জুলাই আন্দোলন - অধ্যায় ৬
পর্ব ৬: প্রস্তুতি
আগামীকাল ঝুমু কলেজে যাবে। সন্ধ্যার পর ঘরের এক কোণে ঝুমু ছোট্ট টেবিলে পড়তে বসেছে। চৈতি তার পাশে বসে মেয়ের কলেজ ব্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছিল। হঠাৎ তার হাত থেমে গেল। ইংরেজি বইটা খুঁজে পাচ্ছে না।
“ঝুমু, তোমার ইংরেজি বইটা কোথায়?” চৈতি জিজ্ঞেস করল।
ঝুমু অংক করায় ব্যস্ত। হাতে কড় গুনে যোগ করছে। সে তাচছিল্য করে জবাব দেয়, “জানি না মা…”
ঝুমুর এরকম তাচ্ছিল্যতা তার মনে আঘাত করে। চৈতির গলা একটু উঁচু হয়ে গেল, “দেখো, মেয়েটা কিছুই সামলিয়ে রাখতে পারে না! নিজের জিনিস নিজে রাখবে না, অন্য কেউ এসে গুছিয়ে রেখে দেবে নাকি?”
ঠিক তখনই দরজার সামনে এসে দাঁড়াল লোকনাথ। তার বিশাল কালো শরীরটা দরজার আলোয় আরও ভারী লাগছিল। হাতে ঝুমুর সেই ইংরেজি বইটা।
“ভাবী, এই বইটা খুঁজছেন নাকি?”
চৈতি মাথা তুলে তাকাল। হ্যাঁ, এটাই। সে হাত বাড়িয়ে বইটা নিল।
“কোথায় পেলে?”
“ওইখানে, জানালার পাশে রাখা ছিল,” লোকনাথ সংক্ষেপে বলল।
চৈতি একটু বিরক্ত হয়ে ঝুমুর দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখো দেখি, মেয়েটা কিছুই ঠিকমতো রাখতে পারে না।”
লোকনাথ কিছু একটা বলতে চাইছিল, কিন্তু বলতে পারছিল না। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। চৈতি আবার ব্যাগ গোছানোয় মন দিল। কিন্তু লোকনাথের সেই নীরব দাঁড়িয়ে থাকাটা তার কাছে অস্বস্তিকর লাগল।
একসময় চৈতি মুখ তুলে বলল, “এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন? কিছু বলবে নাকি?”
লোকনাথ যেন অনুমতি পেয়ে গেল। সে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “ভাবী, আপনি কি কাল ঝুমুকে নিয়ে কলেজে যাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ, যাব,” চৈতি সহজভাবে বলল।
“ভাবী, কাল আপনার যেতে হবে না। আমি নিয়ে যাব।”
চৈতি ভুরু কুঁচকে তাকাল, “না, কাল ক্লাস টিচারের সাথে কথা বলতে হবে। অনেক দিন কলেজ মিস করেছে। তাই আমাকেই যেতে হবে।”
লোকনাথের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে চায় না চৈতি বাইরে যাক। একদমই চায় না। কিন্তু কেন যে চায় না, সেটা সে নিজেও স্পষ্ট করে বলতে পারছিল না। হয়তো সে নিজেও এখনো বুঝে উঠতে পারেনি।
“ভাবী, বাইরে বিপদ আছে। মকবুলের উপর বিশ্বাস করে কি আপনি বাইরে যাবেন?” লোকনাথের গলায় একটা উদ্বেগ মিশে ছিল।
চৈতি একটু থেমে বলল, “বাইরে তো যেতেই হবে লোকনাথ। যে পাপ আমার শ্বশুর করেছে, তার প্রায়শ্চিত্ত এখন আমাদের করতে হবে। এছাড়াও আর কত দিন ঘরে কাটাবো?”
লোকনাথের গলা হঠাৎ একটু উঁচু হয়ে গেল, “আপনি কি খেয়াল করেছেন মকবুলের চাহনি? সে কিন্তু আপনার জন্য বদখেয়াল রাখে।”
চৈতি এবার সরাসরি লোকনাথের দিকে তাকাল। তার চোখে একটা অদ্ভুত মিশ্রণ। সে শান্ত গলায় বলল, “পুরুষ মানুষের স্বভাবই এটা। তুমি কি রাখো না? তুমিও তো আমার দিকে তাকিয়ে থাকো। আমি কি ই বা করতে পারি? আমি এখন অসহায়, আমার শ্বশুর ও স্বামী দুজনেই পলাতক।”
কথাটা বলে ফেলেই চৈতি নিজেই চমকে উঠল। এটা কি বলে ফেলল সে? এমন কথা তার মুখ দিয়ে বের হওয়া উচিত হয়নি। হয়তো কথার ঝোঁকে, হয়তো বিরক্তিতে। কিন্তু বলা হয়ে গেছে।
ঘরের ভেতরে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। লোকনাথের মুখ লাল হয়ে গেল। সে কী বলবে বুঝতে পারছিল না। চৈতিও চোখ নামিয়ে নিল।
ঠিক তখনই ভেতরের ঘর থেকে রেহানা বেগমের গলা ভেসে এল, “সীমা, আমাকে একটু ভাত দে তো …”
নীরবতা ভেঙে গেল। চৈতি দ্রুত ব্যাগ গোছানোয় মন দিল। লোকনাথ আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। চুপ করে তার রুমে চলে গেল।
সকাল সাড়ে নয়টায় চৈতি ঝুমুর হাত ধরে কলেজে পৌঁছাল। গেটের সামনে অনেক অভিভাবক দাঁড়িয়ে ছিল। চৈতিকে দেখামাত্র অনেকের চোখ তার দিকে ঘুরে গেল। কেউ কেউ ফিসফিস করে কথা বলতে শুরু করল।
কয়েক বছর আগে, যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল, তখন এই একই কলেজ গেটে চৈতিকে দেখলেই গার্ডিয়ানরা দৌড়ে আসত। “ভাবী, শরীর কেমন আছে?”, “বাসার সবাই ভালো?”, “মেয়র সাহেবের খবর কী?” — এমন নানা প্রশ্নে তাকে ঘিরে ধরত। আজ সেই একই মানুষগুলো দূর থেকে তাকিয়ে আছে, কেউ এগিয়ে আসছে না। শুধু চোখে এক ধরনের কৌতূহল আর সতর্কতা।
চৈতির বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে ভারী হয়ে উঠল। পুরনো দিনের স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠতেই তার চোখে জল চলে এল। সে দ্রুত চোখ মুছে নিল, যাতে ঝুমু না দেখে।
“চৈতী!”
