জুলাই আন্দোলন - অধ্যায় ৭
পর্ব ৭: স্পর্শ
সন্ধ্যার পর ঘরের ভেতরে চৈতি ঝুমুকে পড়াচ্ছিল। অন্য রুমে সীমা, ঐশী আর রেহানা বেগমও ছিলেন। সীমা এক মনে পান সাজাচ্ছিল, আর রেহানা বেগম পান চিবোতে চিবোতে একটানা গল্প করে যাচ্ছিলেন। সীমা মাঝে মাঝে “হ্যাঁ”, “খালা”, “তাই নাকি?” বলে সম্মতি জানাচ্ছিল। ছোট ঐশী মেঝেতে বসে তার পুতুলগুলোকে সাজিয়ে খেলছিল।
চৈতি ঝুমুর পাশে বসে তাকে অংক করাচ্ছিল। টেবিলের উপর খাতা খোলা, পেন্সিল আর ইরেজার ছড়ানো। ঝুমু ১ থেকে ২০ পর্যন্ত যোগ করার অংকগুলো মেলাতে পারছিল না।
“দেখ ঝুমু, এটা আবার কর,” চৈতি ধৈর্য ধরে বলল। “৭ আর ৮ যোগ করলে কত হয়?”
ঝুমু আঙুল গুনতে গুনতে বলল, “সাত… আট… নয়… দশ…” তারপর হঠাৎ থেমে গিয়ে মুখ তুলে তাকাল, “আম্মু, আমার মাথায় ঢুকছে না।”
চৈতি একটা নিঃশ্বাস ফেলে খাতার উপর ঝুঁকে পড়ল। “শোন, আঙুল দিয়ে গোন। সাতটা আঙুল রাখ, তারপর আরও আটটা যোগ কর। মোট কয়টা হলো?”
ঝুমু দুই হাতের আঙুল নিয়ে গুনতে শুরু করল। একবার গুনে, দুবার গুনে, তারপর হতাশ হয়ে খাতার উপর মাথা রেখে দিল।
“আম্মু, গরম লাগছে… আর পারছি না।”
“একটু চেষ্টা করে দেখ নারে। এটা খুব সহজ। দেখ, আমি করে দেখাচ্ছি।” চৈতি খাতায় আঙুল দিয়ে দেখাতে দেখাতে বলল, “সাত আর আট… পনেরো। এবার তুই কর।”
ঝুমু বিরক্ত হয়ে পেন্সিলটা টেবিলের উপর ফেলে দিয়ে বলল, “না আম্মু! আমার মনে থাকে না। তুমি যখন বলো তখন মনে থাকে, নিজে করতে গেলে ভুল হয়ে যায়।”
চৈতির গলায় একটু বিরক্তি মিশে গেল, “ঝুমু, এভাবে হবে না। প্রতিদিন একটু একটু করে শিখতে হবে। না শিখলে কলেজে কী করবি? ক্লাস টিচার যখন জিজ্ঞেস করবে?”
“টিচার ত আরো সুন্দর করে বুঝায়, তুমি বুঝাতে পারো না।,” ঝুমু মুখ গোঁজ করে বলল।
পাশের রুম থেকে সীমা হালকা হেসে ফেলল, কিন্তু কিছু বলল না। রেহানা বেগম পান চিবাতে চিবাতে বললেন, “আরে ছাড় তো। এই বয়সে অংক শিখতে কারোই ভালো লাগে না। আমার ছেলেও তো এমনই ছিল।”
চৈতি সব কথা সহ্য করছে। সে চায় না তার মেয়ের ভবিষ্যৎ খারাপ হোক। ঝুমুর দিকে ঝুঁকে পড়ল। “আরেকবার চেষ্টা কর। শেষ অংকটা। ১২ আর ৭।”
ঝুমু অনিচ্ছায় আবার আঙুল গুনতে শুরু করল। “বারো… তেরো… চোদ্দ… পনেরো… ষোল…” তারপর হঠাৎ থেমে গিয়ে বলল, “আম্মু, আমার সত্যি সত্যি গরম লাগছে। মাথা ঘুরছে।”
চৈতি মেয়ের কপালে হাত রেখে দেখল। সত্যিই ঘাম হয়ে আছে। ঘরের ভেতরে গরম যেন আরও বেড়ে গিয়েছিল। ফ্যানটা আস্তে আস্তে ঘুরছিল, কিন্তু তাতে তেমন আরাম হচ্ছিল না।
“ঠিক আছে, আরেকটা অংক করে তারপর একটু বিশ্রাম নিবি,” চৈতি নরম গলায় বলার চেষ্টা করল।
কিন্তু ঝুমু আর কিছু শুনতে রাজি ছিল না। সে খাতা বন্ধ করে দিয়ে বলল, “না আম্মু, আজ আর পড়ব না।”
ঠিক তখনই —
হঠাৎ পুরো ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল।
“হুররে! আর পড়ব না! কারেন্ট চলে গেছে!” ঝুমু আনন্দে চিৎকার করে উঠল।
পাশের রুম থেকে ঐশীও তার বোনের আওয়াজ শুনে সমান তালে চেঁচিয়ে উঠল, “হুররে!”
