মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ১৭

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-72560-post-6162501.html#pid6162501

🕰️ Posted on Sat Mar 14 2026 by ✍️ RockyKabir (Profile)

🏷️ Tags:
📖 1424 words / 6 min read

Parent
দ্বাদশ অধ্যায় দুপুরের দিকে কলেজের স্টাফরুমটা বেশ ফাঁকা থাকে। বেশিরভাগ ফ্যাকাল্টিদের এই সময়টায় ক্লাস থাকে আর নাহলে তারা ক্যান্টিনে লাঞ্চ করতে যান। বিদিশা নিজের ডেস্কে বসে গত ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্টগুলো দেখছিলেন। আজ তিনি একটা হালকা পিচ রঙের তসর সিল্ক পরেছেন। জানলার কাঁচ ভেদ করে আসা বিকেলের নরম রোদ তার শাড়ির ওপর তিরতির করে কাঁপছে।কাঁধ ছাপিয়ে পিঠের ওপর দিয়ে একরাশ রেশমি কালো চুল ছড়িয়ে আছে।  গত কয়েকদিনের কলেজ লাইফ তাকে যেন আরও সতেজ, আরও মোহময়ী করে তুলেছে। তার মুখে একটা অদ্ভুত, মায়াবী স্নিগ্ধতা। চোখের নিচে বিষাদের ঘন কালিটা আগের চেয়ে অনেক হালকা হয়ে এসেছে। "আপনি কি সারাদিন এই অঙ্কের খাতাগুলোর সাথেই রোমান্স করবেন বলে ঠিক করেছেন, মিস গাঙ্গুলি?" বিদিশা মুখ তুলে তাকালেন। তার ডেস্কের সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন রাহুল বোস। তার হাতে দুটো কফির মগ। একটা থেকে ধোঁয়া উঠছে। বিদিশার ঠোঁটের কোণে একটা হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। গত এক সপ্তাহে কলেজের পরিবেশের সাথে তিনি নিজেকে বেশ মানিয়ে নিয়েছেন আর এই মানিয়ে নেওয়ার পেছনে রাহুল বোসের একটা বড় ভূমিকা আছে। মানুষটি অত্যন্ত মার্জিত, বুদ্ধিমান এবং তার কথায় একটা সহজাত রসবোধ আছে, যা বিদিশার এই একঘেয়ে, বিষণ্ণ জীবনে একটা টাটকা বাতাসের মতো কাজ করে। "রোমান্স করার জন্য অঙ্কের সমীকরণের চেয়ে বিশ্বস্ত আর কী হতে পারে, মিস্টার বোস? ওরা অন্তত হিসেব মেলাতে কখনো ভুল করে না", বিদিশা খাতাটা বন্ধ করে পেনের ঢাকনাটা আটকাতে আটকাতে বললেন। রাহুল বোস একটা কফির মগ বিদিশার দিকে এগিয়ে দিলেন। বিদিশা সেটা নিয়ে তার সামনে টেবিলের উপর রাখলেন। "তারপর বলুন, আপনার তো গত সপ্তাহে চার্লস ডিকেন্সের ওপর একটা পেপার প্রেজেন্ট করার কথা ছিল? কেমন হলো সেটা?" বিদিশা অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ গলায় জিজ্ঞেস করলেন।  তার কথা বলার ভঙ্গিটা খুব নরম, কিন্তু তাতে একটা বুদ্ধিমত্তার ধার আছে। রাহুল হাসলেন।  "হলো একরকম। তবে সত্যি বলতে কী, লিটারেচারের টিচারদের সমস্যা হলো আমরা সবসময় রূপকের আড়ালে বাঁচতে চাই। কিন্তু আপনাদের ম্যাথমেটিক্স অনেক বেশি সৎ। ওখানে দুই আর দুইয়ে চার হয়, কোন গ্রে এরিয়া নেই।" "গ্রে এরিয়া মানুষের জীবনে থাকে, মিস্টার বোস। অঙ্কে নয়", বিদিশা কফির মগে চুমুক দিয়ে একটু অন্যমনস্কভাবে বললেন। তার চোখের সামনে একবার অরুণের নির্লিপ্ত মুখটা আর তারপরই অয়নের সেই রাগে লাল হওয়া মুখটা ভেসে উঠল। অয়ন কথা রেখেছে, এর মধ্যে ক্লাসের বাইরে