অপেক্ষার তেরো বছর... - অধ্যায় ৪
রিহাদ আম্মুর হাতের ওপর চাপ বাড়িয়ে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। আম্মু এবার আর বাধা দিলেন না, বরং এক ধরণের ক্লান্তিতে
রিহাদের কাঁধের ওপর নিজের মাথাটা এলিয়ে দিলেন।
রিহাদ (ফিসফিস করে): বাবা তো বলেই দিলেন আম্মু—তোমাকে আগলে রাখার দায়িত্ব এখন আমার। আর আমি তোমাকে শুধু
আগলে রাখব না, তোমার এই একাকীত্বের প্রতিটা মুহূর্ত আমি ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দেব।
মা (জড়ানো কণ্ঠে): জানি না রিহাদ, তুই কী যাদু জানিস। তোর সামনে এলে আমার সব গাম্ভীর্য কেন জানি ধুলোয় মিশে যায়। মনে হয়,
আমি সেই ছোটবেলার মতো কারও ওপর নির্ভর করতে চাইছি।
রিহাদ এবার আম্মুর সেই স্বেদে ভেজা (sweaty) কপাল থেকে চুলের একটা গোছা সরিয়ে দিল। আম্মুর শরীরের সেই ৩৮-৩৬-৪০ এর
ভরাট অবয়বটা এখন রিহাদের একদম সাথে লেপ্টে আছে। রিহাদ অনুভব করতে পারছিল আম্মুর হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক
বেশি দ্রুত।
রিহাদ: আম্মু, চল রুমে চল। এখানে বসে থাকতে ভালো লাগছে না। আমি আজ তোমাকে নিজের হাতে খাইয়ে দেব, আর তুমি আমাকে
ছোটবেলার মতো গল্প শোনাবে।
আম্মু কোনো কথা বললেন না, শুধু রিহাদের চোখের দিকে তাকালেন। সেই চোখে এখন আর কোনো শাসন নেই, আছে কেবল এক
ধরণের নীরব সম্মতি। তারা দুজনে যখন উঠে দাঁড়াল, রিহাদ খুব কৌশলে আম্মুর কোমরের সেই ভরাট অংশে নিজের হাতটা রাখল।
এবার আর আম্মু বিদ্যুৎবেগে হাতটা সরিয়ে দিলেন না। বরং তিনি রিহাদের সেই স্পর্শটুকু যেন নিজের অবচেতনেই গ্রহণ করে নিলেন।
রিহাদ আর কোনো দ্বিধা না রেখে আম্মুর কাঁধের ওপর নিজের হাতটা রাখল। সুতির পাতলা কামিজের ওপর দিয়ে আম্মুর শরীরের তপ্ত
উত্তাপ রিহাদের হাতের তালুতে এসে লাগছে।
রিহাদ: আম্মু, বাবার ওই ফোন কলটার পর তুমি কি এখনো নিজেকে অপরাধী ভাবছো? বাবা তো নিজেই আমাকে তোমার দায়িত্ব নিতে বলেছেন।
মা (মৃদু স্বরে): দায়িত্ব মানে তো এমনভাবে কাছে আসা নয় রে রিহাদ... লোকে শুনলে কী বলবে? তুই আমার নিজের সন্তান...
