জুলাই আন্দোলন - অধ্যায় ৮
পর্ব ৮: কথপোকথন
ছাদের অন্ধকারে লোকনাথের বিশাল কোলে ঐশী গভীর ঘুমে। মেয়েটার ছোট্ট কপালে ঘাম জমে উঠেছে দেখে চৈতি পাশের চেয়ার থেকে হাতপাখা দিয়ে ধীরে ধীরে বাতাস করতে লাগল। তার হাতটা লোকনাথের খুব কাছ দিয়েই যাচ্ছিল।
লোকনাথ চুপ করে চৈতির দিকে তাকিয়ে ছিল। হালকা আলোয় চৈতিকে দেখতে তার খুব সুন্দর লাগছিল। ঘামে ভেজা কপাল, আলতো করে খোলা চুল, ক্লান্ত চোখ — সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ। লোকনাথ মনে মনে ভাবছিল, “একটা মানুষ এত সুন্দর হয় কী করে?”
একসময় সে আর চুপ থাকতে পারল না। নিচু গলায় বলল, “ভাবী, এই গরমেও আপনাকে অনেক সুন্দর লাগছে। রাজীব ভাই সত্যিই অনেক লাকি, আপনাকে পেয়ে।”
চৈতি ভ্রূ কুঁচকে তাকাল। তার গলায় বিরক্তি স্পষ্ট, “তোমাকে তো ভালো জানতাম লোকনাথ। এতদিন তুমি আমাকে অনেক সম্মান করতে। কিন্তু এখন কী হলো? তুমি আমার সাথে ফ্লার্টিং করছ?”
লোকনাথ তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “না ভাবী, কী বলেন! আমি শুধু সুন্দরের প্রশংসা করছি, আর কিছু না।”
চৈতি একটু ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল, “হ্যাঁ, আমি সব বুঝি।”
ঠিক তখনই একটা মৃদু বাতাস বয়ে গেল। হালকা হাওয়ায় চৈতির ওড়না সরে গেল। পাতলা কাপড়ের নিচে তার স্তনের আকৃতি স্পষ্ট হয়ে উঠল। লোকনাথের চোখ সেদিকে আটকে গেল। তার গলা শুকিয়ে গেল।
সেই নরম, গোলাকার উঁচু অংশ, ঘামে ভেজা চকচকে ত্বক, আর হালকা নড়াচড়ায় যে ছন্দ তৈরি হচ্ছিল — সবকিছু লোকনাথের শরীরে একটা তীব্র আগুন জ্বালিয়ে দিল। তার মনে হলো, এত সুন্দর, এত কাছে, অথচ ছোঁয়া যাবে না। তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। শরীরের ভেতরে একটা অস্বস্তিকর, মধুর টান অনুভব করল। সে চোখ সরাতে চাইছিল, কিন্তু পারছিল না। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তটা যেন চিরকাল ধরে রাখা যায়।
চৈতি হঠাৎ বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি ওড়নাটা টেনে ঠিক করে নিল। তার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। ঐশীকে বাতাস করাও বন্ধ করে দিল।
কিন্তু ঘুমের ঘোরে গরমে ঐশী ছটফট করে উঠল। চৈতি খেয়াল করে আবার হাতপাখা তুলে বাতাস করতে শুরু করল।
ঠিক তখনই লোকনাথের সাথে তার চোখাচোখি হয়ে গেল।
চৈতি অস্বস্তির সাথে বলল, “তুমি সবসময় আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকো কেন? আমার খুব বিরক্ত লাগে।”
লোকনাথ একটু লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিল। ঐশীর কপালের ঘাম আস্তে করে মুছে দিয়ে শান্ত গলায় বলল, “ভাবী, আসলে আপনাকে দেখতে খুব ভালো লাগে। আপনার চেহারা অনেক সুন্দর।”
চৈতি ঢং করে বলল, “ও বাবা! তুমি কি শুধু আমার চেহারা দেখ? তোমার তো নজর অনেক দিকেই।”
চৈতি এ কি বলে ফেলল, সে বলতে চাইনি কথাটা, কিন্তু মুখ থেকে বের হয়ে গেছে। তার এখন আপসোস লাগছে।
লোকনাথ ধরা পড়ে গিয়ে চুপ হয়ে গেল। সে কী বলবে বুঝতে পারছিল না।
চৈতি গলা শক্ত করে বলল, “তোমার বউকে সময় দাও। অন্য নারীর দিকে তাকাতে নেই।”
লোকনাথ একটু থেমে, নিচু গলায় বলল, “আমার বউ যদি আপনার মতো সুন্দর হতো, ভাবী…”
চৈতি চোখ গরম করে তাকাল, “ছিঃ! নিজের বউ আবার সুন্দর আর অসুন্দর কী? এসব কথা বলতে লজ্জা করে না?”