আর তাদের কথা হয়নি। রাহুল কফির মগটা বিদিশার টেবিলে নামিয়ে রেখে সামনের চেয়ারটায় বসলেন, "টাচড! আপনাদের ম্যাথস ডিপার্টমেন্টকে তর্ক করে হারানো মুশকিল। তবে, মাঝে মাঝে হিসেবের বাইরে গিয়ে একটু আনপ্রেডিক্টেবল হওয়াটাও কিন্তু জীবনের একটা অংশ।" বিদিশা কফির মগটা হাতে তুলে নিলেন। কফির উষ্ণতা তার হাতের তালু হয়ে শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ল। তিনি রাহুলের চোখের দিকে তাকালেন। সেই চোখে একটা স্পষ্ট মুগ্ধতা, একটা উষ্ণ আমন্ত্রণ, কিন্তু কোনো সস্তা লোলুপতা নেই। একজন পরিণত পুরুষের এই শালীন অ্যাটেনশন বিদিশার ভেতরের নারীসত্তাকে একটা তৃপ্তি দিচ্ছিল। বহুবছর ধরে শীতল দাম্পত্য জীবন কাটানোর পরে এই অনুভূতি বিদিশার মন্দ লাগছিল না।  রাহুল বিদিশার চোখের ওই ক্ষণস্থায়ী শূন্যতাটা লক্ষ্য করছিলেন। তিনি একটু ঝুঁকে এসে নিচু গলায় বললেন, "অঙ্ক হয়তো সৎ, কিন্তু, যারা অঙ্ক কষে তারা সবসময় সব হিসেব মেলাতে পারে না। আপনি যদি কখনো মনে করেন যে কোনো ইকুয়েশন মেলাতে গিয়ে ক্লান্ত লাগছে, ইউ ক্যান শেয়ার উইথ মি। উই আর ফ্রেন্ডস, রাইট?" বিদিশা একটু চমকে উঠলেন, তারপর খুব মিষ্টি করে হাসলেন। এই মানুষটার সঙ্গ তার ভালো লাগে। এই প্রথম কোনো পুরুষের সাথে কথা বলে তার মনে হচ্ছে যে তার মনেরও একটা দাম আছে। "থ্যাংক ইউ, মিস্টার বোস" বিদিশা তার ভেতরের আবেগটা দমানোর যথাসম্ভব চেষ্টা করলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে স্টাফরুমের দরজাটা ঠেলে একজন ভেতরে ঢুকল। বিক্রম মালহোত্রা। তার গা থেকে ভেসে আসা ফ্রেঞ্চ কোলনের দামি সুবাসটা মুহূর্তের মধ্যে গোটা স্টাফরুমে ছড়িয়ে পড়ে কফির গন্ধটাকে ঢেকে দিল। বিক্রম স্টাফরুমে ঢুকেই সরাসরি চোখ রাখল বিদিশার ওপর। তার চোখের দৃষ্টিতে আজকেও কোনো উগ্র লোলুপতা নেই। সে খুব শান্ত পায়ে হেঁটে এসে বিদিশার ডেস্কের সামনে দাঁড়াল। রাহুল বোস একটু বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকালেন। "ইয়েস, বিক্রম? তোমার তো এখন লিটারেচার ক্লাস থাকার কথা।" বিক্রম রাহুলের দিকে তাকিয়ে একটা অত্যন্ত ভদ্র, নিখুঁত হাসি দিল। "সরি স্যার। আমি আসলে মিস গাঙ্গুলির কাছে এসেছিলাম।" বিদিশা কফির মগটা নামিয়ে রেখে একটু অবাক হয়ে তাকালেন। যদিও তিনি আন্দাজ করতে পারছেন কেন বিক্রম এসেছে। গত সপ্তাহে লাইব্রেরী যাবার পথে বিদিশার ওর সাথে দেখা হয়েছিল। কিন্তু, তারপর বিক্রম আর যোগাযোগ করেনি। ব্যাপারটা বিদিশার মাথা থেকে একরকম বেরিয়েই গেছিল। আজ বোধহয় ও ফেস্ট সংক্রান্ত বিষয়ে কোন সাহায্য চাইতে এসেছে। "বল।"  