The Barter System - অধ্যায় ৩

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-74260-post-6249887.html#pid6249887

🕰️ Posted on Sun Jun 28 2026 by ✍️ andygarfield (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2646 words / 12 min read

Parent
তৃতীয় পরিচ্ছেদ: প্রতীক্ষার অবসান ৩.১. সকালের আশীর্বাদ শুক্রবার সকালের সূর্যটা যেন এক দ্বিধাগ্রস্ত মায়া নিয়ে উদিত হলো। ইন্দিরার শোওয়ার ঘরের পাতলা পর্দা ফুঁড়ে আসা ফ্যাকাশে সোনালি আলো রেশমি ফিতের মতো মেঝেতে এসে পড়েছে। বাগান থেকে ভেসে আসা কোকিলের দূরবর্তী ডাক আর হাতের খবরের কাগজের খসখস শব্দ ছাড়া ঘরটা একেবারে নিস্তব্ধ। বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে আছেন ইন্দিরা; পরনে হালকা ঘিয়ে রঙের একটা সাধারণ আটপৌরে সুতির শাড়ি। শাড়ির আঁচলটা একটু আলগা হয়ে কাঁধের ওপর লটপট করছে। বাইরের সেই পরিপাটি রূপের বদলে বাড়িতে পরার এই অতি সাধারণ সুতির শাড়িতেও ওঁর স্বভাবসিদ্ধ আভিজাত্যটুকু স্পষ্ট। নাকের ডগায় রিডিং গ্লাসটা আটকে তিনি ‘দ্য * ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় চোখ বোলাচ্ছিলেন। বেডসাইড টেবিলে রাখা চায়ের কাপটা ততক্ষণে জুড়িয়ে এসেছে, ওপরে সরের একটা পাতলা আস্তরণ; চুমুক দেওয়ার আগে চামচ দিয়ে ওটা সরিয়ে নিতে হবে। রোজকার অভ্যাসমতো সাড়ে পাঁচটাতেই ঘুম ভেঙে গেছে ওঁর, যদিও আজ আর বিছানা ছেড়ে নিত্যদিনের রুটিনে ঢুকতে ইচ্ছে করছিল না। এই বিশেষ শুক্রবারের সকালটায় কেন যেন নিজের ঘরের এই শান্ত নির্জনতার মধ্যে আরও কিছুটা সময় আঁকড়ে থাকার এক গোপন আকুলতা কাজ করছিল ওঁর মনে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে যে অনিবার্য ঘটনাগুলো একে একে ঘটবে, সেগুলোকে যেন অবচেতনভাবেই কিছুটা পিছিয়ে দিতে চাইছিলেন তিনি। রাহুলের পরীক্ষা। সুব্রতর চলে যাওয়া। আর তারপর... তিনি জোর করে ভাবনাটাকে মন থেকে ঝেড়ে ফেললেন। হাম্পির সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের ওপর একটা আর্টিকেলে মন দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু অক্ষরের সারিগুলো চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছিল, মন আজ কিছুতেই ওঁর নির্দেশ মানতে রাজি নয়। দরজায় মৃদু টোকা ওঁর ভাবনায় ছেদ টানল। "মা?" কাঠের দরজার ওপার থেকে রাহুলের গলা ভেসে এল, বড্ড মৃদু আর দ্বিধামিশ্রিত। "ঘুম ভেঙেছে তোমার?" ইন্দিরা খবরের কাগজটা পাশে সরিয়ে চশমাটা ভাঁজ করা পাতার ওপর রাখলেন। "আয়, ভেতরে আয়।" দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল। রাহুল ঘরে ঢুকল। পরনে রাতের পাজামা আর একটা মলিন টি-শার্ট—কয়েক