মায়ের বান্ধবী - অধ্যায় ২৬

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-72133-post-6175662.html#pid6175662

🕰️ Posted on Fri Apr 03 2026 by ✍️ Orbachin (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2800 words / 13 min read

Parent
২৫ আমরা অনেকক্ষণ কথা বললাম। গত এক মাসের স্মৃতি, শিমুলিয়ার সেই উত্তাল রাতগুলো, আলতাদীঘির জংলা—প্রতিটি মুহূর্ত যেন আবার আমাদের চোখের সামনে সজীব হয়ে উঠল। কথা বলতে বলতে আমি হঠাৎ আনিশার কথা তুললাম। ক্যাম্পাসে আনিশার সেই আমাকে নিয়ে কৌতূহল, আমার প্রতি তার প্রচ্ছন্ন আকর্ষণ—সব খুলে বললাম। তনিমা আন্টির প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য আমি একটু উৎসুক ছিলাম। আন্টি শান্তভাবে শুনলেন। তারপর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'শোন তন্ময়, আমাদের বাস্তবটাকে মেনে নিতে হবে। আমি তোর মায়ের বান্ধবী, বয়সে তোর দ্বিগুণ। সামাজিকভাবে আমাদের মধ্যে কখনোই কোনো বৈধ বা স্থায়ী সম্পর্ক হওয়া সম্ভব নয়। এই সমাজ আমাদের এই মিলনকে ‘পাপ’ বলবে। আর কয়েক বছর পরেই আমার শরীরের এই টানটান ভাব থাকবে না, এই সুখের আর্তি কমে যাবে। আমি বুড়িয়ে যাব। আর তুই তখন থাকবি তোর জীবনের সেরা সময়ে।' আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তিনি আমার ঠোঁটে আঙুল দিয়ে থামিয়ে দিলেন। 'না, শোন। তোর কাছে এখন লম্বা সময় পড়ে আছে। তুই চাইলে আনিশার সাথে প্রেম করতে পারিস। আমি তাতে রাগ করব না। এমনকি তুই যদি বিদেশ গিয়ে অন্য কারো সাথে প্রেমে পড়িস, বিয়ে করিস, সংসার করিস, সন্তান নিস—আমি তাতেও খুশি হব। আমি চাই তুই একটা স্বাভাবিক জীবন পাস।' আমি অবাক হয়ে তাকালাম। 'তুমি আমাকে এভাবে মুক্তি দিয়ে দিচ্ছ?' আন্টি আমার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললেন, 'মুক্তি দিচ্ছি না তন্ময়। আমি তোকে আমার হৃদয়ের এক বিশেষ জায়গায় বন্দি করে রেখেছি। তুই বিয়ে করিস বা অন্য কারো সাথে থাকিস, কিন্তু তুই আন্টিকে ততদিন ছাড়তে পারবি না, যতদিন তোর নিজের মন চাইবে না। যেদিন তোর মনে হবে তুই আর আমাকে চাস না, সেদিন তুই চলে যাস। কিন্তু যতদিন আমাদের এই সংযোগ আছে, ততদিন সামাজিকতা বা নৈতিকতা যেন আমাদের মিলনের বাধা না হয়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হবে। আমি হয়তো সেখানে একা থাকব, কিন্তু আমার মনে তুইই থাকবি।' আন্টির এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আমাকে স্তব্ধ করে দিল। একজন নারী কতটা ভালোবাসলে নিজের প্রিয় পুরুষকে অন্যের সাথে ভাগ করে নেওয়ার অনুমতি দিতে পারে? এই উদারতা কি প্রেমের পরাকাষ্ঠা নাকি এক ধরণের অসহায়ত্ব? আমরা আরও অনেকক্ষণ কথা বললাম। ঢাকা থেকে তাঁর বিদায়, এয়ারপোর্টের পরিবেশ, বিদায়বেলায় মা-বাবার কান্না—সব