায়েরও একই অবস্থা। কিন্তু উপায় তো দেখছি না রে বাবু। তোর বাবা বাড়িতে থাকলে সেটা কোনোভাবেই পসিবল নয়।" রাহুলের চিন্তা যেন ইন্দিরার সঙ্গেই একই ছন্দে মিলছিল। ও দ্রুত একটা সমাধান বের করল। **রাহুল:** "মা, আমি জানি বাড়িতে পসিবল নয়। তাহলে বাইরে কোথাও হলে কেমন হয়? মা, আমার কালকের ক্লাস তো বিকেল ৫টায় শেষ হয়ে যাবে। তুমি কি ইউনিভার্সিটি থেকে ওই সময়টায় বেরোতে পারবে? তাহলে আমরা কোথাও একটু দেখা করতে পারি... ধরো, এলিয়ট পার্কে?" ইন্দিরা মেসেজটা দেখে একটু থমকালেন। এলিয়ট পার্ক? তাঁর ল্যাপটপটা আবার খুলে দ্রুত ক্যালেন্ডারটা চেক করলেন। **ইন্দিরা:** "না সোনা, কাল বিকেল পাঁচটার সময় আমার একজন পিএইচডি স্টুডেন্টের সাথে মিটিং আছে। আমি বেরোতে পারব না।" **রাহুল:** "তাহলে তুমি কি প্লিজ মিটিংটা রিশিডিউল করতে পারো? ও তো একজন স্টুডেন্ট, ও নিশ্চয়ই কিছু মনে করবে না।" **ইন্দিরা:** "না বাবু, সেটা ঠিক হবে না। আমি অলরেডি এই মিটিংটা একবার রিশিডিউল করেছি। এটা মঙ্গলবারে হওয়ার কথা ছিল। আমি আবার পেছাতে পারব না, সেটা খুব আনপ্রফেশনাল দেখাবে।" রাহুল এবার ওর সমস্ত আবেগ ঢেলে দিল মেসেজে। **রাহুল:** "প্লিজ মা... প্লিজ... জাস্ট এই একবারের জন্য... একটু ভেবে দেখো মা। আমার জন্মদিনটাও তো রবিবার পড়েছে, মানে ওইদিনও বাবা বাড়িতে, আর আমরাও বাড়িতে। আমি তোমার সাথে ভালো করে দুটো কথাও বলতে পারব না। প্লিজ মা, আমি জানি স্টুডেন্টরা তোমাকে কতটা রেসপেক্ট করে, আর তারা খুব ভালো করেই জানে প্রফেসর সেন কতটা বিজি থাকেন। তুমি যদি মিটিংটা আরেকবার পিছিয়ে দাও, ও একটুও মাইন্ড করবে না। প্লিজ মা..." ইন্দিরা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তাঁর মনের ভেতর একটা প্রবল, উথালপাথাল করা দ্বন্দ্ব শুরু হলো। একদিকে তাঁর প্রফেশনাল এথিক্স, তাঁর কড়া রুটিন; আর অন্যদিকে তাঁর ছেলেটার ওই করুন, তৃষ্ণার্ত হাহাকার। তিনি চোখ বন্ধ করে ভাবার চেষ্টা করলেন। এলিয়ট পার্ক... ময়দান চত্বরের ওই সবুজ প্রান্তর। মাথার ওপর খোলা আকাশ, আর চারপাশে এক অচেনা, নাম-না-জানা ভিড়। সেখানে তিনি 'প্রফেসর ইন্দিরা সেন' নন, সেখানে তাঁর কোনো পরিচয় নেই। সেখানে তিনি শুধুই একজন সাধারণ নারী, যে তাঁর হৃদয়ের টুকরোটার সাথে দেখা করতে গেছে। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে সেটা একটা পাবলিক স্পেস। সেখানে দাঁড়িয়ে রাহুলকে বুকে জড়িয়ে ধরার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু অন্তত সেখানে কেউ তাঁদের চেনে না। তাঁরা পাশাপাশি বসে অন্তত এক-দেড় ঘণ্টা মন খুলে কথা তো বলতে পারবেন। হয়তো বেঞ্চে বসে একসাথে ঝালমুড়ি খেতে পারবেন। আর... আর যদি রাহুল চায়, হয়তো একটুক্ষণ ওর হাতটাও ধরে থাকতে পারবেন তিনি। আর তারপর... সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়বে, গোধূলির আলো যখন নিভে গিয়ে পার্কের বড় বড় গাছগুলোর নিচে একটা নিবিড়, ছায়াঘেরা অন্ধকার নেমে আসবে... তখন হয়তো... হয়তো তাঁরা একটু আড়ালে গিয়ে... একে অপরকে জড়িয়ে ধরতে পারবেন। এই শেষ চিন্তাটা মাথায় আসতেই ইন্দিরার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা আদিম, নিষিদ্ধ রোমাঞ্চের শিহরণ বয়ে গেল। তিনি নিজেই নিজের ভাবনায় শিউরে উঠলেন। এ তিনি কী ভাবছেন! ঠিক যেন সেইসব উঠতি বয়সী, কলেজ-পালানো প্রেমিক-প্রেমিকাদের মতো, যারা নিজেদের কড়া বাবা-মায়ের চোখ এড়িয়ে পার্কের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে একটুখানি আদর চুরি করতে যায়। আর আজ... আজ তিনি নিজে একজন মাঝবয়সী নারী, একজন মা হয়ে... নিজের জন্ম দেওয়া সাবালক ছেলের সাথে ঠিক সেই একই রকম একটা লুকোচুরির, একটা চুরি-করা প্রেমের শিহরণ কল্পনা করছেন! তিনি একটা গভীর শ্বাস নিয়ে কিপ্যাডে আঙুল রাখলেন। **ইন্দিরা:** "ঠিক আছে, রাহুল। কাল সাড়ে পাঁচটা। এলিয়ট পার্ক।" মেসেজটা পাওয়ার সাথে সাথে রাহুলের অন্ধকার ঘরে যেন একটা সশব্দ, উজ্জ্বল বোমা ফাটল। ওর পুরো শরীরটা একটা বন্য, লাগামছাড়া আনন্দে লাফিয়ে উঠল। ও বিছানায় প্রায় উঠে দাঁড়িয়ে মেসেজ টাইপ করতে লাগল। **রাহুল:** "থ্যাঙ্ক ইউ থ্যাঙ্ক ইউ থ্যাঙ্ক ইউ মা!!! আই অ্যাম সো এক্সাইটেড! তুমি জাস্ট আমাকে বাঁচিয়ে দিলে মা! আই লাভ ইউ সো সো মাচ!" ওর পাঠানো একগাদা লাল হার্ট ইমোজির দিকে তাকিয়ে ইন্দিরার ঠোঁটে এক পরম, স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। তাঁর বুকের ভেতরটা এক অসীম উষ্ণতায় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল। **ইন্দিরা:** "এবার ভালো করে ঘুমো সোনা। কাল কথা হবে।" (continued...)
Parent