বছর আগে রাহুলের জন্মদিনের দিন ইন্দিরা কিনে দিয়েছিলেন, তখন রঙটা এতটা মলিন ছিল না। ঘুমের ঘোরে মাথার চুলগুলো অবাধ্যভাবে খাড়া হয়ে আছে, দেখতে বেশ নিষ্পাপ লাগছে ছেলেটাকে। কিন্তু ওর চোখদুটো সম্পূর্ণ সজাগ; সেখানে এক অদ্ভুত ভীতি আর অন্য এক অনুভূতির সংমিশ্রণ—হয়তো এক তীব্র প্রতীক্ষা, অথবা এক অনমনীয় জেদ। সে দরজাটা ভেজিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে এল। ওর প্রতিটি পদক্ষেপে এমন এক গভীর ধীরতা ছিল, যা দেখে ইন্দিরার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি জানতেন এরপর কী হতে চলেছে। এই আচার, এই ঐতিহ্য—কোনো বড় কাজের আগে গুরুজনদের আশীর্বাদ নেওয়া, বিনম্র শ্রদ্ধায় পা ছুঁয়ে প্রণাম করা—এই ধারা ইন্দিরা পেয়েছিলেন তাঁর নিজের মায়ের কাছ থেকে, আর রাহুল এটা আত্মস্থ করেছে ইন্দিরার থেকে। রাহুলের ছোটবেলা থেকেই এই অলিখিত নিয়মটা অবলীলায় চলে আসছে। বিছানার পাশে এসে রাহুল কোনো কথা বলল না। লম্বা শরীরটা নিয়ে সে ঘরের ঠাণ্ডা মার্বেল মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসল। পরম কুশলতায় সামনের দিকে ঝুঁকে সুতির শাড়িটার নিচ থেকে বেরিয়ে আসা ইন্দিরার পা দুটো নিজের দু-হাত দিয়ে ছুঁল সে। "মা," রাহুল ওর হাতটা নিজের কপালে ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, "প্রণাম।" ইন্দিরার গলাটা মুহূর্তের জন্য বুজে এল। কতবার তিনি এই দৃশ্য দেখেছেন! রাহুলের কত শত সকাল শুরু হয়েছে এভাবে—কলেজে যাওয়ার আগে, পরীক্ষার আগে, জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ও এভাবেই মায়ের আশীর্বাদ চেয়েছে। কিন্তু আজকের এই মুহূর্তটা কেন যেন মনে হচ্ছে খানিকটা আলাদা। এর পেছনে লুকিয়ে থাকা অর্থটা যেন নিছক ঐতিহ্যের গণ্ডি বা শ্রদ্ধার আদান-প্রদানকে ছাপিয়ে আরও গভীরে চলে গেছে। তিনি সামনের দিকে একটু ঝুঁকলেন, তাঁর হাতটা স্থির হলো রাহুলের মাথায়। আঙুলগুলো দিয়ে ওর এলোমেলো চুলগুলো আলতো করে গুছিয়ে দিতে দিতে নরম গলায় বললেন, "ওঠ সোনা। এখানে এসে বোস।" রাহুল মাথা তুলল, ওর চোখ জোড়া মায়ের চোখের ওপর স্থির হলো। ইন্দিরা সেই চোখে এক অদ্ভুত অসহায়তা দেখতে পেলেন—সেই ছোট্ট ছেলেটি, যে আজ এক তরুণের রূপ নিলেও ভেতরে এখনও অবোধই রয়ে গেছে। সে মেঝের ওপর থেকে উঠে বিছানার কিনারায় এসে বসল। এতটাই কাছে যে ওর চোখের নিচের হালকা কালচে ছায়া ইন্দিরার নজরে এল—রাত জেগে পড়ার স্পষ্ট প্রমাণ, যদিও ইন্দিরা ওকে পর্যাপ্ত ঘুমানোর কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন। "কাল রাতে তুই ঠিক করে ঘুমোসনি," ওঁর গলার স্বরে হালকা শাসনের সুর। "খুব ভালো ঘুম হয়েছে," রাহুল