নিয়ে এক ধরণের বিষাদ আমাদের ঘিরে ধরল। আন্টি বললেন, 'আজ রাত জাগলে সমস্যা নেই রে তন্ময়। ফ্লাইটের দেরি আছে। কাল দুপুর পর্যন্ত ঘুমানো যাবে। মা তোকে ডাকবে না জানি।' আমি আন্টির গলার ভাঁজে মুখ গুঁজে দিয়ে তাঁর শরীরের সেই অদ্ভুত মাদকতাময় গন্ধটুকু শুষে নিচ্ছিলাম। এই গন্ধটা আগামী কয়েক মাস আমার স্মৃতিতে অমর হয়ে থাকবে। আন্টির হাতের আঙ্গুলগুলো আমার পিঠে আলতো করে খেলা করছিল। এক সময় খেয়াল করলাম, আমি কথা বলছি কিন্তু আন্টির জবাবগুলো হয়ে আসছে সংক্ষিপ্ত।  'জানো আন্টি, সিডনিতে গিয়ে আমরা সি-বিচে হাঁটব...' 'হুম...' 'আমি তোমার জন্য রান্না করব...' 'হুম...' বুঝলাম, ক্লান্তি আর দীর্ঘ আলোচনার পর তাঁর চোখে ঘুম নেমে এসেছে। গত কয়েকদিনের ধকল তাঁর শরীর আর সইতে পারছে না। আমি আর তাঁকে বিরক্ত করলাম না। তাঁর মাথাটা আমার বুকের ওপর আরও সুবিধাময় করে রাখলাম। অন্ধকারে আন্টির শান্ত নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। তাঁর শরীরটা এখন সম্পূর্ণ শিথিল। আমি তাঁর কপালে শেষবারের মতো একটা আলতো চুমু দিলাম। তারপর আন্টিকে জড়িয়ে ধরে আমিও চোখ বুজলাম। ঘরের এসিটা নিঃশব্দে চলছে। জানালার ওপাশে ঢাকা শহর তখন শেষ প্রহরের ঘুমে আচ্ছন্ন। আমাদের এই অসম সম্পর্কের এক অধ্যায় আজ এখানেই শান্তিতে শেষ হলো। কাল থেকে শুরু হবে বিরহের অগ্নিপরীক্ষা। নিদ্রার ঘোরেও আমি অনুভব করতে পারছিলাম আন্টির হৃৎস্পন্দন। ধপ... ধপ... ধপ...। এই ছন্দটাই এখন আমার বেঁচে থাকার গান। মানুষের চলে যাওয়ার দিনগুলোর একটা নিজস্ব গন্ধ থাকে। সেই গন্ধে বিষাদ থাকে, পুরনো স্মৃতির ন্যাপথলিন থাকে, আর থাকে এক ধরণের হাহাকার। মঙ্গলবার সকাল থেকেই আমাদের ফ্ল্যাটে সেই বিদায়ী গন্ধটা ম-ম করছিল। তনিমা আন্টি আজ চলে যাবেন। গন্তব্য সুদূর অস্ট্রেলিয়া, সিডনি। এই চলে যাওয়া উপলক্ষে মা আজ ব্যাংক থেকে ছুটি নিয়েছেন। কারণ, এই বয়সে এসে বন্ধুদের সাথে কাটানো সময়গুলো ব্যাংকের অডিটের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে। সকাল থেকেই বাসাটায় একটা উৎসব উৎসব, অথচ বিষণ্ণ ভাব। দুপুরের রান্নায় মা কোনো কার্পণ্য করেননি। তনিমা আন্টির পছন্দের সব পদ—সর্ষে ইলিশ, খাসির রেজালা, আর জর্দা পোলাও রান্না হয়েছে। দুপুরের খাবার পর থেকেই ড্রয়িংরুমে দুই বান্ধবীর আড্ডা জমে উঠল। আমি নিজের ঘরের দরজা সামান্য ফাঁক করে সেই আড্ডা শুনছিলাম, আর মাঝে মাঝে ড্রয়িংরুমে গিয়ে চা বা পানির গ্লাস এগিয়ে দিচ্ছিলাম। মা আর আন্টির গল্প যেন ফুরোতেই চাইছিল না। