অপেক্ষার তেরো বছর... - অধ্যায় ৩
লেকের পাড়ে অন্ধকার যতোই ঘন হচ্ছিল, আমার সাহসের সীমা ততোই বাড়ছিল। আমি যখন আম্মুর খুব কাছে ঘেঁষে বসলাম এবং তার
শাড়ির ওপর দিয়ে কোমরের সেই ভরাট অংশে হাত রাখার চেষ্টা করলাম, ঠিক তখনই আম্মু বিদ্যুৎবেগে আমার হাতটা সরিয়ে দিলেন।
তার মুখে সেই চিরচেনা কঠোর এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ ভাবটা ফিরে এল।
মা: "রিহাদ! নিজেকে সামলা। তুই সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিস। আমি তোকে সুযোগ দিয়েছি আমার একাকীত্ব দূর করার জন্য, তার মানে এই
নয় যে তুই আমার সাথে অসভ্যতা করবি।"
মায়ের এই হঠাৎ শাসনে আমি একটু থতমত খেয়ে গেলাম। তার চোখের সেই শীতল চাহনি বলে দিচ্ছিল যে, তিনি যতোই একাকী হোননা
কেন, নিজের সম্মান এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি তার দায়বদ্ধতা তিনি ভুলে যাননি।
আমি: "সরি আম্মু, আমি আসলে আবেগের বশে..."
মা: (গম্ভীর স্বরে) "আবেগ আর অসভ্যতা এক জিনিস নয়। মনে রাখিস, আমি তোর মা। কাল রাত থেকে আমি তোকে অনেক প্রশ্রয়
দিয়েছি, কারণ আমি চেয়েছিলাম তুই আমার বন্ধু হ। কিন্তু তুই যদি আমার এই ভরাট শরীর বা রূপ নিয়ে ওভাবে নোংরা চিন্তা করিস, তবে
আমি আবার আগের মতো কঠোর হয়ে যাব।"
আমি মাথা নিচু করে রইলাম। তবে মনে মনে আমি জানতাম, মা যতোই কঠোর হোন না কেন, তার শরীরটা কিন্তু আমার স্পর্শে কেঁপে
উঠেছিল। আমরা কিছুক্ষণ নিরব হয়ে বসে রইলাম। লেকের বাতাসটা এখন বেশ ঠান্ডা লাগছে।
মা: "চল, অনেক হয়েছে। বাসায় ফিরতে হবে। এশার নামাজের সময় হয়ে যাচ্ছে।"
আমরা রিকশা নিলাম। পুরোটা পথ আম্মু আমার থেকে একটু দূরত্ব বজায় রেখে বসলেন। তার সেই ৩৮-৩৬-৪০ এর অবয়বটা রিকশার
ঝাঁকুনিতে বারবার আমার চোখে পড়লেও, আমি আর হাত দেওয়ার সাহস পেলাম না।
তবে আমি লক্ষ্য করলাম, আম্মু বারবার তার ওড়না দিয়ে নিজেকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করছেন, যেন আমার এই তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি থেকে তিনি
নিজেকে বাঁচাতে চাইছেন।
বাসায় ফেরার পর আম্মু সোজা তার রুমে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় শুধু বলে গেলেন— মা: "ফ্রেশ হয়ে নে। খাবার টেবিলে আয়। আর
মনে রাখিস, আজকে লেকের পাড়ে যা হয়েছে, সেটা যেন আর কখনো না ঘটে।"
আমি ড্রয়িং রুমে বসে রইলাম। আমি জানি মা এখন ইবাদতে বসবেন, নিজেকে পবিত্র করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু আমার কানে তখনো
লেকের পাড়ে তার সেই ঘন নিশ্বাসের শব্দ বাজছিল। মা যতোই কঠোর হোন না কেন, আমি জানি তার অবচেতনে আমি একটা দাগ
কাটতে পেরেছি।
আমি কিচেনে গেলাম এক গ্লাস জল খেতে। দেখলাম আম্মু সেখানে নেই, কিন্তু তার সেই গজরার শুকিয়ে যাওয়া ঘ্রাণটা এখনো রয়ে
গেছে।
রাতের খাবার শেষ করে আমি আর আম্মু ড্রয়িংরুমে এসে বসলাম। আম্মু দুই মগ আদা চা বানিয়ে আনলেন। বাইরে বৃষ্টির শব্দ আর ঘরের ভেতরের এই নিস্তব্ধতা পরিবেশটাকে একটু বেশিই ভারী করে তুলছিল।
আম্মু তার চিরচেনা সেই গাম্ভীর্য নিয়ে সোফার এক কোণে বসে চায়ে চুমুক দিচ্ছিলেন।
তার *টা এখন নেই, চুলগুলো পিঠের ওপর আলগা করে ছড়ানো। সুতির সাদা কামিজের ওপর দিয়ে তার শরীরের সেই ভরাট বাঁকগুলো আবছা আলোয় খুব রহস্যময় লাগছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে আম্মুর ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে 'shamim' নামটা ভেসে উঠতেই রুমের ভেতরকার আলগা ঘনিষ্ঠতা এক নিমেষে
কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
বাবা ফোন করেছেন।
আম্মু ফোনটা রিসিভ করে লাউডস্পিকারে দিলেন।
মা: (গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে) "হ্যাঁ, বলো। কেমন আছো?"