প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেও গালের সামান্য লালচে ভাব ওর মিথ্যেটা ধরিয়ে দিল। "আমি আসলে... শুয়ে শুয়ে মনে মনে ফর্মুলাগুলো জাস্ট রিভাইজ করছিলাম। সব ঠিকঠাক মনে আছে কি না দেখছিলাম।" ইন্দিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর গালটা হাতের তালুতে নিলেন। "তোকে বলেছিলাম না রেস্ট নিতে? ক্লান্ত মস্তিষ্ক সবসময় সিলি মিস্টেক করে বসে।" "জানি, জানি।" রাহুল মায়ের হাতের ছোঁয়ায় চোখদুটো আলতো বন্ধ করে একটু ঝুঁকে এল। "কিন্তু আমি নিজেকে আটকাতে পারছিলাম না। শুধু... সবকিছুর কথা মনে আসছিল।" "পরীক্ষার কথা?" ইন্দিরা জিজ্ঞেস করলেন, যদিও উত্তরটা ওঁর জানা ছিল। রাহুল চোখ খুলল। ওর চোখে আবার সেই চেনা স্ফুলিঙ্গ—এক তীব্র, উদগ্র আলো যা ওকে একই সাথে খুব ছোট আর অনেক পরিণত দেখাচ্ছিল। "হ্যাঁ, পরীক্ষার কথা," সে স্বীকার করল। "আর... তার পরের কথা।" ইন্দিরা নিজের অজান্তেই টের পেলেন ওঁর নাড়ির গতি বেড়ে গেছে। তিনি হাতটা সরিয়ে নিয়ে চায়ের কাপটা তুলে নিলেন, নিজেকে সামলানোর জন্য এক চুমুক দিলেন। চা ততক্ষণে জুড়িয়ে জল, স্বাদটাও সামান্য তেতো ঠেকছিল, তবুও তিনি গিলে নিলেন। "তুই ‘পরের’ বিষয়টার ওপর বড্ড বেশি ফোকাস করছিস," ওঁর গলার স্বর সাবধানে স্বাভাবিক রাখা। "তোর এখন শুধু পরীক্ষাটা নিয়েই ভাবা উচিত।" "আমি পরীক্ষা নিয়েও ভাবছি মা," রাহুল দ্রুত বলল। "সেইজন্যই তো ঘুমাতে পারিনি। আচ্ছা মা, যদি আমি নার্ভাস হয়ে যাই? যদি বোকার মতো কোনো ভুল করে ফেলি? এমসিকিউ-তে তো কোনো পারশিয়াল মার্কস নেই। একটা অপশন ভুল দাগালেই সব শেষ—" "রাহুল।" ইন্দিরা চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে পুরোপুরি ওর মুখোমুখি হলেন। নিজের দু-হাত দিয়ে রাহুলের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরলেন। "আমার কথা শোন। তুই কোনো বোকা ভুল করবি না। আমি বলছি, করবি না। জানিস কেন?" রাহুল নিঃশব্দে মাথা নাড়ল, তার চোখ মায়ের মুখে নিবদ্ধ। "কারণ তুই অত্যন্ত মেধাবী," ইন্দিরার কণ্ঠস্বর নিচু হলেও তাতে এক অমোঘ দৃঢ়তা ছিল। "কারণ আমি আজ পর্যন্ত যত স্টুডেন্ট দেখেছি—আর বিশ্বাস কর, আমি প্রচুর স্টুডেন্ট দেখেছি ... প্রায় কুড়ি বছর তো হতে চললো—তাদের মধ্যে তোর মতো হার্ডওয়ার্কিং আমি কাউকেই দেখিনি। তুই নিখুঁত, তুই সাবধানী, আর তুই যখন কোনো কাজে মন দিস, তখন নিজের সবটুকু উজাড় করে দিস।" তিনি ওর হাত দুটোতে মৃদু চাপ দিলেন। "আর সবচেয়ে বড় কথা, তুই আমার ছেলে। আমার ছেলে কখনো হেরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়নি।" রাহুলের এই ব্যাখ্যাটা ঠিক যেন মনে ধরলো না, বড্ড দায়সারা গোছের জেনেরিক একটা মন ভোলানো