চৈতি রেগে গিয়ে বলল, “পড়বে না মানে? এর মানে কী? এখনই পড়তে বস!”
ঝুমু মুখ গোঁজ করে বলল, “না আম্মু, অনেক গরম এখানে। বসতে পারছি না।”
রেহানা বেগম পানের পিক ফেলে বললেন, “হইছে হইছে। আর কত পড়বে? অনেক পড়ছে। আয়, সবাই ছাদে চল। এই গরমে আর টিকতে পারব না।”
চৈতির জবাব দিতে মন চায় তার শ্বাশুড়ি কে। কিন্তু সে কিছু বলে না। হয়ত তার শ্বাশুড়ি আরো কষ্ট পাবে এসময়। তাই শ্বাশুড়ির কথাই মেনে নিল।
কথামতো সবাই ছাদে উঠে এল। ছাদে বাতাস একটু হলেও ছিল। রেহানা বেগম আবার তার অসমাপ্ত গল্প শুরু করে দিলেন। চৈতির এসব পুরনো গল্প আর ভালো লাগছিল না। সে চুপ করে বসে ছিল, মনে মনে অন্য কিছু ভাবছিল।
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল। অপরিচিত নাম্বার। চৈতি একটু ইতস্তত করে ফোনটা কানে তুলল।
“হ্যালো…”
“চৈতি, আমি রাজীব।”
চৈতির বুকের ভেতরটা যেন হাজারো দুঃখের মাঝে এক টুকরো আলোর মতো জ্বলে উঠল। এই কণ্ঠস্বর — বিশ্বাসের, ভালোবাসার, নিরাপত্তার। যে কণ্ঠস্বরের জন্য সে দিনের পর দিন অপেক্ষা করে আছে।
“রাজীব…” চৈতির গলা কেঁপে গেল।
রাজীব নিচু গলায় দ্রুত বলল, “শোনো, এখন যেখানে আছো সেখান যদি কেও থাকে ওখান থেকে একটু দূরে সরে যাও। কেউ যেন না শোনে।”
চৈতি উঠে ছাদের এক কোণে চলে গেল, যেখানে অন্যরা তার কথা শুনতে পাবে না।
“কেমন আছো তুমি?” রাজীব জিজ্ঞেস করল।
“তোমাকে ছাড়া কেমন থাকব? একদম ভালো নেই,” চৈতির গলা ভেঙে এল। “মেয়ে দুটো তোমার কথা খুব জিজ্ঞেস করে। ঝুমু প্রায়ই বলে, আব্বু কবে আসবে? আর ঐশী তো তোমার ছবি নিয়ে ঘুমায়। মায়ের শরীরও খারাপ যাচ্ছে।”
রাজীব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমি জানি। খুব কষ্ট হচ্ছে তোমাদের। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। তোমরা শুধু সাবধানে থেকো। লোকনাথের উপর ভরসা রেখো, যা কিছু লাগে ওকে দিয়ে আইনো। বাবার সাথে কথা হইছে, উনি ভারত চলে গেছে। দেখি ব্যবস্থা করছি আমিও, যদি বলি তোমরা এসে পর যেখানে বলব। আমি একবার দেখা করব এ মাসে।”
চৈতি চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, “তুমি কবে আসবে? আমরা আর কতদিন এভাবে থাকব?”
“আমি খুব দ্রুত আসব। বিশ্বাস করো। কেঁদো না চৈতি। তুমি শক্ত থেকো। মেয়েদের দেখো। আমি তোমাদের জন্যই লড়ছি।”
কথা শেষ হওয়ার আগে রাজীব নরম গলায় বলল, “কেঁদো না। আমি খুব শিগগিরই আসব। আল্লাহ হাফেজ।”
“আল্লাহ হাফেজ…” চৈতি ফোন কেটে দিল। চোখের জল মুছে সে আবার সবার কাছে ফিরে এল।
রেহানা বেগম তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কে রে? এতক্ষণ কার সাথে কথা বলছিলি?”
চৈতি স্বাভাবিক গলায় বলল, “কেউ না মা, রং নাম্বার।”
রেহানা বেগম ভুরু কুঁচকে বললেন, “রং নাম্বারে এত কিসের কথা? এতক্ষণ ধরে কথা বললি?”
চৈতি কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে রইল। তার চোখে এখনো রাজীবের কথাগুলো বাজছিল।
..
