জুলাই আন্দোলন - অধ্যায় ৯
পর্ব ৯: অধিকার
সকালের সোনালি আলোয় নতুন দিন শুরু হয়েছে। পাখির কলতান, হালকা ঠান্ডা বাতাস আর নরম রোদ — সব মিলিয়ে যেন বলছে, আজ হয়তো কিছু নতুন ঘটনা অপেক্ষা করছে। কালকের গুমোট রাতের পর এই সকালটা অনেকটা স্বস্তির মতো লাগছিল।
ঝুমু গোসল করে কলেজের ইউনিফর্ম পরে টেবিলে বসে নাস্তা করছিল। তার দাদী রেহানা বেগম তার মাথায় হাত রেখে ধর্মীয় বাক্য পড়ে ফুঁ দিয়ে দিচ্ছিলেন। “উপরওয়ালা যেন তোর উপর থেকে সব বিপদ-আপদ, মসিবত দূর করে দেন। আমার নাতনীকে হেফাজত করো হে রব…” — রেহানা বেগমের গলায় মমতা আর দোয়ার সুর মিশে ছিল।
চৈতি পাশের ঘরে ঝুমুর ব্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছিল। ঠিক তখন লোকনাথ ঘরে ঢুকে ঝুমুকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার আম্মু কই?”
ঝুমু মুখ ভর্তি খাবার নিয়ে বলল, “আম্মু রুমে ব্যাগ গুছাচ্ছে।”
লোকনাথ সোজা চৈতির ঘরের দরজায় গিয়ে টোকা দিল। চৈতি তাড়াতাড়ি ওড়না টেনে নিয়ে বলল, “আসতে পারো।”
লোকনাথ ভেতরে ঢুকে রুক্ষ গলায় বলল, “আজ আমি যাব ঝুমুকে নিয়ে কলেজে।”
চৈতি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। কাল রাতের সেই রাগী ভাবটা এখনো লোকনাথের মুখে লেগে আছে। সে নরম গলায় বলল, “লোকনাথ, আসলে কাল ক্লাস টিচার আসেনি। আজ আসবে। গতকাল দেখা হয়নি। তাই আমাকেই যেতে হবে।”
লোকনাথ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। চৈতিকে একা যেতে দেওয়া তার কাছে আর নিরাপদ মনে হচ্ছিল না। মকবুলের কথাগুলো তার মাথায় ঘুরছিল। সে একটু জোর গলায় বলল, “আমিও যাব। আপনি রেডি হয়ে নিন। আমি বাইরে রিকশা নিয়ে আসছি।”
কথা শেষ করে লোকনাথ আর দাঁড়াল না। সে দ্রুত বের হয়ে গেল।
চৈতি ব্রেকফাস্ট সেরে ঝুমুকে নিয়ে বাইরে এল। দেখল লোকনাথ ইতিমধ্যে রিকশা নিয়ে এসে বসে আছে। লোকনাথ ঝুমুকে কোলে তুলে নিয়ে রিকশায় বসিয়ে দিল। চৈতি রিকশার কাছে গিয়ে স্বভাববশত হাত বাড়িয়ে দিল — যেভাবে সে রাজীবের সাথে প্রায়ই করত। ভুলবশত সে লোকনাথের হাতটা ধরে টান দিয়ে উঠতে চাইল।
লোকনাথের মনে একটা অদ্ভুত আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। চৈতির এই সহজাত ভরসা, হাত ধরার স্পর্শ — সবকিছু তার ভেতরে মিষ্টি একটা অনুভূতি জাগিয়ে তুলল। কিন্তু সে বাইরে কোনো প্রকাশ করল না। মুখে এখনো সেই রাগী, গম্ভীর ভাব বজায় রাখল।
সে চৈতির হাত ধরে একটু জোরে টেনে তাকে রিকশায় তুলে দিল। চৈতি তার পাশে বসল। দুজনেরই চেহারা হালকা লাল হয়ে উঠেছে। রিকশাওয়ালা প্যাডেলে চাপ দিতেই রিকশা চলতে শুরু করল।
বাসার বারান্দা থেকে রেহানা বেগম ডেকে বললেন, “সাবধানে যাস তোরা। ঝুমুকে ভালো করে দেখিস।”
ঝুমু হাত নেড়ে “টা টা” করতে লাগল। চৈতি পেছন ফিরে সীমাকে বলল, “মায়ের খেয়াল রাখিস। ওষুধ খাওয়াতে ভুলিস না।”
রিকশা এগিয়ে চলল। লোকনাথ চুপ করে বসে আছে, কিন্তু তার মনের ভেতরে দুটো ভাবনা যুদ্ধ করছিল — একদিকে চৈতির প্রতি অধিকারবোধ, অন্যদিকে মকবুলের ছায়া।
চৈতি বাইরের তাকিয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই রিকশায় বসে থাকাটা যেন কোনো এক অদৃশ্য সীমানা অতিক্রম করছে।
রিকশা চলছিল। ঝুমু লোকনাথের কোলে বসে তার কালো, মোটা হাতটা দেখছিল। হঠাৎ সে নির্দোষ কৌতূহলে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা কাকু, তুমি এত কালো কেন?”
