মায়ের বান্ধবী - অধ্যায় ২৫
২৪
খাওয়া শেষ করে আমরা একটু বের হলাম। তনিমা আন্টি বললেন বান্ধবীদের জন্য আর কিছু ছোটখাটো গিফট কেনা বাকি। আমরা বসুন্ধরা সিটি শপিং মলে গেলাম। বিকেলের ভিড় ঠেলে মলে ঢোকাটা বেশ ঝক্কির ছিল। কিন্তু জনাকীর্ণ মলের ভেতরেও আমাদের মাঝখানে এক অদৃশ্য সুতো টানা ছিল। তনিমা আন্টি সামনে হাঁটছেন, আমি পেছনে। মাঝে মাঝে কোনো দোকানের কাঁচের প্রতিফলন দিয়ে আমরা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিলাম। তিনি যখন কোনো পারফিউম বা গয়না পছন্দ করছিলেন, আমি পাশে দাঁড়িয়ে সাধারণ আত্মীয়ের মতো মত দিচ্ছিলাম। কেউ জানত না এই শাড়ি পরা সম্ভ্রান্ত মহিলার শরীরে আমার বেল্টের দাগ আছে। কেউ জানত না একটু আগে এই নারী এক তরুণের পায়ের নিচে হাঁটু গেড়ে বসে নিবেদন করছিলেন। এই গোপনীয়তাটাই আমাদের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চ।
রাত আটটার দিকে আমরা বাসায় ফিরলাম। বাসায় ফিরতেই দেখলাম এক এলাহি কাণ্ড। বাবা আর মা অফিস থেকে ফিরেছেন, মৃন্ময়ও কলেজ থেকে ফিরে সোফায় বসে ফোন টিপছে। বাসার পরিবেশ এখন পুরোদস্তুর ‘ফ্যামিলি মোড’। তনিমা আন্টির ফেরার খবর শুনে মা আজ একটু বেশিই ব্যস্ত।
মা বললেন, 'তনিমা, তোর প্যাকিং কতদূর? কাল তো সারা দিন হাতে সময় পাবি না। আজ রাতেই সব গুছিয়ে ফেল।' তনিমা আন্টি খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, 'হ্যাঁ রে রাশেদা, আজই সব শেষ করব। তন্ময়কে নিয়ে বসুন্ধরা গিয়েছিলাম কয়েকটা জিনিস কিনতে। ওখানেই দেরি হলো।'
রাতের খাবার শেষে মৃন্ময় হাই তুলতে তুলতে নিজের রুমে চলে গেল। বাবা আর মা ড্রয়িংরুমে বসে তনিমা আন্টির লাগেজের লিস্ট চেক করছিলেন। আমিও যোগ দিলাম। আন্টির মোট লাগেজ হয়েছে ৩-৪টা। প্রবাসীদের যেমন হয়—যাওয়ার সময় আসার চেয়ে দ্বিগুণ মাল থাকে। মা একের পর এক আচার, গুঁড়ো মশলা, নকশী কাঁথা আর আত্মীয়দের দেওয়া উপহার ব্যাগে ভরছেন।
মা তনিমা আন্টির হাত ধরে বললেন, 'কাল চলে যাবি ভাবতেই বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কবে আবার আসবি ঠিক নেই।' আন্টি মাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি আন্টির পিঠের দিকে তাকালাম। তাঁর কামিজের নিচ দিয়ে আমি জানি সেই দাগগুলো এখন কেমন হয়ে আছে।
ব্যাগগুলো যখন চেইন টেনে বন্ধ করা হলো, তখন ঘরের এক কোণায় সেগুলো যেন একেকটা বিশাল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। এগুলো শুধু মালপত্র নয়, এগুলো তনিমা আন্টির চলে যাওয়ার প্রস্তুতি। প্রতিটি চেইনের শব্দ আমার কানে বিদায়ের সুর হয়ে বাজছিল।
ল্যাগেজগুলোর জিপার আটকানোর সেই কর্কশ শব্দটা এখনো আমার কানে বাজছে। ড্রয়িংরুমের এক কোণায় চারটা বিশাল ল্যাগেজ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন চারজন নির্বাক প্রহরী। এগুলো শুধু ব্যাগ নয়, এগুলো আসলে একেকটা সীমানা প্রাচীর। তনিমা আন্টি কাল রাতে চলে যাবেন—এই কঠিন সত্যটা ওই ব্যাগগুলোর ভেতর ঠাসা হয়ে আছে। ঘরের পরিবেশটা অদ্ভুত। একদিকে বিদায়ের বিষাদ, অন্যদিকে আগামীকালের প্রস্তুতির ব্যস্ততা।