বাবা: "আমি ভালো আছি। তোমরা কেমন আছো? রিহাদ পাশে আছে?"
বাবার কণ্ঠস্বর ওপাশ থেকে বেশ ক্লান্ত শোনালো। ১৩ বছর ধরে তিনি দূর প্রবাসে আমাদের জন্য খাটছেন। তার সেই শুকনো খসখসে
গলার আওয়াজ শুনে আম্মুর দিকে তাকালাম। আম্মুর চেহারা এখন পাথরের মতো শক্ত।
মা: "হ্যাঁ, রিহাদ পাশেই আছে। আমরা চা খাচ্ছি। তোমার কাজ কেমন চলছে?"
বাবা: "কাজ তো চলছেই। এবার হয়তো সামনের ছুটিতে আসা হবে না, ওভারটাইম করতে হবে। তোমরা সাবধানে থেকো। রিহাদকে বলো পড়ালেখায় মন দিতে।"
বাবার এই যান্ত্রিক কথাগুলো শুনে আমার কেন জানি খুব বিরক্ত লাগল। তিনি কি একবারও বুঝতে পারছেন না যে তার স্ত্রীর এই
৩৮-৩৬-৪০ এর টইটম্বুর শরীর আর এই মায়াবী মনটা দিনের পর দিন কেবল অবহেলার শিকার হচ্ছে?
আম্মু ফোনটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন।
আমি: "হ্যালো বাবা, আমি ভালো আছি। তোমার নিজের শরীরের দিকে খেয়াল রেখো।"
বাবার সাথে কিছুক্ষণ সাধারণ কথাবার্তা বলে আমি ফোনটা আবার আম্মুর হাতে দিলাম। ওপাশ থেকে বাবা যখন আম্মুকে ঘরোয়া কিছু
খরচের কথা বলছিলেন, আমি তখন আম্মুর দিকে অপলক তাকিয়ে ছিলাম। বাবার প্রতি তার যে এক ধরণের অবদমিত ক্ষোভ আর
শূন্যতা আছে, তা তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।
বাবা যখন ফোনটা রাখলেন, পুরো ঘর আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আম্মু ফোনটা সোফার ওপর রাখলেন এবং লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
তার দুচোখ তখন টলমল করছিল।
মা: "দেখলি তো? ১৩ বছর ধরে একই কথা। কাজ, টাকা আর দায়িত্ব। মানুষের যে একটা মন আছে, তার যে শরীর আছে—এসব তোর
বাবার মাথায় কোনোদিনও ঢুকল না।"
আমি সাহস করে আম্মুর পাশে গিয়ে বসলাম। তার কাঁধের ওপর আলতো করে হাত রাখলাম। এবার আর তিনি আমাকে সরিয়ে দিলেন না।
হয়তো বাবার সাথে ওই নিস্প্রাণ কথাবার্তা তাকে ভেতর থেকে আরও বেশি একা করে দিয়েছে।
আমি: "আম্মু, বাবার তো বয়স হয়েছে। তিনি হয়তো এসব আর বোঝেন না। কিন্তু আমি তো আছি।
আমি তোমার সব অভাব পূরণ করার চেষ্টা করব।"
আমি যখন তার চুলের ওপর হাত বোলাচ্ছিলাম, আম্মু মাথা নিচু করে আমার কাঁধের ওপর মাথা রাখলেন। তার সেই তপ্ত দীর্ঘশ্বাস আমার
গলায় এসে লাগছিল।
মা: "তুই বড় অদ্ভুত ছেলে রিহাদ। মাঝে মাঝে তোকে খুব শাসন করতে ইচ্ছে করে, আবার মাঝে মাঝে মনে হয় তুই না থাকলে আমি