কথা মনে হল। রাহুলের মুখে একটা হালকা, ঈষৎ ব্যাঙ্গাত্মক কম্পিত হাসি ফুটে উঠল। "ওঃ তাহলে তো মিটেই গেল, তার মানে তুমি বলছো কোনো প্রেশারই নেই!" "প্রচণ্ড প্রেশার আছে," ইন্দিরা সংশোধন করে দিলেন, কিন্তু ওঁর চোখে তখন মায়ার আলো। "কিন্তু এই প্রেশার সামলানোর ক্ষমতা তোর আছে। তুই এই জন্যই তৈরি হয়েছিস।" তিনি একটা হাত মুক্ত করে ওর কপালের ওপর থেকে চুলের গোছাটা সরিয়ে দিলেন। "তুই সব জানিস সোনা। খুঁটিনাটি সব তোর তৈরি। ভেবে দেখ, তুই এর আগেও এই ধরনের কঠিন এমসিকিউ পরীক্ষা দিয়েছিস আর প্রত্যেকটাতেই ফাটাফাটি রেজাল্ট করেছিস। আমার স্পষ্ট মনে আছে, সেই পরীক্ষাগুলোর আগেও তুই ঠিক এভাবেই নার্ভাস হয়ে পড়তিস। তারপর পরীক্ষা দেওয়ার পর বাড়ি ফিরে হাসতে হাসতে তুই নিজেই তো বলতিস যে অযথাই এত টেনশন করছিলি, মনে আছে? আমি সবসময় আমার স্টুডেন্টদের একটা কথা বলি—পরীক্ষার আগে একটু-আধটু টেনশন থাকাটা ভালো। এতে প্রমাণ হয় যে স্টুডেন্ট তার পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস। কিন্তু অতিরিক্ত টেনশন একদম ভালো নয়, ওতে জানা জিনিসও গুলিয়ে যায়। তোকে শুধু পরীক্ষার হলে ঢুকতে হবে, একটা বুকভরে শ্বাস নিতে হবে, আর নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে।" "আর যদি আমি নব্বইয়ের ওপর না পাই?" প্রশ্নটা হঠাৎ করেই করে বসল রাহুল, ওর গলায় প্রায় এক শিশুর মতো শোনাল। হয়তো এই প্রশ্নটাই ওর মাথার মধ্যে এতক্ষন ঘুরছিলো। ইন্দিরার মুখের কঠিন ভাবটা গলে জল হয়ে গেল। "তুই পাবি। অবশ্যই পাবি। আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে তুই নব্বইয়ের অনেক ওপরে পাবি।" তিনি একটু থামলেন, তারপর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললেন, "আর যদি কোনো কারণে নাও পাস, তাও আমি তোকে নিয়ে ঠিক ততটাই গর্বিত থাকব। তুই সেটা জানিস তো?" রাহুলের চোখ দুটো সামান্য বড় বড় হয়ে গেল। "কিন্তু... আমাদের সেই শর্তটা—" "শর্ত শর্তের জায়গাতেই আছে," ইন্দিরা নরম গলায় ওর কথা থামিয়ে দিলেন। "আমি তোকে পিছলে যাওয়ার পথ করে দিচ্ছি না। আমি শুধু তোকে মনে করিয়ে দিচ্ছি যে তোকে নিয়ে আমার গর্ব, বা তোর প্রতি আমার ভালোবাসা—কোনো নম্বরের ওপর নির্ভর করে না। কোনোদিন করেনি।" তিনি দেখলেন রাহুল ধীরে ধীরে এই পরম সত্যটাকে নিজের মধ্যে গ্রহণ করছে, ওর কাঁধের আড়ষ্ট ভাবটা কিছুটা শিথিল হলো। সে মাথা নেড়ে একটা গভীর শ্বাস নিল। "ঠিক আছে," ও বলল। "ঠিক আছে। আমি পারব।" "এই তো, বাবুসোনাটা আমার। তুই পারবি, ঠিক পারবি" ইন্দিরা নিশ্চিত করলেন। "এবার বল, পরীক্ষার টাইমিংটা কী? কখন শেষ হচ্ছে?" "বিকেল পাঁচটায়," রাহুলের গলার স্বর এখন অনেক বেশি