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে তাদের সেই সোনালী দিনগুলো, রোকেয়া হলের আড্ডা, টিএসসির চা, আর জীবনের ফেলে আসা হিসাব-নিকাশ। মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছিলেন, 'জানিস তনিমা, জীবনটা কেমন চোখের পলকে পার হয়ে গেল। সেদিনও মনে হয় আমরা ক্যাম্পাসে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে রিকশায় ঘুরতাম, আর আজ আমাদের ছেলেমেয়েরা ভার্সিটি পার করছে।' তনিমা আন্টি হাসতে হাসতে বললেন, 'সময় যায় রে রাশেদা, কিন্তু মানুষের ভেতরের বয়সটা কি বাড়ে? আমার তো মনে হয় আমি এখনো সেই চব্বিশ বছরের তনিমা হয়েই আছি।' কথাটা বলার সময় আন্টি আড়চোখে আমার ঘরের দরজার দিকে তাকালেন। আমি জানি ওই ‘চব্বিশ বছর’ কথাটা তিনি কাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন। আমার ভেতরের বয়স আর তাঁর ভেতরের বয়স গত কয়েকদিনে এক মোহনায় এসে মিশেছে। আমি অবাক হয়ে এই দুই নারীকে দেখছিলাম। মা জানেন, তাঁর সামনে বসা নারীটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আর আমি জানি, এই নারীটি গত সাতটি রাত আমার বিছানায়, আমার বুকে মাথা রেখে তার পঁচিশ বছরের তৃষ্ণা মিটিয়েছেন। মানুষের জীবন কতগুলো গোপন দেরাজে বিভক্ত। এক দেরাজের খবর অন্য দেরাজ কখনোই জানতে পারে না। জানলে হয়তো এই সাজানো ড্রয়িংরুমের কাঁচের টেবিলটা এক মুহূর্তেই চুরমার হয়ে যেত। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। বিদায়ের ক্ষণ ঘনিয়ে আসছে। আমাদের সবার ভেতরেই একটা তাড়াহুড়ো শুরু হলো। আন্টির ফ্লাইট রাত এগারোটায়। কিন্তু ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যামের কথা মাথায় রেখে সন্ধ্যা সাতটার মধ্যেই বের হওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। বাবা ফোন করে জানালেন, তিনি ব্যাংক থেকে সরাসরি এয়ারপোর্টে চলে আসবেন। আমরা যেন সময়মতো বেরিয়ে পড়ি। আমাদের গাড়িটা পার্কিং লট থেকে বের হলো। আমি ড্রাইভিং সিটে। আমার পাশে তনিমা আন্টি। পেছনে মা আর মৃন্ময়। গাড়ির ডিকি ভর্তি আন্টির বিশাল তিনটে স্যুটকেস। সাথে একটা মাঝারি সাইজের হ্যান্ড লাগেজ বা কেবিন ব্যাগ। ঢাকা শহরের চিরচেনা ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে আমাদের গাড়ি এয়ারপোর্ট রোডের দিকে এগোতে লাগল। গাড়ির ভেতরে একটা থমথমে নীরবতা। মা মাঝে মাঝেই আঁচল দিয়ে চোখ মুছছেন। মৃন্ময় ইদানীংকালে একটু চুপচাপ, সে জানালা দিয়ে বাইরের নিয়ন আলো দেখছে। আর আমি? আমি স্টিয়ারিং হুইল ধরে আছি ঠিকই, কিন্তু আমার মনটা পড়ে আছে তনিমা আন্টির বাম হাতের ওপর। অন্ধকারে, পেছনের সিট থেকে মা আর মৃন্ময়ের নজর এড়িয়ে, আন্টি তাঁর বাম হাতটা আমার বাম উরুর ওপর আলতো করে রেখেছেন। তাঁর নখগুলো আমার জিন্সের ওপর দিয়ে খুব মৃদু আঁচড় কাটছে। এই আঁচড়টা কোনো কামনার নয়, এই আঁচড়টা এক গভীর নির্ভরতার, এক নীরব প্রতিশ্রুতির। বনানী পার হওয়ার সময় আন্টি খুব শান্ত গলায় বললেন, 'তন্ময়, সাবধানে চালা। আমাদের কোনো তাড়া নেই।' আমি কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নাড়লাম। তাঁর