রাত গভীর হয়েছে। ছাদের উপর হালকা বাতাস বইছিল। ঝুমু আর সীমা মনোযোগ দিয়ে রেহানা বেগমের গল্প শুনছিল। রেহানা বেগম বরিশালের এক পীরের রূপকথা বলছিলেন — কীভাবে সেই পীর কুমিরের সাথে লড়াই করেছিলেন, কীভাবে তার অলৌকিক ক্ষমতায় কুমির শান্ত হয়ে গিয়েছিল। ঝুমুর চোখ বড় বড় হয়ে গেছে, সীমা মাঝে মাঝে “কি কুদরত” বলে উঠছে।
চৈতি ছাদের এক কোণে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে ছিল। তার কোলে তিন বছরের ঐশী গভীর ঘুমে। চৈতি এক হাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে, অন্য হাতে ধীরে ধীরে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিল। গরমে ঐশীর ছোট্ট কপালে ঘাম জমে ছিল। চৈতির চোখে ক্লান্তি, কিন্তু মেয়েকে ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছিল না।
হঠাৎ ছাদের দরজা খুলে লোকনাথ উঠে এল। সারাদিনের কাজের পর তার শরীরে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। ঘামে ভেজা গেঞ্জি, চুল এলোমেলো। সে প্রথমে রেহানা বেগমের গল্প শোনা তিনজনের দিকে তাকাল, তারপর চোখ ঘুরিয়ে চৈতিকে খুঁজে পেল।
লোকনাথ খালি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে চৈতির খুব কাছে এসে বসল। অন্ধকার রাতে তার বিশাল কালো শরীরটা আরও ভারী আর কাছাকাছি লাগছিল।
“ঐশী ঘুমিয়ে গেছে নাকি ভাবী?” লোকনাথ নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল।
চৈতি শুধু মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ।”
লোকনাথ আর কিছু বলার কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। কিন্তু এই রাতের অন্ধকার, নীরবতা আর চৈতির কাছাকাছি বসার সুযোগ — তার ভেতরে কথা বলার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠছিল। সে চুপ করে বসে চৈতির দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর তার চোখ পড়ল চৈতির কোলে। ঐশীকে জড়িয়ে ধরে বাতাস করতে চৈতির হাত ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। লোকনাথ একটু ঝুঁকে বলল, “ভাবী, ওকে আমার কোলে দিন। আপনার কষ্ট হচ্ছে।”
চৈতি কিছু বলার আগেই লোকনাথ হাত বাড়িয়ে দিল। সে ঐশীকে তুলে নিতে গিয়ে তার শরীরটা চৈতির খুব কাছে চলে এল।
ঠিক সেই মুহূর্তে — লোকনাথের ডান হাত আস্তে করে চৈতির বাম স্তনের উপর দিয়ে চলে গেল। স্পর্শটা ইচ্ছাকৃত নয় বলে মনে হলেও, খুব আস্তে, খুব লম্বা সময় ধরে। গরম শরীরের স্পর্শ, পাতলা কাপড়ের নিচে চৈতির নরমতা — সবকিছু একসাথে লোকনাথের মনে গেঁথে গেল। সেই স্পর্শটা তার কাছে অসম্ভব মিষ্টি লাগল। এক মুহূর্তের জন্য তার হাত থেমে গেল, শরীর শক্ত হয়ে উঠল। ঐশীকে কোলে তুলে নেওয়ার পরও সেই অনুভূতিটা তার হাতে লেগে রইল।
চৈতির শরীরটা শিউরে উঠল। তার মুখ লাল হয়ে গেল। খুব বিরক্ত লাগল, খুব অস্বস্তি। কিন্তু কী বলবে? লোকনাথ তাদের আশ্রয়দাতা, এই বাড়িতে থাকার একমাত্র ভরসা। সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। শুধু চোয়াল শক্ত করে চুপ করে রইল।
লোকনাথ এখন ঐশীকে নিজের বিশাল কোলে নিয়ে বসেছে। ছোট মেয়েটা তার কোলে আরও নিরাপদে ঘুমিয়ে পড়ল। লোকনাথ চৈতির দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু চৈতি চোখ সরিয়ে নিল।
চৈতি আবার হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে লাগল — এবার শূন্য কোলের দিকে। তার মনের ভেতরে একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি ঘুরপাক খাচ্ছিল। লোকনাথের সেই স্পর্শ এখনো তার শরীরে লেগে আছে বলে মনে হচ্ছিল। "লোকনাথ ইচ্ছে করে করেছে, না এটা নিছকই একটি ঘটনা"- চৈতি ভেবে যাচ্ছে।
ছাদের অন্যদিকে রেহানা বেগমের গল্প চলতেই থাকল। কিন্তু চৈতির কানে আর কোনো কথা ঢুকছিল না।