হঠাৎ পেছন থেকে চেনা গলায় ডাক শুনে চৈতি ঘুরে তাকাল। তার পুরনো বান্ধবী মিরা দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। মিরা কোনো কিছুর তোয়াক্কা করে না। সে যেমন ছিল, তেমনই আছে।
“কেমন আছিস রে?” মিরা চৈতির পিঠে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল।
চৈতি তার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ভালো নেই রে মিরা… একদম ভালো নেই।”
মিরা চৈতির চুলে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগল। মিরার মনে পড়ে গেল, কয়েক বছর আগে তার স্বামীর চাকরি চলে যাওয়ার পর চৈতির শ্বশুর কুদ্দুস মিয়া কীভাবে তার স্বামীর জন্য নতুন চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সেই ঋণ মিরা এখনো ভোলেনি।
দুজনে কিছুক্ষণ কথা বলার পর হঠাৎ একটা হোন্ডার আওয়াজ এল। সবাই ঘুরে তাকাল। একটা কালো হোন্ডা কলেজ গেটের সামনে এসে থামল। হোন্ডা থেকে নামল মকবুল। আজ সে একেবারে প্রস্তুত হয়ে এসেছে — গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, চোখে সানগ্লাস, হাতে দামি ঘড়ি আর শরীরে মিষ্টি সুগন্ধি। নির্বাচনের আগে তার “জনসেবক” অভিনয় শুরু হয়েছে।
মকবুল সানগ্লাস খুলে চৈতির দিকে তাকিয়ে হাসল। নিজেকে সে এখন হিরো ভাবছে।
“আরে আপা! আপনি এসেছেন কলেজে?”
চৈতি কিছু বলার আগেই মিরা ঝাঁঝিয়ে উঠল, “আরে চাচা, চৈতীকে আপনি ‘আপা’ বলছেন কেন? ও তো আপনার বড় মেয়ের চেয়েও অনেক ছোট!”
মকবুলের মুখের হাসি মুহূর্তে নষ্ট হয়ে গেল। তার চোখে রাগ ঝলসে উঠল, কিন্তু সবার সামনে কিছু বলতে পারল না। সে শুধু জোর করে হাসার চেষ্টা করল।
মকবুল কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই কলেজের হেডমাস্টার দৌড়ে এসে হাজির হলেন।
“আরে স্যার! আপনি এখানে? এত গরমে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আসুন, আমার রুমে এসে বসুন।”
মিরা চৈতির কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “দেখ, এই হেডু আগের বার তোকে নিয়ে নিজের রুমে বসাতো, আর এখন… সালা সুবিধাবাদী! এটাকে কলেজ থেকে বের করতে হবে।”
মকবুল চৈতির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি আসছি আপা। আপনার কোনো কিছু লাগলে নিঃসন্দেহে আমাকে জানাবেন।”
চৈতি কোনো জবাব দিল না। সে শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
মকবুল ও হেডমাস্টার চলে যাওয়ার পর মিরা চৈতির কাঁধে হাত রেখে বলল, “এই বুড়ো তোর পিছু নিয়েছে কেন রে?”
চৈতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “জানি না রে। বাদ দে এর কথা। ওকে দেখলেই বিরক্ত লাগে।”
মিরা গম্ভীর হয়ে বলল, “হ্যাঁ, সাবধানে থাকিস। লোকটা ভালো না। এখন তো আবার ওর দল ক্ষমতায় যাবে বলে মনে হচ্ছে।”
চৈতি মাথা নেড়ে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে।”
মিরা হঠাৎ হাসি ফুটিয়ে বলল, “চল, আজ তোকে ঝালমুড়ি খাওয়াব। অনেক দিন হয়নি একসাথে খাই।”
চৈতির মুখেও হালকা হাসি ফুটে উঠল। “তাই নাকি? চল তাহলে, ঝুমুকে আগে ক্লাসে দিয়ে আসি।”
দুই বান্ধবী ঝুমুকে দিয়ে কলেজের পাশের দোকানের দিকে হাঁটতে শুরু করল।