রিহাদ: লোকে জানে না আম্মু যে তুমি প্রতিটা রাত কতটা একা কাটাও। লোকে দেখে তোমার গাম্ভীর্য, কিন্তু আমি দেখি তোমার ওই চোখের জল আর শরীরের এই চাপা হাহাকার।
রিহাদ কথাগুলো বলতে বলতে আম্মুর চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। আম্মুর মুখে এখন বিন্দু বিন্দু ঘাম (sweat) জমেছে, যা নাইট
ল্যাম্পের আলোয় চিকচিক করছে। রিহাদ নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে সেই ঘামটুকু মুছে দিল। আম্মুর ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছিল।
রিহাদ যখন আরও কাছে আসার চেষ্টা করল, ঠিক তখনই আম্মুর শরীরের ভেতরকার সেই পুরনো সংস্কার আর নীতিবোধ এক ঝটকায়
জেগে উঠল। তিনি দুই হাত দিয়ে রিহাদকে আলতো করে ঠেলে একটু সরে গেলেন।
আম্মুর ঘন নিশ্বাস তখনও পড়ছিল, কিন্তু তাঁর চোখের সেই ঘোরলাগা ভাবটা কেটে গিয়ে সেখানে এক ধরণের আত্মগ্লানি আর সতর্কতা
ফিরে এল। তিনি বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালেন, নিজের এলোমেলো ওড়নাটা দ্রুত গায়ে জড়িয়ে নিলেন।
মা (গম্ভীর এবং ধরা গলায়): না রিহাদ, এভাবে নয়। তুই যা করছিস সেটা ঠিক হচ্ছে না। বাবার ফোন কলটা তোকে দায়িত্ব দিতে
বলেছে, তার মানে এই নয় যে তুই আমার শরীরের ওপর অধিকার ফলাবি।
[*]রিহাদ (একটু দমে গিয়ে): কিন্তু আম্মু, তুমি তো নিজেই বললে যে তুমি একা... তুমি তো আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলে।
[*]মা: "সেটা আবেগের মুহূর্ত ছিল। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি আমরা ভুল করছি। আমি তোর মা, রিহাদ। এই সত্যটা ভুলে গেলে আমাদের আর কোনো সম্মান থাকবে না।"
রিহাদ বিছানায় বসেই দেখছিল আম্মুর সেই ৩৮-৩৬-৪০ এর ভরাট শরীরের কম্পন। আম্মু যতোই মুখ ফিরিয়ে রাখুন না কেন, তাঁর
পিঠের সেই স্বেদে ভেজা ভাবটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। রিহাদ জানত, আম্মু এখন নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করছেন।
রিহাদ: "তুমি যতোই সরে যাও না কেন আম্মু, তোমার শরীর আর মন কিন্তু অন্য কথা বলছে। বাবার ওই শুকনো কথাবার্তা তোমাকে
কোনোদিন এই শান্তি দিতে পারবে না যা আমি পারি।"
আম্মু কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি রেলিং ধরে বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর পায়ের সেই রূপালি নূপুর এখন আর বাজছে
না, যেন নিস্তব্ধতা পালন করছে।
ঘরটা এখন এক অস্বস্তিকর নীরবতায় ছেয়ে গেছে। রিহাদ বুঝতে পারল, আজ রাতে জোর করে কিছু করা যাবে না। তাকে ধাপে ধাপে এগোতে হবে।
রিহাদ: "ঠিক আছে আম্মু, তুমি যদি চাও আমি সরে যাচ্ছি। কিন্তু মনে রেখো, কাল সকালে যখন তুমি আবার ওই আয়নার সামনে দাঁড়াবে, তখন আমার এই স্পর্শগুলোর কথাই তোমার বারবার মনে পড়বে।"
রিহাদ উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল। কিন্তু যাওয়ার আগে সে দেখল, আম্মু আড়চোখে একবার তার দিকে তাকালেন। সেই
চাহনিতে বিরক্তি নয়, বরং এক ধরণের না পাওয়া আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে ছিল।
পরদিন সকালে যখন রিহাদের ঘুম ভাঙল, জানালার ফাঁক দিয়ে আসা রোদে ঘরটা ঝলমল করছে। গতরাতের সেই নিষিদ্ধ টানটান
উত্তেজনা, আম্মুর সেই স্বেদে ভেজা শরীরের ঘ্রাণ আর নূপুরের শব্দের রেশ যেন এখনো ঘরে লেগে আছে। কিন্তু রিহাদ যখন ড্রয়িংরুমে
এল, দেখল সব কিছু অদ্ভুতভাবে স্বাভাবিক।
রান্নাঘর থেকে প্রেশার কুকারের শব্দ আসছে। আম্মু নাস্তা বানাচ্ছেন। তাঁর পরনে আজ একটি ছিমছাম হালকা ল্যাভেন্ডার রঙের সুতির
কামিজ, চুলে একটি সাধারণ ক্লিপ আটকানো। গতরাতের সেই এলোমেলো ভাব বা চোখের সেই ঘোর এখন আর নেই।
রিহাদ ডাইনিং টেবিলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আম্মু রুটি আর ভাজি নিয়ে টেবিলে আসলেন।
রিহাদ: "শুভ সকাল আম্মু। ঘুম ভালো হয়েছে?"