লোকনাথ আর কিছু বলতে পারল না। যা-ই বলুক, চৈতির সামনে সে আরও নিচু হয়ে যাবে। সে চুপ করে ঐশীকে কোলে নিয়ে বসে রইল। ছাদের হালকা বাতাসের মাঝেও দুজনের মধ্যে একটা ভারী অস্বস্তি ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
ছাদের উপর এখনো সবাই বসে আছে। বাতাস একদম নেই। ভ্যাপসা গরমে সবার শরীর ঘেমে উঠেছে। আকাশে মেঘ জমলেও বৃষ্টি নামছে না। শুধু একটা গুমোট আবহাওয়া চারদিকে ছড়িয়ে আছে।
ঝুমু তার দাদীর উরুর উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। রেহানা বেগম পান চিবাতে চিবাতে বলছিলেন, “আওয়ামী লীগ সরকার চইলা গেলে নাকি দেশ উন্নত হইব। কই রে আমি তো বুঝি না।”
সীমা মাথা নেড়ে বলল, “ঠিকই তো বলছেন খালা। হাসিনায় কত রাস্তাঘাট বানাইল, ব্রিজ বানাইল, আর সবাই মিলে তাকেই বের করে দিল। এখন কী হইব কে জানে।”
রেহানা বেগম আবার বললেন, “যাই হোক, আমাদের তো আর কিছু করার নাই। যারা ক্ষমতায় আছে, তারাই দেশ চালাইব। আমরা শুধু দেখি আর ভুগি।”
সীমা “ঠিক ঠিক” করে সম্মতি জানাতে লাগল। দুজনের মধ্যে রাজনৈতিক আলোচনা চলতেই থাকল।
ছাদের অন্য পাশে লোকনাথ আর চৈতি চুপচাপ বসে ছিল। লোকনাথের মুখে কোনো কথা নেই। সে শুধু চুপ করে বসে আছে। চৈতির হাত অনেকক্ষণ ধরে বাতাস করতে করতে ব্যথা হয়ে গেছে। কবজি শক্ত হয়ে উঠেছে।
হঠাৎ লোকনাথ নিচু গলায় ডাকল, “ভাবী?”
চৈতি ক্লান্ত গলায় বলল, “হুম।”
লোকনাথ বলল, “ঐশীকে আমার কোলে দিন। আপনার হাত ব্যথা করছে। আমি বাতাস করি।”
চৈতি কিছু না বলে ঐশীকে লোকনাথের কোলে তুলে দিল। লোকনাথ হাতপাখাটা নিয়ে ধীরে ধীরে চৈতি ও ঐশী দুজনকেই বাতাস করতে শুরু করল। তার বিশাল হাতে পাখাটা ছোট দেখাচ্ছিল, কিন্তু বাতাসটা ছিল আরামদায়ক।
মা-মেয়ে দুজনেরই যেন খুব ভালো লাগছিল। ঐশী ঘুমের মধ্যেও একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। চৈতিও চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বাতাসটা উপভোগ করল।
এ বাতাসে চৈতির চুল গুলো উড়ছে। আহা এ কি দৃশ্য যেন লোকনাথ এর সামনে এ দৃশ্য হাজার কোটি টাকার চেয়েও বেশি। লোকনাথ চৈতিকে প্রথম যেদিন দেখে সেদিন রাজীবের পাশে ছিল। পালিয়ে বিয়ে করে রাজীব আর চৈতি। লোকনাথ যেন সেদিন সবচেয়ে সুন্দর নারী দেখেছে। সে জানে এরকম একটা নারী পাওয়া তার জীবনে নেই। রাজীবের পাশে চৈতিকে দেখলে লোকনাথের খারাপ লাগত। দুইটা মেয়ের পেটে আসার বা জন্মের খবর জেনেও লোকনাথ এর মন ভালো হয় নি। কারণ সে নিজের চোখের সামনে ওই সুন্দর ফুল টাকে পেতে চাইত। যার মূল্য টাকার অংকে পরিমাপ করা যাবে না।
একটু পর চৈতি মজা করে বলল, “কেন যে বিদ্যুৎ আসে না। যাও লোকনাথ, বিদ্যুৎ নিয়ে এসো।”
লোকনাথ হালকা হেসে বলল, “কোথা থেকে আনব ভাবী?”
