The Barter System - অধ্যায় ৩২

Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-74260-post-6309290.html#pid6309290

Posted on Wed Sep 09 2026 by andygarfield (Profile)

Tags:incest
3483 words / 16 min read

Parent
(continuation of the chapter...) ১৫.২. অভিমানের মেঘ এবং ফিরে আসা এক আদিম লেনদেন এশিয়াটিক সোসাইটির সেই ঐতিহ্যবাহী, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হলঘরটিতে তখন পিনপতন নিস্তব্ধতা। ডক্টর ইন্দিরা সেন তাঁর বক্তৃতার একদম শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছেন। আজকের বিষয়বস্তু তাঁর বহুবার চর্চিত, অত্যন্ত চেনা একটি টপিক হলেও, তাঁর উপস্থাপনার ওই নিজস্ব, প্রখর আভিজাত্য আর অমোঘ কণ্ঠস্বরের জাদুতে সামনের সারিতে বসে থাকা শহরের নামজাদা বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে পেছনের সারির তরুণ গবেষকরা পর্যন্ত একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিলেন। তাঁর উচ্চারিত প্রতিটি শব্দে যেমন রয়েছে গভীর পাণ্ডিত্য, তেমনি তাঁর শরীরী ভাষায় ফুটে উঠছে এক অনস্বীকার্য, দৃপ্ত আত্মবিশ্বাস। বক্তব্য শেষ হতেই হলঘর ফেটে পড়ল করতালিতে। বক্তৃতার পর লাগোয়া লাউঞ্জে একটা ছোট্ট চা-চক্রের আয়োজন ছিল। সেখানেও ইন্দিরার চারপাশ ঘিরে রইল মানুষের ভিড়। কেউ তাঁর গবেষণার নতুন দিক নিয়ে প্রশ্ন করছেন, কেউ বা শুধু তাঁর সান্নিধ্য পেয়েই আপ্লুত। চিনামাটির কাপে দার্জিলিং চায়ে চুমুক দিতে দিতে অত্যন্ত শালীন, মেপে-তৈরি-করা হাসিমুখে সবার সাথে কথা বলছিলেন তিনি। তাঁর ভেতরের প্রফেশনাল সত্তা আজ পুরোপুরি তৃপ্ত। অবশেষে, ঘড়ির কাঁটা যখন বিকেল পাঁচটা ছুঁইছুঁই, তিনি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলেন। সোসাইটির তরফ থেকে পাঠানো এসি গাড়িটা পার্ক স্ট্রিটের মোড়েই অপেক্ষা করছিল। পেছনের সিটে এসে হেলান দিয়ে বসার পর ইন্দিরার মনে হলো, সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি যেন এক গভীর, প্রশান্তিকর স্বস্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। একটা সফল ইভেন্ট শেষ করার পর মনের ভেতর যে একটা ফুরফুরে, নির্ভার আনন্দ থাকে, সেটা তিনি এই মুহূর্তে পুরোপুরি উপভোগ করছিলেন। আর ঠিক সেই ফুরফুরে মেজাজের রেশ ধরেই তাঁর মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠল একটা চেনা মুখ। রাহুল। আজ সকাল থেকে ছেলেটার সাথে সেভাবে কথাই হয়নি। কালকের ওই এলিয়ট পার্কের ঘটনা, আর আজ সকালে তাঁর নিজের ওই 'খোলা দরজার' নীরব, বন্য স্বীকারোক্তি—সব মিলিয়ে ছেলেটার মনের ওপর দিয়ে যে কী বয়ে যাচ্ছে, তা তিনি খুব ভালো করেই জানেন। হয়তো ছেলেটা এখনও কালকের ওই ঘটনার জন্য তাঁর ওপর অভিমান করে আছে, অথবা ভাবছে মা বোধহয় এখনও ওর ওপর রেগে আছে। ইন্দিরার বুকের ভেতরটা এক অসীম মমতায় উথলে উঠল। তিনি নিজের সাইডব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে হোয়াটসঅ্যাপ খুললেন। দ্রুত টাইপ করতে শুরু করলেন তাঁর সোনা ছেলের জন্য: "রাহুল, তোর ওয়ার্কশপ কেমন চলছে? এতক্ষণে তো শেষ হয়ে যাওয়ার কথা, তাই না? এনিওয়ে, আমি জাস্ট এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে বেরোলাম, বাড়ির দিকেই যাচ্ছি। আজকের ইভেন্টটা খুব ভালো হয়েছে রে! আমি বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়েই আজ আমাদের দুজনের জন্য একদম তোর ফেভারিট মুচমুচে পেঁয়াজি ভাজব। তোর বাবা তো এখন অফিসে ওর পার্টনারদের সাথে মিটিংয়ে ব্যস্ত, ফিরতে দেরি হবে। তুই তাড়াতাড়ি