মা (একদম স্বাভাবিক গলায়): "হ্যাঁ, ভালোই। তুই ফ্রেশ হয়ে আয়, নাস্তা বেড়ে রেখেছি। আজ তোর চা-টা একটু কড়া করে দিয়েছি।"
আম্মুর কণ্ঠে বা চোখে কোনো অস্বস্তি নেই। যেন গত রাতে ড্রয়িংরুমের সেই নিবিড় মুহূর্ত বা বেডরুমে রিহাদের হাত ধরে তাঁর কেঁদে
ফেলা—এসব কিছুই ঘটেনি। তিনি খুব স্বাভাবিকভাবে প্লেটগুলো গুছিয়ে রাখছেন।
রিহাদ অবাক হয়ে আম্মুর দিকে তাকিয়ে রইল। আম্মুর এই ৩৮-৩৬-৪০ এর ভরাট শরীরটা সকালের আলোয় আরও সতেজ লাগছে। সে
ভাবছিল, মানুষ কীভাবে এতো দ্রুত নিজেকে পাল্টে ফেলতে পারে!
রিহাদ: "আম্মু, গত রাতে কিন্তু তুমি...
মা (কথা কেড়ে নিয়ে, শান্তভাবে): "রিহাদ, রাতের কথা রাতে শেষ করাই ভালো। এখন দিন শুরু হয়েছে।
আজ অনেক কাজ আছে—তোর কিছু কাপড় ধুতে হবে, আর ফ্রিজটা একটু পরিষ্কার করা দরকার। ওসব আজেবাজে চিন্তা না করে
নাস্তাটা খেয়ে নে।"
আম্মু যখন রুটিটা রিহাদের প্লেটে দিলেন, তখন একবারের জন্য রিহাদের আঙুলের সাথে আম্মুর আঙুল ছুঁয়ে গেল। রিহাদ দেখল, আম্মুর
চোখের পাতা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল, কিন্তু তিনি পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে অন্য কাজে মন দিলেন।
রিহাদ বুঝতে পারল, আম্মু বাইরে যতোই স্বাভাবিক থাকার ভান করুন না কেন, ভেতরে ভেতরে তিনি ঠিকই বদলে গেছেন। তাঁর সেই
নূপুর আজ শাড়ির নিচে ঢাকা পড়লেও, হাঁটার সময় তার মৃদু আওয়াজ রিহাদকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে—সবকিছু স্বাভাবিক দেখালেও
আসলে কিছুই আগের মতো নেই।
বাবার সেই "খেয়াল রাখার" দায়িত্বটা রিহাদের মাথায় ঘুরছে। সে মনে মনে হাসল। আম্মু এখন যতোই 'মা' সাজার চেষ্টা করুন, গতরাতের
সেই স্পর্শের দাগগুলো মুছে ফেলা এতো সহজ নয়।
দুপুরের খাবারের পর বাড়িটা এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। বাইরে রোদের তেজ বাড়ছে, আর ঘরের ভেতরে এসি বা ফ্যানের
একটানা শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। রিহাদ তার রুমে শুয়ে ভাবছিল—আম্মু সকালে যতোই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করুক না
কেন, কাল রাতের ঘটনাগুলো তাঁদের দুজনের মনেই গেঁথে আছে।
বিকেলের দিকে রিহাদ দেখল আম্মু ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে একা একা একটা ম্যাগাজিন উল্টাচ্ছেন। তাঁর সেই গম্ভীর আর শান্ত রূপটা
যেন পুরো ঘরকে শাসন করছে। রিহাদ আলতো পায়ে গিয়ে আম্মুর পাশে বসল।
রিহাদ: "কী পড়ছো আম্মু? একা একা বোর হচ্ছো না?"
মা (বই থেকে চোখ না সরিয়েই): "না রে, সময় কাটছে। তুই ঘুমাসনি?"
রিহাদ: "ঘুম আসছে না। আম্মু, চলো না আজ বিকেলে আমরা একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি?
রিকশায় করে হুড ফেলে ঘুরলে তোমার মনটা ভালো হয়ে যাবে।"
আম্মু এবার ম্যাগাজিনটা বন্ধ করে রিহাদের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে এক মুহূর্তের জন্য সেই পুরনো দ্বিধা উঁকি দিল, কিন্তু তিনি এবার আর কঠোর হলেন না।
মা: "এখন এই রোদে বাইরে যাবি? তার চেয়ে বরং ঘরে বসে থাকাই ভালো।"
রিহাদ: "আরে না, রোদ কমে যাবে। তুমি সুন্দর একটা শাড়ি পরে রেডি হও তো। বাবা নেই বলে কি তুমি সারাজীবন এই চার দেয়ালের
ভেতরেই কাটিয়ে দেবে?"