স্থির। "সাড়ে পাঁচটার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসা উচিত, খুব জোর পৌনে ছটা। আর বাবার ফ্লাইট তো রাত দশটায়, তার মানে বাবা সাড়ে ছটা নাগাদ বেরিয়ে যাবে, তাই তো?" "হ্যাঁ, ঠিকই হিসেব করেছিস," ইন্দিরার কণ্ঠে এবার প্রশ্রয়ের হাসি। "তোর বাবা সাড়ে ছটাতেই বেরোবে। আর আমরা দুজনেই বাড়িতে থাকব ওকে টাটা করার জন্য।" তিনি একটা ভ্রু সামান্য তুললেন। "কেন রে? তুই কি এখন থেকেই পাঁচটা বাজার মিনিট গুনছিস?" রাহুলের গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে টকটকে লাল হয়ে উঠল, সে চোখ সরিয়ে নিয়ে বিছানার চাদরের নকশার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। "মা..." "তোর হাবভাব বড্ড স্পষ্ট রে বোকা ছেলে," ঠোঁটের কোণের হাসিটা এবার আর চেপে রাখতে পারলেন না ইন্দিরা। তিনি হাত বাড়িয়ে ওর চিবুকটা আলতো করে ধরে মুখটা নিজের দিকে ফেরালেন। "তোর মনের কথা বর্ষার মেঘের মতো পরিষ্কার দেখা যায়।" "আমি কী করব বলো," রাহুল আমতা আমতা করল, তার লালচে ভাব তখনো কমেনি। "সারা সপ্তাহ ধরে আমি শুধু এটা নিয়েই ভাবছি। তোমার সাথে থাকার কথা... শুধু আমরা দুজন। কোনো বাধা থাকবে না, বাবার হঠাৎ ঘরে ঢুকে পড়ার কোনো টেনশন থাকবে না, কোনো—" "মন দে," ইন্দিরা ওর কথা থামিয়ে দিলেন, তবে গলায় কোনো কাঠিন্য ছিল না, ছিল পরম উষ্ণতা। "এই মুহূর্তে তোর মাথায় শুধু কেমিস্ট্রি থাকা উচিত। বাকি সবকিছু—সবকিছু—তার পরে আসবে। বুঝেছিস?" "বুঝেছি," রাহুল বলল, যদিও তার চোখের উজ্জ্বলতা বলছিল মন তখনো সেই ‘পরের’ বুদবুদেই ভাসছে। ইন্দিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্নেহের বিরত্তিতে মাথা নাড়লেন। "তুই আমাকে সত্যিই পাগল করে ছাড়বি, জানিস তো?" "তুমি তো সবসময় ওই এক কথাই বলো," রাহুল ঠোঁট টিপে হাসল। "কিন্তু তুমি তো তাও নরমালই আছো, পাগল হয়ে যাওনি তো।" "সব আমার পূর্বজন্মের কর্মফল," ইন্দিরা বিড়বিড় করলেন। সামনের দিকে ঝুঁকে ওর কপালে একটা গভীর চুমু খেলেন—এক পরম আশীর্বাদ, এক পবিত্র প্রতিশ্রুতি। "যা। রেডি হয়ে নে। ভালো করে ব্রেকফাস্ট করবি। আর রাহুল?" "বলো মা?" "আমি যা বলেছি মনে রাখিস। তুই প্রিপেয়ার্ড। যখন পরীক্ষার হল থেকে বেরোবি, তখন যেন তোর মনে হয় তুই তোর সেরাটা দিয়েছিস। আমার মুখ উজ্জ্বল করিস সোনা।" "সবসময়," রাহুল ফিসফিসিয়ে বলল। উঠে দাঁড়াল ও, ঘর থেকে বেরোতে ইচ্ছা করছিল না, কিন্তু যেতেই হবে। দরজার কাছে গিয়ে সে একবার পিছন ফিরে তাকাল। "তোমাকে খুব ভালোবাসি, মা।" "আমিও," ইন্দিরা নরম গলায় বললেন। "এবার যা।" দরজাটা মৃদু শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। ইন্দিরা আবার একা হয়ে গেলেন—সেই সকালের আলো, জুড়িয়ে যাওয়া চায়ের কাপ আর খবরের কাগজটার মাঝে। 