হাতের ওপর নিজের বাম হাতটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য রাখলাম। এই স্পর্শটুকুই আমাদের বিদায়বেলার শেষ গোপন কথোপকথন। রাত সাড়ে আটটার দিকে আমরা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-২ এর সামনে পৌঁছালাম। চারদিকে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। কেউ বিদেশ যাচ্ছে বলে কাঁদছে, কেউ বিদেশ থেকে ফিরছে বলে হাসছে। এয়ারপোর্ট হলো পৃথিবীর এমন একটা জায়গা যেখানে সবচেয়ে বেশি নিখাদ আবেগ দেখা যায়। বাবা ২ নম্বর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর পরনে কর্পোরেট স্যুট। তিনি ট্রলি জোগাড় করে রেখেছিলেন। আমরা গাড়ি পার্ক করে মালপত্র ট্রলিতে তুললাম। বিশাল তিনটে স্যুটকেস। বাবা বললেন, 'তনিমা, তোমার তো অনেক ওভারওয়েট হয়ে যাবে মনে হচ্ছে।' তনিমা আন্টি হাসলেন। 'কিছু হবে না জামিল ভাই। আমি আগেই এক্সট্রা ব্যাগেজ অ্যালাউন্স কিনে রেখেছি। আর একটু আধটু বেশি হলে ফাইন দিয়ে দেব।' আমরা সবাই মিলে ভেতরে ঢুকলাম। চেক-ইন কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন। আমি আর বাবা মিলে সেই ভারী স্যুটকেসগুলো বেল্টের ওপর তুলে দিলাম। কার্গো বা চেক-ইন ব্যাগেজ হিসেবে সেগুলো বোর্ডিং পাস নেওয়ার সাথে সাথেই ভেতরে চলে গেল। তনিমা আন্টির হাতে শুধু তাঁর পার্স আর একটা মাঝারি সাইজের হ্যান্ড লাগেজ বা কেবিন ট্রলি রইল। বোর্ডিং পাস হাতে পাওয়ার পর আমরা সবাই একটা ফাঁকা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম। এবার উপহার পর্ব। বাঙালি বিদেশ গেলে বা বিদেশ থেকে এলে এই পর্বটা অবধারিত। মা তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে সুন্দর রেপিং পেপারে মোড়ানো একটা বাক্স বের করে আন্টির হ্যান্ড লাগেজের চেইন খুলে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন। 'তনিমা, এটা তোর জন্য। জামদানি শাড়ি। সিডনিতে কোনো বাঙালি অনুষ্ঠানে পরবি।' আন্টি মাকে জড়িয়ে ধরলেন। 'তোর শাড়িটা পরলেই আমার মনে হবে তুই আমাকে জড়িয়ে ধরে আছিস।' বাবা একটা খাম দিলেন। সম্ভবত কোনো বই বা স্যুভেনিয়ার। মৃন্ময় দিল একটা সুন্দর পেনসিল স্কেচ, যেটা ও নিজেই গত দুই দিন ধরে এঁকেছে। আন্টি মৃন্ময়ের মাথা নেড়ে দিলেন। 'তুই অনেক বড় শিল্পী হবি বাবা।' এবার আমার পালা। আমার বুকের ভেতর তখন অদ্ভুত একটা উত্তেজনা আর শয়তানি আনন্দ খেলা করছে। আমি আমার সঙ্গে থাকে ব্যাগ থেকে একটা ছোট, আয়তাকার বাক্স বের করলাম। খুব সুন্দর নীল রঙের রেপিং পেপারে মোড়ানো, ওপরে একটা লাল ফিতা দিয়ে বাঁধা। মা বললেন, 'কিরে তন্ময়, তুই আবার কী কিনলি? আমাকে তো বলিসনি।' আমি খুব নিষ্পাপ মুখ করে বললাম, 'আন্টির জন্য একটা স্পেশাল সারপ্রাইজ গিফট মা। সিডনিতে ওনার খুব কাজে লাগবে।' তনিমা আন্টি বাক্সটার দিকে একটু কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর হাত বাড়িয়ে সেটা নিলেন। 