রিহাদের এই সহজ আর আবদারমাখা কথাগুলো আম্মুর মনের দেয়ালটা আবার একটু শিথিল করে দিল। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হাসলেন।
মা: "তুই বড় জেদি হয়েছিস। আচ্ছা ঠিক আছে, যা... আমি রেডি হচ্ছি। কিন্তু বেশি দেরি করা যাবে না, সন্ধ্যায় আবার রান্নার ঝামেলা আছে।"
রিহাদ খুশিতে আম্মুর হাতটা এক সেকেন্ডের জন্য চেপে ধরল। আম্মু এবার হাতটা সরিয়ে নিলেন না, শুধু একটু লজ্জিত হয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
আধা ঘণ্টা পর আম্মু ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। রিহাদ অপলক তাকিয়ে রইল। আম্মু আজ একটি হালকা নীল রঙের জামদানি পরেছেন। কপালে ছোট একটা টিপ, আর হাতে সেই প্রিয় লাল চুড়িগুলো।
তাঁর সেই ৩৮-৩৬-৪০ এর ভরাট শরীরটা শাড়ির ভাঁজে আজ আরও বেশি আকর্ষণীয় লাগছে।
হাঁটার সময় আম্মুর পায়ের সেই রূপালি নূপুর আবার ঝমঝম করে বেজে উঠল।
রিহাদ: "তোমাকে আজ একদম পরীর মতো লাগছে আম্মু। সত্যি বলছি, তোমাকে দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না যে তোমার আমার
মতো এতো বড় একটা ছেলে আছে।"
আম্মু একটু আড়চোখে রিহাদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
মা: বেশি কথা না বলে চল। নিচে রিকশা ডাক।
রিকশাটা যখন একটু ফাঁকা রাস্তায় এল, রিহাদ আলতো করে রিকশার হাতলের ওপর রাখা আম্মুর হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখল।
রিহাদ: "আম্মু, দেখো আকাশটা কত পরিষ্কার। এই যে নীল শাড়ি পরেছ, একদম আকাশের সাথে মিশে গেছ তুমি।"
মা (একটু লজ্জা পেয়ে): "তুই না রিহাদ... সব সময় বাড়িয়ে বলিস। রিকশায় ওভাবে হাত ধরিস না, মানুষ দেখবে।"
মুখে বারণ করলেও আম্মু হাতটা সরিয়ে নিলেন না। বরং রিহাদের আঙুলের চাপে তিনি আরও একটু ঘনিষ্ট হয়ে বসলেন। রিকশার
ঝাঁকুনিতে আম্মুর সেই ৩৮-৩৬-৪০ এর ভরাট শরীরের ছোঁয়া রিহাদ বারবার অনুভব করছিল। আম্মুর হাতের লাল চুড়িগুলো রিকশার
হাতলের সাথে লেগে টুংটাং শব্দ করছিল।
কিছুক্ষণ ঘোরার পর তারা ধানমণ্ডি লেকের এক কোণায়, যেখানে ভিড় একটু কম, সেখানে গিয়ে নামল।
লেকের পাড়ে সিমেন্টের বাঁধানো বেঞ্চে তারা পাশাপাশি বসল। সামনের টলটলে পানিতে বিকেলের রোদের প্রতিচ্ছবি চিকচিক করছে।
রিহাদ: "জানো আম্মু, ছোটবেলায় তুমি যখন আমাকে পার্কে নিয়ে আসতে, আমি তোমার আঙুল শক্ত করে ধরে রাখতাম। আজ ঠিক
উল্টোটা হচ্ছে—আমি চাচ্ছি তুমি আমার হাতটা ধরে রাখো।"
আম্মু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লেকের পানির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে এক ধরণের প্রশান্তি। তিনি ধীরে ধীরে রিহাদের
হাতের মুঠোয় নিজের হাতটা রাখলেন।
মা: "তোর বাবা থাকলে আজ হয়তো এভাবে বসা হতো না। সে তো এসেই শুধু বাজারের ফর্দ আর টাকা-পয়সার হিসেব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