চলে আয়। তুই ফিরলে আজ দুজনে মিলে একসাথে বসে গরম চায়ের সাথে পেঁয়াজি খাব!" মেসেজটা সেন্ড করে ইন্দিরা একটা তৃপ্তির হাসি নিয়ে ফোনের স্ক্রিনটা অফ করলেন। গাড়িটা তখন পার্ক স্ট্রিট পেরিয়ে চৌরঙ্গীর দিকে এগোচ্ছে। বাইরের আবহাওয়াটা আজ এক অদ্ভুত, রহস্যময় রূপ নিয়েছে। কিছুক্ষণ আগেই এক পশলা হালকা বৃষ্টি হয়ে গেছে। এখন সেই বৃষ্টির রেশ ধরে আকাশের এক দিকে জমে আছে নরম, ধূসর মেঘ, আর অন্য দিক চিরে বেরিয়ে এসেছে শেষ বিকেলের এক মায়াবী, সোনালি রোদ। ভেজা পিচগলা রাস্তা, গাছের পাতায় আটকে থাকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর ওপর সেই গোধূলির রোদ পড়ে পুরো কলকাতা শহরটাকে যেন কোনো এক রোম্যান্টিক, জলরঙের ক্যানভাসে পরিণত করেছে। ইন্দিরা নিজের পার্স থেকে ইয়ারফোনটা বের করে কানে লাগালেন। তাঁর ফোনে সেভ করা রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্লেলিস্টটা চালিয়ে দিলেন। গায়িকার সুমিষ্ট, উদাস করা কণ্ঠস্বর তাঁর কানের ভেতর দিয়ে গিয়ে সোজা মগজে আছড়ে পড়ল। *গোপন কথাটি রবে না গোপনে,* *উঠিল ফুটিয়া নীরব নয়নে।* *না না না, রবে না গোপনে॥* ইন্দিরা পেছনে হেলান দিয়ে চোখদুটো ধীরে ধীরে বন্ধ করে নিলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা নেশাতুর, আলগা হাসি। গানের সুরের সাথে সাথে তাঁর মনটা যেন ভাসতে ভাসতে চলে যাচ্ছিল এক অনন্ত শান্তির দেশে। https://iili.io/ndOUnaI.png কিন্তু সেই শান্তির মেয়াদ ছিল নেহাতই ক্ষণস্থায়ী। হঠাৎ করেই ইয়ারফোনের গানটা থেমে গিয়ে বেজে উঠল ফোনের তীক্ষ্ণ রিংটোন। চোখ মেলে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখলেন রাহুলের কল। ইন্দিরার বুকের ভেতরটা খুশিতে নেচে উঠল। তিনি তৎক্ষণাৎ কলটা রিসিভ করলেন। "হ্যালো রাহুল! ওয়ার্কশপ শেষ?" ইন্দিরার গলায় এক চনমনে, উচ্ছ্বসিত সুর। "হ্যাঁ মা, এই জাস্ট বেরোলাম," রাহুলের গলাটা একটু অন্যরকম, যেন কিছুটা আড়ষ্ট। "আমার মেসেজটা দেখেছিস তো? কখন ফিরছিস বাড়িতে? আমি কিন্তু বাড়ি গিয়েই ভাজতে শুরু করে দেব।" ওপার থেকে রাহুল একটু আমতা আমতা করে বলল, "হ্যাঁ মা, মেসেজটা দেখেছি... আসলে... ওই ব্যাপারটা নিয়েই কথা বলার ছিল।" ইন্দিরার কপালের পেশিগুলো সামান্য কুঁচকে গেল। "কোন ব্যাপারটা নিয়ে? কী হয়েছে?" "আসলে মা... একটু আগে বরুণের মা আমাকে ফোন করেছিলেন।" এই একটা নাম—'বরুণের মা'—শোনার সাথে সাথেই ইন্দিরার সেই ফুরফুরে মেজাজটা যেন এক বালতি বরফ-ঠান্ডা জলে ডুবে গেল। তাঁর গলার স্বর মুহূর্তের মধ্যে এক হিমশীতল, টানটান গাম্ভীর্যে নেমে এল। "ওহ্... আচ্ছা... তা হঠাৎ উনি তোকে ফোন করতে গেলেন কেন?" রাহুল পরিস্থিতিটার গুরুত্ব বুঝতে পেরেই যেন একটু ডিফেন্সিভ গলায় বোঝানোর চেষ্টা করল, "আমি ঠিক শিওর নই মা, তবে মনে হয় বরুণ ফেসবুক থেকে আমার কালকের বার্থডে-র নোটিফিকেশনটা পেয়ে ওর মাকে বলেছে। উনি ফোন করে বললেন যে, আমি কলেজ থেকে ফেরার পথে যেন একবার অন্তত ওদের বাড়িতে যাই। উনি নাকি আইডিয়ালি কালকেই আমাকে ইনভাইট করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ভাবলেন কাল হয়তো আমার অন্য কোনো প্ল্যান থাকতে পারে, আর তাছাড়া ওরা নাকি কালকেই ফ্যামিলি নিয়ে কোথায় একটা ট্রাভেল করছে। তাই আজই একবার দেখা করতে বললেন।" ইন্দিরা এক সেকেন্ডের জন্য চুপ করে রইলেন। তাঁর চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে আসছে। রাহুল আবার বলতে শুরু করল, "এমনকি বরুণও বলেছে। ও আজকে কলেজে আসেনি, ওদের ডিপার্টমেন্টে কোনো ইভেন্ট ছিল না। কিন্তু ও-ও আমাকে