পাগল হয়ে যেতাম।"
আমি বুঝলাম, বাবার সাথে এই ফোন কলটা আম্মুকে মানসিকভাবে আরও ভেঙে দিয়েছে এবং আমার জন্য এক নতুন সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
আমি তার আরও কাছে ঘেঁষে বসলাম।
বাবার সাথে কথা বলার পর আম্মুর মুখটা একদম কালো হয়ে গেল। তিনি শূন্য মগটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকলেন। আমি
বুঝলাম, এই চার দেয়ালের ভেতর তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
আমি: "আম্মু, চলো ছাদে যাই। আজ বাতাসটা খুব সুন্দর, তোমার মনটা ভালো হয়ে যাবে।"
আম্মু প্রথমে একটু অমত করলেন, "এত রাতে ছাদে যাবি? লোকে কী বলবে?" কিন্তু আমি যখন তার হাতটা ধরে একটু জোর করলাম,
তখন তিনি আর না বলতে পারলেন না। তিনি তার পাতলা সুতির ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে আমার সাথে ছাদে এলেন।
ছাদের নির্জনতায় সেই দৃশ্য
আগারগাঁওয়ের রাতের আকাশটা আজ বেশ পরিষ্কার। দূরে সিটির আলোগুলো চিকচিক করছে, আর ছাদে বইছে এলোমেলো ঠান্ডা বাতাস।
আম্মু ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়ালেন। বাতাসের ঝাপটায় তার কামিজটা শরীরের সাথে লেপ্টে যাচ্ছিল, যাতে তার সেই ৩৮-৩৬-৪০ এর
ভরাট শরীরের প্রতিটি বাঁক নক্ষত্রের আলোয় এক মোহনীয় রূপ নিচ্ছিল।
আমি তার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কোনো কথা না বলে আমরা দুজনেই কিছুক্ষণ শহরের নিস্তব্ধতা উপভোগ করলাম।
মা: (নিচু স্বরে) "জানি না রিহাদ, তোর বাবার কপালে কী আছে। আর আমার কপালেই বা কী ছিল। এই খোলা আকাশটার দিকে তাকালে
মনে হয়, মানুষটা কত একা।"
আমি আরও এক পা এগিয়ে তার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়ালাম। এবার আর তিনি সরে গেলেন না। আমি: "বাবা একা নন আম্মু, বাবা একা
থাকতে ভালোবাসেন। কিন্তু তুমি একা নও। এই যে আকাশ দেখছো, এই যে চাঁদ—সবই তো তোমার মতো সুন্দরীদের জন্য। বাবার
অবহেলা দিয়ে নিজের জীবনটাকে বিচার করো না।"
আমি সাহস করে আম্মুর কাঁধের ওপর আমার চিবুক রাখলাম। তার চুলের সেই মৃদু ঘ্রাণ আর বাতাসের শীতলতা মিলে এক অদ্ভুত
আবেশ তৈরি করল।
আমি: "জানো আম্মু, এই ছাদে দাঁড়িয়ে তোমাকে দেখলে মনে হয় তুমি কোনো অপার্থিব মানবী। বাবার ওই যান্ত্রিক জীবনের চেয়ে এই যে
আমাদের সময় কাটানো, এটাই কি বেশি শান্তির নয়?"