মা কিচেন থেকে ট্রে-তে করে চার কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে এলেন। আদা আর এলাচের সুবাস ম-ম করছে। মা চা নামিয়ে রেখে আন্টির পাশে সোফায় বসলেন। বাবা নিউজ চ্যানেলের ভলিউম কমিয়ে দিয়ে আড়মোড়া ভাঙলেন। বিকেলের সেই উত্তাল ঝড়, বুনো উন্মাদনা আর বাথরুমের সেই নিষিদ্ধ মুহূর্তগুলোর পর এখন এই ড্রয়িংরুমের সভ্য পরিবেশটাকে আমার কাছে খুব পরাবাস্তব মনে হচ্ছে। আমি সোফার এক কোণায় গুটিসুটি মেরে বসেছি। আমার গায়ের চামড়ায় এখনো আন্টির নখের মৃদু আঁচড় অনুভব করছি, অথচ এখন আমাকে অভিনয় করতে হচ্ছে সেই লক্ষ্মী ছেলেটির, যে তাঁর আন্টির ল্যাগেজ গুছিয়ে দিয়ে ক্লান্ত।
মা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর তনিমা আন্টির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তনিমা, কাল তো চলেই যাবি। এতগুলা দিন কীভাবে কেটে গেল টেরই পেলাম না। তোর অভাবটা খুব ফিল করব রে।'
তনিমা আন্টি আলতো করে মায়ের হাতটা ধরলেন। 'আমিও রে রাশেদা। এবার দেশে ফিরে আসার দিনগুলো, তোদের এই আতিথেয়তা—সিডনিতে বসে এগুলোই মিস করব।'
তনিমা আন্টি আচমকা জিজ্ঞেস করবেন, 'রাশেদা, একটা কথা অনেকদিন ধরে ভাবছি। তন্ময়কে নিয়ে তোদের কী প্ল্যান? এই যে পঁচিশ বছরে পা দিল, ভার্সিটি শেষ হতে চলল—এরপর কী?'
মা বলতে শুরু করলেন তাঁর চিরাচরিত মধ্যবিত্ত স্বপ্নের ফর্দ। 'আমি তো ভাবি, ও পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস-এর জন্য ট্রাই করবে। সরকারি চাকরি হলে একটা নিরাপত্তা থাকে। আর যদি তা না হয়, তবে কোনো ভালো মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংকে ঢুকে যাবে তোর জামিল ভাইয়ের মতো। তারপর বাকি সবার মতো ঠিকঠাক একটা মেয়ে দেখে বিয়ে থা দিয়ে সংসার ধর্ম পালন করা। সাধারণ জীবন, এর চেয়ে বেশি আর কী চাব?'
মায়ের কথাগুলো শুনে আমার হাসি পেল। এই হলো আমাদের জীবনের স্ক্রিপ্ট। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব ছক কাটা। পড়াশোনা, চাকরি, বিয়ে, বাচ্চা, আর শেষে আজিমপুর গোরস্থান। এই একঘেয়ে রিপ্লে মুড থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তা মা দেখেন না।
তনিমা আন্টি চায়ের কাপটা টেবিল রাখলেন। তিনি আমার দিকে একবার তাকালেন, তাঁর চোখে এক ধরণের উজ্জ্বলতা। তিনি মায়ের দিকে ফিরে বললেন, 'রাশেদা, তুই তন্ময়কে খুব ছোট করে দেখছিস। ও তোদের জীবনের ‘রিপ্লে’ হতে যাবে কেন? ওর যা মেধা, ওর যে ধরণের নলেজ আর অবজারভেশন পাওয়ার—আমি মনে করি ওকে এই ঢাকার ছোট গণ্ডিতে আটকে রাখা ঠিক হবে না। তন্ময়ের উচিত স্কলারশিপ নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া। ওর সাবজেক্ট ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস—বিদেশের ইউনিভার্সিটিগুলোতে এর ডিমান্ড অনেক।'
মা একটু দমে গিয়ে বললেন, 'বিদেশে যাওয়া তো চাট্টিখানি কথা না রে। কত টাকা লাগে, কত ঝামেলা। আমাদের তো আর অত সামর্থ্য নেই যে ওকে কয়েক লাখ টাকা দিয়ে বাইরে পাঠাব। আর স্কলারশিপ কি বললেই পাওয়া যায়?'