কয়েকটা টেক্সট করে খুব রিকোয়েস্ট করল যাওয়ার জন্য। বলল, আন্টি নাকি আমার জন্য স্পেশাল করে বিরিয়ানি বানাবেন।" ইন্দিরার মগজের ভেতর তখন একটা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়ে গেছে। তাঁর ছেলের জন্য ওই মহিলা বিরিয়ানি বানাবে? গতকাল এলিয়ট পার্কে তাঁর ছেলের হাত ধরে টানাটানি করার পর আজ সোজা বাড়িতে নেমন্তন্ন? তাঁর ভেতরের সেই প্রাজ্ঞ, শিক্ষিতা নারীসত্তাটা এক লহমায় কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল। তার জায়গা নিল এক চরম পজেসিভ, বন্য এবং অন্ধ ঈর্ষায় জ্বলতে থাকা এক আদিম মানবী। তাঁর শ্বাসটা দ্রুত হয়ে এল। "না... রাহুল... কোনো দরকার নেই," ইন্দিরার গলার স্বরটা এতটাই রুক্ষ আর শুকনো শোনাল যে রাহুল নিজেই চমকে গেল। "তোর ওখানে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। তুই সোজা কলেজ থেকে বাড়ি আয়।" রাহুল একটু অবাক হয়ে, একটু জোর দিয়েই বলল, "কেন মা? কী হয়েছে? আমি তো জাস্ট একটু ঘুরে আসব..." "আমি বললাম না, যাবি না!" ইন্দিরা এবার প্রায় ধমকের সুরে বলে উঠলেন, কিন্তু কথা বলার সময় তিনি কোনো যুৎসই লজিক খুঁজে পাচ্ছিলেন না। "আমার কথা শোন... তুই বাড়ি ফিরে আয়... এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে..." রাহুলের গলার স্বরে এবার একটা স্পষ্ট অভিযোগ আর বিরক্তি ফুটে উঠল। "তোমার প্রবলেমটা কোথায় মা? তুমি কালও এলিয়ট পার্কে আমার সাথে এরকম একটা উইয়ার্ড বিহেভ করলে, আর আজও করছ! কেন? আমি জানি তুমি আন্টিকে খুব একটা পছন্দ করো না, কিন্তু মা, উনি তো আমার সাথে কোনোদিন খারাপ বিহেভ করেননি! উলটে উনি এত ভালোবেসে কাল পার্কে কথা বললেন, আর আজ আমার বার্থডে-র জন্য এত করে ইনভাইট করছেন..." এই কথাগুলো ইন্দিরার কানে যেন গলিত সিসের মতো ঢুকল। তাঁর ছেলে ওই মহিলার হয়ে তাঁর সাথে তর্ক করছে? তাঁর ভেতরের ঈর্ষা আর রাগের আগুনটা এবার তাঁর সমস্ত বুদ্ধি আর যুক্তিকে গ্রাস করে নিল। তিনি একজন পিএইচডি করা, নামজাদা প্রফেসরের মতো নয়, বরং ক্লাস ফোরের একটা জেদি বাচ্চার মতো যুক্তিহীনভাবে বলে উঠলেন: "ওহ্! তাই নাকি? এতই যদি ভালোবাসা, তাহলে এত বছর ধরে তোর বার্থডে-তে কোনোদিন ইনভাইট করেনি কেন শুনি? হঠাৎ এই বছরই কেন এত আদিখ্যেতা উথলে উঠল ওঁর?" রাহুল ফোনের ওপারে পুরো হতবাক হয়ে গেল। মায়ের মুখে এমন সস্তা, শিশুসুলভ যুক্তি ও জীবনে কোনোদিন শোনেনি। "মা... তুমি এসব কী বলছ? তুমি কি নিজের কথাগুলো নিজে শুনতে পাচ্ছ?" রাহুল এক চরম অবিশ্বাসের সুরে বলল। "আমি তো তোমাকে বললাম, উনি সবে ফেসবুক থেকে আমার বার্থডে-র কথা জানতে পেরেছেন। আর গতকালই তো আমাদের সামনাসামনি দেখা হলো, তখন উনি নিজের বাড়িতে যাওয়ার কথা বলেওছিলেন, তাই না? তাহলে আজ যখন দেখলেন যে কাল আমার বার্থডে, আর কাল ওরা ট্রাভেল করছে, তখন আই গেস উনি ভাবলেন এটাই হয়তো আমাকে ডাকার বেস্ট সুযোগ। এনিওয়ে মা, আমি বুঝতে পারছি না তুমি এত সিম্পল একটা ব্যাপারকে এত কমপ্লিকেটেড কেন করছ! ওরা আমাদের এত কাছেই থাকে, আমি যাব, একটু গল্প করব, খেয়েদেয়ে চলে আসব... এর মধ্যে এত মহাভারত অশুদ্ধ হওয়ার কী আছে?" ইন্দিরার মগজ তখন পুরোপুরি ব্ল্যাঙ্ক। তিনি জানেন রাহুল একদম ঠিক বলছে। তাঁর এই রাগের, এই ঈর্ষার কোনো যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি নেই। কিন্তু তাঁর মন কিছুতেই মানতে চাইছে না। তাঁর ছেলে ওই মহিলার সাজানো ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসবে, আর ওই মহিলা ওর গায়ে হাত দিয়ে ন্যাকামি করবে। কিছুতেই না! কিন্তু তিনি