মা একটু হাসলেন, তবে সেই হাসিতে বিষাদ ছিল। তিনি ঘুরে আমার দিকে তাকালেন। চাঁদের আলোয় তার ফর্সা-শ্যামলা মুখটা এক
অপার্থিব সৌন্দর্যে ফুটে উঠেছে।
মা: "তুই বড় মিষ্টি কথা বলিস রে। তোর কথাগুলো শুনলে মনে হয় আমার সব দুঃখ ভুলে যাই। তোর বাবা তো কোনোদিন এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে একটা প্রশংসাও করেনি।"
আমি এবার তার দুই হাত ধরলাম। তার হাতের তালুটা বেশ ঠান্ডা ছিল। আমি আমার হাতের উষ্ণতা দিয়ে তার হাতটা গরম করার চেষ্টা করলাম।
আমি: "বাবা যা করেনি, আমি তা সব করব। তুমি কেবল আমাকে তোমার পাশে থাকতে দিও। আজ থেকে এই আকাশ, এই রাত—সবই আমাদের।"
মা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তার সেই কঠোর ধার্মিক চাহনি এখন অনেকটাই নরম হয়ে এসেছে। তিনি মাথা নিচু করে
আমার বুকের ওপর রাখলেন। আমি অনুভব করলাম তার গরম নিশ্বাস আমার টি-শার্টের ওপর দিয়ে হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।
ছাদের ওই নির্জনতায়, যেখানে কেবল আমরা দুজন আর মাথার ওপর বিশাল আকাশ—সেখানে আমাদের মধ্যকার সেই নিষিদ্ধ ভালো
লাগাটা এক নতুন মাত্রা পেল। মা হয়তো মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা চাইছিলেন, কিন্তু তার শরীর আর মন তখন আমার এই মায়াজালে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েছে।
ছাদের ওই ঝোড়ো বাতাস আর চাঁদের আলোয় আমাদের মধ্যে যে এক অদ্ভুত মায়াবী টান তৈরি হয়েছিল, মা হয়তো সেটা টের পেয়েছিলেন। তিনি বেশিক্ষণ সেই আবেশে নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। হয়তো তার ভেতরে থাকা সেই নীতিবোধ আর গাম্ভীর্য
আবার জেগে উঠল।
তিনি আলতো করে আমার বুকের ওপর থেকে তার মাথাটা সরিয়ে নিলেন এবং শাড়ির আঁচলটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিলেন।
মা: "অনেক রাত হয়েছে রিহাদ। এবার নিচে চল। কাল ভোরে আবার ইবাদতের জন্য উঠতে হবে, সংসারের কাজও আছে।"
মায়ের গলায় সেই চিরচেনা কঠোরতা আর শাসন ফিরে এসেছে। আমি বুঝতে পারলাম, বাবার সাথে কথা বলে তার মনে যে বিষাদ
জন্মেছিল, ছাদের এই বাতাস আর আমার সঙ্গ তাকে কিছুটা হলেও শান্ত করেছে। তিনি আবার নিজেকে সেই ধার্মিক আবরণে ঢেকে নিতে চাইছেন।
আমরা নিচে নেমে এলাম। ঘরের আবছা আলোয় আম্মুকে আবারও সেই গম্ভীর গৃহকর্ত্রীর মতো লাগছিল। তিনি তার রুমের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালেন।
আমি: "আম্মু, শরীরটা কি এখনো খারাপ লাগছে? একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দেব?"