তনিমা আন্টি সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর গলার স্বরে এখন এক ধরণের আত্মবিশ্বাস। 'শোন রাশেদা, টাকা কোনো সমস্যা না। বিদেশ যাওয়ার জন্য যে প্রাথমিক খরচ—পাসপোর্ট, টিকেট, লবিং—সেটার জন্য যে টাকা লাগবে, আমি ওটা তন্ময়কে লোন হিসেবে দেব। ও যখন বিদেশে গিয়ে সেটেল হবে, পার্ট টাইম জব করবে, তখন আস্তে আস্তে আমাকে শোধ করে দিলেই হবে। এটা নিয়ে তোদের ভাবতে হবে না।'
মায়ের চোখে তখন বিস্ময়। মা যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না। আন্টি বলে চললেন, 'আর থাকার সমস্যা? তন্ময় আমার বাসায় উঠবে। ও আমার কাছে থাকলে তোদেরও দুশ্চিন্তা থাকবে না। লোকাল গার্ডিয়ান আর স্পন্সর হিসেবে আমি নিজে সই করব। অস্ট্রেলিয়ায় তো লকাল গার্ডিয়ান খুব বড় একটা ফ্যাক্টর।'
বাবা এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিলেন। তিনি একজন ব্যাংকার, তাই প্র্যাকটিক্যাল দিকগুলো আগে ভাবেন। বাবা বললেন, 'তনিমা, তোমার প্রস্তাবটা খুবই লোভনীয়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটিগুলোতে তো সহজে স্কলারশিপ দেয় না। আইইএলটিএস, জিআরই—কত কী লাগে।'
আন্টি রহস্যময় হাসি হাসলেন। 'জামিল ভাই, আমি সব ভেবে রেখেছি। অস্ট্রেলিয়ার একটা নামকরা ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট হেড হলেন ড. রায়ান হেন্ডারসন। তিনি আমার বেশ পরিচিত। আমি যদি ওনাকে বলি, তবে তন্ময়ের জন্য স্কলারশিপ বা টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের ব্যবস্থা করা পানির মতো সহজ। আমি ফিরে গিয়েই ওনার সাথে কথা বলব।'
মা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। 'তনিমা, তুই সত্যি বলছিস? এসব কি এত সহজে হয়ে যায়?'
আন্টি হাসতে হাসতে বললেন, 'সহজে হয় না যদি তুই একা চেষ্টা করিস। কিন্তু সিস্টেমের ভেতরে লোক থাকলে সব হয়। আমি তন্ময়ের হয়ে সব লবিং করব। শুধু তন্ময়কে মানসিকভাবে তৈরি হতে বল। মাস ছয়েকের মধ্যেই আমি সব গুছিয়ে ফেলব ইনশাআল্লাহ।'
আমার মাথায় তখন আনন্দের পাহাড় ভাঙছে। ছয় মাস! মাত্র একশ আশি দিন। এরপর এই ধানমন্ডি, এই পাশের ঘর, এই মা-বাবার কড়া নজরদারি—সব থেকে আমি মুক্ত। সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় আমি আর তনিমা থাকব। এক ছাদের নিচে। সেখানে আমরা আর আন্টি-ভাতিজা থাকব না। আমরা থাকব স্বামী-স্ত্রীর মতো। বুনো উন্মাদনায় ভরা রাতগুলো সেখানে হবে বৈধ, বা অন্তত কারো চোখের আড়াল করার দরকার পড়বে না। তনিমা আন্টি আমাকে শুধু বিদেশের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন না, তিনি আমাকে তাঁর নিজের জীবনের অংশ করে নেওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।
বাবা একটু কেশে বললেন, 'দেখো তনিমা, আইডিয়াটা দারুণ। তবে আমাদের দেশে পাসপোর্ট অফিস থেকে শুরু করে ভার্সিটির সার্টিফিকেট তোলা, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স—এসব সরকারি অফিস মানেই যমের দুয়ার। প্রচুর সময় লাগে, টেবিলের ওপর দিয়ে টাকা দিলেও কাজ এগোয় না।'