যখন কোনো লজিকই খুঁজে পেলেন না, তখন তিনি অত্যন্ত অযৌক্তিক একটা অস্ত্র ছুঁড়লেন। "তোর কি কোনো হোমওয়ার্ক নেই, রাহুল?" ইন্দিরার গলাটা রীতিমতো কাঁপছে রাগে। "তোর তো সামনে ক্লাস টেস্ট! তুই দিন দিন বড্ড ফাঁকিবাজ হয়ে যাচ্ছিস, বলে দিলাম! সারাক্ষণ শুধু বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর ঘোরাঘুরি!" রাহুল এবার আর নিজের মেজাজ ঠিক রাখতে পারল না। ও একপ্রকার চেঁচিয়ে উঠল, "মা!! হোয়াট আর ইউ ইভেন সেয়িং? আমি ফাঁকিবাজ? তুমি খুব ভালো করেই জানো আমি পড়াশোনা নিয়ে কতটা সিরিয়াস! জাস্ট এক-দেড় ঘণ্টার একটা ভিজিটে আমার পড়াশোনার কী এমন ক্ষতি হয়ে যাবে? আমি বাড়ি ফিরে ঠিক আমার হোমওয়ার্ক করে নেব!" ইন্দিরা বুঝতে পারলেন, তাঁর হাত থেকে পরিস্থিতি পুরোপুরি বেরিয়ে গেছে। রাহুলকে কোনো যুক্তিতেই তিনি আটকাতে পারবেন না। আর তিনি নিজের আসল রাগের কারণটাও ওকে বলতে পারবেন না। তাঁর ভেতরের অসহায়তাটা এবার একটা জমাট বাঁধা অভিমানে রূপান্তরিত হলো। তিনি গলার স্বরটাকে এক হিমশীতল, চরম অবজ্ঞার খাদে নামিয়ে আনলেন। "ওকে, রাহুল। তুই এখন অনেক বড় হয়েছিস। নিজের ভালোমন্দ ডিসিশন নেওয়ার মতো সাবালক তুই হয়ে গেছিস। তোর কাছে তো এখন আর মায়ের কথার কোনো দাম নেই। এনিওয়ে, তোর যা যুক্তিসঙ্গত মনে হয়, তুই তাই কর।" কথাটা শেষ করেই তিনি আর রাহুলের কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে খট করে ফোনটা কেটে দিলেন। ফোনটা সিটের ওপর প্রায় জোরে শব্দ করে রেখে ইন্দিরা গাড়ির সিটের ওপর সজোরে হেলান দিলেন। তাঁর বুকের ভেতরটা তখন একটা আগ্নেয়গিরির মতো ফুটছে। হতাশা, রাগ, অপমান, আর এক তীব্র, অন্ধ ঈর্ষা তাঁকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। তাঁর ওই প্রখর যুক্তিবাদী মন তাঁকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে তিনি কতটা অ্যাবসার্ড, কতটা ভিত্তিহীন একটা আচরণ করলেন এইমাত্র। তিনি তো নিজেই রাহুলকে শিখিয়েছেন বড়দের সম্মান করতে। আর আজ তিনি নিজেই সেই শিক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে একটা পাগলের মতো বিহেভ করলেন! কিন্তু তাঁর ওই অভিমানী মন কিছুতেই এই আত্মবিশ্লেষণ মানতে চাইল না। সে শুধু বারবার একটা কথাই বলতে লাগল—ছেলেটা আমার কথা শুনল না! ওই দেবলীনার বিরিয়ানি ওর কাছে মায়ের কথার চেয়েও বড় হয়ে গেল! তিনি চোখদুটো শক্ত করে বুজে ফেললেন। ইয়ারফোনে তখন রবীন্দ্রসঙ্গীতের পরের অন্তরা শুরু হয়েছে। *বিভল হাসিতে* *বাজিল বাঁশিতে,* *স্ফুরিল অধরে নিভৃত স্বপনে--* *না না না, রবে না গোপনে॥* ফোনটা আবার বেজে উঠল। স্ক্রিনে নাম ভাসছে—'গঙ্গা'। এমনিতেই ইন্দিরার মেজাজ তখন সপ্তমে চড়ে আছে। এই অসময়ে গঙ্গা মাসির ফোন তাঁকে আরও বিরক্ত করল। তিনি একটা বিরক্তিকর 'উফ্' শব্দ করে ফোনটা রিসিভ করলেন। "কী হলো গঙ্গা?" ওপার থেকে গঙ্গা মাসির অত্যন্ত করুণ, কান্নামিশ্রিত গলা ভেসে এল। "ম্যাডাম জি... ম্যায় কাল সুবহে মে কাম পে নহী আ পাউঙ্গি... মেরি ছোটি বেটি কো বহুত তেজ বুখার আ গয়া হ্যায়... উল্টি ভি কর রহি হ্যায়। মুঝে কাল উসকো ডাক্তার কে পাস লে জানা পড়েগা..." খবরটা শুনে ইন্দিরার মেজাজটা যেন এক ধাক্কায় আরও দশ তলা চড়ে গেল। কাল রাহুলের জন্মদিন! কালকে এতগুলো স্পেশাল রান্না করার প্ল্যান, আর কালকেই গঙ্গা মাসি অ্যাবসেন্ট! কিন্তু তাঁর ভেতরের মানবিক রূপটা এই রাগের মধ্যেও তাঁকে সম্পূর্ণ অমানুষ হতে দিল না। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের বিরক্তিটাকে গিলে নিলেন। "ওহ্... আচ্ছা আচ্ছা। ঠিক আছে, তুই মেয়ের খেয়াল রাখ, কাল সেরম হলে আসিস না।" তিনি নিজের প্রফেশনাল, অভিজ্ঞ গলায় কিছু মেডিক্যাল অ্যাডভাইস দিতে শুরু করলেন। "শোন, যদি দেখিস জ্বর একশোর ওপরে আছে, তাহলে একটা প্যারাসিটামল খাইয়ে দিস। আর বারবার জল পট্টি দে। পেটটা খারাপ হলে ওআরএস দিস, বুঝলি? আর কাল সকালেই ডাক্তার দেখিয়ে নে। কিছু দরকার হলে আমাকে বলিস।" গঙ্গা মাসি ওপার থেকে বারবার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফোনটা রাখল। বলল সব ঠিক থাকলে চেষ্টা করবে দুপুরের দিকে আসার। ইন্দিরা ফোনটা সিটের ওপর নামিয়ে রাখলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে তাঁর সাজানো, সুন্দর বিকেলটা যেন একটা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। প্রথমত, ছেলেটা ওই ডাইনির বাড়িতে গেল। দ্বিতীয়ত, কাল সকালে গঙ্গা মাসি আসবে না। আর তৃতীয়ত, সুব্রত কাল সারাদিন ক্লায়েন্ট মিটিং আর ফাইলস নিয়ে নিজের ঘরে ব্যস্ত থাকবে। তার মানে, কাল রাহুলের জন্মদিনের স্পেশাল রান্নার জন্য যা যা বাজার-হাট করার দরকার, সেই সব তাঁকে একাই গিয়ে কিনে আনতে হবে। তাঁর মাথাটা এবার দপদপ করে ব্যথা করতে শুরু করল। তিনি গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন। ট্রাফিক জ্যামে গাড়িটা গত বেশ কয়েক মিনিট ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর গাড়ির ঠিক সামনে, ডান দিক ঘেঁষে একটা ভিড়ে ঠাসা বাস দাঁড়িয়ে। বাসের পেছনের দিকের নাম্বার প্লেটের ঠিক নিচে, কালো রঙের কালিতে একটা কোটেশন লেখা আছে: "Everything happens for a reason." ইন্দিরা বাক্যটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। এই চরম ফ্রাস্ট্রেশনের মুহূর্তে এই ফিলোসফিক্যাল জ্ঞানবাণী তাঁর কাছে এক চূড়ান্ত রসিকতা ছাড়া আর কিছুই মনে হলো না। তিনি একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে চোখ সরিয়ে নিলেন। আবার সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজে গানের ভলিউমটা বাড়িয়ে দিলেন। বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় ছটা বেজে গেল। ইন্দিরা যখন সদর দরজা খুলে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকলেন, তখন তাঁর পুরো শরীর আর মন এক চরম অবসাদে ডুবে আছে। ফ্ল্যাটটা নিঝুম। ইন্দিরার মনের ভেতর কোনো উৎসাহ, কোনো ভালোলাগা অবশিষ্ট নেই। তাঁর খুব খিদে পেয়েছিল, কিন্তু এখন আর নিজের জন্য কিছু বানানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তাঁর নেই। তিনি সোজা রান্নাঘরে গিয়ে সকালের বেঁচে যাওয়া খাবারগুলো বের করলেন। একটা বাটিতে কিছুটা ভাত আর তরকারি নিয়ে মাইক্রোওয়েভে গরম করতে ঢোকালেন। মাইক্রোওয়েভের সেই একটানা 'মুমমম' শব্দটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তিনি নিজের পার্স থেকে ফোনটা বের করে গুগল ক্যালেন্ডারটা খুললেন। কালকের দিনের শিডিউলটা একবার দেখে নেওয়া দরকার। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তাঁর হৃৎপিণ্ডটা যেন এক লহমায় থমকে গেল। কাল শনিবার সকালে তাঁর একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্লক করা আছে। এটা সেই মিটিং, যেটা তিনি গত শুক্রবার রাহুলের সাথে এলিয়ট পার্কে দেখা করার জন্য তাঁর পিএইচডি স্টুডেন্টের সাথে রি-শিডিউল করেছিলেন! এতবার পেছানোর জন্য কালকের মিটিংটাও বেশ লম্বা সময়ের জন্য শিডিউল করা আছে। "ওহ্ নো... মাই গড..." ইন্দিরা অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে নিজের কপালে হাত দিলেন। তিনি এটা পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিলেন! মিটিং শেষ হতে হতে অন্তত দুপুর এগারোটা তো বাজবেই। তারপর কখন বাজার করবেন, কখনই বা রান্না করবেন! পরিস্থিতির এই নির্মম সত্যটা ইন্দিরার মগজে আছড়ে পড়তেই তাঁর মনে হলো তিনি যেন একটা ফাঁদে পড়ে গেছেন। কাল সকালে যদি বাজারে যেতে না পারেন, তাহলে রাহুলের বার্থডে-র রান্নার জন্য জিনিসপত্র আসবে কোথা থেকে? তার একটাই মানে—তাঁকে আজ রাতেই, এই ক্লান্ত, অবসন্ন শরীর নিয়েই বাজারে দৌড়তে হবে! মাইক্রোওয়েভটা একটা 'বিপ' শব্দ করে বন্ধ হলো। ইন্দিরা যন্ত্রচালিতের মতো বাটিটা বের করে নিয়ে এসে ডাইনিং টেবিলে একা বসলেন। একটা চামচ দিয়ে ভাতের দলাগুলোকে এদিক-ওদিক নাড়াচাড়া করতে লাগলেন তিনি। খাবারটা তাঁর মুখে যেন ছাইয়ের মতো লাগছিল। এই বিশাল, নিস্তব্ধ ডাইনিং রুমে একা বসে থাকতে থাকতে তাঁর ভেতরের ওই অন্ধ, অভিমানী রাগের আবরণটা ধীরে ধীরে খসতে শুরু করল। তিনি কী করছেন এসব? কেন তিনি এমন পাগলের মতো বিহেভ করছেন? রাহুল তো কোনো অন্যায় করেনি! ছেলেটা তো জাস্ট একটা সাধারণ সৌজন্যতা বজায় রাখার জন্য ওই বাড়িতে গেছে। আর তিনি? তিনি নিজের ওই ভিত্তিহীন, অবদমিত আর গোপন ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে ছেলেটাকে এমন একটা ডাহা মিথ্যে অপবাদ দিলেন? 'তুই ফাঁকিবাজ হয়ে যাচ্ছিস... সারাক্ষণ শুধু বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর ঘোরাঘুরি...'—এই কথাটা তিনি কীভাবে বলতে পারলেন ওই ছেলেটাকে, যে ছেলেটা গত তিনটে মাস চেন্নাইয়ে একা পড়ে থেকে গাধার মতো খেটেছে! এলিয়ট পার্কে তিনি বিনা দোষে ছেলেটার সাথে দুর্ব্যবহার করেছেন, আর আজ আবার ফোনে ওই একই কাজ করলেন! ইন্দিরার চোখদুটো জলে ঝাপসা হয়ে এল। তিনি নিজের যুক্তিবাদী, প্রাজ্ঞ মনটাকে যেন আবার ফিরে পাচ্ছিলেন। তাঁর ছেলেটা, তাঁর ওই মেধাবী, নম্র, ভদ্র, নিষ্ঠাবান ছেলেটা, যার চোখের প্রতিটা চাউনিতে শুধু তাঁর জন্য এক অনন্ত, অন্ধ ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে—তিনি সেই ছেলেটার সাথে এমন রূঢ় আচরণ করলেন! রাহুলের বলা প্রতিটা লাইন, ওর ওই অভিমানী গলার স্বর এখন ইন্দিরার কানের ভেতর এক অদ্ভুত, যন্ত্রণাদায়ক আবার একই সাথে মিষ্টি আবেশ তৈরি করছিল। ছেলেটা কতটা ইনোসেন্ট; ওর মনটা কত স্বচ্ছ, কত সুন্দর! ইন্দিরা যাহোক করে খাওয়া শেষ করলেন। প্লেটটা সিঙ্কে নামিয়ে রেখে, ভালো করে হাত ধুয়ে তিনি ড্রয়িংরুমের ওই বড় সোফাটায় এসে গা এলিয়ে দিলেন। তাঁর পুরো শরীরটা ব্যথায় আর ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে। তিনি সোফার ওই নরম চামড়ার গদিতে পিঠ ঠেকিয়ে চোখদুটো বন্ধ করলেন। তাঁর মনের ভেতরের ফ্রাস্ট্রেশনটা এখন এক গভীর, উষ্ণ ভালোবাসায় গলে গেছে। তিনি নিজের মনে মনেই হাসলেন। 'আমিও না... একটা পাগল মা...' তিনি ফিসফিস করে নিজেকেই নিজে বললেন। 'অতিরিক্ত পজেসিভ হয়ে গেছি আমি ছেলেটাকে নিয়ে... আমার ছেলেটা শুধু আমারই থাকবে, কেউ ওর দিকে চোখ তুলেও তাকাতে পারবে না... এই রাগে আমি নিজে ওর সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলাম! কিন্তু ছেলেটা তো আমার কোনো কথাই অমান্য করে না কোনোদিন। আজ শুধু ওই একটুখানি রিকোয়েস্ট ফেলতে পারেনি বলে...' এই চিন্তাগুলো করতে করতেই তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল রাহুলের মুখচ্ছবি। তাঁর ভেতরের মাতৃসত্তাটা এক অদ্ভুত, মিষ্টি রোমাঞ্চে শিউরে উঠল। 'আমার অবাধ্য, দুষ্টু ছেলেটা...' তিনি অন্ধকারে সোফার কুশনে মাথা এলিয়ে ফিসফিস করে নিজেকেই নিজে বললেন। 