মা দরজার হ্যান্ডেল ধরে আমার দিকে একবার তাকালেন। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য সেই তৃষ্ণা আর একাকীত্ব উঁকি দিল, কিন্তু তিনি নিজেকে সামলে নিলেন।
মা: "না বাবা, লাগবে না। তুই নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়। সারাদিন অনেক ধকল গেছে তোর ওপর দিয়ে। কাল সময়মতো উঠে যাস।"
মায়ের এই ভদ্র এবং গম্ভীর প্রত্যাখ্যান আমাকে মনে করিয়ে দিল যে, তাকে পুরোপুরি বশ করা এত সহজ নয়। তিনি যতোই আমার প্রতি
দুর্বল হোন না কেন, তার আদর্শ আর ব্যক্তিত্বের দেয়ালটা এখনো বেশ মজবুত।
তিনি রুমের ভেতরে ঢুকে গেলেন এবং দরজাটা হালকা করে ভেজিয়ে দিলেন। আমি ড্রয়িংরুমে একা দাঁড়িয়ে রইলাম। পুরো বাসায় এখন
গভীর নিস্তব্ধতা। কিন্তু আমি জানি, এই দরজার ওপাশে মা যখন বিছানায় একা শুয়ে থাকবেন, তখন তার মনেও ঠিক আমার মতোই ঝড়
বইবে। বাবার সেই শুষ্ক আলাপ আর আমার এই নিবিড় ছোঁয়া—এই দুইয়ের তুলনা তাকে সারারাত ঘুমাতে দেবে না।
আমি নিজের রুমে ফিরে এলাম। বিছানায় শুয়ে ভাবছিলাম আম্মুর সেই ৩৮-৩৬-৪০ এর ভরাট শরীরটার কথা, যা আজ কয়েকবার
আমার খুব কাছে এসেছিল। আমার মনে মনে এক গভীর ফ্যান্টাসি তৈরি হতে লাগল যে, একদিন হয়তো এই দরজার খিলটা আর বন্ধ
থাকবে না।
*******
পরদিন সকালে যখন আমার ঘুম ভাঙল, তখন রোদ বেশ কড়া হয়ে উঠেছে। আমি রুম থেকে বের হয়ে দেখলাম আম্মু রান্নাঘরে কাজ করছে।
তার পরনে একটা সাদা আর নীল রঙের সুতির কামিজ, মাথায় ওড়নাটা খুব ভদ্রভাবে জড়ানো।
আমি কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, কিন্তু আম্মু আমায় দেখেও না দেখার ভান করল। তার মুখে সেই প্রতিদিনের মতো কঠোর এবং গম্ভীর ভাব
ফিরে এসেছে। বোঝাই যাচ্ছে, কাল রাতের সেই ছাদের আলো আর রাস্তার ঘরোয়া দৃশ্যগুলোকে আম্মু একটা 'ভুল' হিসেবে দেখতে চাইছেন।
আমি: "আম্মু, নাস্তা রেডি? খুব খিদে পেয়েছে।"
আম্মু মুখ না ফিরিয়েই খুব ঠান্ডা গলায় বললেন— মা: "হ্যাঁ, টেবিলে রাখা আছে, খেয়ে নে। তারপর তোর পড়াশোনা নিয়ে বস। কাল বেশ
কিছু সময় তোর নষ্ট হয়েছে।"
আম্মুর এই ধারালো কথাগুলো শুনে আমি একটু অবাক হলাম। কাল রাতে যিনি আমার কাছে এসে দুঃখের কথা বলেছিলেন, আজ তিনি
একদম পাথরের মতো শক্ত। তিনি রুটিগুলো টেবিলে রাখতে রাখতে আমায় একবারও চোখ তুলে দেখলেন না। তার সেই ৩৮-৩৬-৪০
এর ভরাট শরীরের ভাঁজগুলো আজ সুতির ঢিলেঢালা কামিজের নিচে খুব সাদামাটা লাগছিল, যেন তিনি নিজেই তার রূপকে লুকিয়ে
রাখতে চাইছেন।
আমি: "আম্মু, কাল রাতের কথা কি তুমি ভুলে গেলে? ছাদে কত কথা হলো..."