তনিমা আন্টি বাবার দিকে তাকিয়ে একটু বাঁকা হাসলেন। 'জামিল ভাই, আপনি তো এই দেশেই থাকেন। আপনি জানেন না টাকা খাওয়ালে এই দেশে বাঘের দুধও পাওয়া যায়? সরকারি ফাইল নড়ে না কারণ ওটার নিচে ‘তৈল’ দেওয়া হয় না। সঠিক জায়গায় টাকা খাওয়ালে সব কাজ পানির মতো সহজ হয়ে যায়। আপনারা শুধু তন্ময়কে এনকারেজ করেন, বাকিটা আমি আর তন্ময় মিলে সামলে নেব।'
মা আবেগে গদগদ হয়ে আন্টিকে জড়িয়ে ধরলেন। 'তনিমা, তুই তন্ময়ের জন্য যা করছিস, তা আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না রে। ও তো তোর নিজের ছেলের মতোই। তুই ওর জীবনটা গড়ে দিবি।'
আমি মায়ের কথা শুনে মনে মনে হাসলাম। ‘নিজের ছেলের মতো!’ মা যদি জানতেন এই ‘ছেলে’ তাঁর বান্ধবীর শরীরে কতটা কামড় বসিয়েছে, তবে মা হয়তো আজই এই ফ্ল্যাট থেকে আমাকে বের করে দিতেন। কিন্তু মায়ের এই সরলতাই আমাদের রক্ষা করেছে।
বাকি সময়টা মা আর আন্টির মধ্যে টুকটাক আলোচনা হলো। ওখানে কী ধরণের কাপড় নিয়ে যেতে হবে, ঠান্ডার দেশ, খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাস বদলাতে হবে—সব। আমি শুধু একপাশে বসে শুনছিলাম আর কল্পনায় সিডনির কোনো অ্যাপার্টমেন্টের ব্যালকনিতে আন্টির নগ্ন শরীরের কথা ভাবছিলাম। ছয় মাস পর আমাদের পৃথিবীটা বদলে যাবে।
রাত বারোটা বাজল। লিভিং রুমের ঘড়িটা নিঃশব্দে সময় ঘোষণা করল। বাবা হাই তুলতে তুলতে বললেন, 'আজ অনেক রাত হলো। কাল সকালে তন্ময়কে আবার এয়ারপোর্ট ড্রাইভ করতে হবে। চলো, সবাই শুয়ে পড়ি।' মা বললেন, 'হ্যাঁ, তনিমাও খুব ক্লান্ত। আজ ওকে একটু তাড়াতাড়ি ঘুমাতে দে।'
তনিমা আন্টি সোফা থেকে উঠলেন। যাওয়ার আগে আমার দিকে একপলক তাকালেন। সেই চাহনিতে ছিল গভীর এক তৃপ্তি। তিনি চোখের ইশারায় যেন বলে দিলেন—‘ছয় মাস পর আমি তোকে জিতে নেব।’
আমরা যে যার রুমের দিকে রওনা হলাম। করিডোরটা এখন অন্ধকারে ঢাকা। তনিমা আন্টি তাঁর রুমে ঢুকলেন। মা আর বাবা তাঁদের রুমে। আমি আমার রুমে ঢুকে দরজাটা টেনে দিলাম।
‘খট’ করে শব্দ হলো দরজার। এই শব্দটা আজ আমার কাছে বিদায়ের শব্দ মনে হলো না। মনে হলো একটা নতুন অপেক্ষার শুরু। আমি দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিলাম। তনিমা আন্টিও ওপাশে দরজা লাগাচ্ছেন। এই বন্ধ দরজাগুলোর ওপাশে আজ আর কোনো শরীরী আকাঙ্ক্ষা নেই, আজ আছে এক বিশাল নীল আকাশের স্বপ্ন।
কাল আন্টি চলে যাবেন। কিন্তু আমি জানি, তিনি ফিরে আসবেন আমার কাছে, অথবা আমি যাব তাঁর কাছে। ছয় মাস। মাত্র ১৮০টা সূর্যোদয়। আমি বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। সিলিং ফ্যানের ঘোরে আমি দেখতে পাচ্ছি এক তুষারপাত হওয়া বিদেশি শহর, যেখানে তনিমা আন্টি আমার জন্য দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছেন।
রাত দুটো। ঢাকা শহরের এই সময়টা বড় অদ্ভুত। বাইরের রাস্তায় দু-একটা ট্রাকের বিকট গর্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। সোডিয়াম বাতির হলদেটে আলো জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে চুইয়ে এসে ঘরের মেঝেতে এক বিষণ্ণ জ্যামিতিক নকশা তৈরি করেছে। আমি বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে সিলিং ফ্যানের অবিরাম ঘূর্ণন দেখছিলাম। আজ মঙ্গলবার হয়ে গেছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় আজকের দিনটিই চিহ্নিত করা আছে তনিমা আন্টির বিদায়ের