এই যে শান্তিতে একটু বসা, এটাই তো আমি ভুলে গিয়েছিলাম।"
রিহাদ আড়চোখে আম্মুর দিকে তাকাল। বাতাসে আম্মুর কানের পাশের ছোট ছোট চুলগুলো উড়ছে। নীল শাড়িতে আম্মুর সেই উজ্জ্বল
শ্যামলা রূপ আজ যেন পূর্ণতা পেয়েছে। আম্মু যখন হাসছেন, তাঁর গালের টোলটা রিহাদকে মুগ্ধ করে দিচ্ছিল।
রিহাদ: "বাবা অনেক কিছু মিস করে আম্মু। তোমার এই হাসি, তোমার এই সুন্দর মন—সবকিছুই তো সে অবহেলা করে। আমি কথা
দিচ্ছি, এই দুই মাস আমি তোমাকে একদিনের জন্যও একা অনুভব করতে দেব না।"
আম্মু রিহাদের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো শাসন ছিল না, ছিল একরাশ মমতা আর গভীর এক ধরণের আশ্রয়
পাওয়ার আনন্দ। আম্মুর পায়ের রূপালি নূপুর পা নাড়ানোর সাথে সাথে মৃদু শব্দ তুলছিল।
সূর্যটা যখন ডুবুডুবু, তখন আম্মু বললেন, "এবার চল রিহাদ, রাত হয়ে যাচ্ছে। বাসায় গিয়ে আবার রান্নাবান্না করতে হবে।"
রিহাদ আম্মুর কাঁধে হাত রেখে বলল, "আজ আর রান্না করতে হবে না আম্মু। আজ আমরা বাইরে থেকেই খাবার নিয়ে যাব। আজ শুধু
তুমি আর আমি আড্ডা দেব।"
রিকশায় ফেরার পথে আম্মু নিজেই রিহাদের কাঁধে মাথা রাখলেন। তাঁর শরীরের সেই পরিচিত গজরার সুগন্ধ আর বিকালের স্নিগ্ধতা মিলে
এক অপূর্ব মায়াবী পরিবেশ তৈরি হলো। কোনো কথা না হলেও তাঁদের এই নীরবতা যেন অনেক না বলা কথা বলে দিচ্ছিল।
বাসায় ফেরার পর আম্মুর মধ্যে সেই গম্ভীর ভাবটা আর নেই, বরং তাঁর চোখেমুখে এখন এক ধরণের কোমলতা আর নির্ভরতা।
রিহাদ ড্রয়িংরুমে বসে টিভিতে একটা সিনেমা দেখছিল, এমন সময় আম্মু তাঁর ঘর থেকে বের হয়ে এলেন।
আম্মু এবার আর শাড়ি পরেননি। নীল জামদানিটা ছেড়ে তিনি একটা হালকা গোলাপি রঙের সুতির সালোয়ার কামিজ পরেছেন।
ঢিলেঢালা পোশাকেও তাঁর শরীরের সেই ৩৮-৩৬-৪০ এর ভরাট বাঁকগুলো বেশ স্পষ্ট। ওড়নাটা কাঁধের ওপর আলগা করে রাখা। তাঁর
ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়ানো, যা দেখে বোঝা যাচ্ছিল তিনি ফ্রেশ হয়েছেন।
আম্মু রিহাদের কাছে এসে সোফার এক কোণে বসলেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি খুব দ্বিধার মধ্যে আছেন, কিছু একটা বলতে চাইছেন কিন্তু লজ্জায় বলতে পারছেন না। তাঁর ফর্সা-শ্যামলা মুখটা কেন জানি একটু লাল হয়ে উঠেছে।
রিহাদ: "কী হয়েছে আম্মু? কিছু বলবে?"
মা (চোখ নামিয়ে, নিচু স্বরে): "আসলে... রিহাদ, একটা দরকার ছিল। আমি তো বুঝতে পারিনি কাল-পরশুর মধ্যে শরীরটা এমন হবে..."
রিহাদ একটু অবাক হয়ে আম্মুর দিকে তাকাল। আম্মু লজ্জায় তাঁর কামিজের কোণাটা আঙুলে পেঁচাতে লাগলেন।
মা: "আমার... আমার বোধহয় period শুরু হতে যাচ্ছে। একটু শরীরটা খারাপ লাগছে। ঘরে একদমই কিছু নেই। তুই কি একটু কষ্ট করে নিচে যাবি? আমার জন্য কয়েকটা 'প্যাড' আর... আর একটা 'রেজর' নিয়ে আসতিস?"