আম্মু এবার আমার দিকে তাকালেন। তার চোখে এক ধরণের শাসন আর কঠোরতা। মা: "সেটা কালকের কথা ছিল রিহাদ। রাতের কথা
রাতেই শেষ হয়ে যাওয়া ভালো। আমি তোর মা, আর তুমি আমার ছেলে—এটাই একমাত্র সত্য। আর বাজে কথা না বলে নাস্তা কর।"
আমি বুঝলাম, আম্মু এখন তার নীতিবোধ আর ব্যক্তিত্ব দিয়ে নিজের মনের দুর্বলতাকে ঢেকে ফেলেছেন। তিনি যতোই কঠোর হোন না
কেন, আমি দেখলাম তার হাতের আঙুলগুলো একটু কাঁপছিল যখন তিনি পানির গ্লাসটা রাখলেন।
আমি নাস্তা করতে করতে ভাবছিলাম, আম্মুর এই কঠোরতার দেয়ালটাকে কীভাবে আবার ভাঙব। তিনি যতোই 'ভদ্র' থাকার চেষ্টা করুন,
তার ভেতরের সেই একাকী নারীকে আমি ঠিকই জাগিয়ে দিয়েছি।
বিকেলের দিকে বাসার পরিবেশটা যখন বেশ থমথমে, ঠিক তখন বাবার ভিডিও কল এল।
আম্মু তখন ড্রয়িংরুমে বসে একটা বই পড়ছিলেন। ফোনটা আসতেই তার গাম্ভীর্য আরও বেড়ে গেল।
তিনি সোফায় সোজা হয়ে বসে ওড়নাটা মাথায় ভালো করে টেনে নিলেন।
আম্মু কলটা রিসিভ করে ক্যামেরাটা আমাদের দুজনের দিকে ধরলেন। স্ক্রিনে বাবার হাসিমুখ দেখা গেল, কিন্তু প্রবাসের খাটুনিতে তার চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
বাবা: "কী খবর তোমাদের? রিহাদ, পড়াশোনা কেমন চলছে রে?"
আমি হাসিমুখে উত্তর দিলাম, "ভালো বাবা। তুমি কেমন আছো?"
বাবা কিছুক্ষণ আমার সাথে কথা বলার পর আম্মুর দিকে তাকালেন। আম্মু তখনো একদম শান্ত, মুখে সেই পাথুরে গাম্ভীর্য।
বাবা: "রুনু, তোমাকে আজ খুব ক্লান্ত লাগছে। শরীর ঠিক আছে তো? শোনো রিহাদ, আমি তো দেশে নেই, তোর আম্মুর খেয়াল কিন্তু
তোকেই রাখতে হবে। ও মুখে কিছু বলে না, কিন্তু ও খুব একা হয়ে পড়ে। ওর ছোটখাটো সব আবদার পূরণ করিস, ওকে আগলে রাখিস।
এটাই এখন তোর বড় দায়িত্ব।"
বাবার এই কথাটা শোনার পর আমার আর আম্মুর মধ্যে এক সেকেন্ডের জন্য চোখাচোখি হলো। বাবার নিজের মুখ থেকেই যেন আমার
সব কাজের বৈধতা চলে এল। আম্মু একটু অস্বস্তিতে পড়ে চোখ সরিয়ে নিলেন।
মা: (নিচু স্বরে) "তুমি নিজের কাজের চিন্তা করো, রিহাদ আমার খেয়াল রাখছে। তুমি সাবধানে থেকো।"
বাবা আরও কিছু উপদেশ দিয়ে কলটা শেষ করলেন। ফোনটা কাটার পর ড্রয়িংরুমে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। আম্মু স্তব্ধ হয়ে
বসে রইলেন। বাবার সেই "খেয়াল রাখার" কথাগুলো যেন আমাদের দুজনের কানেই প্রতিধ্বনি হচ্ছিল।
আমি একটু সাহস বাড়িয়ে আম্মুর একদম পাশে গিয়ে বসলাম। তার সেই ভরাট শরীরটা এখন একটু আড়ষ্ট হয়ে আছে।
আমি: "শুনলে তো বাবা কী বললেন? এখন থেকে তোমার সব দায়িত্ব কিন্তু আমার। তুমি যতোই কঠোর হওয়ার অভিনয় করো না কেন
আম্মু, আমি জানি তোমার মনের ভেতরটা কতটা নরম।"
আম্মু এবারও তার গাম্ভীর্য বজায় রাখার শেষ চেষ্টা করলেন। মা: "তোর বাবা ওসব এমনিতেই বলেছে। তুই বেশি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা
করিস না।"
কিন্তু আমি দেখলাম, আম্মু এবার আর আমার দিক থেকে শরীরটা সরিয়ে নিলেন না। বাবার ওই অনুরোধটা যেন আম্মুর মনের ভেতরের