'পাঁচটা,' তিনি মনে মনে ভাবলেন। 'আর তারপর সাড়ে ছটা। আর তারপর...' তিনি চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ, নিয়ন্ত্রিত শ্বাস নিলেন। মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে রাহুল নিজের দিনের পরিচিত রুটিনে ঢুকে পড়ল। ডাইনিং টেবিলে বসে চুপচাপ ব্রেকফাস্টটা সেরে নিয়েই সে আবার নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল। পরীক্ষার আগে এই শেষ কয়েকটা ঘণ্টা বড্ড দামি। টানা দু-ঘণ্টা বইয়ে মুখ গুঁজে আরও একবার শেষবারের মতো চোখ বুলিয়ে নিল সব ফর্মুলায়। এরপর স্নান সেরে, তাড়াহুড়ো করে লাঞ্চটা গিলে নিয়ে ও পরীক্ষার জন্য তৈরি হতে শুরু করল। বেরোনোর ঠিক আগে ও কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়াল ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো কৃষ্ণের ছবিটার সামনে। চোখ বন্ধ করে হাত জোড় করে মনে মনে প্রার্থনা করল, 'ঠাকুর, আর কিছু চাই না, শুধু এমসিকিউ-তে যেন নব্বইয়ের ওপরে পাই। জাস্ট নব্বইয়ের ওপর।' ছবিটার উদ্দেশ্যে ভক্তিভরে প্রণাম করে, একটা গভীর শ্বাস নিয়ে সে কাঁধে ব্যাগটা তুলে নিল। ৩.২. পরীক্ষার হল পরীক্ষার হল থেকে ফ্লোর-ওয়াক্স আর তীব্র উৎকণ্ঠার একটা অদ্ভুত গন্ধ আসছিল। সাতচল্লিশ নম্বর টেবিলে বসেছিল রাহুল; অ্যাডমিট কার্ডটা ডানদিকের কোণে নিখুঁতভাবে রাখা, আর ওএমআর শিটের পাশে পেনসিলগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজানো। চারপাশে আরও প্রায় দুশো ছাত্র-ছাত্রী খসখস শব্দ করছিল আর নড়েচড়ে বসছিল; ঘরের সেই সম্মিলিত স্নায়বিক উত্তেজনা যেন বাতাসে হাত দিয়ে ছোঁয়া যাচ্ছিল। হল ইনভিজিলেটর—কড়কড়ে ইস্ত্রি করা শাড়ি পরা এক গম্ভীর নারী—সারির মাঝখান দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন, টালির মেঝেতে তাঁর হিল জুতোর খটখট শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। "তোমাদের হাতে তিন ঘণ্টা সময় আছে," ওঁর কণ্ঠস্বর ঘরের গুঞ্জনকে ছাপিয়ে গেল। "তোমরা শুরু করতে পারো।" শুকনো পাতায় হঠাৎ হাওয়া লাগলে যেমন শব্দ হয়, ঠিক তেমনই প্রশ্নপত্র খোলার এক সম্মিলিত শব্দে হলটা গমগম করে উঠল। রাহুল প্রথম পাতার দিকে তাকিয়ে রইল, অক্ষরের সারিগুলো ক্ষণিকের জন্য চোখের সামনে ভাসছিল। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা কামারের হাতুড়ির মতো পিটছিল, এসি ঘর হওয়া সত্ত্বেও হাতের তালু ঘেমে উঠেছিল ওর। প্রশ্ন ১: S_N2 বিক্রিয়ায় নিচের কোন অ্যালকাইল হ্যালাইডটি সবচেয়ে দ্রুত সাড়া দেয়? খুব সহজ। বেসিক অর্গানিক কেমিস্ট্রি। ও এটা জানে। এই ধরনের মেকানিজম ও একশো বার, হাজার বার প্র্যাক্টিস করেছে। অথচ উত্তরগুলোর ওপর তার হাতটা ইতস্তত করছিল, মনের ভেতর ভোরের কুয়াশার মতো সন্দেহ দানা বাঁধছিল। 