বিক্রম বিদিশার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার গলার স্বরটা ভরাট এবং অত্যন্ত মোলায়েম। " ম্যাম। আজকে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কমিটির মিটিংয়ে, কলেজে সামনের মাসে যে অ্যানুয়াল কালচারাল-ফেস্ট হচ্ছে, তার ফাইন্যান্স এবং বাজেট কমিটির হেড হিসেবে প্রিন্সিপাল স্যার আপনার নাম রেকমেন্ড করেছেন। আমি সেই কমিটির ভলান্টিয়ারিং হেড। তাই আপনার পারমিশন নিতে এসেছিলাম, কখন আপনি ফ্রি থাকবেন একটু ডিটেইলসে কথা বলার জন্য।" বিদিশা বেশ অবাক হলেন। প্রিন্সিপাল এত গুরুত্বপূর্ণ খবর বিক্রমকে স্টাফরুমে পাঠিয়ে জানাচ্ছেন কেন ? যদিও বিক্রম কথাগুলো এমনভাবে গুছিয়ে, এত সম্মান দিয়ে বলল যে বিদিশা ইমপ্রেসড না হয়ে পারলেন না। "ওহ, আই সি। প্রিন্সিপাল স্যার আমাকে এখনো কিছু জানাননি। ঠিক আছে, তুমি কাল লাঞ্চ ব্রেকের পর আমার কেবিনে আসতে পারো। আমি এর মধ্যে ওনার সাথে কথা বলে নেব", বিদিশা প্রফেশনাল গলায় উত্তর দিলেন। "থ্যাংক ইউ সো মাচ, ম্যাম", বিক্রম একটু মাথা নুইয়ে বলল। তারপর সে যাওয়ার জন্য ঘুরল, কিন্তু ঠিক এক মুহূর্তের জন্য সে আবার বিদিশার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে একটা খুব সূক্ষ্ম, প্রায় অদৃশ্য একটা হাসি খেলে গেল। বিদিশা আর রাহুল কেউই সেটা লক্ষ্য করলেন না। "বাই দ্য ওয়ে ম্যাম," বিক্রমের গলার স্বরটা এবার আরেকটু নিচু, একটু বেশি পার্সোনাল শোনাল। "ওই পিচ রঙের শাড়িতে আপনাকে সত্যিই খুব... গ্রেসফুল লাগছে। হ্যাভ আ গুড ডে।" কথাটা বলেই বিক্রম আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে গেল। বিদিশা কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে রইলেন। একটা ছাত্র তার শাড়ির প্রশংসা করছে! এটা তো কলেজের ডেকোরামের বাইরে। কিন্তু, বিক্রম কথাটা এমন সরল এবং ভদ্রভাবে বলেছে যে এটাকে ঠিক অভদ্রতা বলা যায় না। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে ডেস্কের উপরে পড়ে থাকা অ্যাসাইনমেন্টগুলোর দিকে মন দিলেন। রাহুল বোস চশমাটা খুলে পরিষ্কার করতে করতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।  "মিস গাঙ্গুলি, বিক্রম মালহোত্রা ছেলেটা কিন্তু খুব একটা সুবিধার নয়। বি কেয়ারফুল।" বিদিশা হাসলেন। "মিস্টার বোস, একটা একুশ বছরের কলেজ বয় আমাকে কী এমন বিপদে ফেলবে? ডোন্ট ওয়ারি।" "এনি ওয়ে।" রাহুল একটু ঝুঁকে এসে বললেন। "সামনের মাসে কালচারাল ফেস্ট শুরু হলে পুরো ক্যাম্পাস তখন একটা অন্য রূপ নেবে। আশা করি তখন আপনাকে এই অঙ্কের খাতাগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে দেখব না।" "কালচারাল ফেস্টে টিচাররাও অংশ নেয় ?" বিদিশার ভুরু সামান্য কুঁচকে গেল। "হ্যাঁ। স্টুডেন্টদের সাথে ফ্যাকাল্টিরাও সমানভাবে এনজয় করে। আমি তো কালচারাল কমিটির দায়িত্বে আছি। শুধু ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে তো আর জীবন কাটে না, তাই না?" রাহুল চোখ টিপলেন। বিদিশা কফিতে চুমুক দিয়ে হাসলেন। ফেস্ট, কালচারাল প্রোগ্রাম, ভিড়ভাট্টা - এসব থেকে তিনি বহু বছর দূরে। কিন্তু এখন, এই নতুন জীবনে, হয়তো এই বদলগুলোরই তার প্রয়োজন ছিল। কয়েক ঘণ্টা পর। অয়ন ফুটবল মাঠ থেকে ফিরছিল। তার সারা গায়ে কাদা আর ঘাম। কাঁধে কিটব্যাগটা ঝোলানো। শরীরটা আজকে ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে, কিন্তু মাথার ভেতরের আগুনটা এই হাড়ভাঙা খাটুনির পর একটু হলেও শান্ত হয়েছে। সে মেইন বিল্ডিংয়ের পাশের করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। করিডোরের শেষ প্রান্তে, একটা থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে বিক্রম মালহোত্রা। তার সাথে তার গ্যাংয়ের আরও দুটো ছেলে। বিক্রমের হাতে একটা সিগারেট, সে সেটাতে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়াটা ওপরের দিকে ছাড়ল। অয়ন একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে গেল। এখান থেকে বিক্রম ওকে দেখতে না পেলেও, অয়ন খুব পরিষ্কারভাবে বিক্রমের কথাগুলো শুনতে পাচ্ছে। "ভাই, তোরা শুধু দেখে যা," বিক্রম হাসতে হাসতে তার বন্ধুদের বলছিল।  "মেয়েদের পটানোর ফার্স্ট রুল হলো, ওদের বুঝতে দেওয়া যাবে না যে তুই ওদের পটাতে চাইছিস। স্পেশালি এই ধরনের মহিলাদের ক্ষেত্রে। এদের কাছে একটু ভদ্র, একটু 'গুড বয়' ইমেজ নিয়ে যেতে হয়। আজ জাস্ট সুতোটা ছাড়লাম।" "কিন্তু ভাই, মালটা তো হেভি কড়ক! প্রিন্সিপাল পর্যন্ত ওই মিস গাঙ্গুলির দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে" একটা বন্ধু বলল। বিক্রম সিগারেটের ছাইটা ফেলে একটা কুটিল হাসি দিল।  "আরে মালটা কড়ক বলেই তো মজা! আমি বাজেট কমিটির বাহানায় ওর কেবিনে যখন খুশি ঢোকার পারমিশন পেয়ে গেছি। আগামী দু-সপ্তাহ ওর সাথে শুধু ইন্টেলেকচুয়াল কথা বলব। দেখবি, এক মাসের মধ্যে ওর শাড়ি আমি খুলছি কি না।" অয়নের মনে হলো তার কানের পর্দাগুলো এক্ষুনি ফেটে যাবে। তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হল, রাগে মাথা দপদপ করতে লাগল, হাতের মুঠো এতোটাই শক্ত হয়ে গেল যে নখগুলো হাতের তালুতে বসে গিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো।  তার চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা যেন লাল হয়ে গেল। তার মা... তার স্নিগ্ধ, পবিত্র মা... আজ এই লম্পট ছেলেগুলোর কাছে স্রেফ একটা মাংসপিণ্ড? একটা চ্যালেঞ্জ? অয়নের ইচ্ছে করল এখনই ছুটে গিয়ে বিক্রমের মুখটা ইঁট দিয়ে থেঁতলে দিতে। কিন্তু তার পা দুটো মাটিতে গেঁথে বসে রইল। এখন কিছু করা ঠিক হবে না ! সে নিজের কিটব্যাগটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, দাঁতে দাঁত চেপে ওখান থেকে আস্তে আস্তে সরে গিয়ে, হস্টেলের দিকের রাস্তা ধরল। তার বুকের ভেতর কালবৈশাখীর পূর্বাভাস। বিক্রম মালহোত্রা জানে না সে কার গায়ে হাত দিতে যাচ্ছে। ইতালিতে বনগানি যে ভুল করেছিল, এখানে বিক্রমও সেই একই ভুল করছে। অয়ন ঠিক করে নিল সে ধৈর্য্য ধরে সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষা করবে। ঠিক যেমন একজন শিকারী ওত পেতে বসে থাকে। যখন সঠিক সময় আসবে, তখন সে ছোবল মারবে। বিক্রমের পরিণতি বনগানির চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর হতে চলেছে।
Parent