'কী রে এটা? খুব ভারী মনে হচ্ছে।' আমি হাসলাম। 'এখন খোলা যাবে না আন্টি। সিডনিতে নিজের ফ্ল্যাটে গিয়ে। আই হোপ ইউ উইল লাভ ইট।' আন্টি আমার চোখের দিকে তাকালেন। আমার ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে থাকা সেই বাঁকা হাসিটা তিনি হয়তো ধরতে পারলেন। তিনি বাক্সটা সযত্নে তাঁর হ্যান্ড লাগেজের একদম ভেতরের পকেটে ঢুকিয়ে চেইন আটকে দিলেন। কী আছে ওই বাক্সে? সেটা ভাবলেই আমার নিজেরই হাসি পাচ্ছিল। গত পরশু যখন আন্টি শপিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন, আমি তখন অনলাইনে ঘেঁটে একটা অত্যন্ত দামি, সিলিকনের তৈরি সিন্থেটিক খেলনা অর্ডার করেছিলাম। একদম হুবহু আসল জিনিসের মতো দেখতে। শুধু তাই নয়, আমি আমার নিজের সেই ‘উদ্ধত অহংকারের’ একটি হাই-রেজুলেশন ছবি প্রিন্ট করে, খুব সুন্দর করে ল্যামিনেট করে সেই খেলনাটার সাথে স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে দিয়েছি। সাথে একটা ছোট চিরকুটে লেখা— 'ডুপ্লিকেট দিয়ে কাজ চালিয়ে নিও সোনা, আসলটা ছয় মাস পর তোমার দরজায় কড়া নাড়বে।' আমি কল্পনা করছিলাম, সিডনির কোনো এক নিস্তব্ধ রাতে তনিমা আন্টি এই বাক্সটা খুলবেন, তখন তাঁর চোখের এক্সপ্রেশনটা কেমন হবে! তিনি হয়তো লজ্জায় লাল হবেন, তারপর হো হো করে হাসবেন, আর বলবেন— 'কি হারামি আর জানোয়ার হয়েছিস রে তন্ময়!' এই অসভ্য, গোপন উপহারটাই হবে আমাদের মধ্যকার দূরত্বের একমাত্র সেতুবন্ধন। ঘড়িতে রাত দশটা বাজল। ইমিগ্রেশনের ভেতরে ঢোকার সময় হয়ে এসেছে। বিদায়ের এই চূড়ান্ত মুহূর্তটা বড্ড ভারী। মা হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তিনি তনিমা আন্টিকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মতো কাঁদতে লাগলেন। 'ভালো থাকিস তনিমা... নিজের খেয়াল রাখিস... আবার কবে আসবি...' তনিমা আন্টির চোখও ছলছল করে উঠল। তিনি মায়ের পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। 'কাঁদিস না বোকা মেয়ে। আমি তো আবার আসব। তুইও যাবি আমার কাছে। তন্ময়কে পাঠাবি, আমি সব ব্যবস্থা করব।' বাবা এগিয়ে এসে আন্টির সাথে হ্যান্ডশেক করলেন। 'সেফ জার্নি তনিমা। পৌঁছে জানাবে।' মৃন্ময় বলল, 'সাবধানে যাবেন আন্টি।' সবশেষে আন্টি আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমাদের মাঝখানে এখন মা, বাবা আর মৃন্ময়। হাজারো মানুষের কোলাহল। সিসিটিভি ক্যামেরা আর সিকিউরিটি গার্ডদের নজরদারি। এখানে আমরা একে অপরকে পাগলের মতো জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে পারব না। এখানে আমাদের সম্পর্কটা শুধুই একজন আন্টি আর তাঁর বান্ধবীর ছেলের। কিন্তু শরীরী ভাষার তো কোনো ব্যাকরণ হয় না। তনিমা