'যদি আমি প্রশ্নটা ভুল পড়ে থাকি? যদি এমন কোনো ট্রিক থাকে যা আমি খেয়াল করিনি?' সে চোখ বন্ধ করে একটা ধীর শ্বাস নিল। আর আচমকাই, সে তার মায়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, ঠিক যেন তিনি ওর পাশেই বসে আছেন: *'নিজের ওপর বিশ্বাস রাখ। বিশ্বাস রাখ তোর প্রস্তুতির ওপর।'* চোখ খুলতেই উত্তরটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। অপশন সি: মিথাইল ক্লোরাইড। সে খুব স্থির হাতে বৃত্তটি ভরাট করল, তারপর পরের প্রশ্নের দিকে এগিয়ে গেল। প্রথম এক ঘণ্টা কাটল এক গভীর মনোযোগের মধ্য দিয়ে। কিছু প্রশ্ন খুব সহজেই মিলে যাচ্ছিল, অন্যগুলোর জন্য একটু চিন্তার প্রয়োজন ছিল—ভুল অপশনগুলোকে বাদ দেওয়া, মনের ভেতরের হিসাবগুলোকে দু-বার করে মিলিয়ে নেওয়া। সে সময়ের গতি সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিল; চারপাশের পেনসিলের মৃদু খসখস শব্দ আর হল পরিদর্শকের পায়ের আওয়াজে প্রতিটা মিনিট যেন মেপে মেপে কাটছিল। প্রশ্ন ২৩: অ্যাসিট্যালডিহাইডকে লঘু ক্ষারের উপস্থিতিতে উত্তপ্ত করলে যে বিক্রিয়াটি ঘটে, তার মেকানিজম অনুযায়ী চূড়ান্ত উৎপাদটি কী হবে? রাহুল চোখের পলক ফেলল, সাময়িকভাবে একটু হকচকিয়ে গেল। অ্যালডল কনডেনসেশনের একটা বেশ জটিল ও ঘোরানো প্রশ্ন। উত্তরের অপশনগুলো এত কাছাকাছি যে সামান্য ভুল হলেই নম্বর কাটা যাবে। ও পেনসিলটা ঠোঁটে ঠেকিয়ে ভাবতে লাগল, মাথার ভেতর বিক্রিয়ার ধাপগুলো যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছিল। একটা মুহূর্তের জন্য ওর মনে হলো, হয়তো এই প্রশ্নটাই ওর নব্বই পার হওয়ার স্বপ্নটা ভেঙে দেবে। ঠিক তখনই সকালের সেই দৃশ্যটা ওর মনের পর্দায় ভেসে উঠল। বিছানার কিনারায় বসে থাকা মা, তাঁর চোখে-মুখে এক অদ্ভুত কোমলতা। ওর চুলে বিলি কেটে দেওয়া মায়ের সেই উষ্ণ হাতের স্পর্শটা রাহুল যেন এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসেও অনুভব করতে পারল। মায়ের সেই দীপ্ত, আত্মবিশ্বাসী মুখটা ওর চোখের সামনে ভাসল। *'তুই নিখুঁত, তুই সাবধানী, আর তুই যখন কোনো কাজে মন দিস, তখন নিজের সবটুকু উজাড় করে দিস... তুই আমার ছেলে। আমার ছেলে কখনো হেরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়নি।'