চৈতি চোখ খুলে বলল, “যেখান থেকে পারো।”
লোকনাথ-“আমি তো পারি না।”
চৈতি আবার জিজ্ঞেস করে-“কেন তুমি পারো না?”
লোকনাথ এবার মজা করে জবাব দিল, “আমার যে রাজীব ভাইয়ের মতো সুন্দর বউ নাই।”
কথাটা শুনে চৈতির ভেতরটা বিরক্তিতে ভরে গেল। লোকনাথের মুখে শুধু একই কথা। সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। চুপ করে রইল।
ঠিক তখনই লোকনাথের ফোন বেজে উঠল। সে পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল — মকবুল।
লোকনাথের ভুরু কুঁচকে গেল। সে একবার চৈতির দিকে তাকাল, তারপর ফোনটা কানে তুলল।
লোকনাথ এক মুহূর্ত ইতস্তত করে ফোনটা কানে তুলল।
“হ্যালো…”
ওপাশ থেকে মকবুলের রুক্ষ, উত্তেজিত গলা ভেসে এল, “কিরে সালা, কই তুই? এত রাতে কোথায় গায়েব হয়ে আছিস?”
লোকনাথ গলা নামিয়ে বলল, “জ্বী ভাই, বলুন। আমি বাসায় আছি।”
মকবুল হাসতে হাসতে বলল, “আজ তো কলেজে গিয়েছিলাম রে। ইসস… চৈতীকে কী সুন্দর লাগছিল! মাথা নষ্ট হয়ে গেছে আমার। কী ফিগার, কী চেহারা! একদম পাগল করে দিয়েছে। শোন, তুই আমাকে একটু সাহায্য কর না। আমার নামে চৈতীর কাছে একটু ভালো ভালো কথা বলিস। বুঝলি?”
লোকনাথের হাত শক্ত হয়ে গেল। মকবুলের মুখে চৈতীর নাম শুনে তার মাথার ভেতরটা গরম হয়ে উঠল। রক্ত যেন মাথায় চড়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে রইল। মকবুলের কথাগুলো তার কানে বিষের মতো লাগছিল।
কিন্তু সে কোনো রাগ দেখাল না। শুধু ঠান্ডা গলায় বলল, “আচ্ছা ভাই… দেখি।”
কথা শেষ করেই লোকনাথ ফোনটা কেটে দিল। তার মুখ শক্ত হয়ে গেছে।
ওপাশে মকবুল ফোন কেটে যাওয়ায় একটু অপমানিত বোধ করল। সে মনে মনে গর্জে উঠল, “সালা লোকনাথ… চৈতীকে একবার পেয়ে নেই, তারপর তোর খবর আছে। দেখে নেব তোকে।”
লোকনাথ চুপ করে বসে রইল। তার চোখ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চৈতির দিকে চলে গেল। চৈতি তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
“কী হলো? কে ফোন দিয়েছিল?” চৈতি জিজ্ঞেস করল।
লোকনাথ একটু থেমে বলল, “আজ মকবুল কলেজে গিয়েছিল নাকি?”
চৈতি কিছুটা অবাক হয়ে ভেবে বলল, “হ্যাঁ… এসেছিল তো। কেন?”
লোকনাথ আর কোনো কথা বলল না। তার মুখে রাগের ছাপ স্পষ্ট। সে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল এবং ছাদ থেকে নিচে নেমে যেতে লাগল। তার পায়ের শব্দে রাগ আর অস্থিরতা মিশে ছিল।
চৈতি পেছন থেকে অবাক হয়ে বলে উঠল, “এর আবার কী হলো?”
লোকনাথ কোনো উত্তর দিল না। সে সিঁড়ি দিয়ে নেমে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
ঠিক তখনই পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ এসে পড়ল। ছাদের আলো জ্বলে উঠল। ঝুমু আর ঐশী ঘুমের মধ্যে একটু নড়ে উঠল। রেহানা বেগম ও সীমা অবাক হয়ে চারদিকে তাকাল।
কিন্তু চৈতির মন থেকে লোকনাথের হঠাৎ রাগ করে চলে যাওয়াটা কিছুতেই সরছিল না।