'কত বড় হয়ে গেছে... কবে যে এতটা লম্বা, এতটা ফিটফাট হয়ে গেল ছেলেটা! ওই কাঁধদুটো, ওই শক্ত, ছড়ানো বুকটা... সেদিন যখন শার্টটা খুলে ফেলল, আমি তো চোখের পলকই ফেলতে পারছিলাম না। আমার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না যে এই ছেলেটাকে আমি পেটে ধরেছি। কী সুন্দর ওই চিবুকের ধারালো রেখাগুলো... আর ওই অপূর্ব চোখদুটো, যেগুলো সারাক্ষণ শুধু আমার দিকেই এমন কাঙালের মতো তাকিয়ে থাকে। আস্ত একটা ম্যান হয়ে উঠেছে আমার বাবুটা... এতটা হ্যান্ডসাম, এতটা অ্যাট্রাকটিভ! বাইরের যে কোনো মেয়ে তো ওকে দেখলে পাগল হয়ে যাবে। কিন্তু ওর সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আমার এই এত বড়, ধেড়ে ছেলেটা, যে কিনা এক হাতে আমাকে পাঁজকোলা করে তুলে নিতে পারে, সে-ই কিনা এখনও আমার বুকের ওম খোঁজার জন্য ওই ছোট্ট বাচ্চাটার মতোই ছটফট করে। মায়ের কাছে সেই ছোট্টটিই রয়ে গেছে... আমার, শুধুই আমার...' ক্লান্তি আর এই উষ্ণ ভাবনার প্রলেপে তাঁর চোখের পাতাগুলো ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এল। তিনি সোফার ওপরই একটা গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন। --- প্রায় কুড়ি মিনিট পর। হঠাৎ করেই ড্রয়িংরুমের নিস্তব্ধতা ভেঙে সদর দরজার কলিং বেলটা বেজে উঠল। 'ডিং-ডং'। ইন্দিরা এক ঝটকায় ঘুম থেকে ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। প্রথম কয়েক সেকেন্ড তিনি বুঝতেই পারলেন না তিনি কোথায় আছেন। তিনি দ্রুত শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে নিয়ে গিয়ে দরজাটা খুললেন। আর দরজা খুলতেই তাঁর চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন রাহুলকে! দেওয়ালঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলেন ৬:৪০ বাজে। এত তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া সেরে রাহুল ফিরে এলো? রাহুলের পরনে সেই সকালের জামাকাপড়, কাঁধে ব্যাগ। কিন্তু ওর মুখে একটা অদ্ভুত, অপরাধী আর কাঁচুমাচু হাসি। ইন্দিরা ওর দিকে তাকিয়ে চরম অবাক হয়ে গেলেন। তাঁর ভেতরের সেই মাতৃত্বের আনন্দটা এক লহমায় লাফিয়ে উঠল। ছেলেটা এত তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছে! কিন্তু তাঁর ওই নারীসুলভ, অভিমানী ইগোটা তখনও পুরোপুরি শান্ত হয়নি। তিনি নিজের খুশিটাকে নিখুঁতভাবে আড়াল করে, মুখে এক সিরিয়াস আর নির্লিপ্ত ভাব ফুটিয়ে তুললেন। "ওহ্, তুই ফিরে এলি?" ইন্দিরা অত্যন্ত নিরপেক্ষ, শুকনো গলায় বললেন। "যাসনি তুই ওই বাড়িতে?" রাহুল চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল। ওর নড়াচড়ার মধ্যে একটা ধরা-পড়ে-যাওয়া আড়ষ্টতা। ঘাড়ের পেছনের চুলগুলোতে একটু হাত বুলিয়ে, সামান্য ইতস্তত করে ও বলল, "হ্যাঁ মা, গেছিলাম তো।" ইন্দিরা আর একটি শব্দও খরচ করলেন না। তাঁর মুখের রেখায় কোনো পরিবর্তন এল না, কেবল এক পাথরকঠিন নীরবতা বজায় রেখে তিনি সটান ঘুরে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন। যাওয়ার আগে শুধু ছুঁড়ে দিলেন, "দাঁড়া, আমি জল নিয়ে আসছি।" রান্নাঘরে ঢুকে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জলের বোতলটা বের করলেন। রাহুলও এক অপরাধী ছায়ার মতো ওঁর পিছু পিছু এসে রান্নাঘরের দরজার চৌকাঠে দাঁড়াল। কাঁচের গ্লাসে জল ঢালার মৃদু, একটানা শব্দটার মাঝখানেই ইন্দিরা অত্যন্ত নিচু অথচ কড়া গলায় বললেন, "আমি তো তোকে বারণ করেছিলাম, রাহুল। তুই তো আমার কথা শুনলি না।" কথাটা শেষ করেই তিনি কোনোদিকে না তাকিয়ে গ্লাসটা সোজা রাহুলের দিকে এগিয়ে