* স্মৃতিটা ওকে এক অদ্ভুত মানসিক স্থিরতা দিল। মায়ের সেই গর্বিত হাসি আর ওর প্রতি অগাধ বিশ্বাসটুকু জাদুমন্ত্রের মতো কাজ করল। ও একটা গভীর শ্বাস নিয়ে নতুন করে প্রশ্নটার দিকে তাকাল। জট পাকানো ধাপগুলো এবার একে একে পরিষ্কার হতে শুরু করল ওর মাথায়। বিন্দুমাত্র না ভেবেই ও এবার সঠিক উত্তরটা চিনে নিল। অপশন বি। দ্বিতীয় ঘণ্টার মধ্যে সে নিজের ছন্দ খুঁজে পেয়েছিল। ভেতরের সমস্ত ভয় উবে গিয়ে সেখানে এক শান্ত একাগ্রতা দানা বেঁধেছিল। তার হাত উত্তরপত্রের ওপর খুব নিশ্চিতভাবে নড়ছিল, বৃত্ত ভরাট করা, পরের প্রশ্নে যাওয়া, কাজ মিলিয়ে নেওয়া—সবকিছু চলছিল এক ছন্দে। ফর্মুলাগুলো কোনো চেষ্টা ছাড়াই তার মনের গভীর থেকে ভেসে উঠছিল, ঠিক যেমন শান্ত জলের বুক চিরে মাছ ওপরে ভেসে ওঠে। তৃতীয় ঘণ্টাটা ছিল সময়ের বিরুদ্ধে এক লড়াই, কিন্তু সে জানত এই লড়াইয়ে সে জিতছে। কুড়ি মিনিট বাকি থাকতেই শেষ প্রশ্নটা সমাধান করে ফেলল ও, তারপর আবার প্রথম থেকে শুরু করে প্রতিটি উত্তর পদ্ধতিগতভাবে মিলিয়ে দেখতে লাগল। সে দুটো সিলি মিস্টেক খুঁজে পেল, যা তার নম্বর কেটে নিতে পারত। মায়ের সেই ‘রিভাইজ করার’ কড়া নির্দেশের প্রতি এক গভীর কৃতজ্ঞতায় সে ওগুলো শুধরে নিল। ইনভিজিলেটর যখন সময় শেষের কথা ঘোষণা করলেন, রাহুল এক পরম তৃপ্তিতে পেনসিলটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। সে পেরেছে। নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে ও। কিন্তু এটা কি যথেষ্ট ছিল? পরীক্ষার হল থেকে যখন সে শেষ বিকেলের রোদে বেরিয়ে এল, সংশয়টা আবার তার মনে উঁকি দিল। যে প্রশ্নগুলো পরীক্ষার খাতার পাতায় এত পরিষ্কার মনে হচ্ছিল, এখন স্মৃতির পাতায় সেগুলো কেমন যেন ঝাপসা ঠেকছিল। পনেরো নম্বরের উত্তরটা কি সত্যিই ঠিক হয়েছে? আর আটত্রিশ নম্বরটা? তবে এই সংশয়ে ওকে বেশিক্ষণ ভুগতে হবে না। ইউনিভার্সিটির নিয়ম অনুযায়ী, স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য পরীক্ষা শেষ হওয়ার পনেরো মিনিটের মধ্যেই তাদের অফিশিয়াল পোর্টালে এমসিকিউ-এর অ্যানসার-কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপলোড হয়ে যায়। অটোস্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় রাহুল পকেট থেকে ফোনটা বের করল। বাড়ি ফেরার পথেই সে নিজের ভাগ্যটা মিলিয়ে নিতে পারবে। 'নব্বইয়ের ওপর,' সে ভাবল, ফোনের স্ক্রিনে ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটটা খুলতে খুলতে। 'আমার নব্বইয়ের ওপর চাই-ই চাই।' শহরের কোলাহল আর রঙের মেলা ওর চোখের সামনে দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু রাহুল তার কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। তার মন ততক্ষণে অনেক দূর এগিয়ে গেছে—বাড়ির দিকে, মায়ের দিকে, আর সেই রাতের দিকে যা ওঁর জন্য অপেক্ষা করছে... যদি ও তা অর্জন করতে পেরে থাকে। (...continued in the next post)
Parent