আন্টি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। খুব সাধারণ, ফরমাল একটা আলিঙ্গন। কিন্তু তাঁর দুই হাত যখন আমার পিঠে গিয়ে ঠেকল, তাঁর আঙুলগুলো আমার টি-শার্টের ওপর দিয়ে পিঠের চামড়ায় দশটা সূচের মতো চেপে বসল। এই চাপটুকু সাধারণ ছিল না। এই চাপে লেখা ছিল গত কয়েক রাতের ইতিহাস, শিমুলিয়ার সেই মাটির ঘর, আর বাথরুমের সেই উদ্দামতা। তাঁর গালের উষ্ণতা আমার গালে লাগল। তিনি আমার কানের খুব কাছে মুখ এনে, এমন এক স্বরে ফিসফিস করলেন যা শুধু আমিই শুনতে পেলাম— 'তৈরি থাকিস। আমি অপেক্ষায় রইলাম।' আমিও তাঁর পিঠে আলতো করে হাত রেখে স্বাভাবিক গলায় বললাম, 'সাবধানে যাবেন আন্টি। হ্যাপি জার্নি।' আন্টি আমাদের সবার থেকে বিদায় নিয়ে ইমিগ্রেশনের কাঁচের দরজাটার দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর সেই হাঁটার ভঙ্গি, সেই সোজা মেরুদণ্ড আর আত্মবিশ্বাসী পা ফেলা—সবকিছুই আমাকে চুম্বকের মতো টানছিল। কাঁচের দরজা পার হওয়ার ঠিক আগে তিনি একবার ঘুরে দাঁড়ালেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন। তাঁর চোখটা একবার মায়ের দিকে, আর একবার আমার দিকে স্থির হলো। তারপর তিনি ভেতরে ঢুকে গেলেন। স্বয়ংক্রিয় দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। তনিমা আন্টি আমাদের দৃষ্টিসীমা থেকে হারিয়ে গেলেন। বাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘড়ি দেখলেন। 'চলো রাশেদা, এবার ফেরা যাক। কাল সকালে আবার মিটিং আছে আমার।' মা চোখ মুছতে মুছতে বললেন, 'চল। বাসাটা কেমন খালি খালি লাগবে আজ থেকে।' আমরা সবাই মিলে পার্কিং লটের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। গাড়ির কাছে এসে আমি বাবাকে বললাম, 'বাবা, তোমরা যাও। আন্টি ইমিগ্রেশন পার হয়ে বোর্ডিং গেটে গিয়ে বসে আমাকে মেসেজ বা কল দেবেন বলেছেন। প্লেনটা স্টার্ট হওয়ার ঠিক আগে। আমি ততক্ষণ এখানেই থাকি। ওনার সাথে লাস্ট একবার কথা বলে তারপর ফিরব।' মা বললেন, 'আচ্ছা থাক। কল দিলে আমাকেও দিস, কথা বলব।' বাবা বললেন, 'তুই ফিরবি কীভাবে? গাড়ি তো আমি নিয়ে যাচ্ছি।' 'সমস্যা নেই বাবা, আমি উবার বা পাঠাও নিয়ে চলে যাব। তোমরা যাও।' বাবা, মা আর মৃন্ময় গাড়িতে উঠে বসল। বাবা গাড়ি স্টার্ট দিলেন। আমি হাত নেড়ে তাদের বিদায় জানালাম। আমাদের সাদা গাড়িটা ধীরে ধীরে এয়ারপোর্টের এক্সিট গেট দিয়ে বেরিয়ে ঢাকা শহরের জ্যামে হারিয়ে গেল। এবার আমি একা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-২ এর বাইরে বিশাল ক্যানোপির নিচে আমি দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশের কোলাহল যেন হঠাৎ করেই মিউট হয়ে গেছে। আমার কানের ভেতর শুধু একটা কথাই বাজছে— 'আমি অপেক্ষায় রইলাম।' আমি পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করলাম। একটা সিগারেট