দিলেন। রাহুল গ্লাসটা হাতে নিয়ে একটু চড়া গলায়, নিজের আত্মপক্ষ সমর্থন করতে শুরু করল। "কাম অন মা! আবার তুমি সেই একই কথা শুরু করলে... আমি তো তোমাকে ফোনেই বললাম..." "আগে জলটা খা।" ইন্দিরা ওকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে এক মাতৃসুলভ নির্দেশে বললেন। রাহুল বাধ্য ছেলের মতো এক নিঃশ্বাসে গ্লাসের পুরো জলটা খেয়ে নিল। ওর গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে ছিল। জলটা খাওয়ার পর ওর গলার স্বরটা একটু শান্ত, একটু নরম হলো। "মা, আমি তো তোমাকে ফোনেই সবটা বলার চেষ্টা করলাম," রাহুল গ্লাসটা নামিয়ে বলল। "ওরা দুজন আমাকে এত করে রিকোয়েস্ট করল, এতবার করে বলল... আমি কী করে না করি বলো তো? জাস্ট কয়েক ঘণ্টার তো একটা ভিজিট ছিল।" রাহুল খালি গ্লাসটা ইন্দিরার দিকে এগিয়ে দিল। ইন্দিরা গ্লাসটা নিয়ে কোনো কথা না বলে, মুখটা ঘুরিয়ে সিঙ্কের দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর এই নৈঃশব্দ্য রাহুলের বুকের ভেতরটা আবার দুমড়ে দিল। আর এক মুহূর্তও সহ্য করতে পারল না রাহুল। ও পেছন থেকে এগিয়ে গিয়ে নিজের দুটো লম্বা, চওড়া হাত দিয়ে ইন্দিরাকে আষ্টেপৃষ্ঠে, এক গভীর আর মরিয়া আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরল। ওর মুখটা গিয়ে সোজা গুঁজে গেল ইন্দিরার ঘাড়ের কাছে। "মা... প্লিজ আমাকে বলো, কী হয়েছে?" রাহুলের গলার স্বরটা এবার এক তীব্র, অনুনয় ভরা ফিসফিসানিতে ভেঙে পড়ল। "তুমি আমাকে ওরম রেগেমেগে কথা বলে যেতে বারণ করছিলে কেন? আমি কি কোনোভাবে তোমাকে কষ্ট দিয়েছি মা? তুমি তো জানো আমি তোমাকে একটুও দুঃখ দিতে চাই না... প্লিজ আমাকে বলো না মা..." ইন্দিরা সিঙ্কের ওপর গ্লাসটা নামিয়ে রাখলেন। আলিঙ্গনের তীব্রতায় আর ছেলেটার এই আর্দ্র, ব্যাকুল গলার স্বরে তিনি আর তাঁর রাশভারী রূপটা ধরে রাখতে পারলেন না। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে, অত্যন্ত মৃদু গলায় বললেন, "ছাড় আমাকে, রাহুল। যা... নিজের ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে।" রাহুল ওর হাতের বাঁধনটা আরও একটু শক্ত করল। ওর চিবুকটা ইন্দিরার কাঁধের ওপর আরও গভীরভাবে চেপে বসল। "না মা, আমি কোথাও যাব না। যতক্ষণ না তুমি আমাকে সত্যিটা বলছ, আমি এক ইঞ্চিও নড়ব না এখান থেকে। প্লিজ মা... আমার সিচুয়েশনটা একটু বোঝার চেষ্টা করো। আন্টি আমাকে নিজে ইনভাইট করলেন, আমি কী বলতাম? আমি যেতে পারব না, আমার অন্য কোথাও যাওয়ার আছে? কিন্তু সেটা তো একটা ডাহা মিথ্যে কথা হতো! আর মা, তুমিই তো আমাকে ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছ কোনোদিন মিথ্যে কথা না বলতে। আমি চাইলে হোমওয়ার্কের এক্সকিউজ দিতে পারতাম, যেটা সত্যিও ছিল, কিন্তু সেটা বড্ড রুড শোনাত। ওরা ঠিক বুঝতে পারত যে আমি ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যাচ্ছি। প্লিজ আমাকে বলো মা, তুমি কেন ওরম বিহেভ করছিলে?" ছেলের এই যুক্তিসঙ্গত, অথচ গভীর আবেগে মোড়ানো কথাগুলো শুনে ইন্দিরার ভেতরের শেষ ছিটেফোঁটা অভিমানটুকুও ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে ছেলেটা একশো শতাংশ ঠিক বলছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, রাহুলের জড়িয়ে থাকা হাতের ওপর ইন্দিরা নিজের হাতটা রাখলেন। "চল... লিভিং রুমে গিয়ে বসি..." রাহুল তাঁকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরেই, একপ্রকার ওই অবস্থাতেই হেঁটে হেঁটে লিভিং রুমের সোফার দিকে নিয়ে গেল। (continued in the next post....)
Parent