সেই কঠোর দেয়ালটাতে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। আমি আলতো করে তার কাঁধের ওপর হাত রাখলাম। সুতির কামিজের ওপর দিয়ে তার শরীরের সেই পক্কতা অনুভব করতে করতে আমি হাসলাম।
আমি: "বাবার কথা তো অমান্য করা যাবে না আম্মু। আজ থেকে আমি তোমাকে একটু অন্যভাবে আগলে রাখব, যেভাবে বাবা কোনোদিন পারেনি।"
আম্মু কোনো উত্তর দিলেন না, শুধু একটা গভীর নিশ্বাস নিলেন।
বাবার ভিডিও কলটা কেটে যাওয়ার পর ড্রয়িংরুমে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। আম্মু জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন, যেন
তিনি নিজের ভেতরের অস্থিরতা আড়াল করতে চাইছেন। আমি সোফায় তার খুব কাছাকাছি বসলাম। বাবার সেই "খেয়াল রাখার" কথাটা
যেন আমাকে এক অদৃশ্য লাইসেন্স দিয়ে দিয়েছে।
আমি খুব ধীর আর শান্ত গলায় বললাম,
আমি: "আম্মু, একটা কথা বলি? তুমি সারাটা জীবন শুধু আমাদের কথা ভেবেই কাটিয়ে দিলে। বাবার ফোন এলেই তুমি শুধু হিসাব আর
দায়িত্বের কথা বলো। কিন্তু তোমার নিজেরও তো একটা মন আছে, তাই না?"
আম্মু কোনো উত্তর দিলেন না, শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন। আমি তার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিলাম। তার নরম
আঙুলগুলো শিউরে উঠল, কিন্তু তিনি হাতটা সরিয়ে নিলেন না।
আমি: "বাবা যেহেতু আমাকে তোমার খেয়াল রাখার দায়িত্ব দিয়েছেন, আমি চাই তুমি আমাকে তোমার মনের কথাগুলো বলো। তোমার
কী ভালো লাগে, কী অপছন্দ—সব আমাকে বলবে। আমি চাই না তুমি এই বড় বাড়িতে নিজেকে একটা আসবাবপত্রের মতো মনে করো।
তোমার ভেতরের যে নারীটি দিনের পর দিন একা থেকেছে, আমি তাকে আবার হাসাতে চাই।"
আম্মু এবার আমার দিকে তাকালেন। তার চোখে সেই কঠোরতা আর নেই, বরং এক ধরণের আর্দ্রতা। তার সেই ফর্সা-শ্যামলা মুখে একটা ম্লান হাসি ফুটে উঠল।
মা: "তোর মতো করে আমাকে কেউ কোনোদিন এসব জিজ্ঞেস করেনি রে রিহাদ। সবাই শুধু জানতে চেয়েছে আমি ঠিকমতো সংসার
সামলাচ্ছি কি না। কিন্তু আমার কী ইচ্ছে করে, তা কেউ জানতে চায়নি।"
আমি তার হাতের ওপর নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে আলতো করে ঘষতে লাগলাম। তার শরীরের সেই পক্কতা আর উষ্ণতা আমার ভেতরে
এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দিচ্ছিল।
আমি: "এখন থেকে আমি জানব আম্মু। তোমার পছন্দের নীল রঙ, তোমার সেই গজরার ঘ্রাণ, কিংবা তোমার ছোট ছোট সব ভালো লাগা
—আমি সব শুনতে চাই।
আজ থেকে আমাদের মধ্যে কোনো পর্দা থাকবে না। তুমি শুধু মা নও, তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।"
আম্মু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
মা: "তুই বড় বেশি আদুরে কথা বলিস রিহাদ। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, তুই আমার সব জেদ আর নিয়মগুলো ভেঙে দিবি।"
আমি মনে মনে হাসলাম। আমি জানতাম, আম্মুর এই স্বীকারোক্তিই আমার জন্য বড় জয়। তিনি যতোই ভদ্র এবং গম্ভীর থাকার চেষ্টা
করুন, তার মনের কপাট এখন আমার জন্য খুলতে শুরু ......
golpo ta kamon lagche janate vulben naa...