ধরিয়ে লম্বা একটা টান দিলাম। নিকোটিনের ধোঁয়াটা ফুসফুসে গিয়ে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি দিল। আমি হাঁটতে হাঁটতে এয়ারপোর্টের এক কোণায়, একটু অন্ধকার মতো জায়গায় এসে দাঁড়ালাম। রাত এখন প্রায় সাড়ে দশটা। এয়ারপোর্টের এই জায়গাটা বড্ড মায়াবী। মাথার ওপর দিয়ে মাঝে মাঝেই বিকট শব্দ করে প্লেন উড়ে যাচ্ছে। লাল-নীল সিগন্যাল লাইটগুলো অন্ধকারের বুকে দাগ কাটছে। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ওইরকমই কোনো একটা লোহার পাখিতে চড়ে তনিমা আন্টি একটু পর উড়ে যাবেন মেঘের দেশে। ঘণ্টাখানেক কেটে গেল। আমি পর পর চারটে সিগারেট শেষ করেছি। আমার মনে গত কয়েক দিনের দৃশ্যগুলো কোনো সিনেমার মন্তাজের মতো ভেসে উঠছে। ড্রয়িংরুমের সেই প্রথম দেখা, চার্জার নেওয়ার সেই ছলনা, শিমুলিয়ার সেই অন্ধকার রাত, আর আজকের এই বিদায়। মনে হচ্ছে, এক জীবনে আমি যেন শত বছরের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ফেলেছি। তনিমা আন্টি আমাকে শুধু শরীর দেননি, তিনি আমাকে একজন সম্পূর্ণ পুরুষ হিসেবে নতুন করে গড়ে তুলেছেন। রাত সাড়ে এগারোটা বাজতে চলল। হঠাৎ আমার হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে নাম ভাসছে— ‘T Auntie’. আমার হৃৎপিণ্ডটা এক লাফে গলার কাছে উঠে এল। আমি দ্রুত কল রিসিভ করলাম। 'হ্যালো?' ওপাশ থেকে প্লেনের ভেতরের সেই গোঁ গোঁ যান্ত্রিক শব্দ আর এয়ারহোস্টেসের ঘোষণা শোনা যাচ্ছে। তনিমা আন্টির গলাটা একটু ধরা, কিন্তু সেখানে এক অদ্ভুত উত্তেজনা। 'তন্ময়? শুনতে পাচ্ছিস?' 'হ্যাঁ তনিমা। শুনতে পাচ্ছি। প্লেনে উঠেছ?' 'হুঁ। সিটবেল্ট বেঁধে বসে আছি। আর পাঁচ মিনিট পর ফোন অফ করতে বলবে।' আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, 'চারপাশটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে তনিমা। মনে হচ্ছে আমার ভেতর থেকে কেউ একটা বড় অংশ কেটে নিয়ে গেছে।' ফোনের ওপাশে তনিমা আন্টি একটু হাসলেন। সেই হাসিতে কান্নার আভাস ছিল। 'পাগল ছেলে! খালি লাগবে কেন? তোর গিফটটা তো আমার কোলের ওপর রাখা ব্যাগে। সিকিউরিটি চেকিংয়ের সময় আমি ভয় পাচ্ছিলাম, যদি ওরা খুলে দেখতে চায়! স্ক্যানারে যখন ব্যাগটা পার হচ্ছিল, আমার বুকটা ধড়ফড় করছিল। আমি জানি তুই কী শয়তানি করেছিস ওই বাক্সে।' আমি হেসে ফেললাম। 'খুলেছ নাকি?' 'পাগল হয়েছিস? এখানে হাজারটা মানুষের সামনে ওই জিনিস খোলা যায়? আমি প্যাকেটটার শেপ আর তোর সেই শয়তানি হাসি দেখেই বুঝে গেছি ভেতরে কী আছে। সিডনিতে গিয়ে, বাথটাবে শুয়ে আমি তোর ওই গিফটটা খুলব। আর তখন তুই বুঝবি আমি কী করতে পারি।' আমি বললাম, 'আমি সেই দিনের অপেক্ষাতেই রইলাম।' তনিমা আন্টি একটা লম্বা শ্বাস নিলেন। 