রাহুলের বন্ধু রোহন ও তার মা - অধ্যায় ৪৯
গাড়ির ভিতরের সেই চাপা, গরম নীরবতা এখনও ভাঙেনি। কেউ কথা বলছিল না। শুধু এসির হালকা শব্দ আর রাস্তার দু’পাশের অন্ধকার জঙ্গলের ছায়া।
সুজাতা জানালায় মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে ছিল। তার শ্বাস একটু ভারী। রিনা আন্টির হাত এখনও তার উরুর উপর ছিল, আঙুলগুলো আলতো করে নড়ছিল। রোহন আর রাহুল সামনে চুপ করে বসে ছিল।
হঠাৎ —
থক্… থক্… থক্…
গাড়িটা একটু কেঁপে উঠল। রাহুল ভুরু কুঁচকে স্টিয়ারিং ধরে আরও শক্ত করে চেপে ধরল।
“কী হলো?” রোহন জিজ্ঞাসা করল।
রাহুল বলল, “মনে হয় টায়ারে সমস্যা হয়েছে…”
গাড়ির গতি কমে আসছিল। রাহুল গাড়িটা ধীরে ধীরে রাস্তার একপাশে থামাল। চারপাশে গভীর অন্ধকার। কোনো আলো নেই। কোনো গাড়ি নেই। শুধু দূরের জঙ্গল থেকে অদ্ভুত একটা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আসছে।
রাহুল গাড়ি থেকে নেমে পিছনের টায়ারটা দেখতে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর তার গলা শোনা গেল,
“…পাংচার হয়ে গেছে।”
সুজাতার শরীর শক্ত হয়ে গেল। সে সোজা হয়ে বসল।
“এখানে? এত রাতে?”
রিনা আন্টি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল, “কোনো দোকান বা গ্যারেজ আছে নাকি কাছে?”
রাহুল ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে চারপাশে দেখল। রাস্তাটা একদম খালি। দু’পাশে ঘন জঙ্গল। কোনো আলোর চিহ্ন নেই।
রোহনও নেমে এল। “স্পেয়ার টায়ার আছে তো?”
রাহুল মাথা নেড়ে বলল, “আছে… কিন্তু এই অন্ধকারে টায়ার চেঞ্জ করা… অনেক সময় লাগবে।”
ঠিক তখনই দূরের জঙ্গল থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে এল।
কড়াৎ…
যেন কেউ শুকনো ডাল ভেঙেছে।
চারজনই একসাথে সেই দিকে তাকাল। কিন্তু অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
সুজাতা গাড়ির ভিতর থেকে বলল, “রাহুল… তাড়াতাড়ি কর। আমার ভালো লাগছে না এখানে।”
রিনা আন্টি তার হাত চেপে ধরল। তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে।
রাহুল আর রোহন টুলবক্স বের করে টায়ার চেঞ্জ করার প্রস্তুতি নিতে লাগল। কিন্তু রাস্তাটা একদম নির্জন। মাঝে মাঝে দূর থেকে কুকুরের ডাক আসছে, কিন্তু সেটাও থেমে গেল।
হঠাৎ রিনা আন্টি ফিসফিস করে বলল,
“দেখো… ওই দিকে… কিছু একটা নড়ছে না?”
সবাই সেই দিকে তাকাল। জঙ্গলের কিনারায় অন্ধকারে কী যেন একটা ছায়া সরে গেল। খুব ধীরে।
রোহন গলা শুকিয়ে বলল, “মনে হয় হরিণ বা কিছু…”
কিন্তু তার গলায় নিজের কথাটাও বিশ্বাস হচ্ছিল না।
সুজাতা গাড়ির দরজা আঁকড়ে ধরে বলল,
“তোরা তাড়াতাড়ি কর… আমি এখানে একদম একা থাকতে চাই না।”
রাহুল টায়ার খুলতে শুরু করল। কিন্তু অন্ধকারে কাজ করতে খুব অসুবিধা হচ্ছিল। তার হাত কাঁপছিল।
আবার সেই শব্দ।
কড়াৎ… কড়াৎ…
এবার আরও কাছে।
চারজনেরই শরীর শক্ত হয়ে গেল। রিনা আন্টি সুজাতার হাত শক্ত করে চেপে ধরল।
সুজাতা ফিসফিস করে বলল,
“রোহন… গাড়ির ভিতরে এসো… প্লিজ…”