'রেজর' আর 'প্যাড'-এর কথা বলতে গিয়ে আম্মুর গলার স্বর একদম ক্ষীণ হয়ে এল। তিনি কোনোদিন তাঁর ছেলের কাছে এসব ব্যক্তিগত জিনিসের আবদার করেননি। লজ্জায় তাঁর ঘাড় আর কান লাল হয়ে উঠেছে। আম্মুর এই অসহায় আর লাজুক রূপটা রিহাদের কাছে খুব মায়াবী লাগল।
রিহাদ (সহজভাবে): "আরে আম্মু, এতে লজ্জা পাওয়ার কী আছে? তুমি বসো, আমি এখনই গিয়ে নিয়ে আসছি। আর কিছু লাগবে? কোনো পেইনকিলার বা চকলেট?"
মা (একটু অবাক হয়ে): "না রে, আর কিছু লাগবে না। তুই জাস্ট সাবধানে গিয়ে নিয়ে আয়। দোকানদার যেন আবার অন্য কিছু না
ভাবে..."
রিহাদ হাসল। সে বুঝল, আম্মু এখনো এই আধুনিক সময়ে এসেও পুরোনো সংস্কারের কারণে এই স্বাভাবিক বিষয়গুলোতে লজ্জা পাচ্ছেন।
রিহাদ যখন ওঠার জন্য তৈরি হলো, সে দেখল আম্মু সোফায় একটু কুঁকড়ে বসে আছেন। পিরিয়ডের আগের সেই অস্বস্তি আর পেটে
ব্যথার ছাপ তাঁর মুখে স্পষ্ট।
রিহাদ যাওয়ার আগে আম্মুর কপালে হাত দিয়ে দেখল।
রিহাদ: "গা তো বেশ গরম আম্মু। তুমি শুয়ে থাকো। আমি ১০ মিনিটের মধ্যে আসছি।"
আম্মু রিহাদের এই যত্ন দেখে মনে মনে খুব শান্তি পেলেন। তিনি ভাবলেন, তাঁর স্বামী প্রবাসে থাকায় এই কঠিন দিনগুলোতে তাঁকে একাই
সব সামলাতে হতো, কিন্তু আজ তাঁর ছেলে তাঁর পাশে আছে—একদম বন্ধুর মতো।
মা ডাইনিং চেয়ারে বসলেন। রিহাদ জোর করে আম্মুর পাতে বড় এক পিস ডিম আর অনেকটা খিচুড়ি তুলে দিল।
রিহাদ: "লক্ষ্মী মেয়ের মতো সবটা খেয়ে নাও তো আম্মু। তোমার শরীরে এখন পুষ্টি দরকার।"
মা (হেসে ফেলে): "তোর বাবাও তো আমাকে এভাবে কোনোদিন শাসন করেনি রে। তুই তো দেখছি একদম বাড়ির বড় কর্তা হয়ে গেছিস!"
খাবার টেবিলের সেই সাধারণ মুহূর্তটা ছিল খুব সুন্দর আর ঘরোয়া। কোনো নিষিদ্ধ উত্তেজনা নয়, বরং মা আর ছেলের মাঝে এক গভীর
বন্ধুত্ব ফুটে উঠছিল। রিহাদ তার হোস্টেলের মজার মজার সব গল্প বলছিল, আর আম্মু সব ভুলে প্রাণখুলে হাসছিলেন। আম্মুর হাতের
লাল চুড়িগুলো খাওয়ার সময় প্লেটের সাথে লেগে টুংটাং শব্দ করছিল, যা এই পরিবেশটাকে আরও মিষ্টি করে তুলেছিল।
খাওয়া শেষ করে রিহাদ জোর করে আম্মুকে সোফায় বসিয়ে দিল আর নিজে সব বাসন ধুয়ে পরিষ্কার করে ফেলল। তারপর আম্মুকে তাঁর
ঘরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এল।
রিহাদ: "জিনিসগুলো (প্যাড আর রেজর) ঠিক জায়গায় রেখেছো তো? রাতে কোনো অসুবিধা হলে আমাকে কিন্তু অবশ্যই ডাকবে।"
মা (একটু লজ্জামাখা হেসে): "রেখেছি বাবা। তুই অনেক করলি আজ আমার জন্য। যা, এবার নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়।"
আম্মু তাঁর ঘরে গিয়ে পাতলা একটা কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়লেন। পিরিয়ডের অস্বস্তিটা এখন রিহাদের দেওয়া সেই আদা-চা আর
মমতায় অনেকটাই কমে এসেছে। তাঁর পায়ের সেই রূপালি নূপুর বিছানার চাদরে স্থির হয়ে থাকল।