'শোন তন্ময়, কাল সকাল থেকেই তোর পেপারসের কাজ শুরু করবি। আমি গিয়েই ড. হেন্ডারসনের সাথে বসব। ছয়টা মাস। চোখের পলকে কেটে যাবে। আমি তোকে আমার কাছে নিয়ে আসবই।' 'আমিও সেই চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখব না তনিমা।' ওপাশ থেকে এয়ারহোস্টেসের গলা শোনা গেল— 'Please switch off your mobile phones...' তনিমা আন্টি ফিসফিস করে বললেন, 'ফ্লাইট স্টার্ট নিচ্ছে। আমাকে ফোন রাখতে হবে রে।' আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুমড়ে মুচড়ে উঠল। 'সাবধানে যেও তনিমা।' 'হুম। আই লাভ ইউ, সোনা।' কথাটা বলেই তনিমা আন্টি ফোনের রিসিভারে তাঁর ঠোঁট চেপে ধরলেন। একটা দীর্ঘ, সিক্ত, আর গভীর চুম্বনের শব্দ আমার কানের পর্দা দিয়ে সরাসরি আমার মস্তিষ্কে গিয়ে পৌঁছাল। আমিও ফোনটা মুখের কাছে নিয়ে আমার সবটুকু অনুভূতি ঢেলে একটা পাল্টা চুমু দিলাম। 'আই লাভ ইউ টু, তনিমা।' লাইনটা কেটে গেল। 'টুট... টুট... টুট...' ফোনটা হাত থেকে নামিয়ে আমি আকাশের দিকে তাকালাম। রানওয়ে থেকে একটা বিশাল প্লেন বিকট গর্জন করে রাতের আকাশ চিরে ওপরের দিকে উঠে গেল। আমি জানি না ওই প্লেনেই তনিমা আন্টি আছেন কি না, কিন্তু আমি মনে মনে ওই প্লেনটাকেই বিদায় জানালাম। আমি আরও কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইলাম। রাত তখন বারোটা ছুঁই ছুঁই। এয়ারপোর্টের বাইরের ভিড়টা এখন একটু কমে এসেছে। আমি উবার অ্যাপটা ওপেন করে একটা 'উবার মোটো' ডাকলাম। একা যাওয়ার জন্য বাইকই ভালো। এই রাতে খোলা বাতাসে বাইকে করে ফেরার একটা আলাদা আনন্দ আছে। মিনিট দশেকের মধ্যে একটা বাইক এসে আমার সামনে দাঁড়াল। রাইডার একটা হেলমেট এগিয়ে দিল আমার দিকে। আমি হেলমেটটা পরে বাইকের পেছনে উঠে বসলাম। 'মামা, ধানমন্ডি যাবেন তো?' রাইডার জিজ্ঞেস করল। 'হ্যাঁ মামা, চলেন।' বাইক স্টার্ট দিল। এয়ারপোর্টের বাউন্ডারি পার হয়ে আমরা যখন এয়ারপোর্ট রোডের ফ্লাইওভারে উঠলাম, তখন রাতের ঢাকা শহরটাকে একটা ঘুমন্ত দৈত্যের মতো মনে হলো। ফাঁকা রাস্তায় বাইকটা বেশ গতিতেই ছুটছ। বাতাসে একটা হিমেল ভাব আছে। ঠান্ডা বাতাস আমার টি-শার্ট ভেদ করে বুকে এসে লাগছে। হেলমেটের ভাইজরটা খোলা রেখেছি আমি। বাতাস এসে আমার চোখ-মুখ ভিজিয়ে দিচ্ছে। এই বাতাসটা আমার খুব চেনা। আমি দুই হাত দিয়ে বাইকের পেছনের গ্রিলটা শক্ত করে ধরে রাখলাম। আজ রাতে আমি একা একটা ফাঁকা ঘরে ঘুমাব। আমার বিছানায় আজ আর কোনো তনিমা আন্টি থাকবেন না, কোনো চার্জারের বাহানা থাকবে না। কাল সকাল থেকে শুরু হবে আমার নতুন যুদ্ধ—পাসপোর্ট অফিস, ভার্সিটির সার্টিফিকেট, আর আমেরিকার স্বপ্ন। ছয় মাস। একশ আশি দিন। বাইকটা বনানীর সিগন্যাল পার হয়ে দ্রুতবেগে এগোতে লাগল। আমার চোখের সামনে তখন কেবল একটাই ছবি—সিডনির কোনো এক আলোকিত ব্যালকনি, আর সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকা এক নারী। (সমাপ্ত)
Parent