দিন হিসেবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী রাত দুটোর দিকেই দরজায় সেই অতি পরিচিত আঁচড়ের শব্দ হলো। আমি জানতাম তিনি আসবেন। এই শেষ রাতটুকু আমাদের প্রাপ্য ছিল। আমি উঠে গিয়ে দরজাটা পুরোপুরি খুলে দিলাম। অন্ধকারে তনিমা আন্টির অবয়ব দেখা যাচ্ছে। তাঁর পরনে একটি পাতলা সুতির নাইট ড্রেস, যা বাতাসের ছোঁয়ায় তাঁর শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। তিনি ঘরে ঢুকেই কোনো কথা না বলে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি তাঁর উষ্ণতা অনুভব করলাম।
আমাদের ঠোঁট জোড়া একে অপরকে স্বাগত জানাল এক দীর্ঘ, আর্দ্র চুম্বনে। এই চুম্বনে কোনো বুনো আক্রোশ ছিল না, ছিল একরাশ আকুতি আর বিচ্ছেদের বেদনা। আমরা একে অপরের নিশ্বাস ভাগ করে নিলাম। মনে হলো, এই নিশ্বাসটুকুই হয়তো আগামী ছয় মাসের জন্য আমাদের একমাত্র অক্সিজেন। চুমু শেষে আন্টি আমার বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বললেন, 'তন্ময়, দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে দে। আজ আর কোনো বাধা চাই না।'
আমি দরজাটা লক করে দিয়ে আন্টিকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। আমরা একে অপরকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে শুলাম। জিরো বাল্বের নীলচে আলোয় আন্টির মুখটা এক অপার্থিব মায়ায় ভরে উঠেছে। তাঁর চোখের পাতায় বিন্দু বিন্দু জল চিকচিক করছে।
আন্টি আমার গালে হাত বুলিয়ে বললেন, 'তন্ময়, আমি ওখানে ফিরে গিয়ে আমার সব কাজ কিছুদিনের জন্য পজ করে দেব। আমার একটাই মিশন হবে—তোকে কত দ্রুত আমার কাছে নিয়ে যাওয়া যায়। ড. হেন্ডারসনের সাথে কথা বলে তোর সব পেপারস রেডি করাব। তুই শুধু কথা দে, এখানে পাসপোর্ট আর অন্যান্য ডকুমেন্টসের কাজগুলো দ্রুত শুরু করবি।'
আমি তাঁর হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখলাম। 'আমি কথা দিচ্ছি তনিমা। আমি এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করব না। কিন্তু মা-বাবাকে ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট হবে।'
আন্টি আমার কপালে একটা চুমু দিলেন। 'কষ্ট হবে রে তন্ময়। এটাই জীবন। কিছু পেতে হলে কিছু হারাতে হয়। মা-বাবার মায়া চিরকালীন, কিন্তু আমাকে পাওয়ার যে আনন্দ, সেটা কি তোর এই দুঃখ ভুলিয়ে দেবে না? তুই তো জানিস, তোকে ছাড়া আমি এখন এক মুহূর্তও ভাবতে পারছি না।'
আমি তাঁর চিবুকটা আলতো করে নেড়ে দিয়ে বললাম, 'তুমি কি সত্যি বলছিলে আন্টি? মানে ওই যে বললে, আমি তোমার জীবনে রঙ ফিরিয়ে দিয়েছি?'
আন্টি একটু হাসলেন, সেই হাসিটা ছিল এক প্রশান্তির। 'সত্যি বলছিলাম রে। তুই আমার জীবনে আসলি এক ঘূর্ণিঝড়ের মতো। তুই আমাকে শেখালি পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সেও এক নারী কীভাবে কিশোরীর মতো হৃদস্পন্দন শুনতে পায়। তুই আমার জিবনকে রামধনুর মতো রঙিন করে দিয়েছিস সোনা। আজ আমি যখন আয়নায় নিজেকে দেখি, তখন আমি আর সেই তনিমাকে দেখি না, আমি দেখি এক উদ্দাম প্রেমিকাকে।'
পরের অধ্যায় অর্থাৎ অধ্যায় ২৫-এ এই গল্প সমাপ্ত হয়ে যাবে। আপনারা যারা নিয়মিত কমেন্ট করে আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।