লোকনাথ হেসে মজা করে বলল, “কী করে সুন্দর হব, তুমিই বলো।”
ঝুমু খুব সিরিয়াস মুখে বলল, “এটা তো অনেক সহজ! দুধ খেলেই হয়।”
লোকনাথ মজা করে বলল - “দুধ? আচ্ছা, আজই তাহলে গরুর দুধ কিনতে হবে।”
“না না, গরুর দুধ না!” ঝুমু হাসতে হাসতে বলল, “মানুষের দুধ। তুমি আম্মুর দুধ খাও, দেখবে খুব তাড়াতাড়ি সাদা হয়ে যাবে।”
কথাটা শুনে লোকনাথ আর চৈতি দুজনেই যেন বজ্রাহত হয়ে গেল। চৈতির মুখ লাল হয়ে উঠল। সে চোখ রাঙিয়ে ধমক দিল, “ঝুমু! চুপ কর! এসব কী আজেবাজে কথা বলছিস?”
কিন্তু ঝুমু থামল না। সে আরও উৎসাহ নিয়ে বলল, “না মা, সত্যি কথা। আমাদের হেড স্যার তো আগে খুব কালো ছিল। পরে নাকি আমাদের সুন্দরী ইংরেজি ম্যাডামের দুধ খেয়ে সুন্দর হয়ে গেছে। তাই আম্মু, তুমি তো অনেক সুন্দর। কাকু যদি তোমার দুধ খায়, তাহলে খুব তাড়াতাড়ি সাদা হয়ে যাবে।”
চৈতির শরীরটা অস্বস্তিতে কেঁপে উঠল। কথাগুলো তার কানে যেন আগুনের মতো লাগছিল। সে কড়া গলায় বলল, “ঝুমু, এগুলো খারাপ কথা! আর কখনো এমন কথা বলবি না।”
ঝুমু অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “কেন মা? তুমি তো আব্বুকে খাওয়াতে। আমি দেখেছি।”
চৈতি আরও লজ্জায় পড়ে গেল। সে কিছু বলার আগেই ঝুমু লোকনাথের দিকে ঘুরে আরও উৎসাহ নিয়ে বলতে শুরু করল:
“জানো কাকু, আগে রাতে যখন আমার ঘুম ভেঙে যেত, তখন দেখতাম মা আর আব্বু পুরো ন্যাংটা হয়ে শুয়ে আছে। আব্বু মায়ের দুধ মুখে নিয়ে খাচ্ছে। মা আব্বুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর আদর করে বলছে, ‘ভালো ছেলে হয়ে মায়ের কথা শোন, তাহলে আরও দুধ পাবি।’ আব্বু তখন মুখ তুলে বলত, ‘আচ্ছা মা…’
তারপর আব্বু মায়ের দুধ আরও জোরে চুষতে থাকত। মা চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস ভারী করে ফেলত। কখনো কখনো মা আব্বুর পিঠে নখ দিয়ে আঁচড়াত। আব্বু বলত, ‘আরও দাও মা…’ মা তখন হাসতে হাসতে বলত, ‘যত খাবি তত খা, কিন্তু আমার কথা শুনতে হবে।’
আমি চুপ করে দেখতাম। মা-আব্বু খুব মজা করত। হি হি…”
ঝুমু হাসতে হাসতে বলছিল, কিন্তু চৈতির কাছে প্রতিটা শব্দ যেন ছুরির মতো বিঁধছিল। তার মুখ লজ্জায় একেবারে লাল হয়ে গেছে। সে দ্রুত ঝুমুর মুখ চেপে ধরল।
“চুপ কর ঝুমু! একদম চুপ!” চৈতির গলা কাঁপছিল। তার সারা শরীরে লজ্জার ঢেউ বয়ে যাচ্ছিল। রিকশায় বসে এমন কথা শুনতে হবে — এটা সে কল্পনাও করেনি।
চৈতি হাত দিয়া ঝুমুর মুখ বন্ধ করল, আর বলল- আর একটা কথাও তুমি বলবা না, কাদের সাথে থেকে এগুলো শিখেছ কে জানে।
লোকনাথও প্রথমে সরম পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঝুমুর বর্ণনা শুনতে শুনতে তার শরীরে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। তার সোনা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। মনে মনে সে চৈতির নগ্ন শরীর, রাজীবের মুখে চৈতির স্তন, চৈতির আদুরে গলায় “ভালো ছেলে” বলা — সবকিছু কল্পনা করে ফেলল।
কিন্তু একই সাথে তার বুকের ভেতরে তীব্র রাগও জন্ম নিল। রাজীব যে অধিকারটা ভোগ করেছে, সেই অধিকার তার নেই। চৈতি তার স্ত্রী নয়, অথচ সে এখনো রাজীবের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে। এই চিন্তাটা লোকনাথের ভেতরে জ্বালা ধরিয়ে দিল। রাজীবের দূরে থাকায় যে অনুপস্থিতি চৈতির মনে সে যদি তা দখল করতে পারত, তবে হয়ত চৈতির অধিকার বাড়ত।
রিকশা চলছিল। তিনজনের মধ্যে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এসেছিল। চৈতি মুখ নিচু করে বসে ছিল। লোকনাথ সামনে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু তার মন পুরোপুরি অন্য জগতে। আর ঝুমু নির্দোষ মনে ভাবছিল — সে তো শুধু সত্যি কথাই বলেছে।